Academy

১.১ উদ্ভিদের সংবেদনশীলতা ও সাড়াপ্রদান

১.১ উদ্ভিদের সংবেদনশীলতা ও সাড়াপ্রদান - WBBSE - Class 10 - বিজ্ঞান

0

১.১ উদ্ভিদের সংবেদনশীলতা ও সাড়াপ্রদান Sensitivity and response in plants :-

আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা সমস্ত উপাদান নিয়েই গড়ে ওঠে আমাদের পরিবেশ। এই পরিবেশ সদা পরিবর্তনশীল। দিনের বেলা পরিবেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়, আবার রাতে তা কমে যায়। এইরকম অনেক পরিবেশগত পরিবর্তনের মধ্যে কিছুকিছু হল অনুকূল বা সুবিধাজনক, আবার কোনোটি বেঁচে থাকার পক্ষে প্রতিকূল বা ক্ষতিকর। তাই এই পরিবর্তনশীল পরিবেশে সুষ্ঠুভাবে বসবাস করার জন্য জীবদেহকে পরিবেশের বিভিন্ন পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিতে হয়। উদ্ভিদ ও প্রাণীরা যখন পরিবেশের বিভিন্ন পরিবর্তনকে চিহ্নিত করে যথাযথ সাড়াপ্রদান করে, কোনো নির্দিষ্ট বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন (উদ্দীপক) শনাক্ত করে সেই অনুযায়ী জীবের সাড়াপ্রদানের ক্ষমতাকে সংবেদনশীলতা বলে। সংবেদনশীলতার মাধ্যমেই কোনো জীব তার পরিবর্তনশীল পরিবেশের সাথে সঠিকভাবে বেঁচে থাকতে পারে। পরিবেশের যে পরিবর্তনগুলি জীব শনাক্ত করতে পারে এবং সেগুলির যদি জীবের সাড়াপ্রদানে সাহায্য করে, তবে তাকে উদ্দীপক বলা হয়। উদ্দীপক হল, জীবদেহ থেকে সৃষ্ট একপ্রকার শক্তি যা জীব অনুভব করতে পারে। সমস্ত জীবই কম-বেশি বিভিন্ন উদ্দীপকের প্রভাবে সাড়া দেয়। উদ্দীপক প্রধানত দুই প্রকারের হয়, যথা— ১. বাহ্যিক উদ্দীপক: যে উদ্দীপকের উৎস হল জীবদেহের বাইরে, তাকে বাহ্যিক উদ্দীপক বলে। যেমন— মোটর গাড়ির কোনো শব্দ, অলসঞ্চালনের সংস্পর্শ (স্পর্শ উদ্দীপক), জলকে ছড়িয়ে দিয়ে বায়ু, শব্দ, আলো, চাপ ইত্যাদি (আলোক উদ্দীপক, তাপ উদ্দীপক ইত্যাদি)। এছাড়াও গাছ, অধিকন্তু হল বাহ্যিক উদ্দীপকের উদাহরণ। ২. অভ্যন্তরীণ উদ্দীপক: যে উদ্দীপকের উৎস জীবদেহের অভ্যন্তরে থাকে, তাকে অভ্যন্তরীণ উদ্দীপক বলে। যেমন— উদ্ভিদের দেহের হরমোন (যেমন-অক্সিন, জিব্বেরেলিন) উদ্ভিদের বৃদ্ধির উদ্দীপনা যোগায়। তাই হরমোন একটি অভ্যন্তরীণ উদ্দীপক। চিত্র: সূর্যমুখী ফুলের একটি ছবি, যা সূর্যের আলোর দিকে মুখ করে রয়েছে। সূর্যালোকে উদ্ভিদের সংবেদনশীলতা

১.১.১ পরিবেশের পরিবর্তন শনাক্তকরণ এবং উদ্ভিদের সাড়াপ্রদানের পদ্ধতি

(Identification of environmental changes and method of plant response) পরিবেশের পরিবর্তন বলতে মূলত বোঝায় পরিবেশের বিভিন্ন উপাদানের পরিবর্তন। পরিবেশগত পরিবর্তনের সাথে সাথে জীবজগৎ তথা উদ্ভিদও নিজস্ব পরিবর্তন ঘটায়।

🌿 উদ্ভিদের পরিবেশ-পরিবর্তন শনাক্তকরণ :-

উদ্দীপনার প্রভাবে সকল জীবই কম-বেশি সংবেদনশীলতা দেখায়। কখনো জীব উদ্দীপকের প্রভাবে একই স্থানে স্থির থেকে দেহাংশ তথা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সঞ্চালন করে বা চলন সম্পন্ন করে, আবার কখনো সামগ্রিক স্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে গমন সম্পন্ন করে। আগে মনে করা হত যে, পরিবেশের কোনো পরিবর্তনই উদ্ভিদ শনাক্ত করে না। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে উদ্ভিদও প্রাণীর মতোই পরিবেশের পরিবর্তন শনাক্ত করে ও তাতে সাড়া দেয়। যদিও উদ্ভিদের ক্ষেত্রে উদ্দীপকের প্রভাবে সাড়াপ্রদানের ঘটনা প্রাণীদের তুলনায় অনেক কম দেখা যায়। অধিকাংশ উদ্ভিদ একটি নির্দিষ্ট স্থানে আবদ্ধ থাকে বলে তারা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সঞ্চালন বা চলনের মাধ্যমে সাড়াপ্রদান করে।

💡 উদাহরণের সাহায্যে উদ্ভিদের সাড়াপ্রদান পদ্ধতির ব্যাখ্যা :-

উদ্ভিদের সাড়াপ্রদান সাধারণত অত্যন্ত ধীর এবং তা মূলত বৃদ্ধিঘটিত (বৃদ্ধিজ চলন) বা রসস্ফীতিজনিত (প্রকরণ চলন) হয়ে থাকে। উদ্ভিদজগতে দ্রুত সাড়াপ্রদানের ঘটনা অত্যন্ত বিরল। দ্রুত সাড়া প্রদানের দুটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ ব্যাখ্যা করা হল:

  1. লজ্জাবতীর সংবেদনশীলতা: 🌸 লজ্জাবতী (Mimosa pudica) লতার পাতাগুলি স্পর্শ করলে তার পত্রকগুলি গুটিয়ে নুইয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে স্ফীত পত্রমূলের (পালভিনাস) থেকে রস পাশের কোশগুলিতে পরিবাহিত হয়। ফলস্বরূপ পত্রমূল রসের অভাবে শ্লথ হয়, ফলে পাতা গুটিয়ে যায়। এক্ষেত্রে স্পর্শ উদ্দীপক হল এই সাড়াপ্রদানের কারণ। একে স্পর্শব্যাপ্তি বা সিসমোন্যাস্টি বলে।
  2. বনচাঁড়ালের সংবেদনশীলতা: 🌿 বনচাঁড়াল (Desmodium gyrans) নামক গাছের ত্রিফলকযুক্ত পাতার বৃত্তের পাশের ছোটো পত্রক দুটি ক্রমাগত ওঠা-নামা করতে থাকে। পার্শ্বীয় পত্রক দুটির পত্রমূলে (পালভিনাস) রসস্ফীতি চাপের স্বতঃস্ফূর্ত তারতম্যে এই চলন ঘটে। একে প্রকরণ চলন (movement of variation) বলে। এই চলন কেবল দিনের বেলাতেই ঘটে। এ ছাড়াও, বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থ, বিদ্যুৎ তরঙ্গ এবং চৌম্বক ক্ষেত্রের উপস্থিতিতেও এই ধরনের চলন লক্ষ করা যায়। এই প্রকার চলনের জন্য বনচাঁড়াল উদ্ভিদটিকে 'ভারতীয় টেলিগ্রাফ উদ্ভিদ' নামে ডাকা হয়।

🧑‍🔬 উদ্ভিদের সাড়াপ্রদান বিষয়ে আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসুর অবদান

উদ্ভিদের ক্ষেত্রে সংবেদনশীলতা বা উদ্দীপকের প্রভাবে সাড়াপ্রদান কীভাবে ঘটে, বিজ্ঞানী আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু তার ব্যাখ্যা দেন। তার আগে পর্যন্ত এটাই জানা ছিল যে বিভিন্ন জৈবরাসায়নিক পদার্থ (হরমোন) উদ্ভিদের সাড়াপ্রদান ও সমন্বয় নিয়ন্ত্রণ করে। প্রাণীর মতো উদ্ভিদদেরও যে বিভিন্ন অনুভূতি রয়েছে, তা তিনিই প্রথম উল্লেখ করেন।

বিজ্ঞানী বসু লজ্জাবতী ও বনচাঁড়াল উদ্ভিদ দুটি নিয়ে তাদের সাড়াপ্রদান সংক্রান্ত পরীক্ষানিরীক্ষা করেন। তিনি তাঁর আবিষ্কৃত ক্রেসকোগ্রাফ (crescograph) যন্ত্রের সাহায্যে উদ্ভিদদুটির চলন নির্ণয় করেন।

📌 ক্রেসকোগ্রাফ হল একটি সুবেদী যন্ত্র, যার সাহায্যে উদ্ভিদের সামান্য সাড়াপ্রদানও (1 সেকেন্ডে 1 mm) পরিমাপ করা যায়।

এই যন্ত্রের সাহায্যে প্রাপ্ত গ্রাফ পর্যবেক্ষণ করে তিনি আবিষ্কার করেন— প্রাণীর মতোই উদ্ভিদদেহেও নানান ছন্দবদ্ধ ক্রিয়া সম্পন্ন হয়, যা উদ্ভিদের চলন তথা সংবেদনশীলতা নিয়ন্ত্রণ করে। বাহ্যিক স্পর্শ, উত্তাপ, ঠান্ডা, বিষ (KCN) প্রভৃতি উদ্দীপক কোশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন পরিবর্তন সৃষ্টি করে বলে উদ্ভিদ বিভিন্নভাবে সাড়াপ্রদান করতে পারে।

জীবজগতে নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয়

11.2 🍃 উদ্ভিদের চলন (Movement of plants)

উদ্ভিদের ক্ষেত্রে চলন স্বতঃস্ফূর্তভাবে বা উদ্দীপকের প্রভাবে ঘটে। উদ্দীপকের প্রভাবে যে চলন হয় তাকে আবিষ্ট (induced) চলন বলে। কিছু নিম্নশ্রেণির উদ্ভিদের ক্ষেত্রে চলনে উদ্ভিদদেহের সামগ্রিকভাবে স্থান পরিবর্তন ঘটে। তবে বেশিরভাগ উদ্ভিদ মাটির সঙ্গে মূল দ্বারা আবদ্ধ থাকে বলে সামগ্রিকভাবে স্থান পরিবর্তন করতে পারে না। এরা উদ্দীপকের প্রভাবে একস্থানে স্থির থেকে অঙ্গ সঞ্চালন করে। এই প্রকার চলনকে বক্রচলন বলে।

📝 চলন: যে প্রক্রিয়ায় জীব বিভিন্ন উদ্দীপকের প্রভাবে বা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এক স্থানে স্থির থেকে দেহের অংশকে সঞ্চালন করে, তাকে চলন বলে।

🌳 উদ্ভিদ চলনের প্রকারভেদ

উদ্দীপক নিয়ন্ত্রিত উদ্ভিদ চলন প্রধানত তিন প্রকারের হয়। যথা—ট্যাকটিক চলন, ট্রপিক চলন এবং ন্যাস্টিক চলন। নীচে এই তিন প্রকার প্রধান চলনের সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হল।

🧠 জেনে রাখো

  • বৃদ্ধিজ চলন: উদ্ভিদের বর্ধনশীল অংশের অসমান বৃদ্ধির দ্বারা যে চলন সম্পন্ন হয়, তাকে বৃদ্ধিজ চলন বলে।
  • প্রকরণ চলন: কোশের রসস্ফীতির তারতম্যের দরুন উদ্ভিদের পরিণত অংশে যে চলন দেখা যায়, তাকে প্রকরণ চলন বলে।

[a] ট্যাকটিক চলন (Tactic movement)

🔬 বহিস্থ উদ্দীপকের প্রভাবে সমগ্র উদ্ভিদদেহের সামগ্রিক স্থান পরিবর্তনকে ট্যাকটিক চলন বা ট্যাক্সিস বলে।

(i) বৈশিষ্ট্য:

  1. এই চলনে উদ্ভিদের সামগ্রিক স্থান পরিবর্তন ঘটে, অর্থাৎ গমন সম্পন্ন হয়।
  2. এই চলন কোনো বহিস্থ উদ্দীপক ও তার উৎস বা গতিপথ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।
  3. সাধারণত অনুন্নত জলজ উদ্ভিদে ও উদ্ভিদের জননকোশে এই চলন ঘটে।
  4. সিলিয়া বা ফ্ল্যাজেলা ট্যাকটিক চলনে সহায়তা করে।

(ii) প্রকারভেদ:

ট্যাকটিক চলন বিভিন্ন প্রকারের—

  • ফোটোট্যাকটিক (আলোক অভিমুখ চলন)
  • কেমোট্যাকটিক (রাসায়নিক পদার্থ অভিমুখ চলন)
  • থার্মোট্যাকটিক (উয়তা অভিমুখ চলন)
  • হাইড্রোট্যাকটিক (জল অভিমুখ চলন)
  • রিওট্যাকটিক (জলস্রোতের অভিমুখে) ইত্যাদি।

🌟 ফোটোট্যাকটিক চলন: আলোক উদ্দীপকের প্রভাবে উদ্ভিদের সামগ্রিক চলনকে ফোটোট্যাকটিক চলন বলে।

উদাহরণ: ক্ল্যামাইডোমোনাস, ভলভক্স ইত্যাদি এককোশী শৈবালগুলি আলোর উৎসের দিকে এগিয়ে যায়, কিন্তু উন্নতা বৃদ্ধির কারণে তীব্র আলো থেকে দূরে সরে যায়।

[b] ট্রপিক চলন (Tropic movement)

🌳 উদ্ভিদ অঙ্গের বক্রচলন যখন বহিস্থ উদ্দীপকের গতিপথ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তখন তাকে ট্রপিক চলন বা দিকনির্ণীত বক্রচলন বলে।

(i) বৈশিষ্ট্য:

  1. ট্রপিক চলন উদ্ভিদ অঙ্গের বক্রতা সৃষ্টির মাধ্যমে ঘটে থাকে।
  2. আলো, জল, অভিকর্ষ প্রভৃতি বহিস্থ কোনো উদ্দীপকের গতিপথ বা উৎস দ্বারা এই চলন নিয়ন্ত্রিত হয়।
  3. ট্রপিক চলন উদ্ভিদের বর্ধনশীল অঙ্গে (মূল, কাণ্ড ও শাখাপ্রশাখা) ঘটে থাকে।
  4. এক্ষেত্রে হরমোনের প্রভাবে উদ্ভিদ অঙ্গের বৃদ্ধি ঘটে, তাই ট্রপিক চলনকে বৃদ্ধিজনিত আবিষ্ট বক্রচলন বলা হয়।

(ii) প্রকারভেদ:

ট্রপিক চলন মূলত তিন প্রকার—

  • ফোটোট্রপিক
  • জিওট্রপিক
  • হাইড্রোট্রপিক

① ফোটোট্রপিক চলন

☀️ আলোক উদ্দীপকের উৎসের গতিপথ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত উদ্ভিদ অঙ্গের চলনকে ফোটোট্রপিক চলন বা আলোকবৃত্তীয় চলন বলে। উদ্ভিদের কাণ্ড ও শাখা আলোর উৎসের দিকে বৃদ্ধি পায় বলে এদেরকে আলোক অনুকূলবর্তী বলে। মূল আলোর বিপরীত দিকে বৃদ্ধি পায় বলে একে আলোক প্রতিকূলবর্তী বলে। উদ্ভিদের পাতা আলোকরশ্মির সঙ্গে লম্বভাবে বা তির্যকভাবে বৃদ্ধি পায় বলে একে আলোক তির্যকবর্তী বলে।

উদাহরণ: একটি টবে লাগানো চারাগাছকে একটি অন্ধকার ঘরে জানালার পাশে রেখে জানালার একটি পাল্লা খুলে দেওয়া হল। কিছুদিন পর দেখা যাবে, চারাগাছের কাণ্ডটি বৃদ্ধি পেয়ে জানালার দিকে বেঁকে গেছে। এর থেকে প্রমাণিত হয় যে, উদ্ভিদের কাণ্ডটি আলোক অনুকূলবর্তী।

② জিওট্রপিক চলন

🌍 উদ্ভিদ অঙ্গের বক্রচলন যখন পৃথিবীর অভিকর্ষ বল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তখন তাকে জিওট্রপিক চলন বা অভিকর্ষবৃত্তীয় চলন বলে। উদ্ভিদের মূল অভিকর্ষের টানে পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে অগ্রসর হয় বলে মূলকে অভিকর্ষ অনুকূলবর্তী বলে। উদ্ভিদের প্রধান মূল থেকে নির্গত পার্শ্বীয় মূল অভিকর্ষ বলের সঙ্গে তির্যকভাবে বৃদ্ধি পায় বলে একে তির্যক অভিকর্ষবর্তী বলে। উদ্ভিদের বিটপ এবং ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের শ্বাসমূল মাটির ওপরের দিকে বৃদ্ধি পায় বলে এদের অভিকর্ষ প্রতিকূলবর্তী বলে।

উদাহরণ: একটি টবে লাগানো তাজা চারাগাছ সোজা অবস্থায় রাখা ছিল। সেই টবটিকে এমনভাবে উলটে রাখা হল, যাতে গাছটি মাটির সাথে সমান্তরালে অবস্থান করে। কয়েক দিন পরে পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেল গাছটির মূল মাটির দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং বিটপ মাটির বিপরীত দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এর থেকে প্রমাণিত হয় যে, উদ্ভিদের মূল অভিকর্ষ অনুকূলবর্তী এবং বিটপ অংশটি অভিকর্ষ প্রতিকূলবর্তী।

③ হাইড্রোট্রপিক চলন

💧 উদ্ভিদ অঙ্গের বক্রচলন যখন জলের উৎসের গতিপথ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তখন তাকে হাইড্রোট্রপিক চলন বা জলবৃত্তীয় চলন বলে। উদ্ভিদের মূল জলের উৎসের দিকে বৃদ্ধি পায় বলে মূলকে জল অনুকূলবর্তী বলে। পক্ষান্তরে উদ্ভিদের কাণ্ড জলের উৎসের বিপরীত দিকে অগ্রসর হয় বলে তাকে জল প্রতিকূলবর্তী বলে।

উদাহরণ: একটি চালুনির মধ্যে কিছুটা ভিজে কাঠের গুঁড়ো রেখে তাতে কয়েকটি সুস্থ ও সতেজ ছোলা বীজ রেখে সেটি ঝুলিয়ে দেওয়া হল। কয়েকদিন পর বীজগুলি অঙ্কুরিত হয়ে ভূণমূলগুলিকে চালুনির বাইরে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়। আরও কয়েকদিন পর লক্ষ করা যায় যে, তৃণমূলগুলি পুনরায় বেঁকে চালুনির ছিদ্র দিয়ে ভিজে কাঠের গুঁড়োতে প্রবেশ করেছে। এর থেকে প্রমাণিত হয়, ভ্রূণমূলগুলি প্রথমে অভিকর্ষজ টানে চালুনির বাইরে বেরিয়ে এলেও পরে সেগুলি জলের উৎসের দিকে বেঁকে গিয়ে আবার চালুনির ভিতর প্রবেশ করে।

[c] ন্যাস্টিক চলন (Nastic movement)

🌸 উদ্ভিদ অঙ্গের বক্রচলন যখন উদ্দীপকের গতিপথ অনুসারে না হয়ে উদ্দীপকের তীব্রতার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তখন তাকে ন্যাস্টিক চলন বা ব্যাপ্তি চলন বলে।

(i) বৈশিষ্ট্য:

  1. এইপ্রকার চলন উদ্দীপকের গতিপথের পরিবর্তে উদ্দীপকের তীব্রতার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।
  2. আলো, উয়তা, রাসায়নিক পদার্থ, স্পর্শ বা আঘাত ইত্যাদি উদ্দীপকের প্রভাবে এইপ্রকার চলন ঘটে।
  3. ন্যাস্টিক চলন উদ্ভিদ অঙ্গের বক্রতা সৃষ্টির মাধ্যমে ঘটে।

(ii) প্রকারভেদ:

উদ্দীপকের প্রকৃতি অনুযায়ী ন্যাস্টিক চলন চার প্রকারের হয়—ফোটোন্যাস্টিক, থার্মোন্যাস্টিক, সিসমোন্যাস্টিক এবং কেমোন্যাস্টিক চলন।

① ফোটোন্যাস্টিক চলন

☀️ আলোর তীব্রতার হ্রাস-বৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে উদ্ভিদ অঙ্গের যে বক্রচলন ঘটে, তাকে ফোটোন্যাস্টিক চলন বা ফোটোন্যাস্টি বলে। এই প্রকার চলনে রসস্ফীতির বৃদ্ধি বা হ্রাসের ভূমিকা থাকতে পারে।

উদাহরণ: পদ্ম, সূর্যমুখী ইত্যাদি ফুলগুলি দিনের তীব্র আলোতে ফোটে এবং সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে বুজে যায়। জুঁই, বেল, সন্ধ্যামালতী ফুল সন্ধ্যার পর ফোটে। সূর্যমুখী ফুল দিনের বেলায় আলোর তীব্রতার পরিপ্রেক্ষিতে দিক পরিবর্তন করে। তেঁতুল গাছের পাতার পত্রকগুলো দিনে খোলা থাকে আর রাতে বুজে যায়।

② থার্মোন্যাস্টিক চলন

🌡️ উয়তার তীব্রতার ওপর নির্ভর করে উদ্ভিদ অঙ্গের যে আবিষ্ট বক্রচলন ঘটে, তাকে থার্মোন্যাস্টিক চলন বা থার্মোন্যাস্টি বলে।

উদাহরণ: টিউলিপ ফুল স্বাভাবিক উন্নতায় ফোটে, কিন্তু উন্নতা হ্রাস পেলে ফুলের পাপড়ি বন্ধ হয়ে যায়। শিম গাছের পাতা অধিক উন্নতায় বুজে যায়।

③ সিসমোন্যাস্টিক চলন

🖐️ স্পর্শ, কম্পন, ঘর্ষণ, আঘাত প্রভৃতি উদ্দীপকের তীব্রতার ওপর নির্ভর করে উদ্ভিদ অঙ্গের যে বক্রচলন ঘটে, তাকে সিসমোন্যাস্টিক চলন বা সিসমোন্যাস্টি বলে।

উদাহরণ: লজ্জাবতী লতার পত্রক আলতোভাবে স্পর্শ করলে তা বন্ধ হয়ে যায় এবং স্পর্শ জোরালো হলে সমগ্র পাতা নুয়ে পড়ে। আবার স্পর্শ সরিয়ে নিলে লজ্জাবতী লতার পত্রক খুলে যায়।

④ কেমোন্যাস্টিক চলন

🧪 রাসায়নিক উদ্দীপকের (প্রোটিন, ইথার, ক্লোরোফর্ম) উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে উদ্ভিদ অঙ্গের যে আবিষ্ট বক্রচলন ঘটে, তাকে কেমোন্যাস্টিক চলন বা কেমোন্যাস্টি বলে।

উদাহরণ: সূর্যশিশির, ডায়োনিয়া, কলসপত্রী প্রভৃতি পতঙ্গভুক উদ্ভিদের পাতার কিনারায় পতঙ্গ বসলে পত্রফলকের কর্ষিকাগুলি সঞ্চালিত হয়ে সেটিকে ঘিরে ফেলে।

📊 ট্যাকটিক, ট্রপিক ও ন্যাস্টিক চলনের তুলনা

বিষয়ট্যাকটিক চলনট্রপিক চলনন্যাস্টিক চলন
1. সামগ্রিক স্থানান্তরসামগ্রিক স্থানান্তর ঘটে।সামগ্রিক স্থানান্তর ঘটে না।সামগ্রিক স্থানান্তর ঘটে না।
2. উদ্দীপকের প্রভাবউদ্দীপক উৎসের তীব্রতা ও গতিপথ দ্বারা প্রভাবিত হয়।কেবলমাত্র উদ্দীপক উৎসের গতিপথ দ্বারা প্রভাবিত হয়।কেবলমাত্র উদ্দীপক উৎসের তীব্রতা দ্বারা প্রভাবিত হয়।
4. অঙ্গের বৃদ্ধিঅঙ্গের বৃদ্ধি ঘটে না।অঙ্গের বৃদ্ধি ঘটে।অঙ্গের বৃদ্ধি ঘটে না।
5. চলনের অভিমুখসরল অভিমুখ।সরল অভিমুখ।বক্র অভিমুখ।
6. অক্সিনের প্রভাবঅক্সিনের প্রভাব নেই।অক্সিনের প্রভাব আছে।অক্সিনের প্রভাব নেই।

CONTENT MANAGER

Sattar Uddin SohelSattar Uddin Sohel