32. দেবতাত্মা হিমালয় | প্রবোধকুমার সান্যাল
32. দেবতাত্মা হিমালয় | প্রবোধকুমার সান্যাল - WBBSE - Class 7 - বাংলা
একাদশ পাঠ
দেবতাত্মা হিমালয়
প্রবোধকুমার সান্যাল
ভোরে এল আমার ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে। ডাক্তার গৃহিণীর ডাইনিং হলে প্রাতরাশ সেরে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়া গেল। কালিম্পঙের উপর দিয়ে চলছে রেনক্ রোেড তিব্বতের দিকে, কিন্তু এ পথে দুর্যোগ বেশি, এবং দুঃসাধ্যও বটে। সুতরাং এই প্রাচীন পথ ছেড়ে এখন প্রায় সবাই যায় গ্যাংটকের পথ দিয়ে। সমগ্র উত্তর ভারতের মধ্যে কালিম্পঙ থেকে তিব্বত সর্বাপেক্ষা নিকটবর্তী। রেনক্ রোেড গিয়েছে 'জেলাপ-লা' গিরিসংকটে, তারপরেই তিব্বত সীমানা। গ্যাংটক থেকে নাথুলা গিরিসংকট হলো মাত্র ছাব্বিশ মাইল; এখান থেকে জেলাপ-লা ঠিক কমাইল আমার জানা নেই। এই পথ দিয়ে কিন্তু তিনজন জগৎপ্রসিদ্ধ বাঙালি গিয়েছিলেন তিব্বতে।
১৩৯
তাঁদের মধ্যে প্রধান হলেন বাংলার চিরদিনের গর্ব ঢাকা-বিক্রমপুরের সন্তান অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান। আজ থেকে নয়শো বছরের বেশি আগে ভারতের তদানীন্তন শ্রেষ্ঠ জ্ঞানঋষি দীপঙ্কর তিব্বত গিয়ে বৌদ্ধধর্মের নির্মল স্বরূপকে প্রচার করেছিলেন। তিনি তেরো বছর সেখানে বাস করেছিলেন এবং লাসার নিকটেই তাঁর মৃত্যু ঘটে। গৌতম বুদ্ধের পরেই তিব্বতবাসীরা তাঁর মূর্তিকে আজও বোধিসত্ত্ব নামে পূজা করে। দ্বিতীয় ব্যক্তি হলেন আধুনিক ভারতের কুলগুরু রাজা রামমোহন রায়। তিনি তিব্বত যাত্রা করেছিলেন, কিন্তু তাঁর আনুপূর্বিক ইতিবৃত্ত আমার জানা নেই। তৃতীয় যে-ব্যক্তির প্রতি আমি অসীম শ্রদ্ধা পোষণ করি তিনি ছদ্মবেশে গিয়েছিলেন তিব্বতে, তাঁর নাম শরৎচন্দ্র দাস। তিনি গিয়েছিলেন উনিশ শতকের শেষভাগে। তাঁর কাছে আধুনিক ভারতবর্ষ ঋণী, কেননা তাঁরই ভ্রমণবৃত্তান্ত শুনে একালে প্রথম আমরা তিব্বতের বিষয় জানতে পারি। বিংশ শতাব্দীর প্রথমে স্যার ফ্রান্সিস ইয়াংহাসব্যান্ড যখন তিব্বত জয় করতে যান, তখন শরৎ দাসের ভ্রমণবৃত্তান্ত থেকেই তিনি সর্বাধিক সাহায্য লাভ করেছিলেন– এটি স্যার ফ্রান্সিসেরই স্বীকারোক্তি। অতীশ দীপঙ্করের আগে আরেকজন ভারতবরেণ্য বাঙালিও তিব্বতে গিয়ে আচার্য বোধিসত্ত্ব উপাধিলাভ করেন, তিনি হলেন যশোরের রাজপুত্র শান্ত রক্ষিত। অষ্টম শতাব্দীতে তিনি তিব্বতে যান। লামারা তাঁকে রাজকীয় সম্বর্ধনা জানায়। কিন্তু দীপঙ্করের যে বিপুল কীর্তির কথা আমরা জানি, শান্ত রক্ষিত সম্বন্ধে অতটা জানা যায় না।
কাশ্মিরের পূর্ব প্রান্তে ভারত তিব্বত বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র হলো গারটক, কিন্তু সে বহুদূর এবং বহু অগম্য অঞ্চল পেরিয়ে সেখানে যেতে হয়। কুমায়ুনের প্রান্তে গার্বিয়াং ছাড়িয়ে লিপু লেক গিরিসংকট অতটা না হলেও অনেকটা তাই; ওখানে তাকলাকোট হলো তিব্বতিদের ঘাঁটি। নেপালেও আছে নামচেবাজার দিয়ে তিব্বত। অন্যান্য পথও পাওয়া যায়। কিন্তু বাংলার এই পথই সর্বশ্রেষ্ঠ। তিব্বত যে এত কাছে তা হয়ত অনেকেরই জানা নেই। বিমানে গেলে কলকাতা থেকে দিল্লি পৌঁছতে লাগে সাড়ে তিন ঘণ্টা–সেই গতিতে গেলে লাসা পৌঁছতে ঘণ্টা তিনেক লাগে কি?
কালিম্পঙের যে পথ চলে গিয়েছে উত্তরে সেখানে পশমের ঘাঁটি একটির পর একটি, অসংখ্য তিব্বতি আর মারোয়াড়ি তার আশেপাশে। এইটি হলো তিব্বতীদের প্রধান ব্যবসা। কিন্তু এখানে কারবারিদের উন্নতি ঘটেছে একালে প্রচুর, তার প্রকাশ্য নিদর্শন হলো বড়ো বড়ো অট্টালিকা, আর অগণ্য কুঠিবাড়ি।
ভোর থেকে আকাশ আজ মেঘময়, শীতের হাওয়া ছিল কনকনে। বড়ো গির্জাটা হলো কালিম্পঙের ল্যান্ডমার্ক। তারই পাশ দিয়ে চলে গেছে চড়াই-পথ এদিক ওদিক ঘুরে অনেক উঁচুতে গ্রেহামস হোমের দিকে। এখানে অ্যাংলো ইন্ডিয়ান এবং সাহেব সুবার অভিভাবকহীন ছেলেমেয়েরা পড়াশুনো করে মানুষ হয়। সমগ্র পাহাড় নিয়ে এ এক বিরাট কীর্তি। পরিচালনা ব্যবস্থা সমস্তই খাঁটি সাহেব-মেমদের হাতে। একটু আধটু দেখে বেড়াতেই ঘণ্টাখানেক সময় লাগলো। ঝিরঝিরে বৃষ্টি হয়েই চলেছে।
প্রায় ঘণ্টা তিনেক ঘুরে আবার ফিরে এলুম ডা. দাশগুপ্তের পাড়ায়। এটা অভিজাত পল্লী। কিন্তু এরই একপাশে একটি সংকীর্ণ গলির নীচে নেমে যে মন্দিরটির চত্বরে এসে দাঁড়ালুম, এটির কথা আজও ভুলিনি। দেখে নিলুম সেই অপরিচ্ছন্ন নোংরা ঝুপসি ঘরখানা, যেখানায় বছর চৌদ্দ আগে একটি রাত্রিবাস করে গিয়েছিলুম আমি আর শশাঙ্ক চৌধুরী। এটির নাম ছিল ঠাকুরবাড়ি, আজও সেই নামটি তেমনি প্রচলিত। সেদিনও কালিম্পঙে এসেছিলুম বটে, কিন্তু কালিম্পঙ চোখে পড়েনি, –মহাকবি রবীন্দ্রনাথের বিরাট ব্যক্তিত্ব সমগ্র হিমালয়কে সেদিন আমাদের চোখের আড়ালে রেখেছিল। মনে পড়ে সেই ২৫ বৈশাখের অপরাহ্ণ। কবি রয়েছেন গৌরিপুর প্রাসাদে। বৈদান্তিক এটর্নী হীরেন দত্ত আছেন, আছেন রথীন্দ্রনাথ, প্রতিমা দেবী, অনিল চন্দ, মৈত্রেয়ী আর চিত্রিতা। অমল হোমের কলম এবং রজনীগন্ধার গুচ্ছ কবির হাতে তুলে দিয়ে প্রণাম করলুম। আমার হাতে ছিল কয়েকখানি 'যুগান্তর' পত্রিকার 'রবীন্দ্র জয়ন্তী সংখ্যা'। মহাকবি জানতেন, আমি তখন 'যুগান্তরের' অন্যতম সম্পাদক। আমার অনুরোধে উনি অনেকবার 'যুগান্তরে'র জন্য লেখা দিয়েছিলেন। আজকের 'যুগান্তরের' প্রথম পৃষ্ঠায় ছিল শিল্পীর হাতে-আঁকা কবির একখানা রেখাচিত্র। গ্রাম-নগর-দেশ-মহাদেশ এবং দিগ্বলয় ছাড়িয়ে
১৪০
কবির মাথা উঠেছে ধবলাধার গৌরীশৃঙ্গের মতো, – হিমালয়ের চেয়ে তিনি বড়ো, - পৃথিবীর উচ্চতম শিখর তিনি! ছবিখানার মধ্যে এই চেহারাটা প্রকাশ করতে চেয়েছিলুম।
কবি বললেন, সমগ্র মহাভারতখানা তিনি নিজের হাতে একবার লিখতে চান, অত বড়ো এপিক পৃথিবীর কোনো কালের কোনো সাহিত্যেই নেই। কিন্তু কাজটি দুরূহ, অনেকদিন সময় লাগবে। হীরেনবাবুকে আনিয়েছি, ওঁর সাহায্য নেবো।-
তাঁকে যখন জানালুম, এখানকার এক ঠাকুরবাড়িতে এসে উঠেছি, তিনি বললেন, এ ছাড়া আর ঠাকুরবাড়ি কোথায় হে?
সৌম্য সুহাস কবির মুখখানিতে স্বাস্থ্যের রক্তিমাভা প্রকাশ পাচ্ছে। বাইরের আলো এসে পড়েছে সেই সুন্দর শ্বেতশ্মশ্রুময় মুখে। নরম একখানা শাল এলায়িত দেহের উপর ছড়ানো। একখানা আরাম কেদারায় তিনি অর্ধশয়ান। দু-চারটি কথার পরে তাঁর পরিহাস-সরস বাক্যবাণ ছুটতে লাগলো। সেই বাণে আমিই বিদ্ধ হচ্ছি বারম্বার এবং হাসির রোল উঠছে এপাশে ওপাশে। কবি সেদিন আমাকে বাগে পেয়েছিলেন।
সেইদিনকার সেই ২৫ বৈশাখের সন্ধ্যায় তিনি দেশবাসীর উদ্দেশে তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে একটি নবরচিত কবিতা বেতারযোগে পাঠ করবেন, সেজন্য কলকাতার বেতারকেন্দ্রের কর্তৃপক্ষ কলকাতা - কালিম্পঙের মধ্যে টেলিফোনের বন্দোবস্ত করেছিলেন। কালিম্পঙে টেলিফোন ছিল না, এই উপলক্ষে তার প্রথম উদ্বোধন। সেজন্য পাহাড়ে-পাহাড়ে টেলিফোনের খুঁটি বসানো এবং তার খাটনো হয়েছে গত কয়েকদিন থেকেই। টেলিফোনের কর্তৃপক্ষ এজন্য প্রচুর অর্থব্যয় করেছেন। কবি তাঁর ঘরের আসনে বসে টেলিফোনে কবিতা পাঠ করবেন এবং বেতার কর্তৃপক্ষ তাঁর কণ্ঠস্বরটি ধরে নিয়ে সঙ্গে-সঙ্গে ব্রডকাস্ট করবেন, এই ছিল ব্যবস্থা। কয়েকজন বেতার-বিশেষজ্ঞ এসেছেন এখানে এই উপলক্ষে। তাঁদের মধ্যে স্বনামখ্যাত নৃপেন্দ্র মজুমদার ছিলেন অন্যতম। মহাকবি মাঝে মাঝে একবার ভীষণ শব্দে গলা ঝাড়া দেন, একথা সকলেরই মনে আছে। কিন্তু আজ কাব্য পাঠকালে সেই আওয়াজটির দাপটে সূক্ষ্ম যন্ত্রটা বিদীর্ণ হয়ে যাবে কিনা, এই আশঙ্কাটা ছিল রথীন্দ্রনাথ প্রমুখ অনেকের মনে। সেজন্য উদ্বেগও ছিল। মাঝখানে নৃপেনবাবু একবার আমাকে বললেন, ঠিক ওই চেয়ারে বসে যন্ত্রে মুখ রেখে কলকাতাকে একবার ডাকুন তো? আপনার গলায় যদি না ফাটে তবে আর ভয় নেই!
কেঁপে উঠলুম। ওটা যে কবির আসন! কিন্তু নৃপেন্দ্রবাবুর ফরমাশ শুনতেই হলো। নধর মখমল বসানো চেয়ারে বসে কয়েকবার ডাকলুম, হ্যালো, ক্যালকাটা...হ্যালো...?
কলকাতা থেকে তৎক্ষণাৎ জবাব এলো–'ও-কে'। (o.k.)
বোধহয় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা কিংবা আটটা। একটা বুঝি বেল বাজলো! কবি উঠে গিয়ে বসলেন যন্ত্রের সামনে। আমরা বাইরে এসে দাঁড়ালুম। বাইরে আমাদের পাশেই রয়েছে রেডিয়ো যন্ত্র– কলকাতা ঘুরে কবির কণ্ঠ ফিরে আসবে এই যন্ত্রে– সেই আমাদের রোমাঞ্চ পুলক। কবি মাত্র পনেরো মিনিটকাল তাঁর কবিতা পাঠ করবেন। বাইরে থেকে আমরা কাচের দরজা বন্ধ করে দিলুম। শব্দ না ঢোকে।
একটি আলোর নিশানা পেয়ে কবির দীর্ঘ দীপ্ত কণ্ঠের মূর্ছনা উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলো নবরচিত কবিতায়—
“আজ মম জন্মদিন। সদ্যই প্রাণের প্রান্তপথে ডুব দিয়ে উঠেছে সে বিলুপ্তির অন্ধকার হ'তে মরণের ছাড়পত্র নিয়ে।”
আমাদের পায়ের নীচে কালিম্পঙ থর থর করতে লাগলো কিনা সেকথা তখন আর কারো মনে রইলো না। জ্যোৎস্না ছিল সেদিন বাইরে। একটা মায়াচ্ছন্ন স্বপ্নলোকের মধ্যে আমরা যেন হারিয়ে যাচ্ছিলুম। ভুলে গিয়েছিলুম পরস্পরের অস্তিত্ব।
(নির্বাচিত অংশ)
১৪১
শব্দার্থ :
প্রাতরাশ: সকালের আহার, জলখাবার। দুর্গতি: ঝড় বৃষ্টি প্রভৃতি প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা ভরা সময়। গিরিসংকট: পর্বতশ্রেণির মধ্যে সংকীর্ণ নিম্ন ভূমি, যা পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কুলগুরু: বংশপরম্পরায় সকলেই যে গুরুর শিষ্য। আনুপূর্বিক: প্রথম থেকে শেষ, ক্রম অনুযায়ী। ভারতবরেণ্য: ভারতের বরণীয় বা শ্রেষ্ঠ মানুষ। রাজপুত্র: রাজকুমার। রাজকীয়: রাজ-সম্বন্ধীয়, সরকারি। সম্বর্ধনা: সম্মান জানানোর অনুষ্ঠান। অগম্য: দুর্গম, সহজে যাওয়া যায় না যেখানে। কুঠিবাড়ি: রাজপুরুষ বা পদস্থ কর্মচারীর কার্যালয় ও বাসস্থান। অভিজাত: সমৃদ্ধ, কুলীন, শ্রেষ্ঠকুলজাত। সংকীর্ণ: অপ্রশস্ত, সরু। চত্বর: চাতাল। ঝুপসি: বায়ুপ্রবাহহীন আলোেকশূন্য ঝোপঝাড়ের পরিবেশে অবস্থিত। ব্যক্তিত্ব: ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য/ স্বাতন্ত্র্য। বৈদান্তিক: বেদান্তদর্শনে অভিজ্ঞ। রেখাচিত্র: কেবল রেখা দিয়ে আঁকা ছবি। দিগ্বলয়: দিগন্তরেখা। দুরূহ: কঠিন, কষ্টসাধ্য। সৌম্য: প্রিয়দর্শন, প্রশান্ত। সুহাস: শোভন হাস্যযুক্ত। রক্তিমাভা: লাল আভা। শ্বেতশ্মশ্রুময়: সাদা দাড়ি ভরা। অর্ধশয়ান: আধশোওয়া। বাক্যবাণ: কথার আঘাত যা বিদ্ধ করে, নিষ্ঠুর কথা। নবরচিত: নতুন রচনা করা হয়েছে এমন। বেতারযোগে: রেডিয়োর মাধ্যমে। কর্তৃপক্ষ: যাদের ওপর পরিচালনার ভার। বন্দোবস্ত: ব্যবস্থা। অর্থব্যয়: অনেক টাকা খরচ। বিশেষজ্ঞ: কোনো বিষয়ে বিশেষ জ্ঞান আছে যার। স্বনামখ্যাত: যে নিজের নামেই পরিচিত বা বিখ্যাত। বিদীর্ণ: ভগ্ন, খন্ডিত। ফরমাশ: আদেশ, নির্দেশ। নধর: সরস কোমল লাবণ্যময়। তৎক্ষণাৎ: তখনই। রোমাঞ্চ: পুলক, হর্ষ। পুলক: হর্ষ, আনন্দ। মূর্ছনা: সুরের আরোহণ ও অবরোহণ। উচ্ছ্বসিত: স্ফুরিত, স্পন্দিত, উৎফুল্ল। বিলুপ্ত: সম্পূর্ণ লোপ। ছাড়পত্র: রসিদ, দাবি-ত্যাগের প্রমাণপত্র। মায়াচ্ছন্ন: মায়ায় ঢাকা। স্বপ্নলোক: স্বপ্নের রাজ্য। অস্তিত্ব: সত্তা, বিদ্যমানতা।
১. বন্ধনীতে দেওয়া একাধিক উত্তরের মধ্যে ঠিক উত্তরটি বেছে নিয়ে নীচের বাক্যগুলি আবার লেখো:
১.১ লামারা রাজকীয় সম্বর্ধনা জানিয়েছিলেন রাজপুত্র (তিষ্য রক্ষিত/ শান্ত রক্ষিত/ কুমার রক্ষিত)-কে। ১.২ তিব্বতীদের প্রধান ব্যবসা (পশম/ রেশম/ তাঁতবস্ত্র)-এর। ১.৩ কালিম্পঙের ল্যান্ডমার্ক (বড়ো মন্দির/ বড়ো মসজিদ/ বড়ো গির্জা)। ১.৪ রবীন্দ্রনাথের হাতে লেখক তুলে দিয়েছিলেন (অমৃতবাজার পত্রিকা/ যুগান্তর/ আনন্দবাজার পত্রিকা)-র 'রবীন্দ্র জয়ন্তী সংখ্যা'। ১.৫ নবরচিত একটি কবিতা রেডিওতে আবৃত্তি করতে রবীন্দ্রনাথের সময় লেগেছিল (আধ ঘণ্টা/ পঁয়তাল্লিশ মিনিট/ পনেরো মিনিট)।
২. ঘটে-যাওয়া ঘটনার ক্রম অনুযায়ী নীচের এলোমেলো ঘটনাগুলি সাজিয়ে লেখো :
২.১ কলকাতা থেকে তৎক্ষণাৎ জবাব এল- 'ও.কে।' ২.২ কবি তাঁর ঘরের আসনে বসে টেলিফোনে কবিতা পাঠ করবেন। ২.৩ ২৫ বৈশাখের সন্ধ্যায় জন্মদিন উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ দেশবাসীর উদ্দেশে একটি কবিতা পাঠ করবেন। ২.৪ প্রস্তুতির সময়ে নরম মখমল বসানো চেয়ারে বসে কয়েকবার ডাকলুম, হ্যালো ক্যালকাটা...হ্যালো....? ২.৫ সেজন্য পাহাড়ে-পাহাড়ে টেলিফোনের খুঁটি বসানো এবং তার খাটানো হলো কদিন ধরে। ২.৬ বেতার কর্তৃপক্ষ কবির কণ্ঠস্বরটি ধরে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে প্রচার করবেন, তাই এই ব্যবস্থা। ২.৭ কবির জন্মদিনের কবিতাপাঠের জন্য কলকাতা-কালিম্পঙের মধ্যে টেলিফোনের বন্দোবস্ত হলো।
১৪২
৩. নীচের বাক্যগুলিতে দাগ-দেওয়া শব্দগুলোর অনুরূপ শব্দ পাঠ্য অংশটিতে পাবে। উপযুক্ত শব্দ খুঁজে নিয়ে বাক্যগুলি আবার লেখো :
৩.১ শরৎচন্দ্র দাসের ভ্রমণের ভ্রমণবৃত্তান্ত থেকেই প্রথম তিব্বতের কথা জানা যায়। ৩.২ এই পথে তিনজন জগৎপ্রসিদ্ধ বাঙালি তিব্বতে গিয়েছিলেন। ৩.৩ সবার অগোচরে ছদ্মবেশের জন্য অন্যরকম পোশাক পরে নেতাজি সুভাষচন্দ্র একদিন কলকাতা ছেড়ে গিয়েছিলেন। ৩.৪ ভুল মানুষমাত্রেরই হতে পারে, তবে নিজের দোষ স্বীকারোক্তি করে নেওয়ার সাহসও থাকা উচিত। ৩.৫ যাদের ওপর পরিচালনার ভার, এ-কাজের জন্য আগে তাদের ছাড়পত্র প্রয়োজন। ৩.৬ যাঁরা নিজের নামেই স্বনামখ্যাত, ভারতের সেই বরণীয় মানুষদেরই সম্বর্ধনার আয়োজন হয়েছে এই সভায়।
৪. নীচের বাক্যগুলিতে যে ইংরেজি শব্দগুলি আছে, তার বদলে বাংলা শব্দ বসিয়ে বাক্যগুলি আবার লেখো : (বাংলা শব্দের জন্য পাশের শব্দঝুড়ির সাহায্য নিতে পারো)
পথনির্দেশক চিহ্ন, সম্প্রচার, ঘণ্টা, মহাকাব্য, দূরভাষ, খাবারঘর, গাড়িচালক।
৪.১ ডাক্তার গৃহিণীর খাবারঘরে প্রাতরাশ সারা হলো। ৪.২ অত বড়ো মহাকাব্য পৃথিবীর কোনো কালের কোনো সাহিত্যে নেই। ৪.৩ কালিম্পঙে দূরভাষ ছিল না। ৪.৪ বেতার-কর্তৃপক্ষ তাঁর কণ্ঠস্বর সঙ্গে সঙ্গে সম্প্রচার করবেন। ৪.৫ ভোরে আমার গাড়িচালক এল গাড়ি নিয়ে। ৪.৬ একটা বুঝি ঘণ্টা বাজল। ৪.৭ গির্জাটা হলো কালিম্পঙের ল্যান্ডমার্ক।
৫. নীচের বিশেষণগুলির পরে উপযুক্ত বিশেষ্য বসিয়ে বাক্য রচনা করো :
মেঘময়, ভীষণ, মায়াচ্ছন্ন, সূক্ষ্ম, দীপ্ত, অগম্য, বিপুল, ঝুপসি
৬. নীচের বিশেষ্যগুলির আগে উপযুক্ত বিশেষণ বসিয়ে বাক্য রচনা করো :
কন্ঠস্বর, স্বপ্নলোক, ব্যক্তিত্ব, আশঙ্কা, ইতিবৃত্ত, কীর্তি, রেখাচিত্র, দিগ্বলয়
৭. নীচের দাগ-দেওয়া শব্দগুলি কী জাতীয়? শব্দগুলির বিশিষ্টতা উল্লেখ করে শব্দগুলি দিয়ে নতুন বাক্য রচনা করো :
৭.১ শীতের হাওয়া ছিল কনকনে। ৭.২ ঝিরঝিরে বৃষ্টি হয়েই চলেছে। ৭.৩ পায়ের নীচে কালিম্পঙ থরথর করতে লাগল কিনা আর মনে রইল না।
৮. নীচের বাক্যগুলি থেকে তারতম্যসূচক শব্দগুলি খুঁজে বার করো। কোনটি দুয়ের মধ্যে তুলনা, আর কোনটি বহুর মধ্যে তুলনা, তা নির্দেশ করে শব্দগুলি দিয়ে নতুন বাক্য রচনা করো :
৮.১ পৃথিবীর উচ্চতম শিখর তিনি। ৮.২ এর চেয়ে মহত্তর উদ্যোগ আর দেখিনি। 8.৩ বাংলার এই পথই সর্বশ্রেষ্ঠ। 8.4 পাশের গলিটি সংকীর্ণতর হয়ে এসেছে। 8.5 অল্প আয়োজনে শুরু হলো দীর্ঘতম যাত্রা।
১৪৩
৯. নীচের বাক্যগুলি থেকে সংখ্যাবাচক শব্দ, অনির্দেশক সংখ্যাবাচক শব্দ আর পূরণবাচক শব্দগুলি খুঁজে বার করে লেখো:
৯.১ গ্যাংটক থেকে নাথুলা গিরিসংকট হলো মাত্র ছাব্বিশ মাইল। ৯.২ তিনি তেরো বছর সেখানে বাস করেছিলেন। ৯.৩ দ্বিতীয় ব্যক্তি হলেন আধুনিক ভারতের কুলগুরু রাজা রামমোহন রায়। ৯.৪ শরৎচন্দ্র দাস গিয়েছিলেন উনিশ শতকের শেষ ভাগে। ৯.৫ অষ্টম শতাব্দীতে রাজপুত্র তিব্বতে যান। ৯.৬ বিমানে গেলে কলকাতা থেকে দিল্লি পৌঁছতে লাগে সাড়ে তিন ঘন্টা, সেই গতিতে গেলে লাসা পৌঁছতে ঘণ্টা তিনেক লাগে কি? ৯.৭ একটু আধটু দেখে বেড়াতে ই ঘণ্টাখানেক সময় লাগল। ৯.৮ মনে পড়ে সেই ২৫ বৈশাখের অপরাহ্ণ। ৯.৯ যেখানে বছর চৌদ্দ আগে একটি রাত্রি বাস করে গিয়েছিলাম। ৯.১০ কবি মাত্র পনেরো মিনিটকাল তাঁর কবিতা পাঠ করবেন।
১০. নীচের বিশেষ্যগুলিকে বিশেষণে বদলে লেখো :
প্রণাম, অনুরোধ, পৃথিবী, উদ্বোধন, পূজা, উদ্বেগ, পুলক, আশঙ্কা
১১. নীচের বিশেষণগুলিকে বিশেষ্যে বদলে লেখো:
বৈদান্তিক, নবরচিত, অভিজাত, উচ্ছ্বসিত, প্রসিদ্ধ, প্রচলিত, প্রচুর, প্রধান
১২. নীচের শব্দগুলির সন্ধি ভেঙে লেখো:
শশাঙ্ক, হিমালয়, সর্বাপেক্ষা, অন্যান্য, রক্তিমাভা, যুগান্তর, মায়াচ্ছন্ন, অপরাহ্ণ, সর্বাধিক, রথীন্দ্র, নৃপেন্দ্র, স্বীকারোক্তি, শয়ান, সম্বর্ধনা, উন্নতি, অপরিচ্ছন্ন, দিগ্বলয়, বারম্বার, উদ্বোধন, উচ্ছ্বসিত
১৩. নীচের প্রতিটি শব্দের মধ্যেই দুটি করে শব্দ আছে, বুঝে নিয়ে ভেঙে লেখো:
জগৎপ্রসিদ্ধ, গিরিসংকট, কুলগুরু, ঠাকুরবাড়ি, ভ্রমণবৃত্তান্ত, রাজপুত্র, ছদ্মবেশ, কুঠিবাড়ি, অর্থব্যয়, নবরচিত, মহাকবি, ভারতবরেণ্য, স্বনামখ্যাত, স্বপ্নলোক, জন্মদিন
১৪. নিম্নরেখাঙ্কিত পদগুলির কারক-বিভক্তি নির্ণয় করো :
১৪.১ তিব্বতবাসীরা তাঁর মূর্তিকে আজও বোধিসত্ত্ব নামে পূজা করে। ১৪.২ তিনি ছদ্মবেশে গিয়েছিলেন তিব্বতে। ১৪.৩ কবি তাঁর ঘরের আসনে বসে টেলিফোনে কবিতা পাঠ করবেন। ১৪.৪ কবি সেদিন আমাকে বাগে পেয়েছিলেন। ১৪.৫ শরৎ দাসের ভ্রমণবৃত্তান্ত থেকেই তিনি সর্বাধিক সাহায্য লাভ করেছিলেন।
১৫. একটি বাক্যে উত্তর দাও:
১৫.১ প্রাচীন পথ ধরে কোন তিনজন প্রসিদ্ধ বাঙালি অতীতে তিব্বতে গিয়েছিলেন? ১৫.২ কোন প্রাচীন পথের রেখা ধরে তাঁরা গিয়েছিলেন? ১৫.৩ এখনকার পর্যটকরা এই প্রাচীন পথটি পরিহার করেন কেন? ১৫.৪ কোন দুই বিখ্যাত বাঙালি তিব্বতে গিয়ে বোধিসত্ত্ব উপাধি লাভ করেছিলেন? ১৫.৫ ছদ্মবেশে কে গিয়েছিলেন তিব্বতে? ১৫.৬ স্যার ফ্রান্সিস ইয়াংহাসব্যান্ডকে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছিল তিব্বত-বিষয়ক কোন বইটি? ১৫.৭ কালিম্পঙের কোথায় পড়াশুনো করে অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ও ইংরেজ অনাথ ছেলেমেয়েরা ? ১৫.৮ গৌরীপুর প্রাসাদে কারা ছিলেন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গী? ১৫.৯ লেখকের অনুরোধে কোন পত্রিকার জন্য অনেকবার লেখা দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ? ১৫.১০ ২৫ বৈশাখের সেই বিশেষ দিনটি যে ছিল শুক্লপক্ষ, লেখা থেকে সেকথা জানতে পারো কেমন করে?
১৪৪
১৬. চার-পাঁচটি বাক্যে উত্তর দাও:
১৬.১ কীভাবে গেলে পৌঁছনো যায় কালিম্পঙের গ্রেহামস হোম-এ? এই হোমটির বিশিষ্টতা কী? ১৬.২ ২৫ বৈশাখের 'যুগান্তর' পত্রিকার প্রথম পাতায় শিল্পীর আঁকা যে বিশেষ রেখাচিত্রটি প্রকাশ পেয়েছিল, তার বিষয় কী ছিল? রবীন্দ্র-জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসেবে ছবির এই বিষয়টি তোমার যথার্থ মনে হয় কিনা, লেখো। ১৬.৩ 'কাজটি দুরূহ, অনেকদিন সময় লাগবে'– কোন কাজটি সম্পন্ন করবার ইচ্ছে লেখককে জানিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ? কেন সে-কাজ করার ইচ্ছে হয়েছিল তাঁর? কার সাহায্য প্রত্যাশা করেছিলেন ওই কাজে? ১৬.৪ 'এ ছাড়া আর ঠাকুরবাড়ি কোথায় হে?'— কোন প্রসঙ্গে এই পরিহাস রবীন্দ্রনাথের? ১৬.৫ 'কবি সেদিন আমাকে বাগে পেয়েছিলেন।' 'বাগে পেয়েছিলেন'– এই বিশিষ্ট ক্রিয়াপদটির অর্থ কী? তাঁকে কবির 'বাগে পাওয়া'র কী পরিচয় রয়েছে লেখকের সেদিনের বিবরণে? ১৬.৬ 'কালিম্পঙে টেলিফোন ছিল না, এই উপলক্ষে তার প্রথম উদ্বোধন'– কোন বিশেষ উপলক্ষে, কীভাবে এই উদ্বোধন সম্পন্ন হলো? ১৬.৭ 'কিন্তু নৃপেন্দ্রবাবুর ফরমাশ শুনতেই হলো'– নৃপেন্দ্রবাবু কে? কী ছিল তাঁর ফরমাশ? কীভাবে তা শুনেছিলেন লেখক? ১৬.৮ জন্মদিনে কবির স্বকণ্ঠে বেতার-সম্প্রচারিত কবিতা শোনাবার মুহূর্তটি কীভাবে ধরা দিয়েছিল তাঁর শ্রোতাদের চেতনায়?
১৭. দশটি বাক্যের মধ্যে উত্তর দাও :
১৭.১ এ-লেখায় একটা হারিয়ে-যাওয়া সময়ের ছবি আছে, ভারতবর্ষ তথা বাংলার শ্রেষ্ঠ কয়েকজন সন্তানের কথা আছে, যাঁদের সঙ্গে একসময় তিব্বতের নিবিড় যোগ রচিত হয়েছিল। লেখাটি অনুসরণ করে বাংলার ওই শ্রেষ্ঠ মানুষগুলি সম্পর্কে তোমার যে ধারণা হয়েছে, নিজের ভাষায় লেখো। ১৭.২ এই লেখার একটি প্রধান চরিত্র রবীন্দ্রনাথ আর তাঁর ব্যক্তিত্বময় উপস্থিতি। কালিম্পঙ শহরে অতিবাহিত তাঁর একটি বিশেষ জন্মদিন উদ্যাপনের সম্পূর্ণ ছবিটি যেভাবে এখানে ফুটে উঠেছে, তার পরিচয় দাও। ১৭.৩ ইতিহাস-ভূগোলের ইতিবৃত্তে জড়ানো কালিম্পঙ নামে একটা শহরকে নতুন করে চিনতে তোমার কেমন লাগল, একটা অনুচ্ছেদে তা লেখো।
প্রবোধকুমার সান্যাল (১৯০৫-১৯৮৩): বিশিষ্ট ঔপন্যাসিক এবং ভ্রমণকাহিনি রচয়িতা। 'কল্লোল' পত্রিকার লেখকদের অন্যতম। প্রথম উপন্যাস 'যাযাবর'। 'মহাপ্রস্থানের পথে' নামে বিখ্যাত ভ্রমণকাহিনি লিখে প্রবোধকুমার বাংলা সাহিত্যে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন; এই গ্রন্থেই ভ্রমণ এবং উপন্যাসের একটি মিশ্র রূপ সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তীকালে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। 'চেনা ও জানা', 'নিশিপদ্ম', 'তুচ্ছ' প্রভৃতি ছোটোগল্প সংকলন, এবং 'প্রিয়বান্ধবী', 'নদ ও নদী', 'বনহংসী' প্রভৃতি উপন্যাস তাঁর বিপুল সৃষ্টিসম্ভারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। তাঁর আত্মজীবনীর নাম 'বনস্পতির বৈঠক'।
'দেবতাত্মা হিমালয়' (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড) তাঁর ভ্রামণিক সত্তার একটি উজ্জ্বল পরিচয়। পাঠ্য অংশটি 'দেবতাত্মা হিমালয়'-এর প্রথম খণ্ডের 'কালিম্পঙ' অধ্যায় থেকে নেওয়া হয়েছে।
১৪৫
CONTENT MANAGER