Academy

9. আত্মকথা | রামকিঙ্কর বেইজ

9. আত্মকথা | রামকিঙ্কর বেইজ - WBBSE - Class 7 - বাংলা

0

তৃতীয় পাঠ

আত্মকথা

রামকিঙ্কর বেইজ

Illustration of Ramkinkar Baij

যতদূর মনে পড়ে শৈশবেই আমার চোখে পড়ত আমাদের বাড়িঘরের চারদিকের দেওয়ালে নানা দেবদেবীর ছবি, ছবি আমার তখনই ভালো লাগত। ছোটোবেলাতে আমি সেই-সব দেখতাম আর কপি করতাম। ভিসুয়াল আর্টে আমার প্রথম বর্ণপরিচয়।

মূর্তিগড়ার ইতিহাসও খুব মজার। আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তাটা লাল-মোরামে ঢাকা ছিল। একদিন হঠাৎ বৃষ্টির পরে দেখি মোরাম ধুয়ে নীলরঙের মাটি বেরিয়ে পড়েছে। চোখে পড়ামাত্র সেই মাটি খাবলে তুলে নিয়ে নানারকম পুতুল তৈরিও করতে লাগলাম। এখানে বলে রাখা ভালো যে আমার প্রথম শিল্পের-ইস্কুল বাড়ির পাশের কুমোর পাড়া। ছেলেবেলা থেকেই অনেকক্ষণ ধরে কুমোরদের মূর্তি গড়া ও অন্যান্য কাজ দেখার বেশ অভ্যেস ছিল। সুযোগ পেলেই মাটিতে হাত লাগিয়ে ছানাছানি করতাম।

রঙের প্রয়োজনও ছিল। গাছের পাতার রস, বাটনা-বাটা শিলের হলুদ, মেয়েদের পায়ের আলতা, মুড়ি-ভাজা খোলার চাঁছা ভুষোকালি—এইগুলি রঙের প্রয়োজন মেটাত। পাড়ার প্রতিমাকারক মিস্ত্রিদের দেখে ছাগলের ঘাড়ের লোম কেটে নিয়ে বাঁশের কাঠির ডগায় বেঁধে নিয়ে তাতে তুলির কাজ হতো।

বাবার আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকায় আমার অঙ্কন-গুণটির জন্য স্কুলে আমি অবৈতনিক ছাত্র হিসাবে পড়াশুনার সুযোগ পেয়ে এসেছি। স্কুলের দেওয়ালে আঁকা-ছবি ঝোলানো আর পত্রিকায় ছবি দেওয়া আমার প্রতিমাসের কাজ ছিল।

ছোটোবেলাতে পড়াশুনা ভালো লাগত না। বাবা লিখতে দিলে আঁকতে শুরু করতাম। বাঁকুড়াতে ঠেলাঠেলি করে ম্যাট্রিক পর্যন্ত হয়েছিল। শান্তিনিকেতনে এসে পড়েছি। কিন্তু তা অ্যাকাডেমিক নয়। ইচ্ছে মতো পড়তাম।

এই-সবের মধ্যে কখন নন্-কোঅপারেশন আন্দোলন এসে গেল। স্কুল-কলেজ বন্ধ। ন্যাশনাল স্কুলে ভর্তি হলাম আর কংগ্রেসের কাজে যোগ দিলাম। আমার উপর ভার ছিল মহাপুরুষদের বাণী থেকে উদ্ধৃতি লিখে ঝুলিয়ে দেওয়া আর প্রসেশনের সময় লিডারদের পোর্ট্রেট এঁকে দেওয়া। সেগুলি অয়েলপেন্ট দিয়ে করতে হতো।

এইসময় শ্রদ্ধেয় রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় মহাশয় বাঁকুড়ায় আসেন এবং তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়। শান্তিনিকেতনের সঙ্গে যোগাযোগ তাঁরই কৃপায় ঘটে। সেটা হচ্ছে ১৯২৫ সাল। আমার এত আনন্দ হলো যে ম্যাট্রিক না দিয়েই চলে এলাম। একমাত্র রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনই ব্রিটিশ কর্তৃত্বের বাইরে।

চলে এলাম। এটা শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্য বিদ্যালয়। তিনি (রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়) জেনারেল লাইব্রেরির উপরতলায় কলাভবনে নিয়ে গেলেন এবং আচার্য নন্দলালবাবুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তখন নন্দলালবাবুর শিল্প সম্বন্ধে আমার ধারণা বেশি কিছু ছিল না। যা কিছু 'প্রবাসী'র অ্যালবামে দেখেছি। তা-ও বেশি নয়। ভারতীয় শিল্প ভালো লাগত না তা নয়— কিন্তু বাস্তবতার ভিতর দিয়ে না-গেলে সেটা সার্থক হবে না— এটাই ছিল মূল ধারণা। যার ফলে পরবর্তীকালে শান্তিনিকেতনে প্রাকৃতিক বাস্তবতার সূচনা হয়েছে। এখনো চলছে। ছাত্রদের অ্যানাটমি ও মাস্ল সম্বন্ধেও শিক্ষা দেওয়া হয়।

আমরা কাজ করতাম নিজেদের ইচ্ছামতন। নন্দবাবু নিজের কাজ করতেন। একবার করে ঘুরে যেতেন। বিশেষ কিছু ইনস্ট্রাকশন দিতেন না। তবে হ্যাঁ, একটু আধটু যা না-বললেই না, তা কি আর বলতেন না? কিন্তু নিজে ইমপোজ করতেন না। পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন।

অয়েল পেন্টিং তখন শান্তিনিকেতনে কেউ করতেন না। আমিই প্রথম শুরু করি। দোকানে গিয়ে বললাম, 'অয়েল-পেন্টিং করব, কী রং আছে? কীভাবে করতে হয়, দেখান?' তা দোকানদার দেখাল, 'এই তুলি, এই টিউবে রং আর এই পাত্রে তেল আছে, একবার ডুবিয়ে নিয়ে রং করুন।' ব্যস, অয়েল পেন্টিং শেখা হয়ে গেল। ভালো কাজ করেছিলাম অয়েলে, যতদূর মনে হচ্ছে— গার্ল অ্যান্ড দ্য ডগ। নন্দলালবাবু কিন্তু একটু অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন অয়েলে করেছিলাম বলে। তবে বাধাও দেননি। আমি শান্তিনিকেতনে আসার বছর-চারেক আগে নন্দলালমশাই কলাভবনের অধ্যক্ষ হয়ে আসেন। ছাত্রদের সঙ্গে ওঁর ব্যবহার খুব সুন্দর ছিল। সকলেই খুব সাহায্য করতেন। তবে তিনি তো ওরিয়েন্টাল আর্টের প্রবর্তক। ওয়েস্টার্ন আর্টের প্রচলন তখনো হয়নি। উনি পছন্দও করতেন না।

আচার্যদেবের সঙ্গে দেখা হলো। দেখলেম বলিষ্ঠ চেহারার মানুষ, গায়ে সিল্কের পাঞ্জাবি, পরনে ধুতি। আমার ছবি দেখতে চাইলেন। দেখালাম। বললেন, 'তুমি সবই জানো, আবার এখানে কেন?' একটু ভেবে বললেন, 'আচ্ছা, দু-তিন বছর থাকো তো।' সেই দু-তিন বছর আমার এখনো শেষ হলো না। তাঁর বিচিত্র অবদানের ভিতর দেখেছি শিল্প স্রোত নানাভাবে নানারূপে এসেছে তীব্রভাবে, কিন্তু কখনো স্বাদবিহীন নয়।

অত বড়ো একজন শিল্পীর কাছে শিক্ষালাভ করেছি, আমার সৌভাগ্য। শিল্পী হিসাবে যেমন মর্যাদাবান, শিক্ষক হিসেবেও তেমনি। এত বড়ো পেইন্টার, এত নিখুঁত স্ট্রোক। প্রায় সমস্ত ছবিরই বিষয় বা ব্যাকগ্রাউন্ড খুব সাদামাটা। সাধারণ চরিত্র, কমন ল্যান্ডস্কেপ, একেবারে গ্রামের কমপ্লিট ক্যারেকটার নিয়ে ওঁর ছবি। এই সাদামাটা সুরটাই আমাকে ভীষণভাবে টানে। আমার ছবি বা মূর্তির অধিকাংশ ক্যারেকটারই যে খুব সাধারণ, তা অনেকটা নন্দলালবাবুর পরোক্ষ প্রভাবে।

(নির্বাচিত অংশ)

Painting of a woman by Ramkinkar Baij

রামকিঙ্কর বেইজের আঁকা একটি প্রতিকৃতি

১. ঠিক উত্তরটি বেছে নিয়ে বাক্যটি আবার লেখো:

1.1 রামকিঙ্করের প্রথম শিল্পের-ইস্কুল বাড়ির পাশের—কামারপাড়া/কুমোরপাড়া/পটুয়াপাড়া।
1.2 'পোর্ট্রেট' শব্দটির অর্থ হলো—প্রতিকৃতি/আত্ম-প্রতিকৃতি/প্রকৃতির ছবি।
1.3 'অয়েল পেন্টিং' বলতে বোঝায়—জলরঙে আঁকা ছবি/মোেমরঙে আঁকা ছবি/তেলরঙে আঁকা ছবি
1.4 রামকিঙ্করের ছবি বা মূর্তি অধিকাংশ ক্যারেকটারই যে খুব— অসাধারণ/সাধারণ/নগণ্য।

২. একই অর্থ-যুক্ত শব্দ রচনাংশ থেকে বেছে নিয়ে লেখো:

বিনা ব্যয়ে, অভ্যুত্থান, দরকার, নিপুণ, সম্মাননীয়।

৩. বিশেষ্য থেকে বিশেষণ এবং বিশেষণ থেকে বিশেষ্য বদলাও :

সার্থক, সুন্দর, মূর্তি, চরিত্র, উদ্ধৃতি

শব্দার্থ:

কপি – অনুকরণ/নকল। ভিসুয়াল আর্ট– ছবি/চিত্রকলা। অ্যাকাডেমিক – প্রথাগত লেখাপড়া। নন্ - কোঅপারেশন – অসহযোগ আন্দোলন। প্রসেশন – শোভাযাত্রা। পোর্ট্রেট – প্রতিকৃতি। অয়েল পেন্ট – তৈলচিত্র। রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় – 'প্রবাসী' পত্রিকার সম্পাদক। অ্যানাটমি – শরীরতত্ত্ব। মাসল–পেশি। ইনস্ট্রাকশন– নির্দেশ। ইমপোজ – আরোপ। ওরিয়েন্টাল আর্ট–শিল্পকলার প্রাচ্যধারা। ওয়েস্টার্ন আর্ট– শিল্পকলার পাশ্চাত্যধারা। পেইন্টার – শিল্পী।

৪. একটি বাক্যে উত্তর দাও :

4.1 কী কী দিয়ে শিল্পী রামকিঙ্কর রঙের প্রয়োজন মেটাতেন?
4.2 কার সৌজন্যে রামকিঙ্করের সঙ্গে শান্তিনিকেতনের যোগাযোগ হয়?
4.3 শান্তিনিকেতনের আচার্য নন্দলাল বসু কাজের ক্ষেত্রে কেমন মনোভাব দেখাতেন?
4.4 নন্দলাল বসুর কাজের কোন দিকটা শিল্পী রামকিঙ্করকে বেশি প্রভাবিত করেছিল?

৫. নিম্নলিখিত ব্যক্তি ও বিষয়গুলি নিয়ে দু-একটি বাক্য লেখো:

নন্-কোঅপারেশন মুভমেন্ট, অয়েল পেন্টিং, আচার্য নন্দলাল বসু, ল্যান্ডস্কেপ।

৬. নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর নিজের ভাষায় লেখো :

6.1 'ভিসুয়াল আর্টে আমার প্রথম বর্ণপরিচয়'— শিল্পী রামকিঙ্করের ছবির সঙ্গে প্রথম বর্ণপরিচয় হয়েছিলো কী ভাবে? 6.2 'জেনারেল লাইব্রেরির উপরতলায় কলাভবনে নিয়ে গেলেন'— কে কাকে নিয়ে গিয়েছিলেন? তারপর কী ঘটেছিলো? 6.3 'যতদূর মনে হচ্ছে—গার্ল অ্যান্ড দ্য ডগ'— কার উক্তি? 'গার্ল অ্যান্ড দ্য ডগ' কীসের নাম? তিনি কী ভাবে এ ধরনের কাজ শিখলেন?
6.4 'এই সাদামাটা সুরটা আমাকে ভীষণভাবে টানে'— কাকে টানে? 'সাদামাটা সুর' বলতে তিনি কী বুঝিয়েছেন? তাঁকে এই সুর টানে কেন?

৭. 'সাহিত্য মেলা' বইয়ের কোনো একটি কবিতা বা গল্প বা কোনো একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে তুমি একটি ছবি এঁকে দেখাও। নিজের আঁকা ছবি নিয়ে পাঁচ/ছয়টি বাক্য লিখে নিজের মতামত জানাও।

Illustration of mother and child in rain

রামকিঙ্করের স্কেচে মা ও ছেলে

রামকিঙ্কর বেইজ (১৯০৬-১৯৮০) :

প্রখ্যাত ভাস্কর এবং চিত্রশিল্পী ছিলেন। ছোটোবেলা থেকেই ছিলেন ছবি আঁকায় পারদর্শী। দেব-দেবীর ছবি আঁকতেন। কুমোর-কামারদের কাজেও আকৃষ্ট ছিলেন। পুতুল-গড়া, থিয়েটারের সিন-তৈরি, ছবি-আঁকা ইত্যাদি কাজে যুক্ত ছিলেন। শিল্পী রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় তাঁকে শান্তিনিকেতনে ১৯২৫ সালে নিয়ে আসেন। তাঁর আঁকা ছবি দেখে নন্দলাল বসু বলেছিলেন, 'তুমি সবই জানো, আবার এখানে কেন?' সারাজীবন অজস্র ছবি এঁকেছেন, মূর্তি গড়েছেন। তাঁর ছবিতে, ভাস্কর্যে রাঢ় দেশের মাটি ও মানুষের প্রাধান্য লক্ষ করা যায়। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য শিল্পকলার নানা বিশেষত্ব তাঁর কাজে ধরা পড়েছে।

শান্তিনিকেতনে তাঁর গড়া বিখ্যাত মূর্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে—'সুজাতা', 'হাটের সাঁওতাল পরিবার', 'গান্ধিজি', 'বুদ্ধদেব', 'কাজের শেষে সাঁওতাল রমণী' ইত্যাদি। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে 'বিশ্বভারতী' তাঁকে 'দেশিকোত্তম' উপাধিতে ভূষিত করে।

Photograph of Rabindranath Tagore and Ramkinkar Baij sculpting

রবীন্দ্রনাথের মূর্তি তৈরিতে ব্যস্ত শিল্পী রামকিঙ্কর বেইজ

CONTENT MANAGER

Sattar Uddin SohelSattar Uddin Sohel