21. চিরদিনের | সুকান্ত ভট্টাচার্য
21. চিরদিনের | সুকান্ত ভট্টাচার্য - WBBSE - Class 7 - বাংলা
৭৩
চিরদিনের
সুকান্ত ভট্টাচার্য
এখানে বৃষ্টিমুখর লাজুক গাঁয়ে এসে থেমে গেছে ব্যস্ত ঘড়ির কাঁটা, সবুজ মাঠেরা পথ দেয় পায়ে পায়ে পথ নেই, তবু এখানে যে পথ হাঁটা। জোড়া দিঘি, তার পাড়েতে তালের সারি দূরে বাঁশঝাড়ে আত্মদানের সাড়া, পচা জল আর মশায় অহংকারী নীরব এখানে অমর কিষাণপাড়া। এ গ্রামের পাশে মজা নদী বারো মাস বর্ষায় আজ বিদ্রোহ বুঝি করে, গোয়ালে পাঠায় ইশারা সবুজ ঘাস এ গ্রাম নতুন সবুজ ঘাগরা পরে। রাত্রি এখানে স্বাগত সান্ধ্য শাঁখে কিষাণকে ঘরে পাঠায় যে আল-পথ; বুড়ো বটতলা পরস্পরকে ডাকে সন্ধ্যা সেখানে জড়ো করে জনমত।
দুর্ভিক্ষের আঁচল জড়ানো গায়ে এ গ্রামের লোক আজো সব কাজ করে, কৃষক-বধূরা ঢেঁকিকে নাচায় পায়ে প্রতি সন্ধ্যায় দীপ জ্বলে ঘরে ঘরে। রাত্রি হলেই দাওয়ার অন্ধকারে ঠাকুমা গল্প শোনায় যে নাতনিকে, কেমন করে সে আকালেতে গতবারে, চলে গেল লোক দিশাহারা দিকে দিকে। এখানে সকাল ঘোষিত পাখির গানে কামার, কুমোর, তাঁতি তার কাজে জোটে, সারাটা দুপুর ক্ষেতের চাষির কানে একটানা আর বিচিত্র ধ্বনি ওঠে। হঠাৎ সেদিন জল আনবার পথে কৃষক-বধূ সে থমকে তাকায় পাশে, ঘোমটা তুলে সে দেখে নেয় কোনোমতে, সবুজ ফসলে সুবর্ণ যুগ আসে ৷৷
৭৪
শব্দার্থ 📖
বৃষ্টিমুখর—বৃষ্টিপতনের ধ্বনিপূর্ণ। ঘোষিত—প্রচারিত। আত্মদান—পরার্থে নিজের জীবন দান। ঢেঁকি—ধান ভানবার যন্ত্রবিশেষ। মজা নদী—বুজে যাওয়া নদী। দাওয়া—বারান্দা, রোয়াক। সান্ধ্য—সন্ধ্যাকালীন। আকাল—দুর্ভিক্ষ, দুঃসময়। কিষান—কৃষাণ, কৃষক, চাষি। দিশাহার—দিভ্রান্ত, কিংকর্তব্যবিমূঢ়। জনমত—সাধারণ বা অধিকাংশ লোকের অভিমত। ধ্বনি—শব্দ, রব।
১. নীচের শব্দগুলির অন্তত দুটি অর্থ লেখো এবং দুটি পার্থক্য বাক্যে প্রয়োগ করো : কাঁটা, তাল, জোড়া, সারি, মজা, পাশ।
২. নীচের শব্দযুগলের অর্থ পার্থক্য নির্দেশ করে দুটি আলাদা বাক্য তৈরি করো : কাঁটা পার জড়ো সব দীপ কাটা পাড় জড় শব দ্বীপ
৩. ঠিক বানানটি বেছে নাও: ব্যাস্ত/ব্যস্ত, সান্ধ্য/সান্ধ, দূর্ভিক্ষ/দুর্ভিক্ষ, বধু/বন্ধু, ধ্বনি/ধনি, সুবর্ণ/সুবর্ন।
৪. নীচের শব্দগুলির কোনটি বিশেষ্য এবং কোনটি বিশেষণ বাছাই করে আলাদা দুটি স্তম্ভে সাজাও। এরপর বিশেষ্যগুলির বিশেষণের রূপ এবং বিশেষণগুলির বিশেষ্যের রূপ লেখো: লাজুক, ব্যস্ত, মাঠ, সন্ধ্যা, গ্রাম, ঘর, ঘোষিত, চাষি, জল, ফসল।
৫. বিপরীতার্থক শব্দ লেখো: মুখর, অহংকারী, অন্ধকার, একটানা, বিচিত্র।
সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯২৬-১৯৪৭) : বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রতিভাধর ও জনপ্রিয় কবি। 'কিশোর কবি' নামে পরিচিত। বাংলা কবিতায় তিনি সাম্যবাদী চেতনার বিস্তার ঘটান। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ 'ছাড়পত্র', 'ঘুম নেই', 'পূর্বাভাস', 'মিঠে কড়া'। 'চিরদিনের' কবিতাটি তাঁর 'ঘুম নেই' কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত।
৭৫
৬. 'ঘড়ির কাঁটা'— এখানে 'ঘড়ি' আর 'কাঁটা', এই দুটি শব্দের মধ্যে সম্বন্ধ তৈরি করেছে 'র' বিভক্তিটি, 'ঘড়ির কাঁটা'-কে আমরা তাই বলবো সম্বন্ধ পদ। এই কবিতায় এই রকম আরো ক'টি উদাহরণ খুঁজে পাচ্ছো, লেখো। একটি করে দেওয়া হল— তালের সারি।
৭. সন্ধিবিচ্ছেদ করো : বৃষ্টি, অহংকার, স্বাগত, পরস্পর, দুর্ভিক্ষ।
৮. নিম্নরেখ পদগুলির কারক ও বিভক্তি নির্ণয় করো : ৮.১ রাত্রি এখানে স্বাগত সান্ধ্য শাঁখে। ৮.২ এখানে সকাল ঘোষিত পাখির গানে। ৮.৩ এ গ্রামের পাশে মজা নদী বারো মাস। ৮.৪ ঠাকুমা গল্প শোনায় যে নাতনিকে। ৮.৫ কৃষক-বধূরা ঢেঁকিকে নাচায় পায়ে।
৯. বাক্য বাড়াও : ৯.১ চলে গেল লোক। (কখন? কেন? কোথায়?) ৯.২ আজ বিদ্রোহ বুঝি করে। (কে? কখন?) ৯.৩ ঘোমটা তুলে দেখে নেয় কোনোমতে। (কে? কী? কোথায়?) ৯.৪ এ গ্রাম সবুজ ঘাঘরা পরে। (কেমন? কীসের?) ৯.৫ দীপ জ্বলে। (কোথায়? কখন?)
১০. একটি বাক্যে উত্তর দাও: ১০.১ ব্যস্ত ঘড়ির কাঁটা কোথায় গিয়ে থেমে গেছে? ১০.২ তালের সারি কোথায় রয়েছে? ১০.৩ কিষাণপাড়া নীরব কেন? ১০.৪ বর্ষায় কে বিদ্রোহ করে? ১০.৫ কে গোয়ালে ইশারা পাঠায়? ১০.৬ রাত্রিকে কীভাবে স্বাগত জানানো হয়?
৭৬
১০.৭ কোথায় জনমত গড়ে ওঠে? ১০.৮ ঠাকুমা কাকে, কখন গল্প শোনান? ১০.৯ কোন গল্প তিনি বলেন? ১০.১০ সকালের আগমন কীভাবে ঘোষিত হয়? ১০.১১ কবিতায় কোন কোন জীবিকার মানুষের কথা আছে?
১১. আট দশটি বাক্যে উত্তর দাও: ১১.১ এই কবিতায় বাংলার পল্লি প্রকৃতির যে বর্ণনা আছে তা নিজের ভাষায় সংক্ষেপে লেখো। ১১.২ কবিতাটিতে গ্রামীণ মানুষের জীবনযাপনের যে ছবিটি পাও তা নিজের ভাষায় বর্ণনা করো। ১১.৩ আকাল ও দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে মানুষের সম্মিলিত শ্রম আর জীবনীশক্তি কীভাবে বিজয়ী হয়েছে, কবিতাটি অবলম্বনে তা বুঝিয়ে দাও। ১১.৪ “কোনো বিশেষ সময়ের নয়, বরং আবহমান কালের বাংলাদেশ তার প্রকৃতি ও মানুষকে নিয়ে জীবনের যে জয়গান গেয়ে চলেছে, এই কবিতায় তারই প্রকাশ দেখতে পাই।”— উপরের উদ্ধৃতিটির সাপেক্ষে কবিতাটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।
১২. ব্যাখ্যা করো: ১২.১ “এখানে বৃষ্টিমুখর...... ঘড়ির কাঁটা”। ১২.২ “এ গ্রামের পাশে..... বিদ্রোহ বুঝি করে”। ১২.৩ “দুর্ভিক্ষের আঁচল.....কাজ করে”। ১২.৪ “সারাটা দুপুর....বিচিত্র ধ্বনি ওঠে”। ১২.৫ “সবুজ ফসলে সুবর্ণযুগ আসে”।
১৩. তোমার দেখা একটি গ্রামের কথা ডায়েরিতে লেখো। গ্রামটি কোথায়, সেখানে কোন কোন জীবিকার কতজন মানুষ থাকেন ইত্যাদি জানিয়ে গ্রামটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, মানুষজনের জীবনযাপন পদ্ধতি, বিভিন্ন সুবিধা-অসুবিধার কথা লেখো। গ্রামটির উন্নতিসাধনে যদি তোমার কোনো পরামর্শ দেওয়ার থাকে, অবশ্যই সেকথা লিখবে।
৭৭
CONTENT MANAGER