24. ভারততীর্থ | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
24. ভারততীর্থ | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর - WBBSE - Class 7 - বাংলা
৮৫
অষ্টম পাঠ
ভারততীর্থ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হে মোর চিত্ত, পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে। হেথায় দাঁড়ায়ে দু বাহু বাড়ায়ে নমি নরদেবতারে, উদার ছন্দে পরমানন্দে বন্দন করি তাঁরে। ধ্যানগম্ভীর এই যে ভূধর, নদী-জপমালা-ধৃত প্রান্তর, হেথায় নিত্য হেরো পবিত্র ধরিত্রীরে এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে।
৮৬ কেহ নাহি জানে কার আহ্বানে কত মানুষের ধারা দুর্বার স্রোতে এল কোথা হতে, সমুদ্রে হলো হারা। হেথায় আর্য, হেথা অনার্য, হেথায় দ্রাবিড় চিন- শক-হুন-দল পাঠান মোগল এক দেহে হলো লীন। পশ্চিমে আজি খুলিয়াছে দ্বার, সেথা হতে সবে আনে উপহার, দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে, যাবে না ফিরে- এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে।
রণধারা বাহি জয়গান গাহি উন্মাদ কলরবে ভেদি মরুপথ গিরিপর্বত যারা এসেছিল সবে তারা মোর মাঝে সবাই বিরাজে, কেহ নহে নহে দূর- আমার শোণিতে রয়েছে ধ্বনিতে তার বিচিত্র সুর। হে রুদ্রবীণা, বাজো, বাজো, বাজো ঘৃণা করি দূরে আছে যারা আজও বন্ধ নাশিবে- তারাও আসিবে দাঁড়াবে ঘিরে এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে।
হেথা একদিন বিরামবিহীন মহা-ওংকারধ্বনি হৃদয়তন্ত্রে একের মন্ত্রে উঠেছিল রণরণি। তপস্যাবলে একের অনলে বহুরে আহুতি দিয়া বিভেদ ভুলিল, জাগায়ে তুলিল একটি বিরাট হিয়া। সেই সাধনার সে আরাধনার যজ্ঞশালার খোলা আজি দ্বার- হেথায় সবারে হবে মিলিবারে আনতশিরে এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে।
সেই হোমানলে হেরো আজি জ্বলে দুখের রক্তশিখা- হবে তা সহিতে, মর্মে দহিতে আছে সে ভাগ্যে লিখা। এ দুখ বহন করো মোর মন, শোনো রে একের ডাক- যত লাজ ভয় করো করো জয়, অপমান দূরে যাক। দুঃসহ ব্যথা হয়ে অবসান জন্ম লভিবে কী বিশাল প্রাণ- পোহায় রজনী, জাগিছে জননী বিপুল নীড়ে এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে।
এসো হে আর্য, এসো অনার্য, হিন্দু মুসলমান- এসো এসো আজ তুমি ইংরাজ, এসো এসো খ্রিস্টান। এসো ব্রাহ্মণ, শুচি করি মন ধরো হাত সবাকার। এসো হে পতিত, হোক অপনীত সব অপমানভার। মার অভিষেকে এসো এসো ত্বরা, মঙ্গলঘট হয়নি যে ভরা সবার-পরশে-পবিত্র-করা তীর্থনীরে- আজি ভারতের মহামানবের সাগরতীরে।
৮৭
❓ নির্দেশ অনুসারে নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও :
১. কবিতায় ভারতভূমিকে 'পুণ্যতীর্থ' বলা হয়েছে কেন? ২. 'মহামানবের সাগরতীরে' বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? ৩. ভারতের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য ধরা পড়েছে, কবিতা থেকে এমন একটি পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করো। ৪. ভারতবর্ষকে পদানত করতে কোন কোন বিদেশি শক্তি অতীতে এদেশে এসেছিল? তাদের পরিণতি কী ঘটল? ৫. 'পশ্চিমে আজি খুলিয়াছে দ্বার' – উদ্ধৃতাংশে কোন পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে? এমন পরিস্থিতিতে কবির অন্বিষ্ট কী? ৬. 'আমার শোণিতে রয়েছে ধ্বনিতে তার বিচিত্র সুর।' – কোন সুরের কথা বলা হয়েছে? তাকে 'বিচিত্র' বলার কারণ কী? কেনই বা সে সুর কবির রক্তে ধ্বনিত হয়? ৭. 'হে রুদ্রবীণা, বাজো, বাজো, বাজো...'
- 'রুদ্রবীণা' কী? কবি তার বেজে ওঠার প্রত্যাশী কেন? ৮. 'আছে সে ভাগ্যে লিখা'- ভাগ্যে কী লেখা আছে? সে লিখন পাঠ করে কবি তাঁর মনে কোন শপথ গ্রহণ করলেন? ৯. 'পোহায় রজনী'-অন্ধকার রাত শেষে যে নতুন আশার আলোকোজ্জ্বল দিন আসবে তার চিত্রটি কীভাবে 'ভারততীর্থ' কবিতায় রূপায়িত হয়েছে? ১০. 'মার অভিষেকে এসো এসো ত্বরা' - কবি কাদের ব্যাকুল আহ্বান জানিয়েছেন? কোন মায়ের কথা এখানে বলা হয়েছে? এ কোন অভিষেক? সে অভিষেক কীভাবে সম্পন্ন ও সার্থক হবে?
📝 টীকা লেখো :
১১. ওংকারধ্বনি, শক, হুন, মোগল, দ্রাবিড়, ইংরাজ। ১২. ভারতবর্ষের অতীত ইতিহাসের কথা কবিতায় কীভাবে বিধৃত হয়েছে? ১৩. কবির দৃষ্টিতে ভবিষ্যৎ ভারতের যে স্বপ্নিল ছবি ধরা পড়েছে, তার পরিচয় দাও। ১৪. বাক্যে প্রয়োগ করো : উদার, ধৃত, পবিত্র, লীন, মন্ত্র, অনল, বিপুল, বিচিত্র, সাধনা, জয়গান।
৮৮
১৫. প্রতিশব্দ লেখো:
সাগর, ধরিত্রী, ভূধর, হিয়া, রজনী, নীর।
শব্দার্থ :
- ভূধর-পৃথিবী।
- ভেদি-ভেদ করে।
- শোণিত-রক্ত।
- হেরো-দেখো।
- বিরাজ-থাকা।
- ওংকার ধ্বনি-সকল মন্ত্রের আদি ধ্বনি।
- অভিষেক-সিংহাসনে বসবার প্রথম দিনের যে অনুষ্ঠান।
- কলরব—চিৎকার।
- আনত শিরে -মাথা নিচু করে।
১৬. 'শালা' শব্দের একটি অর্থ গৃহ, আগার। 'যজ্ঞশালা' র অনুরূপ 'শালা' পদযুক্ত আরো পাঁচটি শব্দ লেখো।
১৭. নীচের পঙ্ক্তিগুলি গদ্য বাক্যে লেখো:
১৭.১ দুর্বার স্রোতে এল কোথা হতে, সমুদ্রে হলো হারা। ১৭.২ উদার ছন্দে পরমানন্দে বন্দন করি তাঁরে। ১৭.৩ হৃদয়তন্ত্রে উঠেছিল রণরণি। ১৭.৪ হেথায় নিত্য হেরো পবিত্র ধরিত্রীরে। ১৭.৫ হেথায় সবারে হবে মিলিবারে আনত শিরে।
১৮. বিশেষ্যগুলিকে বিশেষণে ও বিশেষণগুলিকে বিশেষ্যে পরিবর্তিত করো :
চিত্ত, পুণ্য, পবিত্র, এক, দ্বার, বিচিত্র, তপস্যা, দুঃখ, জয়, জন্ম, শুচি, লাজ।
১৯. সন্ধি বিচ্ছেদ করো :
পরমানন্দ, দুর্বার, ওংকার, হোমানল, দুঃসহ।
২০. বিপরীতার্থক শব্দ লেখো:
পুণ্য, ধীর, ধৃত, আহ্বান, দুর্বার, বিচিত্র, বহু, অপমান, বিপুল, ত্বরা।
📚 রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) :
জন্ম কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে। অল্পবয়স থেকেই ঠাকুরবাড়ি থেকে প্রকাশিত 'ভারতী' ও 'বালক' পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। 'কথা ও কাহিনী', 'সহজপাঠ', 'রাজর্ষি', 'ছেলেবেলা', 'শিশু', 'শিশু ভোলানাথ', 'হাস্যকৌতুক', 'ডাকঘর', 'গল্পগুচ্ছ'- সহ তাঁর বহু রচনাই শিশু-কিশোরদের আকৃষ্ট করে। দীর্ঘ জীবনে অজস্র কবিতা, গান, ছোটোগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ লিখেছেন, ছবি এঁকেছেন। ১৯১৩ সালে 'Song Offerings'- এর জন্যে প্রথম এশিয়াবাসী হিসেবে নোবেল পুরস্কার পান। দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র ভারত আর বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত তাঁর রচনা। 'ভারততীর্থ' কবিতাটি 'গীতাঞ্জলি' কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে।
CONTENT MANAGER