Academy

27. জাদুকাহিনি | অজিতকৃষ্ণ বসু

27. জাদুকাহিনি | অজিতকৃষ্ণ বসু - WBBSE - Class 7 - বাংলা

0

জাদুকাহিনি

অজিতকৃষ্ণ বসু

ইংল্যান্ডের বিখ্যাত জাদুকর ডেভিড ডেভান্ট একদিন সন্ধ্যাবেলা একটি জনবিরল পথ দিয়ে একা বাড়ি ফিরছিলেন। এমন সময় একটি জোয়ান চেহারার লোক তাঁকে পাকড়াও করে বললে 'এই যে মশাই। অ্যাদ্দিন বাদে বাগে পেয়েছি আপনাকে। আপনিই না টাকা বানান?'

ডেভান্ট একটু ঘাবড়ে গেলেন। লোকটা বলে কী? একটু সামলে নিয়ে বললেন, 'মাপ করবেন, আপনি বোধহয় ভুল করছেন।'

লোকটি বললে, 'মোটেই ভুল করিনি। আমার এই টুপিটি শিলিং দিয়ে ভরে দিয়ে যাবেন, তার আগে আপনাকে ছাড়ছিনে।' বলে মাথা থেকে টুপিটি নামিয়ে চিৎ করে ধরলে ডেভান্টের সামনে।

ডেভান্ট বুঝলেন পালাবার চেষ্টা করে লাভ হবে না, দৌড়ে বা কুস্তিতে এ লোকটার সঙ্গে পারবেন না তিনি। কাল সন্ধ্যা, পথ নির্জন, চেঁচিয়ে ডাকলেও সাড়া দেবার লোক নেই কাছাকাছি। সুতরাং লোকটিকে চটানো চলবে না। ঠান্ডা মাথায় সামলাতে হবে। ডেভান্ট বললেন, 'আমি দাঁড়িয়ে আছি। আমার পকেটখানা তল্লাসি করে যা পাও সব নিয়ে নাও।'

Two men, one magician looking nervous, another holding a hat

'কত আছে তোমার পকেটে?' প্রশ্ন করল লোকটি। ডেভান্ট বললেন, 'ছয় শিলিং।'

লোকটি বললে, 'ছোঃ! ও তো আমার টুপির তলায় এক কোণে পড়ে থাকবে। টুপিটা ভরে দিতে হবে বলছি না? আপনি হাওয়া থেকে ঝপাঝপ টাকা ধরেন, নিজের চোখে দেখেছি। আমার কাছে চালাকি?'

এইবার ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল ডেভান্টের কাছে। একটি জাদুর খেলা আছে যার নাম 'কৃপণের স্বপ্ন' (Miser's Dream) অথবা 'হাওয়াই টাঁকশাল' এ খেলায় বারবার হাত খালি দেখিয়ে জাদুকর হাওয়া থেকে টাকা ধরে-ধরে পাত্র ভরে ফেলেন। টাকাগুলো অবশ্য হাওয়া থেকে আসবে না। খেলাটি নির্ভর করে প্রধানত পামিং (Palming) বা হাতের তালুতে এক বা একাধিক টাকা লুকিয়ে রাখা এবং গুপ্তস্থান থেকে টাকা নেওয়ার কৌশলের ওপর। ডেভান্ট বুঝলেন এই লোকটি কোনোদিন তাঁর এই খেলাটি দেখেছে আর ভেবে নিয়েছে সত্যিই হাওয়া থেকে টাকা ধরবার অলৌকিক জাদু তাঁর করায়ত্ত। ডেভান্ট লোকটিকে বোঝাতে গেলেন; লোকটি খেপে উঠে বললে, 'ভারি বেয়াড়া, বেআক্কেল, বেদরদি লোক তো আপনি মশাই। চোখের সামনে দেখছেন অর্থাভাবে শুকিয়ে মরছি, আর আপনি হাত বাড়ালেই আঙুলের ডগায় টাকা এসে পড়ে তবু হাতটুকু বাড়াবার মেহনত করতে চান না। ভালো চান তো চটপট শুরু করুন। আর দেরি নয়।'

ডেভান্ট বুঝলেন, লোকটি গুন্ডা, গোঁয়ার অথবা পাগল; এতক্ষণ শুধু মুখ চালাচ্ছিল, এইবার হাত চালাবে। সুতরাং আর কাল বিলম্ব না করে তিনি কাজে লেগে গেলেন; কিছুক্ষণ জাদুকরসুলভ ভঙ্গিতে হাওয়ায় হাত চালিয়ে হাওয়া থেকে একটি শিলিং ধরে লোকটির টুপির ভিতর ফেলে দিলেন। লোকটি খুশি হয়ে বললে, 'বাঃ এই তো চমৎকার পেরেছেন। নিন, জলদি হাত চালান। টুপিটা পুরো ভর্তি করে দিতে হবে যে'।

ডেভান্ট ছোটো বড়ো অনেক আসরে জাদুর খেলা দেখিয়েছেন, কোনোদিনও কল্পনাও করেননি বিজন পথে দাঁড়িয়ে একটি মাত্র দর্শকের সামনে এ হেন অসহায়ভাবে তাঁকে জাদু-প্রদর্শন করতে হবে। সঙ্গে মাত্র ছয়টি শিলিং, হাওয়া থেকে ছয় শিলিং-এর বেশি ধরা তাঁর জাদুবিদ্যায় কুলোবে না। বিপদ শুরু হবে তারপরই, কারণ মাত্র ছয় শিলিং দিয়েই লোকটির টুপি ভরবে না, মনও ভরবে না। শেষটায় কি ঐ গোঁয়ারের হাতে মার খেয়ে মরতে হবে? হাওয়া থেকে টাকা ধরার কাজটিকে তিনি নানা কায়দায় যথা সম্ভব বিলম্বিত করতে লাগলেন, যেন লোকজন এসে পড়ার আগেই সবগুলো শিলিং ফুরিয়ে না যায়।

ডেভান্টের ভাগ্য ভালো, তিনি হাওয়া থেকে লোকটিকে চার শিলিং ধরে দিয়ে আরো বিলম্বিত লয়ে পঞ্চম শিলিং ধরবার তোড়জোড় করছেন, বুকের ভেতরটা ঢিপঢিপ করছে উদ্বেগে, এমন সময় যেন ঈশ্বর প্রেরিত হয়েই চার-পাঁচ জন লোক এসে হাজির। তারা এই লোকটির খোঁজেই বেরিয়েছিল-লোকটির মাথা খারাপ। ডেভান্টের বেকায়দায় দুঃখ প্রকাশ করে তারা তাদের হারানিধিকে নিয়ে চলে গেল। ডেভান্ট হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।

বিস্মিত হয়েছিলাম; ভাবছিলাম এভাবে হাওয়া থেকে খুশিমতো টাকা ধরবার বিদ্যেটা জানা থাকলে কি ভালোই না হতো! তাহলে টাকার জন্য কোনো ভাবনা থাকত না।

![Magician with a hat catching money in a tin](https://picsum.photos/seed/magician-catching-money/600/400)
সঙ্গে-সঙ্গে আমাদের কয়েকজনের মনে একটু খটকাও লেগেছিল। জাদুকরের দক্ষিণা সংগ্রহের জন্য আমরা ছাত্রেরা এক আনা করে টিকিট কিনেছিলাম এবং প্রধান শিক্ষক মশাই কিছু চাঁদা দিয়েছিলেন। তাতে মোট দশ টাকার বেশি হয়নি, কিন্তু তাই পেয়েই জাদুকর চাঁদ মিয়া এত খুশি হয়েছিলেন যে, বোধহয় পাঁচ টাকা পেলেও তিনি অখুশি হতেন না। এ ব্যাপারটাই কেমন যেন খাপছাড়া লেগেছিল। হাওয়া থেকে খুশিমতো টাকা ধরবার জাদু যাঁর জানা আছে তিনি হাওয়াই টাকায় কোটিপতি না হয়ে দীনহীনের মতো এই সামান্য টাকার জন্য ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়ান কেন? এ প্রশ্নের ভারি সুন্দর জবাব দিয়েছিলেন জাদুকর চাঁদ মিয়া। বলেছিলেন, 'হাওয়াই জাদুর টাকা ভোগে লাগাতে নেই। লাগালেই জাদু আর লাগে না। হাওয়ার টাকা তাই আবার হাওয়াতেই ফিরিয়ে দিতে হয়।'

অজিতকৃষ্ণ বসু (১৯২২-১৯৯৩) : অ.কৃ.ব নামে বিখ্যাত এই লেখক সংগীত, সাহিত্য ও জাদুবিদ্যা-পারদর্শী ছিলেন এই তিনটি ক্ষেত্রেই। সাহিত্যক্ষেত্রে বিশেষত ব্যঙ্গ ও কৌতুকরসের কবিতা এবং কৌতুকপ্রধান কথাসাহিত্য রচনার জন্যই প্রসিদ্ধ ছিলেন তিনি। 'শনিবারের চিঠি'তে প্রকাশিত তাঁর 'পাগলা গারদের কবিতা' সিরিজ বা 'শঙ্করস উইক্লি'তে মুদ্রিত তাঁর বহু কৌতুক রচনা তাঁকে স্মরণীয় করে রেখেছে। ইংরেজি ভাষায় লেখা তাঁর উদ্ভট খাপছাড়া কবিতাগুলি Lunarics নামে পরিচিত। ছোটোদের জন্য লেখা তাঁর বইগুলি হলো 'খামখেয়ালী ছড়া', 'আজব ছড়া', 'ছড়ার মিছিল' প্রভৃতি। সংগীত জীবনের নানা কথা ও কাহিনি তিনি বিবৃত করেছেন 'ওস্তাদ কাহিনী' গ্রন্থে। মঞ্চে কখনো জাদু প্রদর্শন না করলেও, তাঁর বন্ধু জাদুসম্রাট পি.সি. সরকারের সঙ্গে সমান্তরাল ভাবে দীর্ঘ দিন জাদুচর্চা করেছেন তিনি। জাদুকরদের বিচিত্র জীবন ও নানা কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনা নিয়ে লেখা তাঁর 'যাদুকাহিনী' বইটি ১৯৪৬ সালে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেয়েছে 'নরসিংহদাস পুরস্কার'।

CONTENT MANAGER

Sattar Uddin SohelSattar Uddin Sohel