1.3 প্রাণীদেহে সাড়াপ্রদান ও রাসায়নিক সমন্বয়-হরমোন
1.3 প্রাণীদেহে সাড়াপ্রদান ও রাসায়নিক সমন্বয়-হরমোন - WBBSE - Class 10 - বিজ্ঞান
1.3 প্রাণীদেহে সাড়াপ্রদান ও রাসায়নিক সমন্বয়-হরমোন (Response in animals and chemical co-ordination-Hormone) 🧬
উদ্ভিদদেহের মতো প্রাণীদেহের সাড়াপ্রদান ও রাসায়নিক সমন্বয়ের কাজটিও সম্পন্ন হয় হরমোনের দ্বারা। প্রাণীদেহের বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় ও বিপাকীয় কাজ নিয়ন্ত্রণে ও তাদের মধ্যে সমন্বয় সাধনে প্রাণী হরমোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
1.3.1 প্রাণীদেহের বিভিন্ন কাজ নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা এবং হরমোনের ভূমিকা (Necessity of regulating various functions of animal & role of hormones) 🧠
মানুষের জীবনে সমস্ত জৈবনিক কাজ নির্দিষ্ট ছন্দে ঘটে, যেমন-রক্তে গ্লুকোজ মাত্রা বজায় রাখা, জননগ্রন্থির বৃদ্ধি ও সঠিক বয়সে যৌন বৈশিষ্ট্যের আগমন, দেহের মৌল বিপাক হার (BMR) নিয়ন্ত্রণ, দিনের বেলা কাজের উদ্দীপনা জোগান ও রাতে ঘুমোতে যাওয়া ইত্যাদি। শুধু তাই নয়, বিপদে বা ভয়ে আমাদের ত্বকের লোম খাড়া হয়ে যায়, শ্বাস-প্রশ্বাস বেড়ে যায়। এরও কারণ হল কতকগুলি জৈবরাসায়নিক অণু বা হরমোনের সমবেত অর্কেস্ট্রা।
জীবজগতে নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয়
11.
📌 প্রাণী হরমোন: অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত যে জৈবরাসায়নিক বার্তাবাহক পদার্থ উৎপত্তিস্থল থেকে (রক্ত বা লসিকা-র মাধ্যমে) বাহিত হয়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অঙ্গে পৌঁছে নির্দিষ্ট কাজ সম্পাদন করে ও ক্রিয়ার পর ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, তাকে প্রাণী হরমোন বলে।
1.3.2 প্রাণী হরমোনের বৈশিষ্ট্য (Characteristics of animal hormones) 🐾
-
উৎস: প্রাণী হরমোন অন্তঃক্ষরা গ্রন্থিতে সংশ্লেষিত ও তা থেকে নিঃসৃত হয়। এ ছাড়াও প্রাণীর অন্তঃক্ষরা কোশযুক্ত দেহাংশ (যেমন-শুক্রাশয়, ডিম্বাশয়, খাদ্যনালীর প্রাচীরগাত্র) থেকেও হরমোন সৃষ্টি হয়।
-
প্রকৃতি: হরমোন রাসায়নিক ধর্মে প্রোটিন বা পেপটাইড, অ্যামিনো ও স্টেরয়েড-জাতীয় হয়ে থাকে। যেমন-প্রোটিন ও পেপটাইড-জাতীয় ইনসুলিন, গ্লুকাগন, পিটুইটারি নিঃসৃত হরমোন, অ্যামিনো-জাতীয় অ্যাড্রেনালিন বা এপিনেফ্রিন, নর-অ্যাড্রেনালিন ও স্টেরয়েড জাতীয় টেস্টোস্টেরন, প্রোজেস্টেরন ইত্যাদি।
-
পরিবহণ পদ্ধতি: প্রাণীদেহে হরমোন দেহতরল, অর্থাৎ রক্ত বা লসিকার দ্বারা বাহিত হয়ে কার্য-অঙ্গে পৌঁছোয়।
-
কাজ: লক্ষ্য অঙ্গে গিয়ে হরমোন নির্দিষ্ট শারীরবৃত্তীয় কাজ সম্পাদন করে।
-
পরিণতি: হরমোন খুব অল্প সময় সক্রিয় থাকে। এরপর নির্দিষ্ট উৎসেচকের ক্রিয়ায় তা বিনষ্ট হয়।
-
বার্তাবাহক: হরমোন নির্দিষ্ট কোশগুচ্ছ থেকে সংশ্লেষিত হয়ে দূরবর্তী কোশে কাজের বার্তা বহন করে বলে, একে রাসায়নিক দূত বা বার্তাবাহক (chemical messenger) বলে।
-
ফিডব্যাক নিয়ন্ত্রণ: সাধারণত কোনো হরমোনের ক্ষরণমাত্রা অপর একটি হormোন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এই ঘটনাকে হরমোনের ফিডব্যাক নিয়ন্ত্রণ বলে।
হরমোনের ফিডব্যাক নিয়ন্ত্রণের উদাহরণ:
সাধারণত রক্তে হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিকের থেকে বেড়ে গেলে অন্য কোনো নিয়ন্ত্রক হরমোন তা কমিয়ে দেয়, ফলে তা স্বাভাবিক মাত্রায় ফিরে আসে। একইভাবে হরমোনটির মাত্রা রক্তে কমে গেলে ফিডব্যাক নিয়ন্ত্রণ তা বাড়িয়ে স্বাভাবিক মাত্রায় ফিরিয়ে আনে। এই বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া নিয়ন্ত্রণে ঠিক বিপরীতমুখী কার্যকরী ব্যবস্থাকে হরমোনের ঋণাত্মক ফিডব্যাক তন্ত্র বলা হয়। যেমন-থাইরয়েড হরমোন [থাইরক্সিন (T4) ও ট্রাই-আয়োডো থাইরোনিন (T3)] রক্তে বেড়ে গেলে হাইপোথ্যালামাসে সেই বার্তা যায়, ফলে তা TRH (থাইরোট্রপিন রিলিজিং হরমোন) ক্ষরণ কমিয়ে দেয়। এই TRH আবার পিটুইটারি থেকে TSH (থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন) ক্ষরণ কমায়। যা শেষে গিয়ে থাইরয়েড হরমোনগুলির নিঃসরণ হ্রাস করে। রক্তে TSH কমে গেলে এর ঠিক উলটো ঘটনা ঘটে; TRH, TSH ও থাইরক্সিন ক্ষরণ অনুক্রম অনুসারে বেড়ে যায়।
💡 ফিডব্যাক নিয়ন্ত্রণের প্রকারভেদ
- ঋণাত্মক ফিডব্যাক: অধিকাংশ হরমোন ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণে ঋণাত্মক ফিডব্যাক দেখা যায়।
- ধনাত্মক ফিডব্যাক: কিছু হরমোনের ক্ষেত্রে হরমোন মাত্রা বৃদ্ধি পেলে ফিডব্যাক ব্যবস্থা দ্বারা দেহে তাদের ক্ষরণ আরও বেড়ে যায়। যমন- বয়ঃসন্ধিতে মেয়েদের ইস্ট্রোজেন ক্ষরণে ধনাত্মক ফিডব্যাক দেখা যায়। ইস্ট্রোজেনের মাত্রা বাড়লে GnRH বাড়ে যা পিটুইটারি থেকে LH ক্ষরণ বাড়ায়। ফলে ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু নিঃসরণ সম্ভব হয়।
উদ্ভিদ ও প্রাণী হরমোনের পার্থক্য
| বিষয় | উদ্ভিদ হরমোন | প্রাণী হরমোন |
|---|---|---|
| 1. পরিবহণ মাধ্যম বা পদ্ধতি | জাইলেম ও ফ্লোয়েম কলার জলীয় দ্রবণ দ্বারা বা ব্যাপন দ্বারা পরিবাহিত হয়। | দেহতরল অর্থাৎ রক্ত বা লসিকা দ্বারা দেহের বিভিন্ন অংশে পরিবাহিত হয়। |
| 2. উৎসস্থল | সাধারণত ভাজক কলা। | অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি বা অন্তঃক্ষরা কোশযুক্ত দেহাংশ। |
| 3. রাসায়নিক প্রকৃতি | N₂-যুক্ত বা বিহীন জৈব অম্ল বা ক্ষার। | প্রোটিন বা পেপটাইড বা স্টেরয়েড। |
| 4. ব্যাবহারিক গুরুত্ব | ব্যাপক এবং তা মূলত কৃষিকাজ ও উদ্যানবিদ্যায় প্রযুক্ত হয়। | তুলনামূলক নগণ্য এবং মূলত চিকিৎসাকার্যে ব্যবহৃত হয়। |
1.3.3 মানবদেহের অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি এবং ক্ষরিত হরমোন (Endocrine glands of human and their hormones) 🧪
হাইপোথ্যালামাস (Hypothalamus)
মানব মস্তিষ্কের ডায়েনসেফালন অঞ্চলে থ্যালামাস অংশের নীচে হাইপোথ্যালামাস অবস্থিত। হাইপোথ্যালামাস নিঃসৃত হরমোনগুলির নাম ও মানবদেহে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এখানে আলোচনা করা হল:
- (i) কর্টিকোট্রপিন রিলিজিং হরমোন (CRH): এই হরমোন অগ্র পিটুইটারির ACTH-এর ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করে।
- (ii) গ্রোথ হরমোন রিলিজিং হরমোন (GHRH): অগ্র পিটুইটারির GH-র ক্ষরণ-নিয়ন্ত্রণ করে।
- (iii) থাইরোট্রপিন রিলিজিং হরমোন (TRH): অগ্র পিটুইটারির TSH-এর ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করে।
- (iv) গোনাডোট্রপিন রিলিজিং হরমোন (GnRH): অগ্র পিটুইটারির GTH-এর ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করে।
- (v) প্রোল্যাকটিন রিলিজিং হরমোন (PRH): অগ্র পিটুইটারির প্রোল্যাকটিন ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করে।
- (vi) মেলানোসাইট রিলিজিং হরমোন (MRH): এটি অগ্র পিটুইটারির MSH-এর ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করে।
- (vii) অ্যান্টিডাইইউরেটিক হরমোন (ADH) ও অক্সিটোসিন: এই হরমোন দুটি হাইপোথ্যালামাসে সংশ্লেষিত হয়ে পশ্চাৎ পিটুইটারিতে সঞ্চিত হয়। সেখান থেকে বাহিত হয়ে দেহের বিভিন্ন অংশের শারীরবৃত্তীয় কাজ নিয়ন্ত্রণ করে।
2. পিটুইটারি গ্রন্থি বা হাইপোফাইসিস (Pituitary gland or hypophysis)
এটি মানুষের অন্তঃক্ষরা তন্ত্রের সবচেয়ে ছোটো গ্রন্থি। মস্তিষ্কের ডায়ানসেফালন অঞ্চলে তৃতীয় মস্তিষ্ক নিলয়ের অঙ্কদেশে অবস্থিত স্ফেনয়েড অস্থির সেলাটারসিকা গহ্বরে সুরক্ষিত অবস্থায় গ্রন্থিটি থাকে। পিটুইটারি ইনফান্ডিবুলাম নামক দণ্ডাকার অংশের মাধ্যমে হাইপোথ্যালামাসে যুক্ত থাকে।
পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে ক্ষরিত হরমোনসমূহ— পিটুইটারি গ্রন্থির দুটি খন্ডক—
- (i) অগ্র পিটুইটারি বা অ্যাডেনোহাইপোফাইসিস, যা ACTH, GH, TSH, GTH (FSH, LH, ICSH, LTH) হরমোন ক্ষরণ করে এবং
- (ii) পশ্চাৎ পিটুইটারি বা নিউরোহাইপোফাইসিস, যা ADH এবং অক্সিটোসিন সঞ্চয় করে।
জীবজগতে নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয়
[a] অগ্র পিটুইটারি নিঃসৃত হরমোনসমূহের মানবদেহে ভূমিকা:
অগ্র পিটুইটারি নিঃসৃত হরমোনগুলি মানবদেহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যথা—
- (i) অ্যাড্রেনোকর্টিকোট্রপিক হরমোন বা অ্যাড্রেনোকর্টিকোট্রপিন বা ACTH-এর ভূমিকা:
- অগ্র পিটুইটারির কর্টিকোট্রফ কোশ থেকে নিঃসৃত এই হরমোন অ্যাড্রেনাল গ্রন্থির কর্টেক্সে গ্লুকোকর্টিকয়েড হরমোন সংশ্লেষ ও নিঃসরণকে উদ্দীপিত করে।
- অ্যাড্রেনাল গ্রন্থির বৃদ্ধি ও ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করে।
- এই হরমোনের স্বল্প ক্ষরণে অ্যাডিশন বর্ণিত রোগ ও অধিক ক্ষরণে কুশিং বর্ণিত রোগ হয়।
- (ii) গ্রোথ হরমোন বা GH-এর ভূমিকা: এর অপর নাম সোমাটোট্রপিক হরমোন (STH)।
- অগ্র পিটুইটারির সোমাটোট্রফ কোশ থেকে নিঃসৃত এই হরমোন প্রোটিন সংশ্লেষ ও সঞ্চয়ের দ্বারা দেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটায়। এটি বিশেষত অস্থি, তরুণাস্থি ও পেশির বৃদ্ধি ও বিকাশে সাহায্য করে।
- রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়ায়।
- শর্করা ও ফ্যাট বিপাকে সাহায্য করে।
- এর অধিক ক্ষরণে অপ্রাপ্তবয়স্কদের জাইগ্যানটিজম এবং প্রাপ্তবয়স্কদের অ্যাক্রোমেগালি রোগ হয়।
- এর স্বল্প ক্ষরণে বামনত্ব বা ডোয়ার্ফিজম রোগ হয়।
- (iii) থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন বা TSH বা থাইরোট্রপিনের ভূমিকা:
- অগ্র পিটুইটারির থাইরোট্রফ কোশ থেকে নিঃসৃত এই হরমোন থাইরয়েড গ্রন্থিকে T₃ এবং T₄ হরমোন সংশ্লেষ ও নিঃসরণে উদ্দীপিত করে।
- থাইরয়েড গ্রন্থির স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করে।
- (iv) গোনাডোট্রপিন বা গোনাডোট্রপিক হরমোন বা GTH-এর ভূমিকা:
- মানুষের অগ্র পিটুইটারি নিঃসৃত GTH হরমোনগুলি হল—FSH, LH/ICSH, LTH বা প্রোল্যাকটিন। এর মধ্যে FSH, LH ও ICSH অগ্র পিটুইটারির গোনাডোট্রফ কোশ থেকে নিঃসৃত হয় এবং LTH বা প্রোল্যাকটিন ক্ষরিত হয় ল্যাক্টোট্রফ বা ম্যামোট্রফ কোশ থেকে।
- ✔ ফলিক্স স্টিমুলেটিং হরমোন বা FSH-এর ভূমিকা:
- (a) মহিলাদের ডিম্বাশয়ের ডিম্বথলির বৃদ্ধিতে এবং পরিণত ডিম্বথলি বা গ্রাফিয়ান ফলিক্স থেকে ইস্ট্রোজেন হরমোন ক্ষরণে সাহায্য করে।
- (b) পুরুষদের শুক্রাণু উৎপাদন পদ্ধতি বা স্পার্মাটোজেনেসিস-এ সাহায্য করে।
- লিউটিনাইজিং হরমোন বা LH বা লিউকোট্রপিন-এর ভূমিকা:
- (a) প্রাণীদেহে LH মাত্রা তীব্র হলে তাকে LH সার্জ বা LH উচ্ছ্বাস বলে। এর ফলে ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু নিঃসরণ (বা ওভিউলেশন) ঘটে। তা ছাড়া ডিম্বথলি থেকে পীতগ্রন্থি সৃষ্টিতেও এটি সাহায্য করে।
- (b) মহিলাদের পীতগ্রন্থি থেকে প্রোজেস্টেরন হরমোন ক্ষরণে সাহায্য করে।
- ইনটারস্টিশিয়াল সেল স্টিমুলেটিং হরমোন বা ICSH-এর ভূমিকা: ICSH পুরুষদের শুক্রাশয়ের ইনটারস্টিশিয়াল কোশ বা লেডিগ বর্ণিত কোশ থেকে টেস্টোস্টেরন নামক পুরুষ হরমোন ক্ষরণে সাহায্য করে।
- ③ প্রোল্যাকটিন বা PRL বা ল্যাক্টোট্রপিক হরমোন বা LTH বা ল্যাক্টোট্রপিন-এর ভূমিকা:
- (a) মাতৃদেহে স্তনদুগ্ধ উৎপাদন ও ক্ষরণ উদ্দীপিত করে।
- (b) নারীদের গর্ভাবস্থায় পীতগ্রন্থিকে নষ্ট হতে দেয় না এবং এর হরমোন ক্ষরণ অব্যাহত রাখে।
[!NOTE] 📌 প্রভুগ্রন্থি (Master gland) পিটুইটারি গ্রন্থিকে প্রভুগ্রন্থি বলার কারণ— এই গ্রন্থি থেকে প্রায় দশটি হরমোন নিঃসৃত হয় যারা অন্যান্য অন্তঃক্ষরা গ্রন্থির ক্ষরণ ও কাজ নিয়ন্ত্রণ করে।
[!NOTE] 📌 প্রভুগ্রন্থির প্রভু (Master of master gland) হাইপোথ্যালামাসে উৎপন্ন নিউরোহরমোনগুলি অগ্র পিটুইটারিতে এসে তার ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করে। এজন্য একে 'প্রভুগ্রন্থির প্রভু' বা 'সুপ্রিম কমান্ডার' গ্রন্থি বলা হয়।
জীবজগতে নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয়
[b] পশ্চাৎ পিটুইটারি নিঃসৃত হরমোনের মানবদেহে ভূমিকা:
পশ্চাৎ পিটুইটারি থেকে দুটি হরমোন নিঃসৃত হয়। যথা—
- (i) ADH ও (ii) অক্সিটোসিন।
- ADH হরমোন:
- ① নেফ্রনের দূরবর্তী সংবর্ত নালিকা ও সংগ্রাহী নালিকাতে জলের পুনঃশোষণ ঘটায় এবং দেহে জলের ভারসাম্য রক্ষা করে।
- ② ধমনিকা ও রক্তজালককে সংকুচিত করে রক্তচাপ বৃদ্ধি করে (এজন্য ADH-এর অপর নাম ভ্যাসোপ্রেসিন; vaso = রক্তজালক, pressin = চাপ)।
- ADH হরমোন:
3. থাইরয়েড গ্রন্থি (Thyroid gland) 🧪
থাইরয়েড গ্রন্থিটি গলার ভিতরে ল্যারিংক্সের ঠিক নীচে ট্রাকিয়ার উভয় পাশে একটি করে মোট দুটি খণ্ডকরূপে অবস্থান করে। এই খণ্ডক দুটি ইস্থমাস নামক যোজক দ্বারা সংযুক্ত থাকে।
থাইরয়েড গ্রন্থির ক্ষরিত হরমোন ও মানবদেহে তাদের ভূমিকা:
থাইরয়েড গ্রন্থির ফলিকিউলার কোশ বা থাইরোসাইটে হরমোন থাইরক্সিন বা T₄ এবং ট্রাই-আয়োডোথাইরোনিন বা T₃ হরমোন সংশ্লেষিত ও ক্ষরিত হয়। T₄ চারটি ও T₃ তিনটি আয়োডিন পরমাণুসমৃদ্ধ যৌগ।
* থাইরক্সিন হরমোন বা টেট্রা-আয়োডোথাইরোনিন বা T₄-এর ভূমিকা:
- (i) দেহের বিপাক ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের দ্বারা দেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশে সাহায্য করে।
- (ii) দেহের BMR-এর স্বাভাবিক মাত্রা বজায় রাখে।
- (iii) কলাকোশে অক্সিজেনের ব্যবহার বাড়িয়ে তাপ উৎপাদনে সাহায্য করে, এই জন্য এই হরমোনকে তাপ উৎপাদক বা ক্যালোরিজেনিক হরমোন বলে।
- (iv) ব্যাঙাচির রূপান্তর (metamorphosis)-এর দ্বারা পূর্ণাঙ্গ ব্যাঙ সৃষ্টিতে সাহায্য করে।
- (v) দেহের রক্তচাপ, হৃৎস্পন্দনের হার ও শ্বসন হার বাড়ায়।
- (vi) স্বাভাবিক প্রজনন ও প্রোটিন সংশ্লেষে সাহায্য করে।
- (vii) মস্তিষ্ক তথা কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশে সহায়তা করে।
4. অগ্ন্যাশয় গ্রন্থি (Pancreas gland) 🧪
অগ্ন্যাশয় নামক মিশ্রগ্রন্থিটি মানবদেহের উদরগহ্বরে পাকস্থলীর নীচে প্রায় অনুপ্রস্থভাবে অবস্থান করে।
অগ্ন্যাশয় গ্রন্থি ক্ষরিত হরমোন ও মানবদেহে তাদের ভূমিকা:
অগ্ন্যাশয়ের অন্তঃক্ষরা কোশগুলি একত্রে দ্বীপপুঞ্জের মতো অবস্থান করে। বিজ্ঞানী ল্যাঙ্গারহ্যান্স-এর নাম অনুসারে একে আইলেট্স অফ ল্যাঙ্গারহ্যান্স বলে, যা বিভিন্ন হরমোন ক্ষরণ করে। যথা—ইনসুলিন, গ্লুকাগন, সোমাটোস্ট্যাটিন, প্যানক্রিয়াটিক পলিপেপটাইড (P-P) হরমোন। এখানে পাঠ্যসূচি অনুযায়ী ইনসুলিন ও গ্লুকাগনের মানবদেহে ভূমিকা আলোচনা করা হল।
- (i) ইনসুলিনের ভূমিকা:
- অগ্ন্যাশয়ের আইলেট্স অফ ল্যাঙ্গারহ্যান্স-এর β-কোশ থেকে ক্ষরিত প্রোটিন-জাতীয় এই হরমোন কলাকোশে গ্লুকোজ বিশোষণ ও কোশে গ্লুকোজ গ্রহণে সাহায্য করে।
- যকৃৎ, পেশিকোশ ও মেদকলায় গ্লুকোজকে গ্লাইকোজেনে পরিণত করে সঞ্চয়ে সাহায্য করে।
- রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের থেকে বৃদ্ধি পেলে ইনসুলিন শর্করার মাত্রা কমিয়ে স্বাভাবিক রাখে।
- ফ্যাট ও প্রোটিন থেকে গ্লুকোজ উৎপাদনে বাধা দেয়।
- (ii) গ্লুকাগনের ভূমিকা:
- অগ্ন্যাশয়ের আইলেটস অফ ল্যাঙ্গারহ্যান্সের α-কোশ থেকে ক্ষরিত পলিপেপটাইড প্রকৃতির এই হormoneটি শর্করার মাত্রা হ্রাস পেলে যকৃতে সঞ্চিত গ্লাইকোজেনকে গ্লুকোজে ভেঙে যেতে সাহায্য করে। ওই গ্লুকোজ রক্তে মুক্ত হয় এবং রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বৃদ্ধি করে অর্থাৎ গ্লুকাগনের ক্রিয়া ইনসুলিনের বিপরীত হয়।
- অশর্করা পদার্থ (প্রোটিন ও ফ্যাট) থেকে গ্লুকোজের সংশ্লেষ বৃদ্ধি করে ও রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করে।
- কলা-কোশে গ্লুকোজ জারণ হ্রাস করে ও ফ্যাটের ভাঙন বাড়ায়।
5. অ্যাড্রেনাল গ্রন্থি (Adrenal gland) 🧪
মানুষের উদরগহ্বরে মেরুদণ্ডের দু-পাশে অবস্থিত প্রতিটি বৃক্কের ওপরের প্রান্তের সাথে সংলগ্ন অবস্থায় একটি করে অ্যাড্রেনাল গ্রন্থি অবস্থিত। বৃক্কের ওপরে অবস্থানের জন্য অ্যাড্রেনাল গ্রন্থিকে 'সুপ্রারেনাল গ্রন্থি' বলা হয়।
অ্যাড্রেনাল গ্রন্থির ক্ষরিত হরমোনসমূহ ও মানবদেহে তাদের ভূমিকা:
ত্রিকোণাকার এই গ্রন্থিটির প্রধানত দুটি অংশ বর্তমান। এর পরিধিস্থ অংশকে অ্যাড্রেনাল কর্টেক্স ও কেন্দ্রীয় মজ্জাংশকে অ্যাড্রেনাল মেডালা বলে। এই গ্রন্থির মেডালা অংশ থেকে অ্যাড্রেনালিন ও নর-অ্যাড্রেনালিন নামক দুটি হরমোন ক্ষরিত হয় এবং কর্টেক্স অংশ থেকে গ্লুকোকর্টিকয়েড, মিনারেলোকর্টিকয়েড এবং অ্যান্ড্রোজেন হরমোন ক্ষরিত হয়। এখানে অ্যাড্রেনালিন ও নর-অ্যাড্রেনালিনের মানবদেহে ভূমিকা আলোচিত হল।
- (i) অ্যাড্রেনালিন বা এপিনেফ্রিনের ভূমিকা:
- এই হরমোন হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন হার, হার্দ-উৎপাদ ও রক্তচাপ বাড়ায়।
- রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ ও BMR বৃদ্ধি করে।
- ফুসফুসের ব্রঙ্কিওলগুলির প্রসারণের মাধ্যমে শ্বাসকার্যের হার বাড়ায়।
- পেশির উত্তেজিতা ও সংকোচনশীলতা বৃদ্ধি করে।
- তারারন্ধ্রকে প্রসারিত হতে সাহায্য করে।
- ইওসিনোফিলের সংখ্যা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
- অ্যারেকটর পিলি পেশির সংকোচন করে ত্বকের রোমকে খাড়া করে তোলে এই হরমোন।
- (ii) নর-অ্যাড্রেনালিন বা নর-এপিনেফ্রিনের ভূমিকা:
- এই হরমোন হৃৎস্পন্দন হার ও রক্তচাপ বৃদ্ধি করে।
- রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বৃদ্ধি করে।
- শ্বাসকার্যের হার বাড়ায়।
- দেহের সকল রক্তবাহের প্রাচীরগাত্রের মসৃণ পেশির সংকোচনে সাহায্য করে।
[!NOTE] 📌 অ্যাড্রেনালিনকে আপৎকালীন বা স্ট্রেস হরমোন বলে। কারণ, বিশ্রামকালে এই হরমোনটি কম ক্ষরিত হলেও, দুঃখ, ভয়, মানসিক চাপ প্রভৃতি সংকটকালীন অবস্থায় এই হরমোনের ক্ষরণ বাড়ে এবং এইসব আপৎকালীন বা জরুরিকালীন পরিস্থিতির মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
6. জননগ্রন্থি 🧪
জননগ্রন্থিদের বলে গোনাড। মানবদেহে শুক্রাশয় হল প্রধান পুরুষ জননগ্রন্থি এবং ডিম্বাশয় হল প্রধান স্ত্রী জননগ্রন্থি। এই গ্রন্থিগুলি থেকে ক্ষরিত হরমোনগুলি স্টেরয়েড প্রকৃতির হয়।
[a] শুক্রাশয় (Testes):
পুরুষদেহে উদরের নিম্নাংশে স্ক্রোটাম বা শুক্রথলির অভ্যন্তরে দুটি শুক্রাশয় অবস্থিত।
শুক্রাশয় ক্ষরিত হরমোন ও তার ভূমিকা:
শুক্রাশয় নিঃসৃত প্রধান পুরুষ যৌন হরমোন হল টেস্টোস্টেরন। এই হরমোনকে অ্যান্ড্রোজেন-ও (Andro = পুরুষোচিত) বলে। এই হরমোন—
- (i) বয়ঃসন্ধিকালে পুরুষ দেহের যৌনাঙ্গের গঠনগত পূর্ণতা দানে সাহায্য করে এবং শুক্রাণু (sperm) উৎপাদনে মুখ্য ভূমিকা নেয়।
- (ii) পুরুষালি গৌণ যৌন বৈশিষ্ট্য, যথা-ভারী কণ্ঠস্বর, গোঁফ-দাড়ি, পেশিবহুল দেহ প্রভৃতির বিকাশে এবং পুরুষোচিত দৈহিক ও মানসিক গঠন ও ব্যক্তিত্ব গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
- (iii) এ ছাড়া মৌল বিপাকীয় হার (BMR) বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
[!NOTE] 💡 লোকাল হরমোন ও ট্রপিক হরমোন (i) যে হরমোন তার সৃষ্টিস্থলে বা তার কাছেই কাজ করে তাকে লোকাল হরমোন বলে। যেমন-শুক্রাশয়ের টেস্টোস্টেরন। (ii) যে হরমোন উৎস থেকে দূরে গিয়ে অপর কোনো গ্রন্থির ওপর কাজ করে, তাকে বলে ট্রপিক হরমোন। যেমন-পিটুইটারি হরমোন।
[b] ডিম্বাশয় (Ovary):
স্ত্রীদেহে উদরগহ্বরে জরায়ুর উভয় পাশে দুটি ডিম্বাশয় অবস্থান করে।
ডিম্বাশয় ক্ষরিত হরমোনসমূহ ও তাদের ভূমিকা:
বয়ঃসন্ধিকাল ও পরবর্তী সময়ে স্ত্রীদেহের ডিম্বাশয় থেকে দুটি প্রধান হরমোন সংশ্লেষিত ও নিঃসৃত হয়। যথা—ইস্ট্রোজেন, প্রোজেস্টেরন।
- (i) ইস্ট্রোজেনের ভূমিকা:
- ① বয়ঃসন্ধিকালে মহিলাদের জনন-অঙ্গের পরিণতি ও গৌণ যৌন বৈশিষ্ট্য (যেমন-সরু কণ্ঠস্বর, মসৃণ ও স্বল্প লোমবিশিষ্ট ত্বক) ও যৌন চিন্তাভাবনা প্রকাশে সাহায্য করে।
- ② মহিলাদের রজঃচক্রের আবর্তন নিয়মিত করে।
- ③ স্তনগ্রন্থির বৃদ্ধি ও পরিস্ফুরণে সাহায্য করে।
- ④ অস্থির বৃদ্ধি, প্রোটিন সংশ্লেষ ও ফ্যাটের সঞ্চয়ে সাহায্য করে।
- (ii) প্রোজেস্টেরনের ভূমিকা:
- ① প্রোজেস্টেরনের প্রধান কাজগুলি হল—স্ত্রীদেহে গর্ভাবস্থা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
- ② গর্ভাবস্থায় জরায়ুর বৃদ্ধি, ভূণের জরায়ুতে রোপণ, অমরা গঠন প্রভৃতি কাজে সহায়তা করে।
- ③ গর্ভাবস্থায় ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু উৎপাদন ও রজঃচক্র বন্ধ রাখতে সাহায্য করে।
- ④ প্রসবকালে যোনিপথের প্রসারণে সাহায্য করে।
- ⑤ গর্ভাবস্থায় স্তনগ্রন্থির দুগ্ধ ক্ষরণকারী কোশের বৃদ্ধি ঘটায়।
[!INFO] জ্ঞান-বোধ-বিকাশ: মিশ্রগ্রন্থি অগ্ন্যাশয়, শুক্রাশয়, ডিম্বাশয় হল মিশ্রগ্রন্থি। কারণ এই গ্রন্থিগুলিতে অন্তঃক্ষরা ও বহিঃক্ষরা উভয় প্রকার কোশগুচ্ছ থাকে। এদের বহিঃক্ষরা অংশের উপাদান হল- (i) অগ্ন্যাশয় - পাচক উৎসেচক, (ii) শুক্রাশয় - শুক্রাণু, (iii) ডিম্বাশয় – ডিম্বাণু। এদের অন্তঃক্ষরা অংশ থেকে নানা হরমোন ক্ষরিত হয়।
প্রাণী হরমোনের অনিয়মিত ক্ষরণজনিত রোগসমূহ:
কতকগুলি প্রাণী হরমোনের অনিয়মিত ক্ষরণে বিভিন্ন রোগ দেখা যায়। সে সম্বন্ধে এখানে আলোচনা করা হল।
- [a] বামনত্ব (Dwarfism): এই রোগের কারণ ও উপসর্গগুলি হল—
- (i) কারণ: শৈশবে STH বা GH-এর কম ক্ষরণে এই রোগ হয়।
- (ii) উপসর্গ: দেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, বিশেষত হাড় ও পেশির বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। পরিণত দশায় দেহের উচ্চতা 3 ফুট মতো হয়।
- ③ যৌন বিকাশের সময়কাল বা বয়ঃসন্ধি বিলম্বিত হয়।
- ④ দেহের আন্তরযন্ত্রের বিকাশ হ্রাস পায়।
- ⑤ BMR ও মানসিক সক্রিয়তা স্বাভাবিক থাকে।
- [b] বহুমূত্র বা ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস (Diabetes Insipidus): এই রোগের কারণ ও উপসর্গগুলি হল—
- (i) কারণ: হাইপোথ্যালামাসে টিউমার, আঘাত বা এনকেফ্যালাইটিস রোগের কারণে ADH-এর ক্ষরণ হ্রাস পেলে বা বৃক্কীয় নালিকা ADH-এর প্রভাবে কাজ না করলে এই রোগ হয়। (ii) উপসর্গ (Symptoms):
- বৃক্কীয় নালিকাতে (renal tubules) জলের পুনঃবিশোষণ কমে যায়, ফলে কম ঘনত্বের তরল মূত্র সৃষ্টি হয়।
- মূত্রের পরিমাণ অনেক বেড়ে যায় (দিনে প্রায় 10L), ফলে বারেবারে প্রস্রাব পায়। এই অবস্থাকে 📌 পলিইউরিয়া (Polyuria) বা ডাইইউরেসিস (Diuresis) বলে।
- প্রচুর জল বেরিয়ে যাওয়ায় দেহে জলাভাব (ডিহাইড্রেশন) এবং অতিরিক্ত জলতেষ্টা (পলিডিপসিয়া) অবস্থার সৃষ্টি হয়।
🦋 গলগণ্ড বা গয়টার (Goitre)
কারণ (Cause): থাইরয়েড গ্রন্থির অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটলে, সেই অবস্থাকে গলগণ্ড বলে। 💡 থাইরক্সিন হরমোনের কম ক্ষরণ ও অধিক ক্ষরণ, উভয় অবস্থাতেই গলগণ্ড হয়।
- থাইরক্সিনের কম ক্ষরণে 👉 সাধারণ গলগণ্ড।
- থাইরক্সিনের অধিক ক্ষরণে 👉 বহিঃচক্ষু গলগণ্ড বা এক্সঅফথ্যালমিক গয়টার।
উপসর্গ (Symptoms):
-
সাধারণ গলগণ্ডের ক্ষেত্রে:
- থাইরয়েড গ্রন্থির অতিরিক্ত বৃদ্ধির ফলে গ্রীবা অঞ্চল স্ফীত হয়।
- শ্বাসকার্যের অসুবিধা ও খাদ্য গলাধঃকরণে সমস্যা দেখা যায়।
-
বহিঃচক্ষু গলগণ্ডের ক্ষেত্রে:
- রোগীর থাইরয়েড গ্রন্থির অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটে ও গলা স্ফীত হয়ে যায়।
- অক্ষিগোলক অক্ষিকোটর ছেড়ে বেরিয়ে এসে 'বিস্ফারিত নেত্র' (এক্সঅফথ্যালমস অবস্থা) অবস্থা সৃষ্টি করে।
- মানসিক অস্থিরতা দেখা দেয়, দেহের ওজন হ্রাস পায়।
(Image: সাধারণ গয়টার ও বহিঃচক্ষু গয়টার)
🍬 মধুমেহ বা ডায়াবেটিস মেলিটাস (Diabetes mellitus)
এই রোগের কারণ ও উপসর্গগুলি হল-
(i) কারণ (Cause):
- ইনসুলিনের কম ক্ষরণে বা জিনগত কারণে বা ভাইরাস সংক্রমণে অগ্ন্যাশয়ের আইলেট্স অফ ল্যাঙ্গারহ্যান্স-এর বিটা কোশ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে, ইনসুলিন ক্ষরণ কম হলে এই রোগ হয় (💡 টাইপ II ডায়াবেটিস মেলিটাস)।
- অনেক সময় বয়সকালে কলাকোশের ইনসুলিনের প্রতি সংবেদনশীলতা লোপ পায়। এর ফলেও এই রোগ হয় (💡 টাইপ II ডায়াবেটিস মেলিটাস)।
(ii) উপসর্গ (Symptoms):
- রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের থেকে অনেক বৃদ্ধি পায়। একে 🩸 হাইপারগ্লাইসেমিয়া (Hyperglycemia) বলে।
- প্রতি 100 ml রক্তে শর্করার মাত্রা 180 mg-এর অধিক হলে, মূত্রের মাধ্যমে অধিক মাত্রায় শর্করা নির্গত হয়, একে 💧 গ্লুকোসুরিয়া (Glucosuria) বা গ্লাইকোসুরিয়া (Glycosuria) বলে।
- কোশ গ্লুকোজ ব্যবহার করতে না পারায় পেশির ফ্যাট ও প্রোটিনের বিপাক ঘটে। ফলে দেহের ওজন হ্রাস পায়।
- পলিইউরিয়া, পলিডিপসিয়া, শারীরিক দুর্বলতা।
- এ ছাড়াও চোখ, হৃৎপিণ্ড, স্নায়ু ও বৃক্কজনিত বিভিন্ন সমস্যা দেখা যায়।
ডায়াবেটিসের প্রকারভেদ (Types of Diabetes):
ডায়াবেটিস মূলত দুই প্রকার-
(i) টাইপ I বা ইনসুলিন ডিপেনডেন্ট ডায়াবেটিস মেলিটাস (IDDM, 10%):
- সাধারণত 15-16 বছর বয়সে (বয়ঃসন্ধিতে) রোগটি হয় বলে একে 🧒 জুভেনাইল ডায়াবেটিসও বলে।
- এক্ষেত্রে অগ্ন্যাশয় ইনসুলিন তৈরি করলেও অটোইমিউনিটির জন্য দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইনসুলিনকে বিনষ্ট করে।
(ii) টাইপ II বা নন ইনসুলিন ডিপেনডেন্ট ডায়াবেটিস মেলিটাস (NIDDM, 90%):
- এটি বেশি বয়সে দেখা যায় ও অধিকাংশ মধুমেহ রোগ এই ধরনের।
- এক্ষেত্রে 🛡️ ইনসুলিন প্রতিরোধ (Insulin resistance) অবস্থার সৃষ্টি হয়।
📊 অন্তঃক্ষরা ও বহিঃক্ষরা গ্রন্থির মধ্যে পার্থক্য
| বিষয় | অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি | বহিঃক্ষরা গ্রন্থি |
|---|---|---|
| 1. ক্ষরণ নালী | নালী অনুপস্থিত, তাই অনাল গ্রন্থি। | নালী উপস্থিত, তাই সনাল গ্রন্থি। |
| 2. কাজের স্থান | রক্তে মিশ্রিত হয়ে উদ্দীষ্ট অঙ্গে পৌঁছোয়। | ক্ষরণ পদার্থ সরাসরি কার্যস্থানে কাজ করে। |
| 3. ক্ষরিত পদার্থ | হরমোন | পাচক রস, রেচন পদার্থ (ঘাম), অশ্রু। |
| 4. উদাহরণ | পিটুইটারি, থাইরয়েড | লালাগ্রন্থি, ঘর্মগ্রন্থি। |
CONTENT MANAGER