31. চিন্তাশীল | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
31. চিন্তাশীল | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর - WBBSE - Class 7 - বাংলা
চিন্তাশীল
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রথম দৃশ্য
চিন্তাশীল নরহরি চিন্তায় নিমগ্ন। ভাত শুকাইতেছে। মা মাছি তাড়াইতেছেন মা। অত ভেবো না, মাথার ব্যামো হবে বাছা! নরহরি। আচ্ছা মা, 'বাছা' শব্দের ধাতু কী বলো দেখি। মা। কী জানি বাপু! নরহরি। 'বৎস'। আজ তুমি বলছ 'বাছা'—দু - হাজার বৎসর আগে বলত 'বৎস'— এই কথাটা একবার ভালো করে ভেবে দেখো দেখি মা! কথাটা বড়ো সামান্য নয়। এ কথা যতই ভাববে ততই ভাবনার শেষ হবে না।
পুনরায় চিন্তায় নিমগ্ন
মা। যে ভাবনা শেষ হয় না এমন ভাবনার দরকার কী বাপ! ভাবনা তো তোর চিরকাল থাকবে, ভাত যে শুকোয়। লক্ষ্মী আমার, একবার ওঠ। নরহরি। (চমকিয়া) কী বললে মা? লক্ষ্মী? কী আশ্চর্য! এক কালে লক্ষ্মী বলতে দেবী-বিশেষকে বোঝাত। পরে লক্ষ্মীর গুণ অনুসারে সুশীলা স্ত্রীলোককে লক্ষ্মী বলত, কালক্রমে দেখো পুরুষের প্রতিও লক্ষ্মী শব্দের প্রয়োগ হচ্ছে! একবার ভেবে দেখো মা, আস্তে আস্তে ভাষার কেমন পরিবর্তন হয়। ভাবলে আশ্চর্য হতে হবে।
১৩৩
ভাবনায় দ্বিতীয় ডুব
মা। আমার আর কি কোনো ভাবনা নেই নরু? আচ্ছা, তুই তো এত ভাবিস, তুইই বল দেখি উপস্থিত কাজ উপস্থিত ভাবনা ছেড়ে কি এই-সব বাজে ভাবনা নিয়ে থাকা ভালো? সকল ভাবনারই তো সময় আছে। নরহরি। এ কথাটা বড়ো গুরুতর মা! আমি হঠাৎ এর উত্তর দিতে পারব না। এটা কিছুদিন ভাবতে হবে, ভেবে পরে বলব। মা। আমি যে কথাই বলি তোর ভাবনা তাতে কেবল বেড়েই ওঠে, কিছুতেই আর কমে না। কাজ নেই বাপু, আমি আর-কাউকে পাঠিয়ে দিই।
[প্রস্থান]
মাসিমা
মাসিমা। ছি নরু, তুই কি পাগল হলি? ছেঁড়া চাদর, একমুখ দাড়ি— সমুখে ভাত নিয়ে ভাবনা! সুবলের মা তোকে দেখে হেসেই কুরুক্ষেত্র! নরহরি। কুরুক্ষেত্র! আমাদের আর্যগৌরবের শ্মশানক্ষেত্র! মনে পড়লে কি শরীর লোমাঞ্চিত হয় না! অন্তঃকরণ অধীর হয়ে ওঠে না! আহা, কত কথা মনে পড়ে! কত ভাবনাই জেগে ওঠে! বলো কী মাসি! হেসেই কুরুক্ষেত্র! তার চেয়ে বলো-না কেন কেঁদেই কুরুক্ষেত্র!
অশ্রুনিপাত
মাসিমা। ওমা, এ যে কাঁদতে বসল! আমাদের কথা শুনলেই এর শোক উপস্থিত হয়। কাজ নেই বাপু !
[প্রস্থান]
দিদিমা
দিদিমা। ও নরু, সূর্য যে অস্ত যায়! নরহরি। ছি দিদিমা, সূর্য তো অস্ত যায় না। পৃথিবীই উল্টে যায়। রোসো, আমি তোমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছি। (চারি দিকে চাহিয়া) একটা গোল জিনিস কোথাও নেই? দিদিমা। এই তোমার মাথা আছে— মুণ্ডু আছে। নরহরি। কিন্তু মাথা যে বদ্ধ, মাথা যে ঘোরে না। দিদিমা। তোমারই ঘোরে না, তোমার রকম দেখে পাড়াসুদ্ধ লোকের মাথা ঘুরছে! নাও, আর তোমায় বোঝাতে হবে না, এ দিকে ভাত জুড়িয়ে গেল, মাছি ভন ভন করছে। নরহরি। ছি দিদিমা, এটা যে তুমি উলটো কথা বললে! মাছি তো ভন ভন করে না। মাছির ডানা থেকেই এইরকম শব্দ হয়। রোসো, আমি তোমাকে প্রমাণ করে দিচ্ছি— দিদিমা। কাজ নেই তোমার প্রমাণ করে।
[প্রস্থান]
১৩৪
দ্বিতীয় দৃশ্য
নরহরি চিন্তামগ্ন। ভাবনা ভাঙাইবার উদ্দেশে
নরহরির শিশু ভাগিনেয়কে কোলে করিয়া মাতার প্রবেশ
মা। (শিশুর প্রতি) জাদু, তোমার মামাকে দণ্ডবৎ করো। নরহরি। ছি-মা, ওকে ভুল শিখিয়ো না। একটু ভেবে দেখলেই বুঝতে পারবে, ব্যাকরণ-অনুসারে দণ্ডবৎ করা হতেই পারে না—দণ্ডবৎ হওয়া বলে। কেন বুঝতে পেরেছ মা? কেননা দণ্ডবৎ মানে— মা। না বাবা, আমাকে পরে বুঝিয়ে দিলেই হবে। তোমার ভাগ্নেকে এখন একটু আদর করো। নরহরি। আদর করব? আচ্ছা, এসো আদর করি। (শিশুকে কোলে লইয়া) কী করে আদর আরম্ভ করি? রোসো, একটু ভাবি।
চিন্তামগ্ন
মা। আদর করবি, তাতেও ভাবতে হবে নরু? নরহরি। ভাবতে হবে না মা? বল কী! ছেলেবেলাকার আদরের উপরে ছেলের সমস্ত ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তা কি জানো? ছেলেবেলাকার এক-একটা সামান্য ঘটনার ছায়া বৃহৎ আকার ধরে আমাদের সমস্ত যৌবন কালকে, আমাদের সমস্ত জীবনকে আচ্ছন্ন করে রাখে এটা যখন ভেবে দেখা যায় – তখন কি ছেলেকে আদর করা একটা সামান্য কাজ বলে মনে করা যায়? এইটে একবার ভেবে দেখো দেখি মা! মা। থাক বাবা, সে কথা আর-একটু পরে ভাবব, এখন তোমার ভাগ্নেটির সঙ্গে দুটো কথা কও দেখি। নরহরি। ওদের সঙ্গে এমন কথা কওয়া উচিত যাতে ওদের আমোদ এবং শিক্ষা দুই হয়। আচ্ছা, হরিদাস, তোমার নামের সমাস কী বলো দেখি? হরিদাস। আমি চমা কাব। মা। দেখো দেখি বাছা, ওকে এ-সব কথা জিগেস কর কেন? ও কী জানে! নরহরি। না, ওকে এই বেলা থেকে এইরকম করে অল্পে অল্পে মুখস্থ করিয়ে দেব। মা। (ছেলে তুলিয়া লইয়া) না বাবা, কাজ নেই তোমার আদর করে।
নরহরি মাথায় হাত দিয়া পুনশ্চ চিন্তায় মগ্ন
(কাতর হইয়া) বাবা, আমায় কাশী পাঠিয়ে দে, আমি কাশীবাসী হব। নরহরি। তা যাও-না মা! তোমার ইচ্ছে হয়েছে, আমি বাধা দেব না। মা। (স্বগত) নরু আমার সকল কথাতেই ভেবে অস্থির হয়ে পড়ে, এটাতে বড়ো বেশি ভাবতে হলো না। (প্রকাশ্যে) তা হলে তো আমাকে মাসে মাসে কিছু টাকার বন্দোবস্ত করে দিতে হবে। নরহরি। সত্যি নাকি? তা হলে আমাকে আর কিছুদিন ধরে ভাবতে হবে। এ কথা নিতান্ত সহজ নয়। আমি এক হপ্তা ভেবে পরে বলব। মা। (ব্যস্ত হইয়া) না বাবা, তোমার আর ভাবতে হবে না— আমার কাশী গিয়ে কাজ নেই।
১৩৫
১. একই অর্থযুক্ত শব্দ নাটক থেকে খুঁজে বের করে লেখো: মক্ষিকা, হাজির, অস্থির, ব্যবস্থা, ঢাকা বা আবৃত। ২. শূন্যস্থান পূরণ করো :
| বিশেষ্য | বিশেষণ |
|---|---|
| আদর | |
| ভেতো | |
| শোক | |
| প্রামাণ্য | |
| নির্ভর | |
| আমুদে |
৩. নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও : ৩.১ 'কথাটা বড়ো সামান্য নয়'- বক্তা কে? কার কোন কথাটা সামান্য নয়? ৩.২ 'এই-সব বাজে ভাবনা নিয়ে থাকা ভালো?'-কে কাকে এই কথা বলেছে? কোন ভাবনাকে বাজে বলা হয়েছে? তা কি সত্যিই 'বাজে ভাবনা' তোমার কি মনে হয়? ৩.৩ 'আমাদের কথা শুনলেই এর শোক উপস্থিত হয়।'- বক্তা কে? তার কোন কথায় নরহরি শোকগ্রস্ত হয়ে পড়েছে? ৩.৪ 'রোসো, আমি তোমাকে প্রমাণ করে দিচ্ছি'- নরহরি কার কাছে কী প্রমাণ করে দিতে চেয়েছিল? ৩.৫ 'আদর করবি, তাতেও ভাবতে হবে নরু?'- এর প্রত্যুত্তরে নরু মাকে কী কী বলেছিল? ৩.৬ 'তোমার ইচ্ছে হয়েছে, আমি বাধা দেব না।'- কে কাকে বাধা দিতে চায়নি? ৩.৭ 'এটাতে বড়ো বেশি ভাবতে হল না'- কার স্বগতোক্তি? কাকে বেশি ভাবতে হলো না? কেন? ৪. 'চিন্তাশীল নরহরি সবার সব কথাতেই চিন্তামগ্ন হয়ে পড়ে, অথচ মায়ের কাশীবাসী হওয়ার ইচ্ছা হয়েছে শুনে তখনই সে রাজি হয়ে যায়। কিন্তু তার মা যেই টাকার বন্দোবস্ত করতে বলেন, সে আবার ভাবতে বসে'- এ থেকে নরহরি চরিত্রটি সম্পর্কে তোমার কেমন ধারণা হলো?
১৩৬
৫. ঠিক বানানটি বেছে নিয়ে লেখো: ব্যমো/ব্যামো পরিবর্তণ/পরিবর্তন লক্ষ্মী/লক্ষী প্রমান/প্রমাণ ব্যাস্ত/ব্যস্ত মুখস্থ/মুখস্ত
৬. নীচের বাক্যগুলিকে বদলে চলিত রীতিতে লেখো: ৬.১ ভাত শুকাইতেছে, মা মাছি তাড়াইতেছেন। ৬.২ নরহরির শিশু ভাগিনেয়কে কোলে করিয়া মাতার প্রবেশ। ৬.৩ নরহরি মাথায় হাত দিয়া পুনশ্চ চিন্তায় মগ্ন।
শব্দার্থ 📖: ব্যামো – অসুখ। নিমগ্ন – ডুব দেওয়া বা নিমজ্জিত। ধাতু – ক্রিয়াবাচক প্রকৃতি বা শব্দমূল (এখানে)। কুরুক্ষেত্র – কুরু ও পাণ্ডবের যুদ্ধক্ষেত্র। লোমাঞ্চিত – শিহরিত/ রোমাঞ্চিত। অন্তঃকরণ – হৃদয় বা মন। বদ্ধ – বাঁধা। দণ্ডবৎ – প্রণাম। আমোদ – আহ্লাদ/আনন্দ। নিতান্ত – খুব। বন্দোবস্ত –ব্যবস্থা। রোসো – অপেক্ষা করো। চিন্তাশীল – ভাবুক।
৭. অর্থ লেখো: বৎস, রোসো, দণ্ডবৎ, ভাগিনেয়, বন্দোবস্ত।
৮. সমার্থক শব্দ লেখো: পৃথিবী, সূর্য, স্ত্রীলোক, মা
৯. নাটক থেকে পাঁচটি নির্দেশক ও অনির্দেশক শব্দ খুঁজে নিয়ে লেখো।
১০. 'বাছা' শব্দটি কোন ধাতুনিষ্পন্ন শব্দ? 'বাছা' শব্দের দুটি প্রতিশব্দ লেখো।
১১. 'দাড়ি' শব্দের সাধু রূপটি লেখো।
১২. 'হেসেই কুরুক্ষেত্র'- শব্দবন্ধের মূল ভাবটি কী?
১৩. 'গুরু' শব্দটিকে দুটি আলাদা অর্থে ব্যবহার করে বাক্য রচনা করো।
১৪. 'সূর্য তো অস্ত যায় না' এখানে কোন বৈজ্ঞানিক সত্যের আভাস দেওয়া হয়েছে?
১৫. 'মাথা' শব্দটি কোন তৎসম শব্দ থেকে এসেছে?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) : জন্ম কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে। অল্পবয়স থেকেই ঠাকুরবাড়ি থেকে প্রকাশিত 'ভারতী' ও 'বালক' পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। 'কথা ও কাহিনী', 'সহজপাঠ', 'রাজর্ষি', 'ছেলেবেলা', 'শিশু', 'শিশু ভোলানাথ', 'হাস্যকৌতুক', 'ডাকঘর', 'গল্পগুচ্ছ'- সহ তাঁর বহু রচনাই শিশু-কিশোরদের আকৃষ্ট করে। দীর্ঘ জীবনে অজস্র কবিতা, গান, নাটক, ছোটোগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ লিখেছেন, ছবি এঁকেছেন। ১৯১৩ সালে 'Song Offerings'- এর জন্যে প্রথম এশিয়াবাসী হিসেবে নোবেল পুরস্কার পান। দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র ভারত আর বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত তাঁর রচনা। 'চিন্তাশীল' নাটিকাটি তাঁর 'হাস্যকৌতুক' গ্রন্থ থেকে সংকলিত।
১৩৭
১৬. ‘ভাত জুড়িয়ে গেল'- এখানে কথাটির অর্থ ভাত ঠান্ডা হয়ে গেল/ শুকিয়ে গেল। 'জুড়িয়ে গেল' শব্দবন্ধকে অন্য অর্থে প্রয়োগ করে একটি বাক্য লেখো।
১৭. 'মাছি ভন ভন করছে’— ‘ভন ভন'-এর মতো আরো পাঁচটি ধ্বন্যাত্মক/অনুকার শব্দদ্বৈত তৈরি করো।
১৮. 'কাশী' কোন রাজ্যে অবস্থিত? 'কাশী'র প্রসিদ্ধির কারণ কী?
১৯. নাটকটিতে মোট কটি 'দৃশ্য' রয়েছে? কোন কোন দৃশ্যে কাদের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়?
২০. গুরুতর - এরকম শব্দের পরে 'তর' যোগ করে পাঁচটি নতুন শব্দ লেখো।
২১. সন্ধিবিচ্ছেদ করো- আশ্চর্য, উপস্থিত, পুনশ্চ।
২২. উচ্চারণে বিকৃত শব্দগুলির পাশাপাশি মূল শব্দগুলি লেখো : জিজ্ঞেস, ব্যামো, কও, হপ্তা, দিকি, সম্মুখে।
২৩. নরহরি ভাগ্নের ডাকনামটি কী তা পাঠ থেকে খুঁজে নিয়ে লেখো।
২৪. শব্দযুগলের অর্থ পার্থক্য দেখাও : বাঁচা পুরুষ সকল পারা ভাষা বাছা পরুষ শকল পাড়া ভাসা
২৫. 'মাথা' শব্দটিকে পাঁচটি ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করে বাক্য রচনা করো।
২৬. নাটকটির নামকরণ তোমার যথাযথ মনে হয়েছে কি-না তা যুক্তিসহ আলোচনা করো।
২৭.
| মূল শব্দ | আদি অর্থ | প্রচলিত অর্থ |
|---|---|---|
| লক্ষ্মী | ||
| অন্ন | ||
| বৎস |
১৩৮
CONTENT MANAGER