17. দুটি গানের জন্মকথা
17. দুটি গানের জন্মকথা - WBBSE - Class 7 - বাংলা
পঞ্চম পাঠ
দুটি গানের জন্মকথা
জনগণমন অধিনায়ক জয় হে
জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা! পঞ্জাব সিন্ধু গুজরাট মারাঠা দ্রাবিড় উৎকল বঙ্গ বিন্ধ্য হিমাচল যমুনা গঙ্গা উচ্ছলজলধিতরঙ্গ তব শুভ নামে জাগে, তব শুভ আশিস মাগে, গাহে তব জয়গাথা। জনগণমঙ্গলদায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা! জয় হে, জয় হে, জয় হে, জয় জয় জয়, জয় হে।
প্রথম গাওয়া হয়: ২৮ ডিসেম্বর ১৯১১ কলকাতায়
গানটির পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায়নি, কবে ও কোথায় রচিত তাও জানা যায় না। 'ভারতের জাতীয় কংগ্রেস'-এর ২৬তম বার্ষিক অধিবেশন ২৬-২৮ ডিসেম্বর ১৯১১ তারিখে কলকাতায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেখানে এই গানটি প্রথম জনসমক্ষে গাওয়া হয় সমবেতকণ্ঠে, ২৭ ডিসেম্বর। গানের রিহার্সাল হয়েছিল ডা: নীলরতন সরকারের হ্যারিসন রোডের বাড়িতে, নেতৃত্ব দিয়েছিলেন দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর। পরেরদিন 'দ্য বেঙ্গলি পত্রিকা' গানটির ইংরেজি অনুবাদ সহ সংবাদটি পরিবেশন করে। 'তত্ত্ববোধিনী' পত্রিকায় (মাঘ ১৩১৮) প্রথম প্রকাশিত গানটির পরিচয় দেওয়া হয় ব্রহ্মসংগীত বলে এবং এবছরের মাঘোৎসবেও গানটি ব্রহ্মসংগীত বলে গীত হয়।
গানটিকে ভারতের জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণের প্রস্তাব উত্থাপিত হলে রবীন্দ্রনাথের বিরোধীগণ প্রচার করেন, গানটি সম্রাট পঞ্চম জর্জের ভারতে আগমনকে উপলক্ষ করে রচিত। বিশ্বভারতীর প্রাক্তন ছাত্র পুলিনবিহারী সেন গানটি রচনার উপলক্ষ জানতে চেয়ে রবীন্দ্রনাথকে চিঠি লিখলে তিনি তাঁকে লিখেছিলেন (২০ নভেম্বর ১৯৩৭):
"...সে বৎসর ভারতসম্রাটের আগমনের আয়োজন চলছিল। রাজসরকারে প্রতিষ্ঠাবান আমার কোনো বন্ধু সম্রাটের জয়গান রচনার জন্যে আমাকে বিশেষ করে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। শুনে বিস্মিত হয়েছিলুম, সেই বিস্ময়ের সঙ্গে মনে উত্তাপেরও সঞ্চার হয়েছিল। তারই প্রবল প্রতিক্রিয়ার ধাক্কায় আমি জনগণমন অধিনায়ক গানে সেই ভারতভাগ্যবিধাতার জয় ঘোষণা করেছি, পতন-অভ্যুদয়-বন্ধুর পন্থায় যুগ-যুগ ধাবিত যাত্রীদের যিনি চিরসারথি, যিনি জনগণের অন্তর্যামী পথপরিচায়ক, সেই যুগযুগান্তরের মানবভাগ্যরথচালক যে পঞ্চম বা ষষ্ঠ বা কোনো জর্জই কোনোক্রমেই হতে পারেন না সে কথা রাজভক্ত বন্ধুও অনুভব করেছিলেন।..."
গানটি নিয়ে নানারূপ সাময়িক তিক্ততা ও ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হলেও রবীন্দ্রনাথ গানটিকে পরেও নানা উপলক্ষে ব্যবহার করেছেন। যেমন, দক্ষিণ ভারত পরিক্রমায় বেরিয়ে ১৯১৯ সালে রবীন্দ্রনাথ গিয়েছিলেন মদনপল্লী – সেখানকার 'থিয়সফিক্যাল কলেজ' এর অধ্যক্ষ এবং রবীন্দ্রনাথের বন্ধু জেমস এইচ. কাজিন্স তাঁর সম্মানে এক সভার আয়োজন করেন। সেই সভায় রবীন্দ্রনাথ গেয়েছিলেন 'জনগণমন', এবং এর নামকরণ করেন 'The Morning Song of India'। সেই গানের সুর এবং অর্থগৌরব কলেজ কর্তৃপক্ষকে অভিভূত করেছিল– সেই গানটিই প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিনের অ্যাসেম্বলি সং বা বৈতালিকরূপে চলিত হয়ে যায়।
এর ১১ বছর পরে, ১৯৩০-র সেপ্টেম্বরে রবীন্দ্রনাথ জেনিভা থেকে গেলেন সোভিয়েট রাশিয়া। মস্কোয় **'পায়োনিয়ার্স কমিউন'**এ অনাথ বালক বালিকারা তাঁকে অভ্যর্থনা জানাল। সেখানে প্রশ্নোত্তর পর্বের পর তারা কবিকে গান গাইতে অনুরোধ করতে, তিনি তাদের গেয়ে শুনিয়েছিলেন 'জনগণমন'।
আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি
আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি। চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস, আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি। ও মা, ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে, মরি হায়, হায় রে– ও মা, অঘ্রানে তোর ভরা ক্ষেতে আমি কী দেখেছি মধুর হাসি ৷ কী শোভা, কী ছায়া গো, কী স্নেহ, কী মায়া গো– কী আঁচল বিছায়েছ বটের মূলে, নদীর কূলে কূলে। মা তোর মুখের বাণী আমার কানে লাগে সুধার মতো, মরি হায়, হায় রে– মা, তোর বদনখানি মলিন হলে, ও মা, আমি নয়নজলে ভাসি ৷৷
প্রথম গাওয়া হয়: ২৫ আগস্ট ১৯০৫
সরলা দেবী লিখেছেন তাঁর **'জীবনের ঝরাপাতা'**য়:
...কর্তাদাদামহাশয় চুঁচুড়ায় থাকতে তাঁর ওখানে মাঝে মাঝে থাকবার অবসরে তাঁর বোটের মাঝির কাছ থেকে অনেক বাউলের গান আদায় করেছিলুম। যা কিছু শিখতুম তাই রবিমামাকে শোনাবার জন্য প্রাণ ব্যস্ত থাকত — তাঁর মতো সমজদার আর কেউ ছিল না। যেমন যেমন আমি শোনাতুম— অমনি অমনি তিনি সেই সুর ভেঙে, কখনো কখনো তার কথাগুলিরও কাছাকাছি দিয়ে গিয়ে এক একখানি নিজের গান রচনা করতেন। ‘কোন আলোকে প্রাণের প্রদীপ...', ' যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে...', 'আমার সোনার বাংলা...' প্রভৃতি অনেক গান সেই মাঝির কাছ থেকে আহরিত আমার সুরে বসান।...
প্রশান্তকুমার পাল অনুমান করেছেন, বঙ্গভঙ্গের নির্দিষ্ট তারিখটি জানতে পারার তাৎক্ষণিক আবেগে গানটি রচিত হয় ও ভক্তদের সূত্রে সমগ্র কলকাতায় ছড়িয়ে পড়ে।
রবীন্দ্রনাথ তখন সপরিবারে গিরিডিতে। এখানে বসে তিনি ২২/২৩ টি গান রচনা করলেন, যেগুলি আজ স্বদেশি গান নামে পরিচিত। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে এই গানগুলি সেসময় বিপুল উদ্দীপনার সঞ্চার করেছিল।
১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র স্থাপিত হলে গানটির এই প্রথম দশ পঙ্ক্তি সেখানকার জাতীয় সংগীত হিসেবে গৃহীত হয়েছে।
কৃতজ্ঞতা : গানের পিছনে রবীন্দ্রনাথ / সমীর সেনগুপ্ত
১. সংক্ষিপ্ত উত্তর দাও : 📚
১.১ ভারতবর্ষের জাতীয় সংগীতটি কোন উপলক্ষে প্রথম গাওয়া হয়েছিল? ১.২ 'তত্ত্ববোধিনী' পত্রিকায় ভারতবর্ষের জাতীয় সংগীতটির কোন পরিচয় দেওয়া হয়েছিল? ১.৩ রবীন্দ্রনাথ 'জনগণমন'র যে ইংরাজি নামকরণ করেন সেটি লেখো। ১.৪ ভারতবর্ষের জাতীয় মন্ত্রটি কী? সেটি কার রচনা? ১.৫ জাতীয় মন্ত্রের প্রথম চারটি পঙ্ক্তি শিক্ষকের থেকে জেনে খাতায় লেখো।
২. টীকা লেখো: 📝 জাতীয় সংগীত, মাঘোৎসব, বিশ্বভারতী, পুলিনবিহারী সেন, ডা. নীলরতন সরকার।
৩. নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর নিজের ভাষায় লেখো: 🤔
৩.১ 'জনগণমন'কে জাতীয় সংগীত রূপে গ্রহণ করতে বিরোধিতা হয়েছিল কেন? রবীন্দ্রনাথের ব্যাখ্যায় সেই বিরোধিতার অবসান কীভাবে ঘটেছিল? ৩.২ 'রবীন্দ্রনাথ গানটিকে পরেও নানা উপলক্ষে ব্যবহার করেছেন।'- ১৯১১ খ্রিস্টাব্দের পরবর্তী সময়ে রবীন্দ্রনাথ কীভাবে এই গানটি ব্যবহার করেন?
CONTENT MANAGER