12. কুতুব মিনারের কথা | সৈয়দ মুজতবা আলি
12. কুতুব মিনারের কথা | সৈয়দ মুজতবা আলি - WBBSE - Class 7 - বাংলা
কুতুব মিনারের কথা
সৈয়দ মুজতবা আলি
কুতুব মিনার পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মিনার। ইংরেজ পর্যন্ত একথা স্বীকার করেছে। আশ্চর্য মনে হয় যে, এর পূর্ববর্তী নিদর্শন এদেশে নেই, ইরান-তুরানেও নেই। বহু স্থপতির বহু এক্সপেরিমেন্টের সম্পূর্ণ ফায়দা উঠিয়ে তাজ নির্মিত হলো—কিন্তু মিনারের ক্ষেত্রে কুতুব প্রথম এবং শেষ এক্সপেরিমেন্ট। এ ধরনের বিজয়স্তম্ভ পূর্বে কেউ করেনি; কাজেই গুণীজনের বিস্ময়ের অবধি নেই যে, হঠাৎ স্থপতি এ সাহস পেল কোথা থেকে? কানিংহাম, ফার্গুসন, কার স্টিফেন, স্যার সৈয়দ আহমেদ অনেক ভেবে-চিন্তেও এর কোনো উত্তর দিতে পারেননি।
কুতুব পাঁচতলার মিনার। প্রথম তলাতে আছে 'বাঁশি' ও 'কোণে'র পর-পর সাজানো নকশা। দ্বিতীয় তলাতে শুধু বাঁশি, তৃতীয় তলাতে শুধু কোণ; চতুর্থ ও পঞ্চম তলাতে কী ছিল জানার উপায় নেই, কারণ বজ্রাঘাতে সে দুটি ভেঙে যাওয়ায় ফিরোজ তুগলক (যিনি অশোক স্তম্ভ দিল্লি আনেন; ইনি যেমন নিজে সোৎসাহে ইমরাত বানাতেন ঠিক তেমনি অকাতরে অন্যের ইমারত মেরামত করে দিতেন—দিল্লির অতি অল্প রাজাতেই এই দ্বিতীয় গুণটি পাওয়া যায়) সে দুটি মার্বেল দিয়ে মেরামত করে দেন। পঞ্চমটিতে নাকি আবার সিকন্দর লোদিরও হাত আছে। মিনারের মুকুটরূপে সর্বশেষে (যেখানে এখন আলো জ্বালানো হয়) কী ছিল সে সম্বন্ধে রসিকজনের কৌতূহলের অন্ত নেই। দুনিয়ার সবচেয়ে সেরা মিনারকে স্থপতি কী রাজমুকুট পরিয়েছিলেন—সেখানেও তিনি তাল রেখে শেষরক্ষা করতে পেরেছিলেন কিনা, তাঁর যে অদ্ভুত কল্পনা-শক্তি মিনারের সর্বাঙ্গে স্বপ্রকাশ সে-কল্পনাশক্তি দিয়ে তিনি দর্শককে কোন দ্যুলোকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, কে জানে?
ইমারত তৈরি করা কত সোজা! কারিগরের হাতে সেখানে কত অজস্র মালমশলা! গম্বুজ, থাম, আর্চ, ছত্রি, মিনারেট, ছজ্জা (ড্রিপস্টোন), কার্নিস, ব্র্যাকেট কত কী! তার তুলনায় একটা সোজা খাড়া স্তম্ভে সৌন্দর্য আনা কত শক্ত! এখানে শিল্পী সফল হয়েছেন শুধু সেটাকে কয়েকটি তলাতে বিভক্ত করে, সামঞ্জস্য রেখে প্রতি তলায় তাকে একটু ছোটো করে করে, গুটিকয়েক ব্যালকনি লাগিয়ে দিয়ে এবং মিনারের গায়ে কখনো 'বাঁশি', কখনো 'কোণে'র নকশা কেটে। ‘প্রপর্শনে'র এরকম চূড়ান্ত নিদর্শন পৃথিবীর আর কোনো মিনারে পাওয়া যায় না।
আর তার গায়ের কারুকার্যও অতি অদ্ভুত। বাঁশি ও কোণের উপর দিয়ে সমস্ত মিনারটিকে কোমরবন্ধের মতো ঘিরে রয়েছে সারি সারি লতা-পাতা, ফুলের মালা, চক্রের নকশা। এগুলো জাতে হিন্দু এবং এর সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে এক সারি অন্তর অন্তর আরবি লেখার সার—সেগুলো জাতে মুসলমান। কিন্তু উভয় খোদাইয়ের কাজই যে হিন্দু শিল্পী করেছেন সে বিষয়ে কণামাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। গোটা মিনারটির পরিকল্পনা করেছেন মুসলমান, যাবতীয় কারুশিল্প করেছে হিন্দু—ভারতবর্ষে মুসলমানদের সর্বপ্রথম সৃষ্টি কার্যে হিন্দু-মুসলমান মিলে গিয়ে যে অদ্ভুত সাফল্য দেখিয়েছিল সে-মিলন পরবর্তী যুগে কখনো ভঙ্গ হয় নি, কভু বা মুসলমানের প্রাধান্য বেশি, কোনো ইমারতে হিন্দুদের প্রাধান্য বেশি। আটশত বছর একসঙ্গে থেকেও হিন্দু-মুসলমান চিন্তার ক্ষেত্রে, রাজনীতির জগতে এক হয়ে যেতে পারে নি, কিন্তু কলার প্রাঙ্গণে (স্থাপত্য, সঙ্গীত এবং নৃত্যে) প্রথম দিনেই তাদের যে মিলন হয়েছিল আজও সেটি অটুট আছে।
কুতুবের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আর কেউ কোনো মিনার কখনো খাড়া করে নি। দীর্ঘ আট শতাব্দী ধরে বহু বাদশা বহু ইমারত গড়েছেন, কিন্তু 'কুতুবের চেয়ে ভালো মিনার গড়বো' এ সাহস কেউ দেখাননি। যে ইংরেজ
৩৮
দিল্লিতে সেক্রেটারিয়েট, রাজভবন গড়ে, কলকাতায় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল বানিয়ে নিজেকে অতুল বিড়ম্বিত করেছে সেও বিলক্ষণ জানতো কুতুবের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া কোনো স্থপতির কর্ম নয়।
আলাউদ্দিন খিলজির মতো দুঃসাহসী রাজা ভারতবর্ষে কমই জন্মেছেন। একমাত্র তিনিই চেয়েছিলেন কুতুবের সঙ্গে পাল্লা দিতে। তাই কুতুবের দ্বিগুণ ঘের দিয়ে তিনি আরেকটি মিনার গড়তে আরম্ভ করেন—বাসনা ছিল মিনারটি কুতুবের দ্বিগুণ উঁচু হবে। ইমারত মাত্রেরই একটা অপটিমাম সাইজ আছে— অর্থাৎ যার চেয়ে বড়ো হলে ইমারত খারাপ দেখায়, ছোটো হলেও খারাপ দেখায় (সর্বকলাতেই এ সূত্র প্রযোজ্য; কিন্তু স্থাপত্যের বেলা এটা অন্যতম মূলসূত্র)—কাজেই আলাউদ্দিনের চূড়া ডবল হলে ফল কী ওতরাতো বলা কঠিন। তা সে যা-ই হোক, মিনারের কাঠামোর কিছুটা শেষ হতে না হতেই ওপারের ডাক খিলজির কানে এসে পৌঁছল, যে-পারে খুব সম্ভব মিনার হাতে নিয়ে লাঠালাঠি চলে না।
আপন মহিমায় নিজস্ব ক্ষমতায় যে স্তম্ভ দাঁড়ায় তার নাম মিনার। মসজিদ, সমাধি কিংবা অন্য কোনো ইমারতের অঙ্গ হিসাবে যে মিনার কখনো থাকে, কখনো থাকে না, তার নাম মিনারেট—মিনারিকা।
কুতুব মিনারের গায়ের কাজ
কুতুবের পর পাঠান মোগল বিস্তর মিনারেট গড়েছে; কিন্তু সেগুলোও কুতুবের কাছে আসতে পারে না। তাজের মিনারিকা ভুবনবিখ্যাত; কিন্তু স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি শিল্পী সেখানে নতমস্তকে হার মেনে নিয়ে সেটাকে সাদামাটার চরমে পৌঁছিয়ে খাড়া করেছেন। পাছে লোকে তার মিনারিকার সঙ্গে কুতুবের তুলনা করে লজ্জা দেয় তাই তিনি সেটাকে গড়েছেন এমন ন্যাড়া করে যে দর্শকের মন অজান্তেও যেন কুতুবকে স্মরণ না করে। না হলে যে-তাজের সর্বাঙ্গে গয়নার ছড়াছড়ি তার চারখানা মিনারিকা-হস্তে 'নোয়াটুকু'র চিহ্ন নেই কেন? ওদিকে দেখুন, হুমায়ুনের সমাধি-নির্মাতা ছিলেন আরও ঘোড়েল—তিনি তাঁর ইমারতটি গড়েছেন মিনারিকা সম্পূর্ণ বর্জন করে।
দিল্লি-আগ্রার বহু দূরে, কুতুবের আওতার বাইরে, গুজরাতের রাজধানী আহমদাবাদে আমি একটি মিনারিকা দেখেছি যার সঙ্গে কুতুবের কোনো মিল নেই এবং বোধহয় ঠিক সেই কারণেই তার নিজস্ব মূল্য আছে। রাজা আহমদের—এঁরই নামে আহমদাবাদ—বেগম রানি সিপ্রির মসজিদে একটি মধুরদর্শন মিনারিকা বহু ভূপর্যটকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। গুজরাত এবং রাজপুতানার মেয়েরা তাদের বাহুলতা মণিবন্ধে যে বিচিত্র-আকার, বিচিত্র-দর্শন অসংখ্য বলয়-কঙ্কণ পরে এ মিনারিকা যেন সেই কমনীয়তায় অনুপ্রাণিত। রাজেশ্বরী সিপ্রি যেন তাঁরই অনুপম হাতখানি নভোলোকের দিকে তুলে ধরেছেন ভুবনেশ্বরের ললাটে তিলক পরিয়ে দেবেন বলে।
৩৯
সৈয়দ মুজতবা আলি (১৯০৪-১৯৭৪) 💡
জন্ম শ্রীহট্টের করিমগঞ্জে। বাবার নাম সৈয়দ সিকান্দর আলি। মহাত্মা গান্ধির ডাকে অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়ে স্কুল ছাড়েন। শান্তিনিকেতনে পড়া শেষ করে তিনি কাবুলের শিক্ষাবিভাগে অধ্যাপক হন। তিনি আরবি, ফারসি, জার্মান সহ ১৫টি ভাষা জানতেন। প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনি, উপন্যাস ও রম্য-রচনায় তাঁর দক্ষতা অসামান্য। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ 'দেশে বিদেশে', 'পঞ্চতন্ত্র', 'চাচাকাহিনি', 'ময়ূরকণ্ঠী', 'শবনম', 'ধূপছায়া', 'টুনিমেম', 'হিটলার' প্রভৃতি। তিনি ‘নরসিংহদাস পুরস্কারে' সম্মানিত।
১. অনধিক দুটি বাক্যে নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দাও : ❓
১.১ কোন সম্রাট 'অশোক স্তম্ভ' কে দিল্লি নিয়ে এসেছিলেন? ১.২ কুতুব মিনার নামটি কার নামানুসারে রাখা হয়েছে এবং কেন? ১.৩ কুতুবের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার জন্য আর কে মিনার গড়তে চেষ্টা করেছিলেন? ১.৪ মিনারেট বা মিনারিকা কী? মিনারের সঙ্গে এর পার্থক্য কোথায়? ১.৫ আহমদাবাদ শহরটি কোন রাজার নামানুসারে হয়েছে? এই শহরটি কোন রাজ্যের রাজধানী?
২. নীচে যাঁদের নাম রয়েছে, তাঁদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও : 🧑🎓
- কানিংহাম
- ফার্গুসন
- সৈয়দ আহমেদ
শব্দার্থ : 📚
- মিনার - মোচার আকারে বা শাঁখের মতো ঊর্ধ্বমুখী উন্নত চূড়া।
- মোগল কলা - মুঘল আমলের শিল্প সংস্কৃতি।
- এক্সপেরিমেন্ট - পরীক্ষা-নিরীক্ষা।
- সিক্রি - এখানে ফতেহপুর সিক্রি।
- স্থপতি – সৌধ, প্রাসাদ, ইমারত প্রভৃতি তৈরির কাজে নিযুক্ত।
- গুলদন্তাজ - মিনারেট জাতীয় ছোটো চূড়া বা শীর্ষদেশ।
- থাম- স্তম্ভ।
- আর্চ- খিলান।
- ছত্রি - চাল বা ছাদ।
- মিনারেট- মিনারের চেয়ে ছোটো চূড়া।
- ছজ্জা- বৃষ্টির ছাট ঠেকানোর জন্য দরজা বা জানলার উপরস্থিত ছাদের প্রলম্বিত অংশ।
- ব্র্যাকেট- প্রধানত দেওয়ালের গায়ে আটকানো তাকের প্রলম্বিত আলম্ব বা দেয়ালগিরি।
- প্রপর্শন - সঙ্গতি।
- অপটিমাম সাইজ- সামঞ্জস্যপূর্ণ আকার।
- ডোম- গোলাকার গম্বুজ।
- জিওমেট্রিক ডিজাইন - জ্যামিতিক বিন্যাস।
- দার্য্য- দৃঢ়তা।
৩. কয়েকটি বাক্যে উত্তর দাও : 💬
৩.১ 'কুতুব মিনার পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মিনার'- এই উদ্ধৃতিটির আলোকে মিনারটির পাঁচটি বিশিষ্টতা উল্লেখ করো। ৩.২ মিনারটির গঠনে হিন্দু-মুসলিম সাংস্কৃতিক মিলনের চেহারাটি কীভাবে ধরা পড়েছে তা লেখো। ৩.৩ কুতুব মিনারের শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলতে গিয়ে লেখক আর কোন কোন স্থাপত্য কীর্তির প্রসঙ্গ এনেছেন? ৩.৪ আলাউদ্দিন খিলজি চেষ্টা করেও কুতুব মিনারের চেয়ে মহত্তর স্থাপত্য গড়তে পারেননি কেন?
৪০
CONTENT MANAGER