Academy

5.2 পরিবেশদূষণ (Environmental pollution) 🌫️

5.2 পরিবেশদূষণ (Environmental pollution) 🌫️ - WBBSE - Class 10 - বিজ্ঞান

0

5.2 পরিবেশদূষণ (Environmental pollution) 🌫️

পরিবেশে যখন জীব ও উদ্ভিদজগতের অস্তিত্বের পক্ষে ক্ষতিকর বস্তুর উপস্থিতি বৃদ্ধি পায়, সেই অবস্থাকে বিজ্ঞানীরা পরিবেশদূষণ বলেন। মানবসভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে প্রাকৃতিক সম্পদের যথেচ্ছভাবে ব্যবহারের ফলে বর্তমানে একদিকে যেমন প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হচ্ছে তেমনি পরিবেশদূষণের মাত্রাও বাড়ছে।

5.2.1 দূষণের ধারণা (Concept of pollution) 💡

পরিবেশে মানুষের এবং অন্যান্য জীবের স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর বস্তুস‌মূহের আধিক্য বা অনুপ্রবেশকে দূষণ বলে। দূষণ জীবজগৎ ও পরিবেশের ওপরে বিরূপ প্রভাব বিস্তার করে। মূলত মানব জনসংখ্যার অত্যধিক বৃদ্ধি এবং নির্দির্ভর উন্নতির প্রচেষ্টা পৃথিবীকে দূষণ নামক সংকটের মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে।

📌 দূষণ: জীবমণ্ডলের ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক বৈশিষ্ট্যের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন যা জীবজগৎ ও পরিবেশের ক্ষতিসাধন করে, তাকে দূষণ বলে।

🧪 দূষক: পরিবেশে যে সকল ক্ষতিকারক বস্তুর আধিক্য বা অনুপ্রবেশে জীবমণ্ডলের ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক বৈশিষ্ট্যের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন ঘটে এবং জীবজগৎ ও পরিবেশের ক্ষতি হয়, তাদের দূষক বলে।

দূষণের প্রকারভেদ: পরিবেশের উপাদান অনুযায়ী দূষণ বিভিন্ন রকম হয়। যেমন—বায়ুদূষণ, জলদূষণ, মাটি দূষণ, শব্দদূষণ প্রভৃতি। নীচে বিভিন্ন প্রকার দূষণ সম্বন্ধে আলোচনা করা হল।

[a] বায়ুদূষণ (Air pollution) 💨

প্রাকৃতিক বা মনুষ্যসৃষ্ট কারণে বায়ুর গ্যাসিয় উপাদানের ঘনত্বের পরিবর্তন বা অন্য কোনো ক্ষতিকর উপাদান মিশে জীব ও পরিবেশের ক্ষতিসাধনের ফলে সৃষ্ট অবস্থাকে বায়ুদূষণ বলে।

বায়ুদূষণের কারণবায়ুদূষণের ফলাফল
1. গ্রিনহাউস গ্যাস: বায়ুমণ্ডলের যেসব গ্যাস সৌর তাপশোষণ করে ও তা ভূপৃষ্ঠে মুক্ত করে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে তাদের গ্রিনহাউস গ্যাস বলে। যেমন—কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂), মিথেন (CH₄), ওজোন (O₃), ক্লোরোফ্লুরোকার্বন (CFCs), নাইট্রাস অক্সাইড (N₂O) প্রভৃতি। নানা কারণে এইসব গ্যাস পরিবেশে বৃদ্ধি পায়। যেমন— ① CO₂ গ্যাসটি জীবাশ্ম-জ্বালানি ও জৈববস্তুর দহন, কলকারখানার ধোঁয়া থেকে উৎপন্ন হয়। ② CH₄ গ্যাসটি আবর্জনা ও1. অ্যাসিড বৃষ্টি: পরিবেশদূষণের ফলে সৃষ্ট সালফার ডাইঅক্সাইড (SO₂), নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড (NO₂) প্রভৃতি গ্যাস বৃষ্টির জল অথবা তুষার বা শিশিরে মিশে বিক্রিয়া করে সালফিউরিক অ্যাসিড (H₂SO₄), নাইট্রিক অ্যাসিড (HNO₃), হাইড্রোজেন ক্লোরাইড (HCl) প্রভৃতি তৈরি করে, ভূপৃষ্ঠে নেমে এসে মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ক্ষতিসাধন করলে, তাকে অ্যাসিড বৃষ্টি বা অম্লবৃষ্টি বলে। অ্যাসিড বৃষ্টি নানারকম জটিল ও সুদূরপ্রসারী সমস্যা সৃষ্টি করে। যেমন— ① মিষ্টি জলের জলাশয়ে অ্যাসিড বৃষ্টির প্রভাবে জলের pH মাত্রা হ্রাস পায়, ফলে জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের মৃত্যু হয়। ② অ্যাসিড বৃষ্টি মাটির অম্লতা বৃদ্ধি করে, ফলে মাটির উর্বরতা হ্রাস পায় এবং উদ্ভিদ বৃদ্ধির পক্ষে অপরিহার্য Ca, Mg প্রভৃতি পরিপোষকগুলির অভাবে উদ্ভিদ বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। ③ মার্বেল,

💨 বায়ু দূষণ ও তার প্রভাব (Air Pollution and Its Effects)

🌡️ গ্রিনহাউস গ্যাস (Greenhouse Gas)

  • ৩. রেফ্রিজারেশন ও এয়ারকন্ডিশন শিল্পে ব্যবহৃত CFC (ক্লোরোফ্লুরোকার্বন) বায়ুদূষণ ঘটায়।
  • ৪. কৃষিকাজে ব্যবহৃত নাইট্রোজেনযুক্ত সার ও শিল্পকারখানা থেকে N₂O (নাইট্রাস অক্সাইড) গ্যাস মুক্ত হয়ে বায়ুদূষণ ঘটায়।

(একটি চিত্র: পৃথিবীর চারপাশে CO, N₂O, CFC, O, CH গ্যাসগুলি দ্বারা তাপ আটকে থাকার চিত্র দেখানো হয়েছে।)

🌫️ সাসপেন্ডেড পার্টিকুলেট ম্যাটার (SPM) (Suspended Particulate Matter)

📌 বাতাসে ভাসমান ধূলিকণা, ধোঁয়া, মাটির কণা, ধাতব কণা, অণুজীব, ছাই, পরাগরেণু প্রভৃতি সূক্ষ্ম, তরল বা কঠিন কণা যেগুলি বায়ুদূষণ ঘটায়, তাদের SPM বা সাসপেন্ডেড পার্টিকুলেট ম্যাটার বলে। এইসব ভাসমান কণার ১ মাইক্রনের (μ) কম হলে, তাদের অ্যারোসল বলে।

  • SPM এর উৎস: শিল্প-কারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়া, ট্র্যাফিক, নির্মাণ কাজ বা প্রাকৃতিক কারণে SPM তৈরি হয়।
  • বর্তমানে ভারতের অধিকাংশ বড়ো শহরে SPM বিপজ্জনক মাত্রায় এসে ঠেকেছে।

🌧️ অ্যাসিড বৃষ্টির প্রভাব (Effects of Acid Rain)

  • 🗿 চুনাপাথর নির্মিত স্মৃতিসৌধের ক্যালসিয়াম কার্বনেট অ্যাসিড বৃষ্টির সঙ্গে বিক্রিয়া করে ক্যালসিয়াম সালফেট বা নাইট্রো যৌগ তৈরি করে, ফলে সৌধের উজ্জ্বলতা হ্রাস পায় ও তা ছিদ্রপূর্ণ হয়ে যায়। একে বলে স্টোন লেপ্রসি বা স্টোন ক্যানসার
  • 🏛️ উদাহরণস্বরূপ: ভারতের তাজমহল, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, ব্রিটেনের পার্লামেন্ট ভবন, সেন্ট পলস গির্জা ইত্যাদি অ্যাসিড বৃষ্টি দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

(একটি চিত্র: একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তির আবক্ষ মূর্তি, যার ক্যাপশন ছিল 'আসিড বৃষ্টির প্রভাব: স্টোন লেপ্রসি')

😷 ফুসফুসের রোগ (Lung Diseases)

  • ১. শিল্পাঞ্চলে বসবাসরত মানুষের দেহে প্রতিনিয়ত শ্বাস-প্রশ্বাস বায়ুর সাথে বিভিন্ন ক্ষতিকারক সূক্ষ্ম কণা (SPM) প্রবেশ করে। ফলে অ্যালার্জি, ব্রঙ্কাইটিস, হাঁপানি ইত্যাদি রোগ দেখা যায়।
  • ২. কয়লা খনিতে কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যে বায়ুদূষণজনিত ব্ল্যাক লাং নামক রোগ, এমনকি ফুসফুসের ক্যানসারও দেখা যায়।
  • ৩. বায়ুদূষণের ফলে শ্বাসনালী সরু হয়ে স্থায়ীভাবে শ্বাসকষ্টের রোগ সৃষ্টি হলে তাকে ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ বা COPD বলে। যেমন— অ্যাসবেস্টোসিস, সিলিকোসিস, এমফাইসেমা (অ্যালভিওলাই বিনষ্ট হয়) নামক COPD।
  • ৪. বায়ুদূষণের ফলে শিশুদের সমস্যা সর্বাধিক হয়। তারা অনেকসময়ই নাকের বদলে মুখছিদ্র দিয়ে প্রশ্বাস নেয়। এর ফলে ফুসফুসগুলির ফিল্টার ঘটা সম্ভব হয় না। এছাড়াও শিশুদের দেহের তুলনায় বায়ুগ্রহণ মাত্রা বেশি হয়। অনাক্রম্যতা ও অপরিণত নয় বলে শিশুদের ক্ষেত্রে অ্যাজমা, ব্রঙ্কাইটিস প্রভৃতি ফুসফুসের রোগ বেশি মাত্রায় ঘটে।

💡 জেনে রাখা (Know This): সাধারণ বৃষ্টির জলে বায়ুর CO₂ মিশে কার্বনিক অ্যাসিড তৈরি হয়ে মিশে থাকে। তাই বৃষ্টির জল সামান্য আম্লিক হয় (pH মান 5.2)। কিন্তু অ্যাসিড বৃষ্টিতে তীব্র অম্ল থাকে বলে pH মান 5.2-এর অনেক কম হয়।


💧 জলদূষণ (Water Pollution)

📌 প্রাকৃতিক বা মনুষ্যসৃষ্ট কারণে জলের সঙ্গে বিভিন্ন প্রকার বর্জ্য পদার্থ, দূষিত পদার্থ ইত্যাদি মিশে গেলে জলের ভৌত, রাসায়নিক এবং জৈব উপাদানগুলির গুণমান নষ্ট হয় এবং জলজ উদ্ভিদ, প্রাণী ও মানুষের ক্ষতিসাধন হয়। এই অবস্থাকে জলদূষণ বলে। এখানে সাধু বা মিষ্টি জলের দূষণ নিয়ে আলোচনা করা হল।

🌊 জলদূষণের কারণ (Causes of Water Pollution)🤢 জলদূষণের ফলাফল (Effects of Water Pollution)
১. কৃষিক্ষেত্রের বর্জ্য (Agricultural Waste):১. রোগ (Diseases):
①. কৃষিক্ষেত্রে উৎপন্ন ও বৃষ্টিধৌত রাসায়নিক সার, পেস্টনাশক ও জীবজাত বর্জ্যকে কৃষিক্ষেত্রের বর্জ্য (agricultural run off) বলে। চাষের...①. দূষিত জল পান করলে বা তা প্রাত্যহিক কাজে ব্যবহার করলে বিভিন্ন রকম সংক্রামক রোগ ঘটে থাকে। যেমন— পানীয় জলে মিশে থাকা Vibrio cholerae নামক ব্যাকটেরিয়া কলেরা রোগ সৃষ্টি করে। এই রোগটিতে জলের...

পরিবেশ, তার সম্পদ এবং তাদের সংরক্ষণ 🌍

১. জলদূষণের প্রধান কারণ ও তাদের প্রভাব 💧

পরিবেশে উপস্থিত বিভিন্ন দূষণকারীর কারণে জলে মিশে যাওয়া পদার্থসমূহ জনস্বাস্থ্যের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। দূষিত জল পান করলে পাতলা পায়খানা ও বমি হতে পারে, যার ফলে রোগীর দেহ জলশূন্য হয়ে যায়।

  • ১. ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ:
    • Salmonella typhi: এই ব্যাকটেরিয়ার কারণে টাইফয়েড রোগ হয়, যার প্রভাবে তীব্র জ্বর, মাথা ব্যথা ও দেহজ্বালা হয়। 🤒
  • ২. প্রোটোজোয়াজনিত রোগ:
    • Entamoeba histolytica: এই প্রোটোজোয়া আমাশয় রোগ সৃষ্টি করে, যার ফলে শ্লৈষ্মিক পাতলা পায়খানা হয়। 💩
  • ৩. রাসায়নিক ও ভারী ধাতু দূষণ:
    • কীটনাশক: ডাইক্লোরো ডাইফিনাইল ট্রাইক্লোরোইথেন (DDT), বেনজিন, ম্যালাথিয়ন, এনড্রিন প্রভৃতি রাসায়নিক দ্রব্য জলদূষণ ঘটায়।
    • আর্সেনিক: জলাশয়ের জলে আর্সেনিক নামক ধাতুটি মিশ্রিত হলে সেই জল পান করলে বা ব্যবহার করলে আর্সেনিকোসিস রোগ সৃষ্টি হয়। এই রোগের প্রভাবে হাত ও পায়ের ত্বক শুষ্ক হয়ে কালো ছোপ ছোপ তৈরি হয়, পায়ে গ্যাংগ্রিন হয়ে ব্ল্যাকফুট ডিজিজ (Blackfoot disease) ঘটে। এমনকি এই ধাতুর প্রভাবে ক্যান্সারও হতে পারে। ☠️

কৃষিক্ষেত্রে কীটনাশক প্রয়োগ

২. ইউট্রোফিকেশন (Eutrophication) এবং আলগাল ব্লুম 🦠🌿

জমিতে ব্যবহৃত অজৈব রাসায়নিক সার, যেমন — NPK (নাইট্রোজেন-ফসফেট-পটাশিয়াম) সার, সুপার ফসফেট প্রভৃতিতে অতিরিক্ত নাইট্রোজেন ও ফসফরাসের যৌগ থাকে। এগুলি জল ধুয়ে বিভিন্ন জলাশয়ে গিয়ে পড়ে (লিচিং বা Leaching)।

💡 ইউট্রোফিকেশন: জলদূষণজনিত কারণে জলাশয়ে অতিরিক্ত পুষ্টি উপাদানের উপস্থিতির ফলে ফাইটোপ্লাঙ্কটনের সংখ্যা অত্যাধিক বৃদ্ধি ঘটে, ফলে জলের গুণমানের ঘাটতি দেখা দেয়, এই ঘটনাকে ইউট্রোফিকেশন বলে। 🌊

জলে ইউট্রোফিকেশন হলে জলের পরিপোষকের মাত্রা বেড়ে যায়, ফলে শেওলার দ্রুত বৃদ্ধি ঘটে জলাশয়ে তার ঘনত্ব বৃদ্ধি পায়। এই ঘটনাকে আলগাল ব্লুম (Algal Bloom) বলে। 💚

আলগাল ব্লুম

আলগাল ব্লুমের পরিবেশগত প্রভাব ও ফলাফল 📉

শেওলার প্রকৃতি অনুযায়ী জলাশয় বর্ণময় হয়ে ওঠে। এর ফলে জীবজগতে যেসব প্রভাব দেখা যায়, তা হল —

  • ১. ইউট্রোফিক জল: জলের বর্ণ সবুজ-বাদামি বা লালচে হয় এবং তা ঘোলাটে ও কটূ গন্ধযুক্ত হয়। তাই তা পানের বা ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে। 🤢
  • ২. দ্রবীভূত অক্সিজেনের অভাব: অতিরিক্ত শেওলা ও জলজ আগাছার মৃত্যুর পরে ব্যাকটেরিয়া দ্বারা বিয়োজন মাত্রা বৃদ্ধি পায় বলে জলের সমস্ত অক্সিজেন ব্যবহৃত হয়ে যায় (BOD বা Biological Oxygen Demand বেড়ে যায়)। জলে দ্রবীভূত অক্সিজেনের (Dissolved oxygen বা DO) ঘাটতি ফলে জলাশয়ের শেওলা, মাছ ও অন্যান্য প্রাণীর মৃত্যু হয়। পুনারায় ব্যাকটেরিয়ার ক্রিয়ায় জলের BOD মান আরও বাড়ে (ধনাত্মক ফিডব্যাক)। 🐠
  • ৩. ক্ষতিকারক টক্সিন: অনেক শেওলা ক্ষতিকর টক্সিন (যেমন — নিউরোটক্সিন, হেপাটোটক্সিন প্রভৃতি) উৎপন্ন করে, যা জলজ প্রাণীর জন্য বিষাক্ত। 🧪

৩. জলদূষণের বিভিন্ন উৎস 🏞️

জলাশয়গুলিতে জলদূষণ বিভিন্ন উৎস থেকে ঘটতে পারে:

  • ১. কৃষি উৎস:
    • অজৈব রাসায়নিক সার: জমিতে ব্যবহৃত অজৈব রাসায়নিক সার, যেমন — NPK (নাইট্রোজেন-ফসফেট-পটাশিয়াম) সার, সুপার ফসফেট প্রভৃতিতে অতিরিক্ত নাইট্রোজেন ও ফসফরাসের যৌগ থাকে। এগুলি জলে ধুয়ে বিভিন্ন জলাশয়ে গিয়ে পড়ে (একে লিচিং বলে), ফলে ফাইটোপ্লাঙ্কটনের অতিবৃদ্ধি ও ইউট্রোফিকেশন ঘটে।
    • ফসলজাত বর্জ্য: কৃষিজমিতে যে ফসল চাষ করা হয়, তার দেহাবশেষ, যেমন — শুকনো পাতা, কর্তিত কাণ্ড, পচা জৈব পদার্থ প্রভৃতি ফসলজাত বর্জ্য বিভিন্ন জলাশয়ে বাহিত হয়ে জলদূষণ ঘটায়।
  • ২. গৃহস্থালির ও পৌর বর্জ্য: গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত জল এবং হোটেল, রেস্তোরাঁ প্রভৃতি থেকে নির্গত জল, খাদ্যাভাবের ফেলে দেওয়া অংশ, শাকসবজির পচা অংশ ইত্যাদির সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে নর্দমা, পয়ঃপ্রণালী দিয়ে নদী, হ্রদ, খাল বা সমুদ্রের জলে পড়ে। এই বর্জ্যগুলিতে বিভিন্ন জীবাণু থাকে, যা দূষণ ঘটায়।
  • ৩. শিল্পবর্জ্য: শিল্পকারখানা থেকে নির্গত বর্জ্য পদার্থ, যা সরাসরি জলাশয়ে ফেলা হয়। 🏭

📖 জীববিদ্যা ও পরিবেশ • দশম শ্রেণি (Page 118)

💧 জলদূষণ (Water Pollution) - (Continued)

  • প্যাকেজনিং অর্থাৎ রোগসৃষ্টিকারী উৎপাদন করে। এই টক্সিনগুলি মাছ, ঝিনুক ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর জীবনহানি ঘটায়।
  • ৩. বিভিন্ন জলাশয়ের জল মানুষের যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে দূষিত হয়, যেমন—মলমূত্র ত্যাগ, স্নান, বাসনপত্র ধোয়া, গবাদিপশুর স্নান বা কাপড় কাচা। এতে বিভিন্ন প্রকার রোগসৃষ্টিকারী জীবাণু জলে মিশে যায় এবং নানা প্রকার রোগের সংক্রমণ ঘটায় যা মানব স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে।

💡 ইউট্রফিকেশন ও বায়োলজিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড: জলে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা নির্ধারণ করে বায়োলজিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড (BOD) পরীক্ষা করা হয়। যখন কোনো জলাশয়ে দূষকের মাত্রা বেড়ে যায়, তখন অক্সিজেনের অভাবে জলে দূষিত জলের BOD মান (যেমন—ইউট্রফিক জল) বেড়ে যায়। অর্থাৎ, BOD জলের জৈবদূষক মাত্রা নির্ণয়ের কাজে লাগে।

🌍 মাটি দূষণ (Soil Pollution)

প্লাস্টিক, রাসায়নিক সার, কীটনাশক, দৈনন্দিন আবর্জনা, ব্যাকটেরিয়া, প্রোটোজোয়া ইত্যাদি দূষক মাটিতে মিশে ভূপৃষ্ঠের ওপরে বিন্যস্ত মাটির স্তরের যে ভৌত, রাসায়নিক ও জৈব বৈশিষ্ট্যের অবাঞ্ছিত ও ক্ষতিকর পরিবর্তন বা ক্ষয় সাধিত হয় তাকে মাটি দূষণ বলে।

🧪 মাটি দূষণের কারণ

  1. জীবাণু: মাটির সজীব দূষক হল—ব্যাকটেরিয়া, প্রোটোজোয়া, কৃমি ইত্যাদি। জীবাণু দ্বারা মাটির দূষণ বিভিন্ন উপায়ে হয়ে থাকে।

    • উদাহরণ:
      1. শহরাঞ্চলে গৃহস্থালি ও অন্যান্য কাজে উৎপন্ন বর্জ্য, সিউয়েজ বা হাসপাতালের বর্জ্যকে তার সঠিক ট্রিটমেন্ট না হলে তার জীবাণু মাটিকে দূষিত করে।
      2. পৌর প্রতিষ্ঠানের আবর্জনা, প্রাণীদের মলমূত্র, হাসপাতালের পরিত্যক্ত বর্জ্যের জীবাণু মাটি দূষণ ঘটায়।
      3. অনেক রোগের জীবাণু মাটিতেই বসবাস করে এবং সংক্রমণ ঘটায়। এদেরকে প্যাথােজেন বলে। যেমন—অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু Bacillus anthracis
  2. রাসায়নিক পদার্থ: বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান বিভিন্ন উপায়ে মাটিকে দূষিত করে।

    • উদাহরণ:
      1. মাটিতে যদি নিয়ম না মেনে অজৈব সার, যেমন—নাইট্রেট, সালফেট ইত্যাদি ব্যবহৃত হয়, তা মাটির দূষণ ঘটায়।

🩺 মাটি দূষণের ফলাফল

  1. মানুষের ওপর প্রভাব: বিভিন্ন রকমের মাটি দূষণগুলির মানুষের ওপর প্রভাব হল—
    • দূষক উপাদানগুলি, সরাসরি মাটি স্পর্শ করার মাধ্যমে অথবা জীবাণু দ্বারা বাহিত হয়ে মানবদেহে প্রবেশ করে নানারকম রোগ সৃষ্টি করতে পারে। আবার অনেকসময় প্রশ্বাস বায়ুর দ্বারাও জীবাণু সংক্রমণ ঘটায়।
    • উদাহরণস্বরূপ:
      • টিটেনাস রোগ সৃষ্টি করে Clostridium tetani
      • গ্যাস-গ্যাংগ্রিন রোগ সৃষ্টি করে Clostridium perfringens
      • অ্যাসপারজিলোসিস রোগ সৃষ্টি করে Aspergillus sp. প্রভৃতি এ্যডফিক জীবাণু। Aspergillus fumigatus-এর সংক্রমণে ফুসফুস, শ্বাসনালী প্রভৃতি স্থানে সংক্রমণ ঘটে।
    • মাটিজাত রোগ অনেকসময় ক‍্যমিয়তা হয়। যেমন—
      • অ্যাসকারিয়েসিস নামক রোগটি সৃষ্টি করে Ascaris lumbricoides নামক কৃমি।
      • স্ট্রংগাইলয়ডিয়াসিস রোগ সৃষ্টি করে Strongyloides sp. নামক কৃমি।
      • একাইনোকক্কাসিস রোগ সৃষ্টি করে Echinococcus sp. নামক কৃমি।
    • ভারী ধাতুদূষণজনিত মৃত্তিকা দূষণের ক্ষেত্রে মাটিতে বিভিন্ন ভারী ধাতুর উপস্থিতি লক্ষ করা যায়, যেগুলি মানুষের দেহে প্রবেশ করে নানা রোগের সৃষ্টি করে থাকে। যেমন—
      • পারদ থেকে মিনামাটা
      • সীসা থেকে ডিসলেক্সিয়া
      • ক‍্যাডমিয়াম থেকে ইটাই-ইটাই রোগ হয়।

পরিবেশ, তার সম্পদ এবং তাদের সংরক্ষণ

  1. 🌿 জীববিবর্ধন (Biomagnification): খাদ্যশৃঙ্খল বরাবর নীচ থেকে ক্রমশ উচ্চতর পুষ্টিস্তরে কোনো দূষকের ক্রমবর্ধমান সঞ্চয়কে জীববিবর্ধন (biomagnification) বলে। জীববিবর্ধন মূলত কোনো জীবের দেহে দূষকের ঘনত্ব তার খাদ্য ও ওই দূষকের ঘনত্বের থেকে অনেক বেশি বেড়ে যায়। মূলত জৈব দূষকগুলি রেচিত না হয়ে জমা হয় (যেমন সিসা)। এবং খাদ্যশৃঙ্খল বরাবর এগুলির প্রবাহের ফলে এই ঘটনা ঘটে থাকে। এভাবে DDT (ডাইক্লোরো ডিফিনাইল ট্রাইক্লোরোইথেন), আর্সেনিক, পারদ, ক্যাডমিয়াম প্রভৃতি দূষকগুলির ঘনত্ব প্রাণিদেহে বৃদ্ধি পেয়ে নানা রোগ সৃষ্টি করে।
  2. সোডিয়াম আর্সেনাইট নামক আগাছানাশক, ক্রোডন জাতীয় রোডেনটিসাইড (যেমন ইঁদুর মারা লোরেট বিনাশকারী উপাদান) প্রভৃতি রাসায়ানিক মাটি দূষণ ঘটায়।

📢 শব্দদূষণ (Noise pollution):

উচ্চ প্রাবল্যের ও উচ্চ তীব্রতাভিত্তিক সহনসীমার ঊর্ধ্বের সুরবর্জিত কর্কশ শব্দ দ্বারা পরিবেশের এবং মানবদেহের পক্ষে ক্ষতিকর ও অবাঞ্ছিত পরিবর্তনকে শব্দদূষণ বলে। শব্দদূষণের পরিমাপের একক হল ডেসিবেল বা dB (বিজ্ঞানী গ্রাহাম বেল-এর নামানুসারে)।


শব্দদূষণের কারণ 👂

  1. যানবাহন (Vehicles): শব্দদূষণের একটি অন্যতম কারণ হল যানবাহনের শব্দ। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে যানবাহনের পরিমাণও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে যানবাহন থেকে শব্দদূষণও দিনের পর দিন বাড়ছে। ট্রাক, মোটর, বাস, রেল, এরোপ্লেন, সুপারসনিক জেট চলাচলের সময়ে সৃষ্ট শব্দ, গাড়ির হর্ন শব্দদূষণ সৃষ্টি করে। কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ (CPCB বা Central Pollution Control Board) যানবাহনজনিত শব্দদূষণের মাত্রা 70 dB নির্ধারণ করলেও, বহু শহরে শব্দের মাত্রা অনেক বেশি।

যানবাহনজনিত শব্দদূষণ 🚌🔊


শব্দদূষণের ফলাফল 💔

  1. মানুষের ওপর প্রভাব (Effects on Humans): শব্দদূষণ মানুষের শ্রবণ ক্ষমতা এবং হৃৎপিণ্ডের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। যেমন—
    • ① কানের ওপর প্রভাব: প্রতিদিন ধরে উচ্চ তীব্রতার শব্দ শুনলে (100 dB) অন্তঃকর্ণের অর্গান অফ কর্টি (শ্রোতাঙ্গ)-র রোমকোশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ফলে শ্রবণ ক্ষমতা হ্রাস পায় বা বিনষ্ট হয়। একে 'নয়েস ইন্ডুসড হিয়ারিং লস' (NIHL) বলে। NIHL দু-ভাবে মানুষের ক্ষতি করে—
      • (a) উচ্চ প্রাবল্যের শব্দে এককালীন হঠাৎ শুনলে অন্তঃকর্ণের ককলিয়া অংশের স্থায়ীভাবে শ্রবণ ক্ষমতা নষ্ট হয়, একে অ্যাকোস্টিক ট্রমা বলে। যেমন—150 dB-এর ঊর্ধ্বে বাজির শব্দ, বিস্ফোরণ প্রভৃতি।
      • (b) সাধারণ শব্দের থেকে উচ্চ প্রাবল্যের কোনো শব্দ (85 dB) অনবরত শুনতে থাকলে শ্রবণ ক্ষমতা ধীরে ধীরে হ্রাস পায়।
    • ② হৃৎপিণ্ডের ওপর প্রভাব: উচ্চ প্রাবল্যের শব্দ হৃৎপিণ্ডের ক্ষতি করে। যেমন—
      • (a) উচ্চ প্রাবল্যের শব্দে স্বয়ংক্রিয় স্নায়ু ও ভেগাস স্নায়ুর উদ্দীপনা বৃদ্ধি পায় ও হৃৎস্পন্দন বাড়ে।
      • (b) 90 dB-এর ঊর্ধ্বে শব্দ হলে সিস্টোলিক রক্তচাপ যথেষ্ট বাড়ে।
      • (c) অনবরত 60 dB-এর ঊর্ধ্বে শব্দ শুনলে হৃৎপিণ্ডের মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন নামক রোগ

ছাত্র জীববিজ্ঞান ও পরিবেশ • দশম শ্রেণি

2. শব্দদূষণ 📢 (Noise Pollution)

2. শিল্প (Industry)

বিভিন্ন শিল্পকারখানায় দ্রব্য উৎপাদনে হওয়া শব্দদূষণ থেকে সৃষ্ট আওয়াজ মারাত্মক স্বাস্থ্যদূষণ ঘটায়। ভারতে শিল্পক্ষেত্রে 8 ঘণ্টা কাজের জন্য সর্বোচ্চ 90 dB শব্দ সহনমাত্রা নির্ধারিত। কিন্তু জাহাজ ও বিমান নির্মাণ, কাঁচের মিল, খাদ্য উৎপাদন শিল্প, আসবাব নির্মাণ শিল্প, ধাতব পণ্য উৎপাদন শিল্পে এই সহনমাত্রার থেকে অনেক বেশি প্রাবল্যের শব্দ উৎপন্ন হয়। এর ফলস্বরূপ মারাত্মক শব্দদূষণ ঘটে।

এ ছাড়াও বর্তমানকালে শব্দদূষণের অন্যতম কারণ হল শব্দবাজি ও লাউডস্পিকারের অযাচিত ব্যবহার। প্রাকৃতিক কারণ যেমন, বজ্রপাত প্রভৃতিতেও শব্দদূষণ ঘটিয়ে থাকে।

2. অন্যান্য প্রাণীর ওপর প্রভাব: 🐾

শব্দদূষণ মানুষের ছাড়াও অন্যান্য প্রাণীর ওপরও গুরুতর প্রভাব বিস্তার করে। যেমন—

  1. বধিরতা: 🔊 85dB-এর ওপরে শব্দ হলে তা প্রাণীদের শ্রবণ ক্ষমতা হ্রাস করে।
  2. প্রজননে বাধা: শব্দদূষণের ফলে বহু প্রাণী ও পাখির প্রজননে অংশ নিতে পারে না। ফলে ওই প্রাণী ও পাখির নতুন অপত্য সৃষ্টিতে বাধা পায়।
  3. স্তন্যপায়ীর বৃদ্ধি হ্রাস: ইঁদুরের ক্ষেত্রে দেখা গেছে উচ্চশব্দের স্তন্যপায়ীর বৃদ্ধি হ্রাস পায়।
  4. মাছির: 🦟 পরিবেশের নানা শব্দ প্রাণীর আত্মরক্ষা, শিকার প্রভৃতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। শব্দদূষণের ফলে সেগুলি শুনতে না পেলে (যেমন মাছির ক্ষেত্রে) প্রাণীর জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে।

CONTENT MANAGER

Sattar Uddin SohelSattar Uddin Sohel