২.২ জনন: পৃষ্ঠা ৫৩ - ৫৯
২.২ জনন: পৃষ্ঠা ৫৩ - ৫৯ - WBBSE - Class 10 - বিজ্ঞান
জীবনের প্রবহমানতা
2.2 জনন (Reproduction) 🧬
জনন হল প্রাণের প্রধান লক্ষণ। গুরুত্বপূর্ণ এই শারীরবৃত্তীয় পদ্ধতি সম্পর্কে এখন আমরা বিশদ জানবো।
2.2.1 💡 জননের ধারণা (Concept of reproduction)
জনন বলতে কোনো জীব থেকে একইরকম দেখতে এবং একই গুণসম্পন্ন জীব সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে বোঝায়। কিন্তু, পুষ্টি, শ্বসন বা রেচনের মতো জনন একটি অত্যাবশ্যকীয় শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া নয়। অর্থাৎ কোনো জীবের নিজের জীবন রক্ষা করার জন্য জনন অপরিহার্য নয়। তবে জননের ফলে জীবের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং পৃথিবীতে প্রজাতির অস্তিত্ব বজায় থাকে।
📌 জনন (যে জৈবনিক পদ্ধতিতে জীব নিজ আকৃতি ও প্রকৃতিবিশিষ্ট এক বা একাধিক অপত্য জীব সৃষ্টি দ্বারা পৃথিবীতে নিজের প্রজাতির অস্তিত্ব বজায় রাখে, তাকে জনন বলে)
জননের গুরুত্ব:
- (i) অস্তিত্ব রক্ষা করা: জননের মাধ্যমে অপত্য জীবের সৃষ্টি হয়, ফলে কোনো জীবপ্রজাতির সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি পায় ও প্রজাতির অস্তিত্ব বজায় থাকে।
- (ii) ধারাবাহিকতা অটুট রাখা: জননের মাধ্যমে জীবের বংশগত বৈশিষ্ট্যের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
- (iii) জীবজগতে ভারসাম্য রক্ষা করা: জীবের মৃত্যুর ফলে সংখ্যা হ্রাস পেলে জননের মাধ্যমেই তা পূরণ হয়। প্রজাতিরটি বাস্তুতন্ত্র থেকে বিলুপ্ত হয় না ও বাস্তুতন্ত্রে ভারসাম্য বজায় থাকে।
- (iv) জীবের অভিযোজন ক্ষমতা ঘটানো: জননে উৎপন্ন অপত্যে উদ্ভুত প্রকারণ প্রজাতিটিকে অভিযোজিতর পথে চালনা করে।
2.2.2 🛠️ জননের পদ্ধতি (Process of reproduction)
প্রধানত দুটি উপায়ে সজীব জীব জনন পদ্ধতি সম্পন্ন করে। যথা—অযৌন জনন এবং যৌন জনন।
- অযৌন জনন (Asexual reproduction): যে জনন প্রক্রিয়ায় গ্যামেট তৈরি এবং নিষেক ছাড়াই, শুধুমাত্র দেহকোষ বিভাজিত হয়ে বা রেণু উৎপাদনের দ্বারা জনিত জীবের মতো অপত্য জীব সৃষ্টি হয়, তাকে অযৌন জনন বলে।
- অযৌন জননের বৈশিষ্ট্য:
- (i) একটি মাত্র জনিত জীবের প্রয়োজন।
- (ii) জনিত জীবটির সমস্ত বৈশিষ্ট্য উৎপন্ন সবকটি অপত্যে সঞ্চারিত হয়।
- (iii) অপত্যগুলি জিনগতভাবে জনিত জীবের সমপ্রকৃতির হয়, কারণ কেবলমাত্র পরিবেশগত
- অযৌন জননের গুণাগুণ:
- সুবিধা—
- (i) এটি সরল ও দ্রুত জনন পদ্ধতি।
- (ii) কম শক্তির প্রয়োজন হয়।
- (iii) বংশবিস্তারে একটিমাত্র জীবের প্রয়োজন।
- অসুবিধা—
- (i) প্রকারণ সৃষ্টি হয় না বলে জীবের অভিযোজন ক্ষমতা কম হয়।
- (ii) অধিক সংখ্যায় অপত্য সৃষ্টি হওয়ার ফলে, অপত্যেরা খাদ্য ও বাসস্থান-সংক্রান্ত তীব্র প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হয়।
- সুবিধা—
- অযৌন জননের বৈশিষ্ট্য:
54 📚 ছায়া জীববিজ্ঞান ও পরিবেশ • দশম শ্রেণি\n\nপ্রজাবর ফলে সৃষ্টি হয়। (iv) অল্প সময়ে বেশি সংখ্যক জীব সৃষ্টি হয়। উদাহরণ: প্রধানত উদ্ভিদ ও নিম্নশ্রেণির কিছু প্রাণীদের ক্ষেত্রে অযৌন জনন পদ্ধতিটি ঘটে।\n\n## 2. যৌন জনন (Sexual reproduction) 💖\n\n> যে জনন প্রক্রিয়ায় দুটি ভিন্নধর্মী গ্যামেট জননকোষের (সাধারণভাবে পুংগ্যামেট ও স্ত্রীগ্যামেট) মিলন ফলে নিষেকও অপত্য জীব সৃষ্টি হয়, তাকে যৌন জনন বলে।\n\nযৌন জননের বৈশিষ্ট্য:\n* (i) যৌন জননে একই প্রজাতির দুটি ভিন্ন জননকোষ বা গ্যামেট-এর মিলন হয়। জননকোষ দুটি একটি পুংগ্যামেট ও অপরটি স্ত্রীগ্যামেট প্রকৃতির হয়।\n* (ii) ডিপ্লয়েড (2n) পুংজনন মাতৃকোষ বা স্ত্রীজনন মাতৃকোষে মিয়োসিস কোষ বিভাজন পদ্ধতিতে হ্যাপ্লয়েড (n) পুংজননকোষ বা স্ত্রী জননকোষ তৈরি করে।\n* (iii) যৌন জননে সর্বদা পুংগ্যামেট এবং স্ত্রীগ্যামেটের মিলন বা নিষেককে সিনগ্যামি বলে। এর ফলে ডিপ্লয়েড (2n) জাইগোট তৈরি হয়, যা থেকে নতুন অপত্য জীব সৃষ্টি হয়।\n* (iv) যৌন জননে দুটি ভিন্ন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন গ্যামেটের মিলন ঘটে বলে, এই প্রকার জননে প্রকরণ সৃষ্টি হয়।\n\n### অযৌন জনন ও যৌন জননের পার্থক্য 📊\n\n| বিষয় | অযৌন জনন | যৌন জনন |\n| :----------------- | :--------------------------------------- | :--------------------------------------------- |\n| 1. জনিত জীবের সংখ্যা | একটি জীব। | বিপরীত লিঙ্গের দুটি জীব। |\n| 2. গ্যামেট উৎপাদন | গ্যামেট সৃষ্টি হয় না। রেণু উৎপাদন বা দেহকোষ বিভাজন দ্বারা জনন সম্পন্ন হয়। | দুই প্রকার গ্যামেট উৎপন্ন হয়—স্ত্রীগ্যামেট (ডিম্বাণু) এবং পুংগ্যামেট (শুক্রাণু)। |\n| 3. মাইটোসিস ও মিয়োসিসের ওপর নির্ভরতা | মাইটোসিস, কিছুক্ষেত্রে অ্যামাইটোসিস ও মিয়োসিস-এর ওপর নির্ভরশীল। | গ্যামেট উৎপাদনে মিয়োসিস পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। |\n| 4. অপত্য জনুর প্রকৃতি | অপত্য জনুর কোনো প্রকরণ ঘটে না বলে তা জনিত জনুর অনুরূপ হয়। | প্রকরণ সৃষ্টি হয় বলে অপত্য জনুর মধ্যে নতুন বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। |\n\n## 2.2.3 অযৌন জনন (Asexual reproduction) 🌿\n\nঅযৌন জননের বিভিন্ন পদ্ধতিগুলি উদাহরণসহ আলোচনা করা হল।\n\n### বিভাজন (Fission) 🦠\n\n> সংজ্ঞা: অধিকাংশ এককোষী জীবে মাইটোসিস বা অ্যামাইটোসিস কোষ বিভাজন পদ্ধতির দ্বারা দুটি (দ্বিবিভাজন) বা দুইয়ের অধিক (বহুবিভাজন) নতুন অপত্য সৃষ্টি করার পদ্ধতিকে বিভাজন বলে।\n\nউদাহরণ:\n* (i) অ্যামিবা (Amoeba proteus):\n * ① দ্বিবিভাজন—অনুকূল পরিবেশে অ্যামিবা-র নিউক্লিয়াসটি মাইটোসিস পদ্ধতিতে দ্বিবিভাজিত হয়। এর সাইটোপ্লাজম বিভাজনরত নিউক্লিয়াসের লম্বতলে (90°) খাঁজ (furrow) সৃষ্টি করে বিভাজিত হয় ও দুটি অপত্য সৃষ্টি করে।\n * ② বহুবিভাজন—প্রতিকূল পরিবেশে অ্যামিবা-র membrana বিশিষ্ট হয় ও সিস্ট প্রাচীর (cyst wall) দ্বারা আবদ্ধ হয়। সিস্টের মধ্যে নিউক্লিয়াস ও সাইটোপ্লাজমের বহুবিভাজন দ্বারা অসংখ্য ক্ষুদ্র স্পোর তৈরি করে। এইপ্রকার বহুবিভাজনকে স্পোরুলেশন বলে। পরিবেশ অনুকূল হলে সিস্ট প্রাচীর বিদীর্ণ করে স্পোরগুলি মুক্ত হয় ও নতুন অ্যামিবা সৃষ্টি করে।\n* (ii) প্লাসমোডিয়াম (Plasmodium vivax): এক্ষেত্রে বহুবিভাজন দুটি দশায় ঘটে—সাইজন্ট এবং স্পোরন্ট। সাইজন্ট এবং স্পোরন্ট দশা শ্রী অ্যানোফিলিস মশার
🌱 জীবনের প্রবাহমানতা (Continuity of Life)
প্লাসমোডিয়াম ও স্পোরাজেনিয়া নামক বহুবিভাজন দ্বারা অসংখ্য অপত্য প্লাসমোডিয়াম তৈরি হয়। সাইজোগোনি ও স্পোরাজেনিয়া দ্বারা সৃষ্ট অপত্য প্লাসমোডিয়াম-দের যথাক্রমে মেরোজয়েট ও স্পোরোজয়েট বলে।
🔬 অ্যামিবা-র বহুবিভাজন (Multiple Fission in Amoeba)
- সিস্ট প্রাকার: প্রতিকূল পরিবেশে অ্যামিবা তার চারপাশে একটি শক্ত আবরণ তৈরি করে, যাকে সিস্ট প্রাকার বলে।
- নিউক্লিয়াস বিভাজন: সিস্টের মধ্যে অ্যামিবার নিউক্লিয়াস বারবার বিভাজিত হয়ে অসংখ্য ছোট নিউক্লিয়াসে পরিণত হয়।
- অপত্য অ্যামিবা: অনুকূল পরিবেশে সিস্ট ফেটে যায় এবং নিউক্লিয়াসগুলো সাইটোপ্লাজম নিয়ে অপত্য অ্যামিবা হিসেবে মুক্ত হয়।
🦠 প্লাসমোডিয়াম-এর বহুবিভাজন (Multiple Fission in Plasmodium)
- সিজন্ট: প্লাসমোডিয়ামের একটি নির্দিষ্ট দশা, যেখানে নিউক্লিয়াস বহুবিভাজন শুরু করে।
- মাইটোসিস বিভাজন: নিউক্লিয়াসগুলো বারবার মাইটোসিস প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিভাজিত হয়।
- মেরোজয়েট ও স্পোরোজয়েট: বিভাজনের ফলে সৃষ্ট প্রতিটি নিউক্লিয়াস সাইটোপ্লাজম দ্বারা আবৃত হয়ে মেরোজয়েট বা স্পোরোজয়েট তৈরি করে, যা নতুন হোস্টকে সংক্রমিত করতে পারে।
🌿 কোরকোদ্গম (Budding)
📌 সংজ্ঞা: যে বিশেষ অযৌন জনন পদ্ধতিতে জনিত জীবের দেহ থেকে কোনো প্রবর্ধিত দেহাংশ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে অপত্য জীবদেহ সৃষ্টি করে তাকে কোরকোদ্গম বা বাডিং বলে।
📝 উদাহরণ:
-
ইস্ট (Yeast):
- ইস্ট মাতৃকোষের অসম বিভাজনের ফলে ক্ষুদ্র প্রবর্ধকের মতো কোৱক (bud) সৃষ্টি হয়, যার মধ্যে জনিত নিউক্লিয়াস বিন্যস্ত থাকে।
- পরবর্তীকালে মাতৃদেহ থেকে কোৱকটি বিচ্ছিন্ন হয়ে নতুন অপত্য ইস্ট তৈরি করে।
- অনেক সময়, ইস্টের টিউবুলিশ পদ্ধতিতে বা বুডিং পদ্ধতিতে বহু মাইসেলিয়াম গঠন করে।
চিত্র: ইস্ট-এর কোৱকোদ্গম
- নিউক্লিয়াস বিভাজন ➡️ কোৱক সৃষ্টি ➡️ কোৱকের শৃঙ্খল ➡️ টিউবুলা দশা
-
হাইড্রা (Hydra vulgaris):
- হাইড্রা-র কোৱক জনিতর দেহের বাইরে সৃষ্টি হয় (এক্সোজেনাস বাড)।
- এটি খাদ্য সংগ্রহকারী সূচি ও কফিকা প্রভৃতি গঠন সম্পন্ন হয় এবং সেটি মাতৃদেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করে।
চিত্র: হাইড্রা-র কোৱকোদ্গম
- মাতৃদেহ ➡️ কোৱক সৃষ্টি ➡️ কোৱকের বৃদ্ধি ➡️ অপত্য হাইড্রা
📏 খণ্ডীভবন (Fragmentation)
📌 সংজ্ঞা: যে অযৌন জনন পদ্ধতিতে জনিত জীবের দেহ দুই বা ততোধিক খণ্ডে ভেঙে যায় ও প্রতিটি খণ্ড অপত্যের সৃষ্টি করে, তাকে খণ্ডীভবন বলে।
📝 উদাহরণ:
-
স্পাইরোগাইরা (Spirogyra maxima): এই নামক শৈবালের সূত্রাকার দেহটি জলস্রোতের প্রভাবে বা আঘাতজনিত কারণে খণ্ডিত হয়ে প্রতিটি দেহাংশ নতুন অপত্য সৃষ্টি করে।
-
খণ্ডীত দেহাংশ মাইটোসিস কোষ বিভাজন পদ্ধতি দ্বারা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে অপত্য জীব সৃষ্টি করে।
চিত্র: স্পাইরোগাইরা-র খণ্ডীভবন
- জনিত শৈবাল (নিউক্লিয়াস, কোশপ্রাচিত) ➡️ খণ্ডীভবন ➡️ অপত্য শৈবাল
56 জীববিদ্যা ও পরিবেশ • দশম শ্রেণি
💡 পুনরুৎপাদন (Regeneration)
সংজ্ঞা:যে অযৌন জনন পদ্ধতিতে জনিত জীবের সামান্য দেহংশ সম্পূর্ণ নতুন জীব সৃষ্টি করে, তাকে পুনরুৎপাদন বলে। এইপ্রকার অযৌন জনন পদ্ধতিকে মরফাল্যাক্সিস বলে। দেহের সামান্য অংশ বিচ্ছিন্ন হলে সেই হারানো দেহাশ পুনর্গঠনকে এপিমরফোসিস বলে।
উদাহরণ:প্ল্যানেরিয়া (Planaria sp.) নামক চ্যাপ্টা কৃমির কোনো অংশ বিচ্ছিন্ন হলে, প্রতিটি বিচ্ছিন্ন অংশ থেকে নতুন অপত্যের সৃষ্টি হয়। প্ল্যানেরিয়া ছাড়াও স্পঞ্জ, হাইড্রা-তেও পুনরুৎপাদন দেখা যায়।
🔬 রেণু উৎপাদন (Sporulation)
সংজ্ঞা:যে অযৌন জনন পদ্ধতিতে মস, ফার্ন ও ছত্রাকদেহে সৃষ্ট এককোষী রেণু জনিত দেহ থেকে আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ে এবং নতুন অপত্য সৃষ্টি করে, তাকে রেণু উৎপাদন বা স্পোরুলেশন বলে।
উদাহরণ:- ছত্রাক: ছত্রাকে বিভিন্নরকম গঠনের এবং গমন ক্ষমতাসম্পন্ন বা গমন ক্ষমতাবিহীন রেণু দেখা যায়, যা উপযুক্ত পরিবেশে অঙ্কুরিত হয়ে অপত্য ছত্রাক গঠন করে। বিভিন্ন ধরনের রেণুগুলি হল—
- চলন ক্ষমতাসম্পন্ন জুওস্পোর (যেমন: ইউলোথ্রিক্স)
- পুরু প্রাচীরযুক্ত ক্ল্যামাইডোস্পোর (যেমন: ফাইটোফথোরা)
- অপুংস্ফুটদশা দ্বারা সৃষ্ট এককোষী উইডিয়া ও কনিডিয়া (যেমন: পেনিসিলিয়াম ও অ্যাসপারজিলাস)
- স্পোরানজিওস্পোর (যেমন: রাইজোপাস)
- মস ও ফার্ন: মসের রেণুঘর উদ্ভিদের রেণুস্থলী থেকে রেণু সৃষ্টি হয়। ফার্নের রেণুঘর উদ্ভিদের রেণুস্থলীও বা বিষম আকৃতির রেণু উৎপন্ন হয়।
- ছত্রাক: ছত্রাকে বিভিন্নরকম গঠনের এবং গমন ক্ষমতাসম্পন্ন বা গমন ক্ষমতাবিহীন রেণু দেখা যায়, যা উপযুক্ত পরিবেশে অঙ্কুরিত হয়ে অপত্য ছত্রাক গঠন করে। বিভিন্ন ধরনের রেণুগুলি হল—
🌿 2.2.4 অঙ্গজ বংশবিস্তার (Vegetative propagation)
অঙ্গজ বংশবিস্তার হল এক বিশেষ প্রকার অযৌন জনন পদ্ধতি যা মূলত উদ্ভিদে ঘটে। এটি মাইটোসিস নির্ভর পদ্ধতি।
সংজ্ঞা:যে অযৌন জনন পদ্ধতিতে উদ্ভিদের কোনো অঙ্গ বা অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পুনরুৎপাদনের দ্বারা নতুন অপত্যের সৃষ্টি করে, তাকে অঙ্গজ বংশবিস্তার বলে।
অঙ্গজ বংশবিস্তারের বৈশিষ্ট্য:
- অঙ্গজ জননে একটিমাত্র জনিত জীবের প্রয়োজন হয়।
- উদ্ভিদের দেহকোষ থেকে কেবলমাত্র মাইটোসিস দ্বারা এক্ষেত্রে অপত্য তৈরি হয়।
- প্রকরণ তৈরি হয় না বলে অঙ্গজ জনন বিবর্তন ও অভিযোজনে সাহায্য করে না।
- এক্ষেত্রে বিশুদ্ধ উদ্ভিদ পাওয়া সম্ভব হয়।
জীবের প্রজননতা 🪴
অঙ্গজ বংশবিস্তারের প্রকারভেদ: উদ্ভিদে অঙ্গজ জনন দুইভাবে সম্পন্ন হয়। যথা—প্রাকৃতিক অঙ্গজ বংশবিস্তার ও কৃত্রিম অঙ্গজ বংশবিস্তার।
[a] প্রাকৃতিক অঙ্গজ বংশবিস্তার 🌿
উদ্ভিদ প্রাকৃতিক উপায়ে অনুকূল পরিবেশে বংশবিস্তার করতে পারে। যেমন—
(i) মূলের মাধ্যমে 🌱
কিছুকিছু উদ্ভিদ যেমন, মিষ্টি আলু বা রাঙা আলুর মূলের সাহায্যে নতুন উদ্ভিদ সৃষ্টি করে। এক্ষেত্রে উদ্ভিদটির রসালো মূল থেকে অস্থানিক মুকুল সৃষ্টি হয়। এই অস্থানিক মুকুল থেকে নতুন উদ্ভিদের সৃষ্টি হয়।
(ii) কাণ্ডের মাধ্যমে 🌿💧
উদ্ভিদের কাণ্ড বিভিন্নভাবে পরিবর্তিত হয় [যেমন—বুলবিল (চুপড়ি আলু), ভূনিম্নস্থ কাণ্ড (আদা, আলু), অর্ধবায়বীয় কাণ্ড (কচুরিপানা) ইত্যাদি] অঙ্গজ জনন করে থাকে। কচুরিপানার সর্বনিম্ন পাতার কাক্ষিক মুকুল থেকে উৎপন্ন একপ্রকার খর্বাকার অর্ধবায়বীয় কাণ্ড জলতলের সঙ্গে আনুভূমিকভাবে বিস্তৃত হয়। এইপ্রকার কাণ্ডকে খর্বধাবক বলে। ওই নতুন সৃষ্ট কাণ্ডের পর্ব থেকে অস্থানিক মূল, কাণ্ড ও পাতা সৃষ্টি হয়, যা মাতৃদেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বতন্ত্র উদ্ভিদ রূপান্তরিত হয়।
📸 চিত্র: বিভিন্ন প্রকার অঙ্গজ জনন—
- (ক) রাঙা আলুর মূল
- (খ) কচুরিপানার খর্বধাবক
- (গ) পাথরকুচির অস্থানিক মুকুল
(iii) পাতার মাধ্যমে 🍃
পাথরকুচি উদ্ভিদে পাতার কিনারায় সারি সারি অস্থানিক মুকুল তৈরি হয়, এই মুকুলকে পত্রাশ্রয়ী মুকুল বলে। এই মুকুল অঙ্কুরিত হয়ে শিশু উদ্ভিদ সৃষ্টি হয়, যা অস্থানিক মূলযুক্ত হয়। এই শিশু উদ্ভিদ জনিত উদ্ভিদ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নতুন স্বতন্ত্র উদ্ভিদে পরিণত হয়।
[b] কৃত্রিম অঙ্গজ বংশবিস্তার 🛠️
হর্টিকালচার বা উদ্যানপালন বিদ্যায় অঙ্গজ জনন দ্বারা বংশবিস্তারের নানা পদ্ধতির ব্যবহারিক প্রয়োগ করে নতুন উদ্ভিদ তৈরি করা হয়। যেমন—
(i) শাখা কলম বা কাটিং (Cutting) ✂️
কিছুকিছু উদ্ভিদের ক্ষেত্রে মূল, কাণ্ড বা পাতা কেটে নিয়ে উপযুক্ত পরিবেশে সৃষ্টি করে মাটিতে রোপণ করলে তার থেকে নতুন উদ্ভিদের সৃষ্টি হয়। একে কাটিং বা শাখাকলম বলে। শাখাকলমে কৃত্রিম অক্সিন (যেমন—IBA, NAA প্রভৃতি) হরমোনের লঘু দ্রবণ প্রয়োগে দ্রুত অস্থানিক মূল গঠিত হয়। এটি তিন প্রকার হয়ে থাকে। যথা—
- মূলের শাখাকলম: কমলালেবু, পাতিলেবু প্রভৃতি উদ্ভিদের মূলের কিছুটা অংশ কেটে নিয়ে মাটিতে রোপণ করলে, তা থেকে নতুন বিটপ সৃষ্টি হয়।
- কাণ্ডের শাখাকলম: গোলাপ, আখ, চা, জবা প্রভৃতি উদ্ভিদের কাণ্ড ৩০-৪০ cm কেটে নিয়ে রোপণ করলে, তাতে মূল সৃষ্টি হয় এবং ক্রমান্বয়ে নতুন উদ্ভিদ সৃষ্টি হয়।
- পাতার শাখাকলম: পাথরকুচি, বেগোনিয়া প্রভৃতি উদ্ভিদের পাতা তির্যকভাবে ২-৩টি খণ্ডে কেটে তা ঊর্ধ্বভাবে নরম মাটিতে স্থাপন করলে নতুন উদ্ভিদ সৃষ্টি হয়।
📸 চিত্র: কাণ্ডের শাখাকলম (উদাহরণ)
(ii) জোড়কলম বা গ্রাফটিং (Grafting) 🔗
যে কৃত্রিম অঙ্গজ জনন পদ্ধতিতে দুটি ভিন্ন উদ্ভিদের কাণ্ড বা শাখা কেটে জোড়া লাগিয়ে মিশ্র বৈশিষ্ট্যযুক্ত উদ্ভিদ সৃষ্টি
যে কৃত্রিম অঙ্গজ জনন পদ্ধতিতে একটি উন্নত প্রজাতির উদ্ভিদের শাখা (সিয়ন) এবং অনুন্নত প্রজাতির উদ্ভিদের মূল কাণ্ড বা শেকড় (স্টক)-কে একত্রিত করে নতুন একটি উদ্ভিদ তৈরি করা হয়, তাকে জোকলম বলে। সাধারণত দুটি নিকট সম্পর্কিত ক্যানিডাসযুক্ত কাঠল বীজলীয় উদ্ভিদের কাণ্ডটা করা হয়ে থাকে।
💡 জোকলম: একটি উন্নত প্রজাতির উদ্ভিদের শাখা (সিয়ন) এবং অনুন্নত প্রজাতির উদ্ভিদের মূল (স্টক) একত্রিত করে নতুন একটি উদ্ভিদ তৈরির পদ্ধতিকে জোকলম বলে।
- সিয়ন: যে কাণ্ডের উপরের অংশে কেটে কাণ্ডের মূল অংশটি গ্রাফটিং-এ ব্যবহৃত হয়, তাকে সিয়ন বলে। পক্ষান্তরে, যে উন্নত, অভিজাত উদ্ভিদের শাখাটি এই কাণ্ডের সাথে জোড়া লাগানো হয়, তাকে সিয়ন বলে। দুটি উদ্ভিদের সহবর্ষণ কলা সংযোগ হয় এবং নতুন কলা তৈরি হয়।
- স্টক: স্টক ও সিয়ন অংশের কাণ্ডের ভাস্কুলার ক্যামবিয়াম নামক ভাজক কলা সংযুক্ত হলেই তা থেকে নতুন সংবহন কলা তৈরি হয় এবং জোকলম পদ্ধতিতে উন্নত উদ্ভিদ সৃষ্টির প্রক্রিয়া সফল হয়। এই পদ্ধতি সফল হওয়ার পর গ্রাফটিং করা গাছে ফল চাষ এবং সৌন্দর্যবর্ধন করা হয়।
- উদাহরণ: আপেল, বোগেনভিলিয়া, আম, গোলাপ, ক্যাকটাস, টমেটো, তরমুজ, শসা প্রভৃতি।
🔬 (iii) অনুবিস্তারণ বা মাইক্রোপ্রোপাগেশন (Micropropagation)
🧪 মাইক্রোপ্রোপাগেশন: কৃত্রিম জনন পদ্ধতিতে কলা বা কোষ পালন করে নতুন পূর্ণাঙ্গ উদ্ভিদ উৎপাদন করা হয়, তাকে অনুবিস্তারণ বা মাইক্রোপ্রোপাগেশন বলে।
-
① নীতি: 'মাইক্রো' শব্দের অর্থ ক্ষুদ্র ও 'প্রোপাগেশন' শব্দের অর্থ উৎপাদন বা বংশবৃদ্ধি। অর্থাৎ, উদ্ভিদের মূল, কাণ্ড বা পাতার ছোটো টুকরা উপযুক্ত কর্ষণ মাধ্যমে (culture medium) রেখে বিভাজিত হতে দিলে, তা অপত্য উদ্ভিদ সৃষ্টি করে। কোষের টটিপোটেন্সি ধর্মের জন্য যে-কোনো কলাকোষ সম্পূর্ণ উদ্ভিদ তৈরি করতে পারে।
-
② পদ্ধতি:
[a]🌿 উদ্ভিদের ছোটো কলাখণ্ড বা এক্সপ্ল্যান্ট-কে কর্ষণ মাধ্যমে রাখা হয়।[b]এই কর্ষণ মাধ্যমে শর্করা উৎসরূপে সুক্রোজ ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণরূপে কৃত্রিম অক্সিন, সাইটোকাইনিন ও বিভিন্ন পরিপোষক ব্যবহৃত হয়।[c]প্রথমে একগুচ্ছ অবিভেদিত কোষ বা ক্যালাস সৃষ্টি হয়। এটি পরে বিভেদিত হয়ে বিভিন্ন কলা সৃষ্টির মাধ্যমে অসংখ্য এমব্রিয়য়েড (embryoid) গঠন করে। ক্রমে তা বিভেদিত হয়ে অপত্য চারা উদ্ভিদ বা প্ল্যান্টলেট (plantlet) সৃষ্টি করে।
-
③ সুবিধা:
[a]🚀 এই পদ্ধতিতে পছন্দমাফিক ভ্যারাইটির উদ্ভিদের দ্রুত বংশবিস্তার ঘটানো যায়।[b]কলাকর্ষণে সমবেষ্টিত সম্পূর্ণ ও রোগমুক্ত উদ্ভিদ সৃষ্টি সম্ভব।[c]এর দ্বারা বন্ধ্য্যা উদ্ভিদের বংশবৃদ্ধি সম্ভব হয়।
📌 অনুবিস্তারণ: প্রধান পর্যায়সমূহ
- নির্বাচিত উদ্ভিদ অংশ → এক্সপ্ল্যান্ট কলা নমুনা
- কর্ষণ মাধ্যমে → ক্যালাস গঠন
- ক্যালাস → এমব্রিয়য়েড গঠন
- পরিপক্ক উদ্ভিদ প্ল্যান্টলেট গঠন → পরিণত উদ্ভিদ
🧠 জ্ঞান-কোষ-বিকাশ
- অল্পবিস্তারণের গুরুত্ব / সুবিধা:
- স্বল্প সময়ে অনেক উদ্ভিদ তৈরি হয়।
- কলা, পোলাপ প্রভৃতি উদ্ভিদে যৌন জনন হয় না। এক্ষেত্রে এটিই নতুন উদ্ভিদ সৃষ্টির উপায়।
- অসুবিধা:
- এক্ষেত্রে নতুন বৈশিষ্ট্য তৈরি হয় না বলে উদ্ভিদের অভিযোজন ক্ষমতা কম।
- অসংখ্য অপত্য সৃষ্টি হয় বলে উদ্ভিদের আবহাওয়াজনিত লক্ষণ প্রকট হয়।
2.2.5 🔄 জনুক্রম (Alternation of generation)
🧬 জনুক্রম: জীবের জীবনচক্রে হ্যাপলয়েড লিঙ্গধর জনু (n) এবং ডিপ্লয়েড রেণুধর জনু (2n) থাকার আবর্তনকে জনুক্রম বলে।
জীবনের প্রবাহমানতা 🧬
উদ্ভিদের ক্ষেত্রে জনুক্রম স্পষ্টভাবে বুঝতে পারা যায়। উদাহরণস্বরূপ এখানে ফার্নের জনুক্রম চিত্রসহ সংক্ষেপে আলোচনা করা হল—
ফার্ন-এর জনুক্রম 🌿
- ফার্ন-জাতীয় উদ্ভিদের ক্ষেত্রে জনুক্রম স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। জনুক্রমে ডিপ্লয়েড (2n) রেণুধর জনু এবং হ্যাপ্লয়েড (n) লিঙ্গধর জনু চক্রাকারে আবর্তিত হয়।
- যে উদ্ভিদটি রেণু ধারণ করে, তাকে রেণুধর উদ্ভিদ বা স্পোরোফাইট বলা হয়। উদ্ভিদের এই দশাটিকে রেণুধর জনু বলা হয়।
- মিয়োসিস কোষ বিভাজন পদ্ধতিতে রেণুধর জনুর রেণু-মাতৃকোষ থেকে হ্যাপ্লয়েড রেণু (n) উৎপন্ন হয় এবং রেণুস্থলী বা স্পোর্যানজিয়াম-এ সেগুলি সঞ্চিত থাকে।
- রেণু (রেণুধর দশার প্রথম কোষ) অঙ্কুরিত হয়ে অপরিণত লিঙ্গধর উদ্ভিদ বা প্রোথ্যালিম্যা তৈরি করে। এই প্রোথ্যালিম্যা থেকে পরিণত লিঙ্গধর উদ্ভিদ বা গ্যামেটোফাইট সৃষ্টি হয়। ফার্নের এই লিঙ্গধর দশাটিকে প্রোথ্যালিম্যা বলে।
- সহবাসী লিঙ্গধর উদ্ভিদের অ্যান্থেরিডিয়ামে উৎপন্ন শুক্রাণু (n), আর্কিগোনিয়ামে ডিম্বাণু উৎপন্ন করে।
- ডিম্বাণুর (লিঙ্গধর দশার প্রথম কোষ) থেকে নিষিক্ত হয়ে জাইগোট (2n) সৃষ্টি করে। ফার্নের জীবনচক্র হ্যাপ্লয়েড ও ডিপ্লয়েড জনু প্রায় সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে একে ডিপ্লোবায়ন্টিক জনুক্রম বলে।
💡 হ্যাপ্লোবায়ন্টিক জনুক্রম: যে জনুক্রমে হ্যাপ্লয়েড অথবা ডিপ্লয়েড দশার যে-কোনো একটি দশা গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাকে হ্যাপ্লোবায়ন্টিক জনুক্রম বলে।
📌 জনুক্রমের গুরুত্ব: জীবের দেহে ক্রোমোজোম তথা জেনোটিক বস্তুর ভারসাম্যের জন্য ডিপ্লয়েড (2n) ও হ্যাপ্লয়েড (n) দশার চক্রাকার আবর্তন প্রয়োজনীয়।
CONTENT MANAGER