২. জীবনের প্রবাহমানতা
২. জীবনের প্রবাহমানতা - WBBSE - Class 10 - বিজ্ঞান
2. জীবনের প্রবাহমানতা
Continuity of Life 🌿
প্রায় 3.7 বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি ঘটে। তারপর থেকে জীবন অনন্ত ও প্রবাহমান। এই দীর্ঘসময় ধরে কীভাবে জীবন বংশপরম্পরায় থেকে যায়? কোথায় লুকিয়ে থাকে প্রাণের তথ্য? এইসব প্রশ্নের উত্তরই আমরা ধীরে ধীরে এই অধ্যায়ে জানতে পারব। 💡
2.1 কোষ বিভাজন এবং কোষচক্র (Cell division and cell cycle) 🔬
জীবন এককোষী অবস্থায় শুরু হলেও তা ক্রমশ জটিল গঠন পায়। এর প্রথম ধাপ হল কোষ বিভাজন। বিভিন্ন কোষীয় পদার্থ সংশ্লেষের সময় অপত্য কোষের বৃদ্ধি ঘটে, অর্থাৎ তা আকারে বড়ো হয়, এরপর তা বিভক্ত হয়। কোষের বৃদ্ধি ও কোষ বিভাজন দশার চক্রাকার আবর্তনকে কোষচক্র বলে।
2.1.1 ক্রোমোজোম, DNA এবং জিনের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক (Interrelationship among chromosome, DNA and gene) 🧬
নিউক্লিয়াসের ভিতর অসংখ্য সূক্ষ্ম সুতোর মতো গঠন জালের আকারে বিন্যস্ত থাকে। এদের ক্রোমাটিন জালিকা বা নিউক্লিয় জালিকা বলা হয়। কোষ যখন বিভাজিত হয় না, তখন এই গঠনগুলি দেখা যায়। এগুলিতে দুটি সরু তন্ত্রী পরস্পর প্যাঁচানো সিঁড়ির অবস্থায় বিন্যস্ত থাকে। এই দ্বি-তন্ত্রীগুলিকে বলে DNA। DNA হল বড়ো জৈব অণু বিশেষ। কোষ বিভাজনের সময় DNA অণু হিস্টোন ও নন-হিস্টোন প্রোটিনকে দৃঢ়ভাবে পাকিয়ে ঘন কুণ্ডলী গঠন করে। এই কুণ্ডলীকৃত গঠনকেই বলে ক্রোমোজোম।
📌 ক্রোমোজোম: ইউক্যারিওটিক কোষের নিউক্লিয়াসে অবস্থিত DNA অণু ও প্রোটিন নির্মিত যে কুণ্ডলীকৃত গঠন জীবের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নির্ধারণকারী কতকগুলি নির্দিষ্ট জিন বহন করে, তাকে ক্রোমোজোম বলে।
অর্থাৎ, ক্রোমাটিন জালিকা ও ক্রোমোজোম হল একই DNA এবং হিস্টোন ও নন-হিস্টোন প্রোটিনের যথাক্রমে স্বত্ব ও অধিক কুণ্ডলীকৃত অবস্থা। 1888 খ্রিষ্টাব্দে জার্মান বিজ্ঞানী ডন ওয়ালডেয়ার-হার্জ সর্বপ্রথম ক্রোমোজোম শব্দটি ব্যবহার করেন।
এই আলোচনার সাথেই চলে আসে কার্যগত দিক। ক্রোমোজোমে যে DNA থাকে, তার কতকগুলি নির্দিষ্ট অংশ (ইউক্রোমাটিন) প্রোটিন সংশ্লেষের সংকেত বহন করে। এই প্রোটিন শেষ পর্যন্ত জীবের নানা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে।
[ 38 ]
জীবনের প্রবাহমানতা 🧬 (Page 39)
বৈশিষ্ট্য প্রকাশে সাহায্য করে। DNA-এর এই এক-একটি ক্ষুদ্র অংশই হল জিন। জিনগুলি পাশাপাশি পরপর বিন্যস্ত থাকে। ক্রোমোজোমে প্রতিটি জিনের অবস্থান সুনির্দিষ্ট, জিনের সেই নির্দিষ্ট স্থানটিকে জিনটির লোকাস বলে।
📌 জিন (Gene): জিন হল ক্রোমোজোমের DNA-তে বিন্যস্ত নির্দিষ্ট অংশ, যা নির্দিষ্ট কার্যকরী প্রোটিন সংশ্লেষে সংকেত বহন করে।
2.1.2 🔬 ক্রোমোজোমের প্রকারভেদ (Types of Chromosome)
ক্রোমোজোমে উপস্থিত জিনের প্রকৃতি অনুযায়ী ক্রোমোজোম দুই প্রকার—অটোসোম ও সেক্স ক্রোমোজোম।
1. অটোসোম:
কোনো ইউক্যারিওটিক কোশে অবস্থিত যে ক্রোমোজোমগুলি দৈহিক বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে, কিন্তু লিঙ্গ নির্ধারণ করে না, তাদের অটোসোম বলে।
- উদাহরণ: মানুষের দেহকোশে 22 জোড়া অটোসোম থাকে। মানুষের জননকোশে অর্থাৎ শুক্রাণু ও ডিম্বাণুতে 22টি অটোসোম থাকে।
2. সেক্স ক্রোমোজোম:
ইউক্যারিওটিক কোশে অবস্থিত যে ক্রোমোজোম প্রধানত যৌন বৈশিষ্ট্য প্রকাশ এবং লিঙ্গ নির্ধারণে সাহায্য করে, তাকে সেক্স ক্রোমোজোম বা অ্যালোসোম বলে।
- উদাহরণ: মানুষের ক্ষেত্রে X এবং Y ক্রোমোজোম হল সেক্স ক্রোমোজোম।
- উল্লেখ্য: মহিলাদের প্রতি দেহকোশে দুটি X ক্রোমোজোম এবং পুরুষদের প্রতি দেহকোশে একটি X ও একটি Y ক্রোমোজোম উপস্থিত থাকে।
- মানুষের জননকোশে সেক্স ক্রোমোজোমের সংখ্যা 1টি, অর্থাৎ ডিম্বাণুতে 1টি মাত্র X এবং শুক্রাণুতে 1টি X বা Y ক্রোমোজোম থাকে। এই কারণে ডিম্বাণুকে হোমোগ্যামেট এবং শুক্রাণুকে হেটেরোগ্যামেট বলা হয়।
💡 ক্যারিওটাইপ: পাশের চিত্রে মানুষের ক্যারিওটাইপ দেখানো হয়েছে, যেখানে 1 থেকে 22 জোড়া অটোসোম এবং X, Y সেক্স ক্রোমোজোম বিন্যস্ত।
2.1.3 🧪 ক্রোমোজোমের সংখ্যা (Number of Chromosome)
একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির সকল জীবের ক্রোমোজোম সংখ্যা নির্দিষ্ট বা ধ্রুবক হয়।
- উন্নত জীবের জননকোশে একসেট ক্রোমোজোম থাকে, একে হ্যাপ্লয়েড সেট (n) বলে। যেমন—মানুষের জননকোশে বা গ্যামেটে (শুক্রাণু বা ডিম্বাণু) 23টি ক্রোমোজোম থাকে।
- পক্ষান্তরে, উন্নত জীবের দেহকোশে উপস্থিত দ্বিগণ বা দুই সেট ক্রোমোজোমকে ডিপ্লয়েড সেট (2n) বলা হয়। যেমন—মানুষের দেহকোশে 46টি বা 23 জোড়া ক্রোমোজোম থাকে।
- প্রকৃতপক্ষে, 23টি ক্রোমোজোমের দুটি সেট থাকে অর্থাৎ, প্রতিটি ক্রোমোজোমের একটি করে একই জিনযুক্ত অতিরিক্ত ক্রোমোজোম থাকে (ব্যতিক্রম: Y ক্রোমোজোম)। জননকোশ হ্যাপ্লয়েড প্রকৃতির হওয়ায় জননকোশে কোনো সমসংস্থ ক্রোমোজোম থাকে না।
2.1.4 🧬 ক্রোমোজোমের গঠন (Structure of Chromosome)
গ্রিক chroma শব্দের অর্থ হল রং এবং soma শব্দের অর্থ হল দেহ। বিভিন্ন ক্ষারীয় রঞ্জকে এগুলি গাঢ়ভাবে রঞ্জিত হয় বলে ক্রোমোজোমের এরকম নাম দেওয়া হয়েছে। ক্রোমোজোমের গঠনে নিম্নলিখিত অংশগুলি গুরুত্বপূর্ণ:
1. ক্রোমাটিড:
কোশ বিভাজনের মেটাফেজ দশায় প্রতিটি ক্রোমোজোমে দুটি অনুরূপ অনুদৈর্ঘ্য দণ্ডাকার অংশ দেখতে পাওয়া যায়। এরা ক্রোমোজোমের মাঝে অবস্থিত বিশেষ খাঁজ তথা সেন্ট্রোমিয়ার নামক অংশে পরস্পর যুক্ত থাকে। এদের প্রত্যেকটিকে ক্রোমাটিড বলে। ক্রোমোজোমের ছোটো বাহুটিকে p বাহু ও বড়ো বাহুটিকে q বাহু বলে।
ছাত্র জীবনবিজ্ঞান ও পরিবেশ • দশম শ্রেণি 📚
🧬 ক্রোমোজোমের গঠন
প্রতিটি ক্রোমাটিডে একটি DNA অণু কুণ্ডলিত হয়ে প্রোটিনসহ অবস্থান করে। কোষ বিভাজনের প্রাথমিক দশায় ক্রোমাটিডগুলি পাশাপাশি সরু কুণ্ডলিত তন্তুর মতো দেখতে লাগে, যাদের প্রতিটিকে ক্রোমোনিমাটা বলে। ক্রোমোনিমাটার দৈর্ঘ্য বরাবর সমদূরত্বে সজ্জিত পুঁতির মতো দানাদার যে সমস্ত ক্রোমাটিন বস্তু দেখা যায়, তাদের ক্রোমোমিয়ার বলে।
💡 ক্রোমোজোমের প্রধান উপাদান
-
প্রাথমিক খাঁজ বা সেন্ট্রোমিয়া (Primary Constriction or Centromere):
- আলোক অণুবীক্ষণ যন্ত্রে দৃশ্যমান ক্রোমোজোমের প্রধান খাঁজ বা স্থূল অংশকে সেন্ট্রোমিয়ার বলে। একে প্রাথমিক খাঁজ বা মুখ্য খাঁজ (primary constriction)-ও বলা হয়।
- একটি ক্রোমোজোমের দুটি ক্রোমাটিডের সঙ্গে একটি করে মোট দুটি কাইনেটোকোর থাকে।
- কোষ বিভাজনকালে সেন্ট্রোমিয়ার অংশের সঙ্গে স্পিন্ডল তন্তু যুক্ত হয়ে ক্রোমাটিড দুটিকে পৃথক করে কোষের দুই মেরুতে নিয়ে যায়।
-
গৌণ খাঁজ (Secondary Constriction):
- অনেক সময় প্রাথমিক খাঁজ ছাড়াও ক্রোমোজোমের অপর একটি বা একাধিক খাঁজ থাকে। একে গৌণ খাঁজ (secondary constriction) বলে।
- এই অংশটি নিউক্লিওলাস গঠন করে বলে একে নিউক্লিওলার অর্গানাইজার রিজিয়ন বা NOR বলে।
-
স্যাটেলাইট (Satellite):
- গৌণ খাঁজ সংলগ্ন গোলার মতো মস্তিককে স্যাটেলাইট বলে।
- স্যাটেলাইট-যুক্ত ক্রোমোজোমকে স্যাটেলাইট ক্রোমোজোম বলে।
-
টেলোমিয়ার (Telomere):
- ক্রোমোজোমের ক্রিয়াহীন প্রান্ত দুটিকে টেলোমিয়ার বলে।
- কোষের অবিভাজন দশায় টেলোমিয়ার DNA প্রতিলিপি গঠনে সাহায্য করে, নিকটবর্তী দুটি ক্রোমোজোমের প্রান্ত জুড়ে যাওয়া প্রতিরোধ করে এবং প্রয়োজনমতো কোষের বার্ধক্য ও মৃত্যু ঘটায়।
📌 জান-বোধ-বিকাশ কোষ বিভাজনের অ্যানাফেজ ও টেলোফেজ দশায় একক ক্রোমাটিড গঠন বা মোনাড এবং প্রোফেজ ও মেটাফেজ দশায় দ্বি-ক্রোমাটিড গঠন বা ডায়াড়রূপে ক্রোমোজোমগুলি বিন্যস্ত থাকে।
2.1.5 🔬 ক্রোমোজোমের রাসায়নিক উপাদান (Chemical composition of chromosome)
ইউক্যারিওটিক ক্রোমোজোম নিউক্লিক অ্যাসিড (DNA ও RNA) ও প্রোটিন দ্বারা গঠিত। ক্রোমোজোমে 90% DNA ও ক্ষারীয় প্রোটিন (হিস্টোনজাতীয়) এবং প্রায় 10% RNA ও আম্লিক প্রোটিন (নন-হিস্টোনজাতীয়) থাকে।
🧪 ক্রোমোজোমের রাসায়নিক উপাদান
- নিউক্লিক অ্যাসিড
- DNA (প্রধান)
- RNA (সামান্য)
- প্রোটিন
- হিস্টোন (ক্ষারীয়)
- নন-হিস্টোন (আম্লিক)
জীবনের প্রবাহমানতা 🌿
1. ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড (DNA) 🧬
ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড (DNA): ডিঅক্সিরাইবোজ শর্করা (S), ফসফেট (P) এবং নাইট্রোজেন-ঘটিত ক্ষার দিয়ে তৈরি স্বপ্রজননক্ষম যে দ্বিতন্ত্রী নিউক্লিক অ্যাসিড অণু বংশগত বৈশিষ্ট্যের ধারক ও বাহক, তাকে DNA বলে।
- DNA অণু দুটি তন্ত্রী দিয়ে তৈরি, সেগুলি লোহার ঘোরানো সিঁড়ির মতো বা হেলিক্স আকৃতির। এই সিঁড়ির হাতল দুটি 5 কার্বনযুক্ত ডিঅক্সিরাইবোজ শর্করা ও ফসফেট অণু পরস্পর যুক্ত হয়ে তৈরি হয়।
- এই সিঁড়ির ধাপগুলো নাইট্রোজেন-ঘটিত ক্ষার দিয়ে গঠিত হয়। নাইট্রোজেন-ঘটিত ক্ষার দু-রকম হয়। যথা—
- (i) পিউরিন — অ্যাডেনিন (A), গুয়ানিন (G)
- (ii) পিরিমিডিন — থাইমিন (T), সাইটোসিন (C)
- অ্যাডেনিন থাইমিন ক্ষারের সঙ্গে দুটি হাইড্রোজেন বন্ধন দ্বারা (A = T) এবং গুয়ানিন সাইটোসিন ক্ষারের সঙ্গে 3টি হাইড্রোজেন বন্ধন দ্বারা (G ≡ C) যুক্ত হয়ে বেস পেয়ার তৈরি করে।
📌 কাজ:
- DNA অণু প্রতিলিপি গঠনের মাধ্যমে বংশগত বৈশিষ্ট্য জনিত কোষ থেকে অপত্য কোশে এবং এক জনু থেকে পরবর্তী জনুতে সঞ্চারিত করে।
- DNA অণু কোশের জৈবনিক কাজ করতে সাহায্য করে।
💡 DNA কাঠামোর অংশসমূহ:
- G = গুয়ানিন
- C = সাইটোসিন
- A = অ্যাডেনিন
- T = থাইমিন
- S = ডিঅক্সিরাইবোজ শর্করা
- P = ফসফেট গ্রুপ
- শর্করা ও ফসফেট নির্মিত কাঠামো
- নাইট্রোজেন-ঘটিত ক্ষার
2. রাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড (RNA) 🧪
DNA থেকে সংস্থাপিত রাইবোজ শর্করা, ফসফেট ও নাইট্রোজেন-ঘটিত ক্ষার নিয়ে গঠিত একতন্ত্রী যে নিউক্লিক অ্যাসিড অণু প্রোটিন সংশ্লেষণ দ্বারা কোশের জৈবনিক কাজে সাহায্য করে, তাকে RNA বলে।
- RNA সাধারণত একতন্ত্রী হয়। এটি রাইবোজ শর্করা, ফসফেট মূলক ও নাইট্রোজেন-ঘটিত ক্ষার দ্বারা গঠিত।
- RNA-এর নাইট্রোজেন-ঘটিত ক্ষারগুলি DNA-এর মতোই, কেবলমাত্র RNA-তে থাইমিনের পরিবর্তে ইউরাসিল (U) নামক পিরিমিডিন ক্ষার থাকে।
📌 কাজ:
কার্য অনুযায়ী RNA তিন প্রকার—
- মেসেঞ্জার RNA (mRNA), DNA-এর সংকেত অনুযায়ী প্রোটিন তৈরির বার্তা বহন করে।
- রাইবোজোমাল RNA (rRNA), DNA নির্দেশিত প্রোটিন তৈরিতে সাহায্য করে।
- ট্রান্সফার RNA (tRNA), অ্যামিনো অ্যাসিড বহন করে।
💡 RNA কাঠামোর অংশসমূহ:
- G = গুয়ানিন
- C = সাইটোসিন
- A = অ্যাডেনিন
- U = ইউরাসিল
- S = রাইবোজ শর্করা
- P = ফসফেট গ্রুপ
- শর্করা ও ফসফেট নির্মিত কাঠামো
- নাইট্রোজেন-ঘটিত ক্ষার
DNA ও RNA-এর পার্থক্য 📊
| বিষয় | DNA | RNA |
|---|---|---|
| 1. অবস্থান | কোশের নিউক্লিয়াস অথবা নিউক্লিওয়েড। | সাইটোপ্লাজম ও রাইবোজোম। |
| 2. শর্করার প্রকৃতি | পাঁচ কার্বনযুক্ত ডিঅক্সিরাইবোজ শর্করা। | পাঁচ কার্বনযুক্ত রাইবোজ শর্করা। |
| 3. পিরিমিডিন ক্ষার | দুই প্রকার—সাইটোসিন ও থাইমিন। | দুই প্রকার—সাইটোসিন এবং ইউরাসিল। |
| 4. গঠন | DNA দ্বিতন্ত্রী ও ঘোরানো সিঁড়ির মতো। | RNA সাধারণত একতন্ত্রী এবং রেখাকার। |
| 5. কাজ | বংশগত বৈশিষ্ট্য বহন করে। | DNA-এর নির্দেশ অনুযায়ী প্রোটিন সংশ্লেষের সংকেত বহন করে। |
🧬 3. হিস্টোন ও নন-হিস্টোন প্রোটিন (Histone and Non-Histone Proteins)
ক্রোমোজোমে উপস্থিত ক্ষারীয় প্রোটিন হল হিস্টোন প্রোটিন। হিস্টোন প্রোটিনগুলি আর্জিনিন, হিস্টিডিন ও লাইসিন জাতীয় অ্যামিনো অ্যাসিড দিয়ে তৈরি হয়। হিস্টোনগুলি ক্ষারীয় প্রকৃতির হওয়ায় সহজেই তারা আম্লিক DNA অণুর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। এছাড়া অন্যান্য আম্লিক অ্যামিনো অ্যাসিড, যেমন—ট্রিপটোফ্যান ও টাইরোসিন দিয়ে তৈরি প্রোটিনগুলিকে নন-হিস্টোন প্রোটিন বলে। ক্রোমোজোমের স্বল্পস্থানে অধিক DNA সংকুলানের জন্য DNA অণুতে হিস্টোন ও নন-হিস্টোন প্রোটিন সংলয় হয় এবং DNA-কে পাকিয়ে ছোটো হতে সাহায্য করে।
📌 জেনে রাখো (Know This)
- (i) বিজ্ঞানী ওয়াটসন ও ক্রিক (1953) DNA-এর দ্বিহেলিক্স মডেল বর্ণনা করেন এবং 1962 সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
- (ii) ইউক্যারিওটিক ক্রোমোজোমের রাসায়নিক উপাদান হিসেবে নিউক্লিক অ্যাসিড ও প্রোটিন ছাড়াও অল্প পরিমাণে কিছু ধাতব আয়ন (যেমন—Ca++, Mg++ প্রভৃতি) উপস্থিত থাকে।
🔬 2.1.6 ইউক্রোমাটিন ও হেটেরোক্রোমাটিন (Euchromatin and Heterochromatin)
ক্রোমাটিন জালিকাগুলি রঞ্জিত করলে দুই প্রকারের ক্রোমাটিন লক্ষ্য করা যায়—ইউক্রোমাটিন ও হেটেরোক্রোমাটিন।
1. ইউক্রোমাটিন (Euchromatin) ✨
ক্রোমাটিন তন্তুগুলি ক্ষারীয় রঞ্জকে রঞ্জিত করলে সক্রিয় জিনযুক্ত, কম কুণ্ডলীকৃত অংশসমূহ হালকাভাবে রঞ্জিত হয়। ক্রোমাটিন তন্তুর এই অংশগুলিকে ইউক্রোমাটিন বলে।
বৈশিষ্ট্য (Characteristics):
- (i) ইউক্যারিওটিক জিনোমে ইউক্রোমাটিনের মাত্রা হেটেরোক্রোমাটিনের তুলনায় অনেক বেশি হয়।
- (ii) ইউক্রোমাটিন অংশ জিনগতভাবে সক্রিয় হয়। তার জন্য এই অংশে RNA উৎপাদন ঘটে থাকে।
- (iii) ইউক্রোমাটিন অংশেই মিয়োসিস কোষ বিভাজনের সময় ক্রসিং ওভার ঘটে।
2. হেটেরোক্রোমাটিন (Heterochromatin) 🔗
ক্রোমাটিন জালিকাগুলিকে ক্ষারীয় রঞ্জকে রঞ্জিত করলে স্বল্প জিনসম্পন্ন, অধিক কুণ্ডলীকৃত অংশসমূহ গাঢ়ভাবে রঞ্জিত হয়। ক্রোমাটিন তন্তুর এই অংশগুলিকে হেটেরোক্রোমাটিন বলে।
বৈশিষ্ট্য (Characteristics):
- (i) ক্রোমোজোমে এর মাত্রা কম থাকে।
- (ii) এটি জিনের কাজ নিয়ন্ত্রণ করে ও ক্রোমোজোমের অখণ্ডতা বজায় রাখে।
- (iii) হেটেরোক্রোমাটিন অংশে মিয়োসিসে কোনো ক্রসিং ওভার ঘটে না।
- (iv) এটি স্থায়ী বা কনস্টিটিউটিভ (যেমন—টেলোমিয়ার ও সেন্ট্রোমিয়ার অংশে) এবং অস্থায়ী বা ফ্যাকালটেটিভ প্রকৃতির হয়ে থাকে।
ইউক্রোমাটিন ও হেটেরোক্রোমাটিন-এর পার্থক্য (Differences between Euchromatin and Heterochromatin) 📊
| বিষয় (Subject) | ইউক্রোমাটিন (Euchromatin) | হেটেরোক্রোমাটিন (Heterochromatin) |
|---|---|---|
| 1. রঞ্জন ধর্ম (Staining Property) | ইন্টারফেজ দশায় হালকা বর্ণ ধারণ করে। | ইন্টারফেজ দশায় গাঢ় বর্ণ ধারণ করে। |
| 2. জিন (Gene) | অপেক্ষাকৃত অধিক সক্রিয় জিন উপস্থিত। | অপেক্ষাকৃত কম সক্রিয় জিন উপস্থিত। |
| 3. ক্রসিং ওভার (Crossing Over) | এই অংশে ক্রসিং ওভার সংঘটিত হয়। | এই অংশে ক্রসিং ওভার সংঘটিত হয় না। |
| 4. পরিমাণ (Quantity) | ক্রোমোজোমে বেশি পরিমাণে থাকে। | ক্রোমোজোমে কম পরিমাণে থাকে। |
জীবনর প্রবহমানতা 🧬 (Continuity of life)
🔬 2.1.7 কোষ বিভাজনে অংশগ্রহণকারী কোশীয় অঙ্গাণু ও অন্যান্য গঠনগত অংশ
(Cellular organelles and other structures participating in cell division)
একটি কোষ বিভাজিত হয়ে দুই বা ততোধিক নতুন অপত্য কোষ সৃষ্টি হলে কোষ বিভাজন হয়। বিভিন্ন কোশীয় অঙ্গাণু ও অন্যান্য গঠনগত অংশ কোষ বিভাজনে সরাসরি সাহায্য করে। নিচে তা আলোচিত হল:
-
নিউক্লিয়াস (Nucleus) 🧠
- নিউক্লিয়াস ক্রোমোজোম ধারণ করে।
- কোষ বিভাজনের সময় ক্রোমোজোম বিভাজিত হয় এবং বংশগত বৈশিষ্ট্যগুলি জনিতৃ কোশ থেকে অপত্য কোশে চলে যায়।
- কোষ বিভাজনের আগে DNA-এর প্রতিলিপি তৈরি হয়। ফলে কোষ বিভাজন সম্ভব হয়।
-
সেন্ট্রোজোম ও মাইক্রোটিবিউল (Centrosome & Microtubule) ✨
- প্রাণীকোষের সেন্ট্রোজোম কোষ বিভাজনকালে কোষের দুই মেরুতে বিন্যস্ত হয় ও মাইক্রোটিবিউল গঠন দ্বারা বেমতন্তু তৈরি করে।
- মাইক্রোটিবিউল হল কোষের সাইটোপ্লাজমে অবস্থিত টিউবিউলিন নামক প্রোটিন নির্মিত নলাকার গঠনবিন্যাস।
- জনিতৃ কোষের ক্রোমোজোমগুলি বেমতন্তুর সাথে যুক্ত হয় এবং বেমতন্তুর সংকোচনের ফলে কোষের দুই মেরুর দিকে চালিত হয়।
-
রাইবোজোম (Ribosome) 🏭
- পর্দাবিহীন এই অঙ্গাণুটি কোষের সাইটোপ্লাজমে প্রোটিন সংশ্লেষে সাহায্য করে।
- তাই একে কোষের প্রোটিন ফ্যাক্টরি বলে।
- এই প্রোটিনগুলি ক্রোমোজোম, কোশীয় অঙ্গাণু ও সাইটোপ্লাজম গঠন করে, যেগুলি কোষ বিভাজনে অংশ নেয়।
-
মাইটোকনড্রিয়া (Mitochondria) 🔋
- মাইটোকনড্রিয়াতে কোশীয় শ্বসনের দ্বারা খাদ্যদ্রব্যের জারণ ঘটে, ফলে শক্তি উৎপন্ন হয় যা ATP অণুতে আবদ্ধ থাকে।
- এই ATP কোষ বিভাজনের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির যোগান দেয়।
💡 2.1.8 কোষ বিভাজনের তাৎপর্য
(Significance of cell division)
কোষ বিভাজনের মূল তাৎপর্যগুলি হল—
-
বৃদ্ধি (Growth) 🌱
- কোষ বিভাজনের ফলে কোষের সংখ্যার বৃদ্ধি ঘটে, যা জীবদেহের সামগ্রিক বৃদ্ধি ঘটায়।
- যেমন, কোষ বিভাজনের মাধ্যমেই এককোষী জাইগোট থেকে বহুকোষী ভ্রূণের পরিস্ফুরণ ঘটে।
-
প্রজনন (Reproduction) 👨👩👧👦
- কোষ বিভাজনের ফলে জননকোশ তৈরি হয়, যা উন্নত জীব যৌন জননে সাহায্য করে।
- যৌন ও অযৌন জননের মাধ্যমে জীবের সংখ্যা বৃদ্ধিতেও এর গুরুত্ব অপরিসীম।
-
ক্ষয়পূরণ (Replenishment) 🩹
- জীবদেহে ক্ষতস্থান নিরাময় ও কলা বা অঙ্গের পুনরুৎপাদনে এটি একটি আবশ্যক পদ্ধতি।
- যেমন, টিকটিকির ল্যাজ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর নতুন ল্যাজ তৈরি হওয়া, কাঁকড়ার বিনষ্ট পদের স্থানে নতুন পদের সৃষ্টি।
🧬 2.1.9 কোষ বিভাজনের প্রকারভেদ
(Types of cell division)
জীবদেহে তিন প্রকার কোষ বিভাজন দেখা যায়—অ্যামাইটোসিস, মাইটোসিস এবং মিয়োসিস।
- অ্যামাইটোসিস (Amitosis) ✖️
নিম্নশ্রেণির জীবে যে কোষ বিভাজন পদ্ধতিতে ক্রোমোজোম ও বেমতন্তু গঠন ছাড়াই নিউক্লিয়াস ও সাইটোপ্লাজমের সরাসরি বিভাজন দ্বারা দুটি অপত্য কোষের সৃষ্টি হয়, তাকে অ্যামাইটোসিস বলে।
- এর অপর নাম ক্যারিওস্টেনোসিস বা অ্যাকাইনেসিয়া।
- [a] সংঘটনস্থল (Occurrence): নিম্নশ্রেণির এককোষী জীব, যেমন—ব্যাকটেরিয়া, ইস্ট, অ্যামিবা, প্যারামেসিয়াম প্রভৃতি।
ছায়া জীবনবিজ্ঞান ও পরিবেশ • দশম শ্রেণি\n\n### [b] ব্যাখ্যা: অ্যামাইটোসিস 🔬\n\n> অ্যামাইটোসিস একটি সরল ও প্রত্যক্ষ কোষ বিভাজন পদ্ধতি যার দ্বারা নিম্নশ্রেণির জীবের দ্রুত বংশবৃদ্ধি ঘটে। এই ধরনের কোষ বিভাজনের সময় কোষ এবং কোষের নিউক্লিয়াসটি দৈর্ঘ্যে বৃদ্ধি পায় ও ডাম্বেল আকার ধারণ করে। কোষপর্দা ও নিউক্লিয়াসের মাথা বরাবর ভাঁজ সৃষ্টি হয়ে তা পৃথক হয়ে যায়। এক্ষেত্রে নিউক্লিয়াস সরাসরি ভাগ হয়ে যায় বলে একে প্রত্যক্ষ কোষ বিভাজন বলে। নিউক্লীয় পর্দার বিলুপ্তি, ক্রোমোজোম আবির্ভাব ও ক্রোমোজোমীয় চলন কিছুই এক্ষেত্রে ঘটে না। এই পদ্ধতিটির শক্তি চাহিদা কম।\n\nচিত্র: অ্যামিবা-র অ্যামাইটোসিস (Amitosis in Amoeba)\n(চিত্রের প্রধান অংশগুলি হল: নিউক্লিয়াস, অ্যামিবা কোষ, সাইটোপ্লাজম, ডাম্বেল আকারের নিউক্লিয়াস, সাইটোপ্লাজমীয় ভাঁজ, অপত্য অ্যামিবা কোষ)\n\n## 2. মাইটোসিস (Mitosis) 🧬\n\n> যে পরোক্ষ কোষ বিভাজন পদ্ধতিতে দেহকোষের নিউক্লিয়াস, ক্রোমোজোম এবং সাইটোপ্লাজম প্রত্যেকই একবার মাত্র বিভাজিত হয়ে মাতৃকোষের সমআকৃতি, সমবৈশিষ্ট্য ও সমান সংখ্যক ক্রোমোজোমযুক্ত দুটি অপত্যকোষ সৃষ্টি করে, তাকে মাইটোসিস বলে।\n\n### 📌 সংগঠনস্থল: (Occurrence)\n1. ইউক্যারিওটিক উদ্ভিদ ও প্রাণীর প্রায় সমস্ত দেহকোষে মাইটোসিস ঘটে।\n2. উদ্ভিদ ও প্রাণীতে দেহের পরিস্ফুরণ, ফুলের রেণুমাতৃকোষ সৃষ্টি ও প্রাণীর জনন মাতৃকোষের সংখ্যা বৃদ্ধির সময় মাইটোসিস ঘটে।\n\n### [b] ব্যাখ্যা: (Explanation)\n> মাইটোসিস বিভাজনের ক্ষেত্রে বিভাজনক্ষম দেহমাতৃকোষটি একবার মাত্র বিভাজিত হয়ে দুটি অপত্য কোষ সৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রে, জনিত কোষ (মাতৃকোষ) এবং নতুন তৈরি হওয়া অপত্যকোষে ক্রোমোজোম সংখ্যা অপরিবর্তিত থাকে। তাই মাইটোসিস কোষ বিভাজনকে সমবিভাজন বা সমসদৃশ বিভাজন বলে। এক্ষেত্রে মাতৃকোষ ও অপত্য কোষ একই বৈশিষ্ট্যযুক্ত হয়। মাইটোসিসে মাতৃকোষ ডিপ্লয়েড (2n) হলে অপত্য কোষগুলিও ডিপ্লয়েড-ই হবে। আবার মাতৃকোষ হ্যাপ্লয়েড (n) হলে অপত্য কোষগুলিও হ্যাপ্লয়েড হবে। এটি পরে বিশদে আলোচিত হল।\n\nচিত্র: মাইটোসিস বিভাজন সম্বন্ধে ধারণা\n(মাতৃকোষ (2n) দুটি অপত্য কোষ (2n) তৈরি করে; মাতৃকোষ (n) দুটি অপত্য কোষ (n) তৈরি করে।)\n\n## 3. মিয়োসিস (Meiosis) 🧪\n\n> জননকোষ ও রেণু উৎপাদনের জন্য যে কোষ বিভাজন পদ্ধতিতে মাতৃকোষের নিউক্লিয়াসটি পরপর দু-বার বিভাজিত হয়ে মাতৃকোষের অর্ধেক সংখ্যক ক্রোমোজোম-বিশিষ্ট চারটি অপত্য কোষ সৃষ্টি হয়, তাকে মিয়োসিস বলে।
CONTENT MANAGER