11. খোকনের প্রথম ছবি | বনফুল
11. খোকনের প্রথম ছবি | বনফুল - WBBSE - Class 7 - বাংলা
খোকনের প্রথম ছবি
বনফুল
খোকন এখন বড়ো হয়েছে। ক্লাস টেন-এ পড়ে। ছবি আঁকার দিকে খুব ঝোঁক হয়েছে তার। সে যখন খুব ছোটো ছিল কাগজের উপর রঙিন পেনসিল দিয়ে হিজিবিজি কাটত। তারপর ক্রমশ বড়ো হলো, স্কুলে গেলো। স্কুলে ড্রইং শেখানো হতো। ড্রইং শিখতে লাগল খোকন। টুল, টেবিল, চেয়ার, কলসি, কাপ এমন কি একটা গোরুও এঁকে ফেলল একদিন। তারপর ড্রইং বুক থেকে কপি করে করে অনেক ছবি আঁকল সে। নানারকম ছবি। যেখানেই সে ছবি দেখত, দেখে দেখে এঁকে ফেলত। একদিন তার ড্রইংয়ের মাস্টারমশাই বললেন—প্রকৃতি থেকে ছবি আঁকো।
খোকন জিজ্ঞেস করলে—প্রকৃতি থেকে?
হ্যাঁ, তোমার চারপাশে তো অনেক ছবি ছড়িয়ে আছে। সেইগুলো দেখে দেখে আঁকো না এবার। তোমার বাড়ির সামনেই তো চমৎকার গাছ আছে একটি। তার ছবিটা এঁকে ফেলো একদিন।
খোকন সত্যি সত্যি এঁকে ফেলল একদিন ইউক্যালিপটাস গাছটাকে। মাস্টারমশাই বললেন—চমৎকার হয়েছে। আরো আঁকো। তোমাদের বাড়ির ছাদ থেকে যে পুলটা দেখা যায়, সেটা আঁকতে পারবে?
পারব—
পুলের ছবিটা দেখেও খুব প্রশংসা করলেন মাস্টারমশাই। বললেন, চারপাশে যা দেখবে এঁকে ফেলবে। খুব বড়ো চিত্রকর হবে তুমি।
খোকন মহা উৎসাহে আঁকতে লাগল ছবি। কিন্তু কিছুদিন পরে সে নিজেই বুঝতে পারল ঠিক হচ্ছে না। সূর্যের যে ছবিটা এঁকেছে সেটা তো সূর্যের মতো নয়। সূর্যের দীপ্তি তো ছবিতে ফোটেনি। গোলাপ ফুলের ছবিতে কি গোলাপ ফুলের সৌন্দর্য ফোটাতে পেরেছে সে? পারেনি। প্রকৃতির ছবি ঠিক আঁকা যায় না। একদিন তো মেঘের ছবি আঁকতে গিয়ে বেকুব হয়ে গেল খোকন। একদিন সে দেখল আকাশে একটা মেঘ হাতির মতো। ঠিক যেন একটি হাতি পেছনের দুপায়ে ভর করে শুঁড় তুলে আছে। খোকন তাড়াতাড়ি তার ড্রইং খাতায় ছবিটা আঁকতে লাগল। আঁকা শেষ হবার পর মিলিয়ে দেখতে গেল ঠিক হয়েছে কিনা। গিয়ে দেখে—হাতি নেই, প্রকাণ্ড একটা কুমির শুয়ে আছে। হাতি কুমির হয়ে গেছে।
খোকনের বাবার একজন বন্ধু বিখ্যাত চিত্রকর। তিনি লক্ষ্ণৌ শহরে থাকেন। একদিন তিনি খোকনদের বাড়িতে এলেন।
খোকনের বাবা তাঁকে বললেন—খোকনও ছবি আঁকছে।
তাই নাকি! দেখি দেখি—
খোকন সগর্বে তার ড্রইং খাতাগুলো নিয়ে এল।
৩৩
ওরে বাস, অনেক ছবি এঁকেছ দেখছি—একে একে উল্টে বললেন, তোমার ছবি কই? এ সবই তো কপি করেছ। তুমি বড়ো হয়ে ক্যামেরা নিয়ে যদি এদের ফটো তোলো তাহলে এগুলো আরও নিখুঁত হবে। এগুলো সব নকল করা ছবি। তোমার নিজের আঁকা ছবি কই?
খোকন অবাক হয়ে গেল।
নিজের আঁকা ছবি? তা কী করে আঁকব?
চোখ বুজে বসে কল্পনা করো। কল্পনায় যা দেখবে সেটাই এঁকে ফেলো।
চিত্রকর চলে গেলেন।
খোকন একদিন নিজের ঘরে চোখ বুজে বসে রইল। অন্ধকার ছাড়া আর কিছু দেখতে পেল না সে। খোকন ঠিক করল এই অন্ধকারেরই ছবি আঁকবে। কালো রং আর তুলি নিয়ে শুরু করে দিল আঁকতে। ড্রইং খাতার একটা পাতা কালো রঙে ভরে গেল।
তারপর সেটার দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল খোকন। এটা কী রকম ছবি হলো? এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল তবু।
তারপর হঠাৎ দেখতে পেল ওই কালোর ভেতরই একটা মুখ রয়েছে। চোখও আছে। অদ্ভুত হাসি সে চোখে।
নিজের প্রথম সৃষ্টির দিকে অবাক হয়ে চেয়ে রইল খোকন।
বনফুল (১৮৯৯-১৯৭৯) : 'বনফুল' হলো সাহিত্যিক বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের ছদ্মনাম। জন্ম বিহারের পূর্ণিয়া জেলার মণিহারীতে। সাহেবগঞ্জ হাইস্কুলে পড়ার সময় ১৯১৫ তে তাঁর প্রথম কবিতা 'মালঞ্চ' পত্রিকায় প্রকাশিত। এরপর 'প্রবাসী' ও 'ভারতী' পত্রিকায় তিনি 'বনফুল' ছদ্মনামে কবিতা লেখেন। পাটনা মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তারি পাস করেন। তাঁর লেখা প্রথম উপন্যাস 'তৃণখণ্ড' ডাক্তারি জীবনের প্রথম দিকের রচনা। বাংলা সাহিত্যে ক্ষুদ্রতম ছোটোগল্পেরও জনক তিনি। ছোটোগল্প, নাটক, উপন্যাস, কাব্য-সাহিত্যের সব শাখাতেই তিনি সমান দক্ষ। তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য রচনা— 'স্থাবর', 'জঙ্গম', 'মন্ত্রমুগ্ধ', 'হাটেবাজারে', 'শ্রীমধুসূদন', 'বিদ্যাসাগর' প্রভৃতি। আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ 'পশ্চাৎপট' রবীন্দ্র পুরস্কারে সম্মানিত। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের 'জগত্তারিণী পদক' আর ভাগলপুর ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি.লিট উপাধি লাভ করেন।
৩৪
ল শব্দার্থ : ঝোঁক - আগ্রহ/প্রবণতা। হিজিবিজি - আঁকিবুঁকি। ড্রইং—আঁকা। পুল—সেতু বা সাঁকো। চিত্রকর—শিল্পী, যিনি ছবি আঁকেন। নকল—অনুকরণ।
১. গল্প থেকে একইরকম অর্থযুক্ত আর একটি করে শব্দ খুঁজে নিয়ে লেখো: শিল্পী, নগর, ঐরাবত, উজ্জ্বলতা, অনুকরণ।
২. বিশেষ্য থেকে বিশেষণে রূপান্তরিত করো : প্রকৃতি, গাছ, কল্পনা, ফুল, দীপ্তি।
৩. নিম্নরেখ অংশটির কারক বিভক্তি নির্ণয় করো : ৩.১ প্রকৃতি থেকে ছবি আঁকো। ৩.২ তোমার ছবি কই? ৩.৩ একদিন তিনি খোকনদের বাড়িতে এলেন। ৩.৪ ড্রইং খাতার একটা পাতা কালো রঙে ভরে গেল।
৪. নীচের প্রশ্নগুলির নিজের ভাষায় উত্তর দাও : ৪.১ 'ড্রইং শিখতে লাগল খোকন'— খোকন কোথায় ড্রইং শিখত? আর প্রথমদিকে কী কী আঁকত? ৪.২ 'একদিন তো মেঘের ছবি আঁকতে গিয়ে বেকুব হয়ে গেল খোকন'— 'বেকুব' শব্দটির অর্থ কী? মেঘের ছবি আঁকতে গিয়ে খোকন বেকুব হয়ে গিয়েছিল কেন? ৪.৩ 'এগুলো সব নকল করা ছবি।'— কে কাকে এই কথা বলেছেন? 'নকল করা ছবি' বলতে তিনি কী বুঝিয়েছেন?
৫. নীচের প্রতিটি বাক্যকে দুটি বাক্যে ভেঙে লেখো : ৫.১ সে যখন খুব ছোটো কাগজের উপর রঙিন পেনসিল দিয়ে হিজিবিজি কাটত। ৫.২ পুলের ছবিটা দেখেও খুব প্রশংসা করলেন মাস্টারমশাই। ৫.৩ সূর্যের যে ছবিটা এঁকেছে সেটা তো সূর্যের মতো নয়। ৫.৪ একদিন তো মেঘের ছবি আঁকতে গিয়ে বেকুব হয়ে গেল খোকন। ৫.৫ খোকন একদিন নিজের ঘরে চোখ বুজে বসে রইল।
৩৫
৬. নীচের আলাদা আলাদা বাক্যগুলি জুড়ে একটি বাক্য তৈরি করো : ৬.১ খোকন বড়ো হয়েছে। ক্লাস টেন-এ পড়ে। ৬.২ খোকনের বাবার একজন বন্ধু বিখ্যাত চিত্রকর। তিনি লক্ষ্ণৌ শহরে থাকেন। ৬.৩ নিজের আঁকা ছবি? তা কী করে আঁকব? ৬.৪ চোখ বুজে বসে কল্পনা করো। কল্পনায় যা দেখবে সেটাই এঁকে ফেলো। ৬.৫ তারপর হঠাৎ দেখতে পেল ওই কালোর ভেতরেই একটা মুখ রয়েছে। চোখও আছে।
৭. গল্পে রয়েছে এমন দশটি ইংরেজি শব্দ খুঁজে নিয়ে লেখো।
৮. 'খোকন জিজ্ঞেস করলে—প্রকৃতি থেকে?'— প্রশ্ন পরিহার করো।
৯. লক্ষ্ণৌ শহরটি কোথায়? সেখানকার একটি বিখ্যাত স্থাপত্যের নাম লেখো।
১০. খোকনের 'ড্রইংয়ের মাস্টারমশাই' কীভাবে খোকনকে প্রকৃতি দেখতে শিখিয়েছিলেন?
১১. প্রকৃতির দৃশ্যের যে বদল অহরহ হয় তা খোকন কীভাবে বুঝল?
১২. 'খোকন অবাক হয়ে গেল,' আর '...অবাক হয়ে চেয়ে রইল খোকন।' -এই দুই ক্ষেত্রে খোকনের 'অবাক' হওয়ার কারণ বিশ্লেষণ করো।
১৩. 'চিত্রকর চলে গেলেন' -এই চিত্রকরের পরিচয় দাও। চলে যাওয়ার আগে তিনি খোকনকে কী বলে গেলেন?
১৪. 'এই অন্ধকারেরই ছবি আঁকবে।' —কখন খোকন এমন সিদ্ধান্ত নিল? অন্ধকারের সেই ছবির দিকে তাকিয়ে খোকন কী দেখতে পেল?
১৫. গল্পে 'খোকনের প্রথম ছবি' হিসেবে তুমি কোন ছবিটিকে স্বীকৃতি দেবে এবং কেন তা বুঝিয়ে লেখো।
১৬. পাঁচজন সাহিত্যিকের নাম এবং তাঁদের ছদ্মনাম পাশাপাশি লেখো। সাহিত্যিকেরা কেন ছদ্মনাম ব্যবহার করেন তা শিক্ষক/শিক্ষিকার থেকে জেনে নাও।
১৭. তুমি যদি বড়ো হয়ে সাহিত্যিক হও, কোন ছদ্মনাম তুমি ব্যবহার করবে এবং কেন— তা লেখো।
১৮. খোকনের ড্রইংয়ের মাস্টারমশাই আর তার বাবার এক বন্ধু যে যে ভাবে তাকে ছবি আঁকতে অনুপ্রাণিত করেছিলেন, তা লেখো। কোন রীতিটিকে তোমার পছন্দ হলো এবং কেন তা যুক্তিসহ লেখো।
৩৬
CONTENT MANAGER