23. ভানুসিংহের পত্রাবলি | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
23. ভানুসিংহের পত্রাবলি | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর - WBBSE - Class 7 - বাংলা
সপ্তম পাঠ
ভানুসিংহের পত্রাবলি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
১
কথা হচ্ছে এবার শ্রাবণ মাসে আর বছরের মতো কলকাতায় বর্ষামঙ্গল গান হবে। কিন্তু যে-গান শান্তিনিকেতনের মাঠে তৈরি সে-গান কি কলকাতা শহরের হাটে জমবে। এখানে অনুরোধে পড়ে কখনো কখনো আমার নতুন বর্ষার গান গাইতে হয়েচে। কিন্তু এখানকার বৈঠকখানায় সেই গানের সুর ঠিক মতো বাজে না। তোমাদের ওখানে এতদিনে বোধহয় বর্ষা নেমেচে, অতএব তোমার নতুন শেখা বর্ষার গান কখনো কখনো গুনগুন স্বরে গাইতে পারবে, কখনো বা এসরাজে বাজিয়ে তুলবে। তুমি যাওয়ার পর আরো কিছু কিছু নতুন গান আমার সেই খাতায় জমে উঠেচে, কলকাতায় না এলে আরো জমত। এদিকে দিনুবাবুও দাঁত তোলাবার জন্যে দু-তিন দিন হলো কলকাতায় এসেচেন;-আষাঢ় মাসের বর্ষাকে এ শহরে যেমন মানায় না, দিনুবাবুকেও তেমনি। আজ সকালেই সে পালাবে স্থির করেচে। ইতি ২৯ আষাঢ়, ১৩২৯।
২
আত্রাই নামক একটি নদীর উপর বোটে করে ভেসে চলেচি। বর্ষার মেঘ ঘন হয়ে আকাশ আচ্ছন্ন করেচে, একটু ঝোড়ো বাতাসের মতো বইচে, পাল তুলে দিয়েচে। নদী কূলে কূলে পরিপূর্ণ, স্রোেত খরতর, দলে দলে শৈবাল ভেসে আসচে। পল্লির আঙিনার কাছ পর্যন্ত জল উঠচে ; ঘন বাঁশের ঝাড়; আম কাঁঠাল তেঁতুল কুল শিমুল নিবিড় হয়ে উঠে গ্রামগুলিকে আচ্ছন্ন করে ফেলেচে; মাঝে মাঝে নদীর তীরে তীরে কাঁচা ধানের ক্ষেতে জল উঠেচে, কচি ধানের মাথা জলের উপর জেগে আছে। দুই তটে স্তরে স্তরে সবুজ রঙের ঘনিমা ফুলে ফুলে উঠেচে, তারি মাঝখান দিয়ে বর্ষার খোলা নদীটি তার গেরুয়া রঙের ধারা বহন করে ব্যস্ত হয়ে চলেচে, সমস্তটার উপর বাদল-সায়াহ্নের ছায়া। বৃষ্টি নেমে এল-দূরে মেঘের ফাঁক দিয়ে সূর্যাস্তের একটা ম্লান আভা এই বৃষ্টিধারার আবেগের উপর যেন সান্ত্বনার ক্ষীণ প্রয়াসের মতো এসে পড়েচে। আমার এই বোট ছাড়া নদীতে আর নৌকা নেই। এই জলস্থল আকাশের ছায়াবিষ্ট নিভৃত শ্যামলতার সঙ্গে মিল করে একটি গান তৈরি করতে ইচ্ছে করচে, কিন্তু হয়তো হয়ে উঠবে না। আমার দুই চক্ষু এখন বাইরের দিকে চেয়ে থাকতে চায়, খাতার দিকে চোখ রাখবার এখন সময় নয়। অনেকদিন বোলপুরে শুকনো ডাঙায় কাটিয়ে এসেচি, এখন এই নদীর উপর এসে মনে হচ্চে, – পৃথিবীর যেন মনের কথাটি শুনতে পাওয়া যাচ্চে। নদী আমি ভারি ভালোবাসি; আর ভালোবাসি আকাশ। নদীতে আকাশে চমৎকার মিলন, রঙে রঙে, আলোয় ছায়ায়, – ঠিক যেন আকাশের প্রতিধ্বনির মতো। আকাশ পৃথিবীতে আর কোথাও আপনার সাড়া পায় না এই জলের উপর ছাড়া।
আজ রাত্রের গাড়িতেই কলকাতায় যাব মনে করে ভালো লাগচে না। ইতি ২ শ্রাবণ, ১৩২৯।
১. ঠিক উত্তরটি বেছে নিয়ে লেখো : ১.১ বর্ষামঙ্গল (আষাঢ়/অগ্রহায়ণ/শ্রাবণ) মাসে অনুষ্ঠিত হয়। ১.২ শান্তিনিকেতন (বীরভূম/বাঁকুড়া/পুরুলিয়া) জেলায় অবস্থিত। ১.৩ কবি (আত্রাই/পদ্মা/শিলাবতী) নদীর ওপর বোটে করে ভেসে চলেছেন। ১.৪ পৃথিবীর মনের কথাটি কবি শুনতে পান (জলের ওপর/ নদীর ওপর/মাটির ওপর)। ১.৫ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত একটি পত্রসাহিত্যের উদাহরণ হল- (শেষের কবিতা/গীতাঞ্জলি/ছিন্নপত্র)। ২. সংক্ষেপে উত্তর দাও : ২.১ “কলকাতা শহরটা আমি মোটেই পছন্দ করিনে”- কবির এই অপছন্দের কারণ কী? ২.২ “সে গান কি কলকাতা শহরের হাটে জমবে”- কোন গানের কথা বলা হয়েছে? সে গান কলকাতা শহরের হাটে জমবে না-কবির এমন ভাবনা কেন? ২.৩ "তোমাদের ওখানে এতদিনে বোধহয় বর্ষা নেমেচে”- কার উদ্দেশ্যে কবি একথা লিখেছেন? 'ওখানে' বলতে কোন জায়গার কথা বলা হয়েছে? ২.৪ “শান্তিনিকেতনের মাঠে যখন বৃষ্টি নামে...”— তখন কবির কেমন অনুভূতি হয়? ২.৫ “আজ সকালেই সে পালাবে স্থির করেচে”- 'আজ' বলতে যে দিনটির কথা বলা হয়েছে তার সাল ও তারিখ কত? 'সে'—বলতে কার কথা বলা হয়েছে? সে কোথায় পালাবে এবং কেন? ২.৬ “সমস্তটার উপর বাদল-সায়াহ্নের ছায়া”- কবির চোখ দিয়ে দেখা এই 'সমস্তটা'-র বর্ণনা দাও। ২.৭ “কলকাতায় না এলে আরো জমত”- কী জমত? কবির কলকাতায় আসার সঙ্গে তা না জমে ওঠার সম্পর্ক কী? ২.৮ “খাতার দিকে চোখ রাখবার এখন সময় নয়”- কোন সময়ের কথা বলা হয়েছে? খাতার দিকে চোখ রাখবার সময় কবির নেই কেন?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) : জন্ম কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে। অল্পবয়স থেকেই ঠাকুরবাড়ি থেকে প্রকাশিত 'ভারতী' ও 'বালক' পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। ‘কথা ও কাহিনী', 'সহজপাঠ', 'রাজর্ষি', 'ছেলেবেলা', 'শিশু', 'শিশু ভোলানাথ', 'হাস্যকৌতুক', 'ডাকঘর', 'গল্পগুচ্ছ'- সহ তাঁর বহু রচনাই শিশু-কিশোরদের আকৃষ্ট করে। দীর্ঘ জীবনে অজস্র কবিতা, গান, ছোটোগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ লিখেছেন, ছবি এঁকেছেন। ১৯১৩ সালে 'Song Offerings'- এর জন্যে প্রথম এশিয়াবাসী হিসেবে নোবেল পুরস্কার পান। দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র ভারত আর বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত তাঁর রচনা।
পাঠ্যাংশটি তাঁর লেখা চিঠির সংকলন 'ভানুসিংহের পত্রাবলি' বই থেকে নেওয়া হয়েছে ।
৩. দু-চার কথায় পরিচয় দাও : * শান্তিনিকেতন, দিনু, বর্ষামঙ্গল, আত্রাই। ৪. একটি বর্ষণমুখর দিনের অভিজ্ঞতা বিষয়ে একটি ছোটো অনুচ্ছেদ রচনা করো।
৫. অর্থ লেখো: * পুলক, উত্তরীয়, এসরাজ, আঙিনা, সায়াহ্ন, প্রয়াস, নিভৃত।
শব্দার্থ :
- উত্তরীয় – চাদর।
- শৈবাল--শ্যাওলা।
- ছায়াবিষ্ট---ছায়ায় ঢাকা।
- ঘনিমা---ঘন হয়ে আসা।
- ম্লান-বিবর্ণ মলিন।
- আঙিনা-উঠোন।
- সায়াহ্ন-সন্ধে।
টীকা : দিনুবাবু-দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৮২-১৯৩৫)। দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পৌত্র ও দ্বিপেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্র। রবীন্দ্র সংগীতের প্রধান স্বরলিপিকার। রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'ফাল্গুনী' নাটক দিনেন্দ্রনাথকে উৎসর্গ করেন এবং তাঁকে 'আমার সকল গানের ভান্ডারী' নামে অভিহিত করেন।
৬. কারক বিভক্তি নির্ণয় করো : ৬.১ কোলকাতা শহরটা আমি মোটেই পছন্দ করিনে। ৬.২ তার উপরে আবার আকাশ মেঘে লেপা। ৬.৩ আমার মনের মধ্যে গান জেগে ওঠে। ৬.৪ কলকাতায় বর্ষামঙ্গল গান হবে। ৬.৫ সে গান কি কলকাতা শহরের হাটে জমবে। ৭. বাক্য রচনা করো : * শান্তিনিকেতন, হাট, বাদল, বৃষ্টিধারা। ৮. শব্দযুগলের অর্থ পার্থক্য দেখাও :
| প্রথম শব্দ | দ্বিতীয় শব্দ | প্রথম শব্দ | দ্বিতীয় শব্দ |
|---|---|---|---|
| সুর | শূর | আষাঢ় | আসার |
| নৃত্য | নিত্য | কূল | কুল |
| বর্ষা | বর্শা | সাড়া | সারা |
৯. বর্ষার কলকাতা শহরকে কবির বিশেষভাবে অপছন্দ করার কারণ কী? ১০. নববর্ষা বলতে কী বোঝ? ১১. বর্ষার ঋতুকে নিয়ে লেখা রবীন্দ্রনাথের দুটি গান ও দুটি কবিতার নাম লেখো। ১২. সবুজ রঙের উত্তরীয় বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? ১৩. কলকাতা শহরে হাট...শহরকে হাটের সঙ্গে তুলনার ব্যঞ্জনাটি কোথায়? ১৪. আষাঢ় মাসের বর্ষাকে কলকাতা শহরে মানায় না- কবির এ জাতীয় মন্তব্যের অর্থ কী? ১৫. আত্রাই নদীটি কোথায়? সেই নদীতে বোটে যেতে যেতে কবি কবে নির্বাচিত পত্রটি লিখেছিলেন? ১৬. নদীপাড়ের গ্রামগুলির ছবি কীভাবে কবির চোখে ধরা পড়েছে? ১৭. আকাশ আর নদীর প্রতি ভালোবাসা, সর্বোপরি বর্ষা প্রকৃতির প্রতি কবির পক্ষপাত কীভাবে পত্রদুটিতে প্রতিফলিত হয়েছে? ১৮. ক্রিয়ার কাল নির্ণয় করো: ১৮.১ কলকাতায় বর্ষামঙ্গল গান হবে। ১৮.২ অনুরোধে পড়ে কখনো কখনো আমার নতুন বর্ষার গান গাইতে হয়েচে। ১৮.৩ আজ সকালেই সে পালাবে স্থির করেছে। ১৮.৪ আত্রাই নামক একটি নদীর উপর বোটে করে ভেসে চলেচি। ১৮.৫ অনেকদিন বোলপুরের শুকনো ডাঙায় কাটিয়ে এসেচি। ১৯. নীচের বাক্যগুলিকে দুটি বাক্যে আলাদা করে লেখো : ১৯.১ কথা হচ্ছে এবার শ্রাবণ মাসে আর বছরের মতো কলকাতায় বর্ষামঙ্গল গান হবে। ১৯.২ শান্তিনিকেতনের মাঠে যখন বৃষ্টি নামে তখন তার ছায়ায় আকাশের আলো করুণ হয়ে আসে। ১৯.৩ আমার এই বোট ছাড়া নদীতে আর নৌকা নেই। ১৯.৪ আমার দুই চক্ষু এখন বাইরের দিকে চেয়ে থাকতে চায়, খাতার দিকে চোখ রাখবার এখন সময় নয়। ১৯.৫ আজ রাত্রের গাড়িতেই কলকাতায় যাব মনে করে ভালো লাগচে না।
গান
নীল অঞ্জনঘন পুঞ্জছায়ায়
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নীল-অঞ্জনঘন পুঞ্জছায়ায় সম্পৃত অম্বর হে গম্ভীর! বনলক্ষ্মীর কম্পিত কায়, চঞ্চল অন্তর- ঝঙ্কৃত তার ঝিল্লির মঞ্জীর হে গম্ভীর।। বর্ষণগীত হলো মুখরিত মেঘমন্দ্রিত ছন্দে, কদম্ববন গভীর মগন আনন্দঘন গন্ধে- নন্দিত তব উৎসবমন্দির হে গম্ভীর। দহনশয়নে তপ্ত ধরণী পড়েছিল পিপাসার্তা, পাঠালে তাহারে ইন্দ্রলোকের অমৃতবারির বার্তা। মাটির কঠিন বাধা হলো ক্ষীণ, দিকে দিকে হলো দীর্ণ- নব-অঙ্কুর-জয়পতাকায় ধরাতল সমাকীর্ণ- ছিন্ন হয়েছে বন্ধন বন্দীর হে গম্ভীর।
CONTENT MANAGER