Academy

৪.১ 🧬 অভিব্যক্তি (Evolution): পৃষ্ঠা ৯১ – ১০৪

৪.১ 🧬 অভিব্যক্তি (Evolution): পৃষ্ঠা ৯১ – ১০৪ - WBBSE - Class 10 - বিজ্ঞান

0

4.1 অভিব্যক্তি (Evolution) 🧬

অভি ব্যক্তি শব্দটির অর্থ হল দীর্ঘ সময়কাল ধরে জীবের পরিবর্তন। জীববিদ্যার ক্ষেত্রে এটি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ধারণা, যেখানে সরলতর জীব থেকে জটিল জীবের সৃষ্টি হয় ও ক্রম পরিবর্তন ঘটে।

4.1.1 🔬 অভিব্যক্তির ধারণা (Concept of evolution)

আজ থেকে প্রায় 5-6 বিলিয়ন বছর পূর্বে সূর্যের বিভাজন হয়ে পৃথিবীর সৃষ্টি হয়। ধীরে ধীরে পৃথিবীর উত্তাপ কমে। প্রায় 3.7 বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে এককোষী জীবাণুর প্রাণের উৎপত্তি ঘটে। তারপর কয়েক কোটি বছর পেরিয়ে বর্তমানে পৃথিবীর জলবায়ু মোটামুটি স্থিতিশীল। পৃথিবীতে এখন বিভিন্নপ্রকার জীবের বসবাস। এই দীর্ঘ সময়কালে এককোষী সরল জীব থেকে অসংখ্য জটিল জীবের সৃষ্টি হয়েছে। কীভাবে তা সম্ভব হল? আসলে সৃষ্টির পর থেকেই জীবের ক্রম পরিবর্তন হয়ে চলেছে। জীবের এই দীর্ঘমেয়াদি ক্রিয়াশীল ক্রম পরিবর্তনের পদ্ধতিটি হল বিবর্তন বা অভি ব্যক্তি। অভিব্যক্তির পথেই নতুন জীবজাতির আবির্ভাব ঘটে। অর্থাৎ, যে ধীর, অবিরাম ও গতিশীল পরিবর্তন দ্বারা কোনো সরলতর জীব থেকে জটিল ও উন্নততর নতুন প্রজাতির উদ্ভব ঘটে, তাকে অভি ব্যক্তি বা বিবর্তন বলে।

💡 জেনে রাখো: বিজ্ঞানী হার্বার্ট স্পেন্সার সর্বপ্রথম 'ইভোলিউশন' শব্দটি প্রবর্তন করেন (1852)। ল্যাটিন শব্দ 'evolvere' থেকে 'evolution' শব্দের উৎপত্তি, যার অর্থ হল unfold বা উন্মোচন

সুতরাং: অভিব্যক্তি অর্থ কিছু উন্নত বা ভালো জীবের সৃষ্টি নয়। এটি হল প্রাকৃতিক নির্বাচনের প্রভাবে নতুন নতুন জীবপ্রজাতির উৎপত্তি। তাই অভিব্যক্তির পথে সরল ব্যাকটেরিয়া থেকে জটিল মানুষ— সকল জীব পৃথিবীতে আজ বর্তমান রয়েছে। সৃষ্ট সকল জীবই তাদের বর্ণ, গন্ধ, আকার, আকৃতি, আচরণের দিক থেকে আলাদা। তাই বলা যায়, জীববৈচিত্র্য সৃষ্টির কারণ হল অভিব্যক্তি।

4.1.2 🌱 জীবনের উৎপত্তি (Origin of life)

জীববিজ্ঞানের বর্তমান ধারণা অনুযায়ী জীবনের উৎপত্তি হঠাৎ করে হয়নি। অসংখ্য রাসায়নিক পরিবর্তন ধীরে ধীরে একত্রিত হয়ে প্রাণের উৎপত্তি ঘটেছে। রাশিয়ান বিজ্ঞানী আলেক্সজান্ডার ওপারিন (1924), 'দি অরিজিন অফ'


🧪 জীববিদ্যা ও পরিবেশ • দশম শ্রেণি

"লাইফ অন আর্থ" (Life on Earth) নামক বইতে ওপারিন (1924) এবং বিজ্ঞানী জে বি এস হ্যালডেন (1929) "র‍্যাসনালিস্ট অ্যানুয়াল" নামক জার্নালে জীবনের উৎপত্তি সংক্রান্ত একটি তত্ত্ব প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জে ডি বার্নাল প্রায় একইরকম একটি মতবাদ প্রকাশ করেন। জীববিদ্যা ও ভৌগোলিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা তাঁদের মতবাদটি ওপারিন-হ্যালডেন প্রকল্প নামে পরিচিত। ওপারিন ও হ্যালডেন-এর এই মতবাদটি জীবনের উৎপত্তির সর্বপ্রথম বৈজ্ঞানিকতার ধারণা করতে সক্ষম হয়।

ওপারিন হ্যালডেন

🌍 জীবনের উৎপত্তি: বিভিন্ন ধাপ

ওপারিন-হ্যালডেন প্রকল্প অনুযায়ী জীবনের উৎপত্তির ঘটনাকে কতগুলি প্রধান পর্যায়ে বিভক্ত করা যায়। যেমন—

  1. (i) প্রথম পর্যায়—পৃথিবীর উৎপত্তি ও তার প্রাচীন পরিবেশ;
  2. (ii) দ্বিতীয় পর্যায়—জীবনের রাসায়নিক উৎপত্তি বা কেমোজেনি;
  3. (iii) তৃতীয় পর্যায়—জৈবিক বিবর্তন বা বায়োজেনি; এবং
  4. (iv) চতুর্থ পর্যায়—ইউক্যারিওটিক কোষের আবির্ভাব

পাঠক্রম অনুযায়ী এখানে জীবনের রাসায়নিক উৎপত্তি বা কেমোজেনি অংশটি নিচে সংক্ষেপে বিবৃত হল।

[a] 🏞️ পৃথিবীর উৎপত্তি ও তার প্রাচীন পরিবেশ:

প্রায় 4.6 বিলিয়ন বছর পূর্বে মহাবিশ্বের গ্যালাক্সিদের গ্যাস ও ধুলিকণা সংকুচিত হয়ে তৈরি হয় সৌর নেবুলা, যার থেকে পৃথিবী সৃষ্টি হয়। সৃষ্টির পর পৃথিবী প্রকৃতপক্ষে বিভিন্ন মৌলের উত্তপ্ত গ্যাসীয় পিণ্ড ছিল। এই সময়ে পৃথিবীর তাপমাত্রা ছিল প্রায় 5000-6000°C। পরে উত্তাপ কমার সাথে সাথে গ্যাসগুলি ঘনীভূত হয়ে কঠিন পিণ্ডে বিন্যস্ত হয়। পরবর্তীকালে পৃথিবীর উত্তাপ ক্রমশ আরও হ্রাস পায় ও জলচক্রের উৎপত্তি ঘটে। একইভাবে পৃথিবীতে প্রথম সমুদ্রের আবির্ভাব হয়। আদি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে হাইড্রোজেন, জলীয় বাষ্প, মিথেন, অ্যামোনিয়া প্রভৃতি গ্যাস বিন্যস্ত থাকলেও, মুক্ত অক্সিজেন গ্যাস ছিল না। অর্থাৎ পরিবেশ বিজারক প্রকৃতির ছিল।

[b] 🧪 জীবনের রাসায়নিক উৎপত্তি বা কেমোজেনি:

প্রাচীন পৃথিবীর পরিবেশে উপস্থিত বিভিন্ন অজৈব রাসায়নিক উপাদান (মৌল ও যৌগ) থেকে জীবনের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ জৈব যৌগ সৃষ্টির ধারাবাহিক রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলিকে জীবনের রাসায়নিক উৎপত্তি বা কেমোজেনি বলে। বিজ্ঞানী হ্যালডেন ও ওপারিন কেমোজেনির প্রধান ধাপগুলি বর্ণনা করেন। এগুলি হল—

💡 (i) প্রথম পর্যায়—সরল জৈব যৌগের উৎপত্তি:

পৃথিবীর উৎপত্তিকালীন তাপমাত্রা ক্রমশ কমে 1000°C হওয়ার পর বিভিন্ন প্রকার হাইড্রোকার্বন সৃষ্টি হয়। যেমন—অ্যাসিটিলিন, ইথিলিন প্রভৃতি। এগুলি আবার উত্তপ্ত বাষ্পের সঙ্গে বিক্রিয়া করে অক্সি ও হাইড্রক্সি যৌগ উৎপন্ন করে। যেমন—অ্যাসিটালডিহাইড। এই যৌগগুলি আবার C, H, O প্রভৃতি মৌল এবং অন্যান্য যৌগের সঙ্গে বিক্রিয়া করে সরল জৈব যৌগ, যেমন, সরল শর্করা, অ্যামিনো অ্যাসিড, ফ্যাটি অ্যাসিড, পিউরিন, পিরিমিডিন ইত্যাদি তৈরি করে।

🧬 (ii) দ্বিতীয় পর্যায়—জটিল জৈব যৌগের উৎপত্তি:

সরল জৈব যৌগগুলি বিভিন্ন বিক্রিয়া দ্বারা নানা জটিল জৈব যৌগ (যেমন—জটিল কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট, নিউক্লিওটাইড ও নিউক্লিক অ্যাসিড ইত্যাদি) সৃষ্টি করে। এই জটিল বিক্রিয়াগুলিতে প্রয়োজনীয় শক্তির যোগান দিয়েছিল সৌরতাপ ও বজ্রপাত। প্রাচীন পৃথিবীতে প্রাণ উৎপত্তির পূর্বে, প্রথম প্রাণীরা সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদানগুলি সমুদ্রের উত্তপ্ত জলে অবস্থান করত। হ্যালডেনের মতে এইসব জৈব


অভিযুক্তি ও অভিযোজন

💡 প্রাচীন পৃথিবীতে যৌগিক অণুগুলি সমুদ্রের জলে মিশে হট ডাইলিউট সুপ বা উষ্ণ লঘু সুপ নামক উষ্ণ তরল হিসাবে অবস্থান করত। এর অপর নাম প্রিবায়োটিক সুপ। তাঁর মতে বৃহৎ ও জটিল জৈবগুলি পরস্পর মিলিত হয়ে কোয়াসারভেট নামক কলোয়েড কণা সৃষ্টি করে। অর্থাৎ, প্রাচীন পৃথিবীতে লঘু সুপের মধ্যে সীমানা পদার্থযুক্ত যে কলোয়েড বিন্দু বা কণা থেকে আদিকোষ বা প্রোটোসেল তৈরি হয়েছিল, তাকে কোয়াসারভেট বলে। এতে প্রোটিন, ফ্যাট, শর্করা, নিউক্লিক অ্যাসিড প্রভৃতি প্রাণ সৃষ্টির উপাদান ছিল। জীবন সৃষ্টির প্রক্রিয়া এর মধ্যেই ঘটেছিল। প্রসংগত উল্লেখ্য, আমেরিকান বিজ্ঞানী সিডনি ফক্স (1957)-এর মতানুসারে প্রাচীন পৃথিবীতে সমুদ্রের মধ্যে অনেকগুলি অ্যামিনো অ্যাসিড যুক্ত হয়ে প্রথমে প্রোটিনয়েড এবং পরে মাইক্রোস্ফিয়ার তৈরি হয়।

চিত্র: কোয়াসারভেট

মাইক্রোস্ফিয়ারে প্রথম প্রাণের উৎপত্তি ঘটে। প্রাচীন পৃথিবীতে ফসফোলিপিড পদার্থযুক্ত, ATP ব্যবহারক্ষম, বৃদ্ধি ও বিভাজনক্ষম যে জৈব গঠনকে বিজ্ঞানী সিডনি ফক্স প্রথম প্রাণ সৃষ্টি হয়েছিল বলে বর্ণনা করেন, তাকে মাইক্রোস্ফিয়ার বলে। তিনি পরীক্ষাগারে অ্যামিনো অ্যাসিডকে শুষ্ক করে প্রোটিনয়েড ও তাকে জলে দ্রবীভূত করে মাইক্রোস্ফিয়ার সৃষ্টি করতে সমর্থ হন। (iv) 🧬 নগ্ন জিন বা নিউক্লিক অ্যাসিডের উৎপত্তি: মুক্ত নিউক্লিওটাইডগুলি একত্রে পলিনিউক্লিওটাইড গঠন করে, যা থেকে নিউক্লিক অ্যাসিড সৃষ্টি হয়। বিজ্ঞানীরা মতে প্রথম সৃষ্ট এই নিউক্লিক অ্যাসিডগুলি RNA প্রকৃতির। একে নগ্ন জিন বলা হয়।

চিত্র: মাইক্রোস্ফিয়ার

📌 প্রোটোসেলের বৈশিষ্ট্য (জান-বোঝ-বিবরণ)

  1. প্রোটোসেল দ্বিতীয়
  2. এগুলি প্রতিলিপি
  3. এগুলি বৃদ্ধি ও বিভাজনে সক্ষম।

🧪 জীবের জৈবিক বিবর্তন বা বায়োজেসি

প্রায় 3.7 বিলিয়ন বছর আগে আদিকোষের উৎপত্তি ও জীবনের অভিব্যক্তির ঘটনাকে বায়োজেসি বলে। এর প্রধান ঘটনাগুলি হল—

  1. প্রোটোসেলের উৎপত্তি: কোয়াসারভেট ও মাইক্রোস্ফিয়ারের মধ্যে নিউক্লিক অ্যাসিডের অনুপ্রবেশ ঘটলে তা প্রথম আদিকোষের আকার পায়। এদেরকেই প্রোটোসেল বলে।
  2. প্রোক্যারিয়োটিক জীবের উৎপত্তি: প্রায় 3.5 বিলিয়ন বছর আগে প্রোটোসেল থেকে প্রোক্যারিয়োটিক জীব উৎপন্ন হয়।
  3. স্বভোজীতার উৎপত্তি: প্রথম আবিষ্কৃত প্রোটোসেল বা আদিকোষগুলি পষ্টিগতভাবে রাসায়নিক পরভোজী ছিল। পরে রাসায়নিক স্বভোজী জীব ও সালোকসংশ্লেষকারী জীবের উৎপত্তি হয়। ফলে বায়ুমণ্ডলে মুক্ত অক্সিজেনের আবির্ভাব ঘটে।
  4. ইউক্যারিয়োটিক কোষের আবির্ভাব: প্রায় 1.5 বিলিয়ন বছর আগে মুক্ত অক্সিজেন শোষণক্ষম ইউক্যারিয়োটিক কোষের আবির্ভাব ঘটে।

🔬 জীবনের রাসায়নিক উৎপত্তির ব্যাখ্যায় মিলার ও উরে-র পরীক্ষা

জীবনের উৎপত্তি সম্পর্কিত ওপারিন ও হ্যালডেনের মতবাদের সপক্ষে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষা করেছিলেন। এদের মধ্যে সর্বপ্রথম ভলকানিক

চিত্র: প্রোটোসেল


🧬 ষষ্ঠ জীবনবিজ্ঞান ও পরিবেশ • দশম শ্রেণি

🧪 তড়িৎস্ফুরণ পরীক্ষা (Volcanic Spark Discharge Experiment)

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী স্ট্যানলি মিলার এবং হ্যারন্ড উরে এই পরীক্ষাটি করেন (1952)।

🔬 পরীক্ষা ব্যবস্থা [a]

বিজ্ঞানী মিলারউরে প্রাচীন পৃথিবীর পরিবেশ তৈরির জন্য একটি বড়ো ফ্লাস্কে মিথেন, অ্যামোনিয়াহাইড্রোজেন গ্যাসের মিশ্রণ 2:2:1 অনুপাতে নেন। 💡 যন্ত্রের ছোটো ফ্লাস্কে জল ফুটিয়ে সৃষ্ট বাষ্প বড়ো ফ্লাস্কে এসে মেশে। টাংস্টেনের তড়িৎদ্বার দ্বারা সমগ্র মিশ্রণে তড়িৎস্ফুরণ (প্রাচীন পৃথিবীর বজ্রপাতের মতো) করা হয়। এর ফলে উৎপন্ন উপাদান ঠাণ্ডা তথা ঘনীভূত করে তাঁরা সংগ্রহ করেন।

🔍 পর্যবেক্ষণ [b]

পরীক্ষায় প্রাপ্ত রাসায়নিক পদার্থগুলির বিশ্লেষণের দ্বারা তাঁরা 5টি অ্যামিনো অ্যাসিড পান। এগুলি হল:

  • গ্লাইসিন
  • অ্যালানিন
  • বিটা অ্যালানিন
  • অ্যাসপার্টিক অ্যাসিড
  • আলফা অ্যামিনোবিউটেরিক অ্যাসিড

পরবর্তী সময়কালে মিলার-এর ছাত্র জেফরি বাডা ও অন্যান্যরা (2008) প্রায় 20টি অ্যামিনো অ্যাসিড ও অন্যান্য জৈব অ্যাসিড এই পরীক্ষাব্যবস্থা থেকে আবিষ্কার করেন।

📜 সিদ্ধান্ত [c]

এই পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রাচীন পৃথিবীতে অক্সিজেনবিহীন বিচারক পরিবেশে বজ্রপাত, অতিবেগুনি রশ্মি বা অগ্নিৎপাতের তাপ উপস্থিতিতে জলীয় বাষ্প, মিথেন, অ্যামোনিয়া, হাইড্রোজেন প্রভৃতির বিক্রিয়ার ফলে জটিল যৌগের সৃষ্টি হয়। 📌 এই পরীক্ষায় প্রাপ্ত অ্যামিনো অ্যাসিডগুলি জীবের দেহ গঠনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ তাঁদের পরীক্ষা হ্যালডেন-ওপারিনের তত্ত্বকে সমর্থন করে

চিত্র: মিলার ও উরে-র পরীক্ষা

4.13 🌍 অভিব্যক্তির মুখ্য ঘটনাবলি (Major Events of Evolution)

অভিব্যক্তি বা বিবর্তন অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া। সরল কয়েকটি ধাপের মাধ্যমে এর ব্যাখ্যা প্রায় অসম্ভব। তাই এখানে পৃথিবী সৃষ্টি, প্রাণের সৃষ্টি ও পর্যায়ক্রমিকভাবে উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতের সৃষ্টি ও তাদের বিবর্তনকেই অভিব্যক্তির মুখ্য ঘটনাবলি হিসেবে ধরা হয়।


অভিযুক্তি ও অভিযোজন 🌿

পৃষ্ঠা: 95

4.1.4 💡 জৈব অভিযুক্তি মতবাদ (Theories of organic evolution)

সময়ের ধারায় সরল জীবের উৎপত্তি ও পরিবর্তনশীল প্রাকৃতিক পরিবেশে ক্রমশ অভিযোজিত হয়ে জটিল জীবের সৃষ্টিকে জৈব অভিযুক্তি বলে। পৃথিবীতে সৃষ্টির সময় থেকে অনবরত অভিযুক্তি ঘটে চলেছে। বিংশ শতাব্দীর আগে থেকেই মানুষ জৈব অভিযুক্তি ব্যাখ্যার চেষ্টা শুরু করে। সে সময়ে দার্শনিক ও ধর্মপ্রচারকরা বিজ্ঞানের আলোতে জৈব অভিযুক্তি বিভিন্ন ব্যাখ্যা দেন। তাঁদের মধ্যে দুজন সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য। এদের মধ্যে একজন হলেন ফরাসি প্রকৃতিবিদ ল্যামার্ক ও অপর জন হলেন ইংরেজ প্রকৃতিবিদ চার্লস ডারউইন

ল্যামার্কের তত্ত্ব (Lamarckism) 🧬

প্রাচীন ব্যাখ্যা গোঁড়া ধর্মপ্রচারক ও দার্শনিকদের জৈব অভিযুক্তি সম্পর্কে কাল্পনিক, অবাস্তব মতবাদ প্রচলিত ছিল। জৈব অভিযুক্তি প্রথম আঘাত করেন ফরাসি প্রকৃতিবিদ জ্যাঁ ব্যাপটিস্ট দ্য মনে ল্যামার্ক (1744-1829)। প্রাণীজগতের গভীর পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে 1809 সালে তিনি ফিলোজফি জুলজিক নামক বইটি রচনা করেন। তিনিই প্রথম অনুধাবন করেন যে, অভিযুক্তি পৃথিবীব্যাপী সমস্ত জীবের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য এবং নতুন প্রজাতির জীব সৃষ্টিতে এর ভূমিকা অপরিসীম।

📌 ল্যামার্কবাদ: অভিযুক্তি ব্যাখ্যার ফরাসি প্রকৃতিবিদ ল্যামার্ক লিখিত পুস্তক ফিলোজফি জুলজিক-এর অন্তর্গত 'অর্জিত বৈশিষ্ট্যের বংশানুসরণ' তত্ত্বের প্রতিপাদ্য বিষয়কেই ল্যামার্কবাদ বা ল্যামার্কিজম বলে।

চিত্র: ল্যামার্ক

ল্যামার্কবাদের প্রতিপাদ্য বিষয়সমূহ: ল্যামার্কবাদের মূল প্রতিপাদ্যগুলি হল—

  1. অভ্যন্তরীণ গুরুত্বপূর্ণ শক্তি (Internal vital force): জীবের অভ্যন্তরীণ শক্তির প্রভাবে জীবের সমগ্র দেহ বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আত্ম-আবেদন অনুযায়ী বৃদ্ধি পায়। ফলে জীবদেহ সরল থেকে জটিল হয়।
  2. চাহিদার থেকে নতুন অঙ্গের উৎপত্তি (Origin of new organs as per necessity): পরিবেশ সকল জীবকে প্রভাবিত করে। তাই পরিবেশের পরিবর্তন জীবদেহেও পরিবর্তন আনে। এই পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে চলতে নতুন চাহিদার সৃষ্টি হয়, যা নতুন গঠন তথা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সৃষ্টির প্রধান কারণ।
  3. ব্যবহার এবং অব্যবহার (Use and disuse): কোনো জীবের একটি অঙ্গ ক্রমাগত ব্যবহারিকতা বাড়ে তবে তা ক্রমশ সুগঠিত হয়। অপরদিকে কোনো অঙ্গের ব্যবহার না হলে তা ধীরে ধীরে অনুন্নত হয়।
  4. অর্জিত বৈশিষ্ট্যের বংশানুসরণ (Inheritance of acquired characters): ল্যামার্কের মতে, জীবদেহে ক্রমাগত সজ্ঞান প্রচেষ্টা ও অঙ্গের ব্যবহার বা অব্যবহার দ্বারা যে বৈশিষ্ট্য অর্জিত হয়, সেগুলি পরবর্তী গণে প্রবাহিত হয়।
  5. নতুন প্রজাতির সৃষ্টি (Origin of new species):

জৈব বিবর্তন/অভিযুক্তি প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহ (Timeline of important events in the process of organic evolution)

  • অনেকোপে মেরুদণ্ডী ও কিছু অমেরুদণ্ডীর উৎপত্তি (Origin of many vertebrates and some invertebrates)
  • বিভিন্ন এককোশী জীবের উৎপত্তি (Origin of various unicellular organisms)
  • আর্কিওব্যাকটেরিয়া সায়ানোব্যাকটেরিয়া সালোকসংশ্লেষ শুরু করে। (Archaebacteria, Cyanobacteria begin photosynthesis.)
  • বিভিন্ন এককোশী জীবের উৎপত্তি (Origin of various unicellular organisms)
  • আদি পৃথিবীতে বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে সৃষ্টি হয়। (In the primitive Earth, various chemical reactions lead to creation.)
  • মহাবিশ্বের সৌর মণ্ডলে পৃথিবী সৃষ্টি হয়। (Earth is created in the solar system of the universe.)

🧬 প্রাণিবিজ্ঞান ও পরিবেশ • দশম শ্রেণি

পৃষ্ঠা: 96

অর্জিত বৈশিষ্ট্যের বংশানুসরণ অনুযায়ী যে সকল বৈশিষ্ট্য কোনো জীব কর্তৃক অর্জিত হয় তা পরবর্তী জনুতে সঞ্চারিত হওয়াকে নতুন প্রজাতির সৃষ্টি করে থাকে।

💡 জেনে রাখা ভালো: নয়া ল্যামার্কবাদ (Neo-Lamarckism)

ল্যামার্কের 'অর্জিত বৈশিষ্ট্যের বংশানুসরণ' মতবাদটির পরিবেশ-জীব আয়োজনার আলোতে নতুনভাবে ব্যাখ্যাকে নয়া ল্যামার্কবাদ বলে। ওয়াইসম্যান, লুইস, হেকাল, কোপ, মেলার প্রমুখ বিজ্ঞানীরা ল্যামার্কের মতবাদ সমর্থন করেন। এই মতবাদ অনুযায়ী পরিবেশ ও দেহকোষের কোনো পরিবর্তন জীবের জননকোষের জিনগত গঠনের পরিবর্তন ঘটাতে পারে।

🧪 (b) ল্যামার্কের মতবাদের স্বপক্ষে কয়েকটি উদাহরণ

ল্যামার্কবাদের স্বপক্ষে কয়েকটি উদাহরণ এখানে আলোচনা করা হল।

🦒 (i) জিরাফের গলা লম্বা হওয়া

ল্যামার্ক বলেন যে, জিরাফের পূর্বপুরুষ ছিল ছোটো গলাযুক্ত। প্রাকৃতিক কারণে উঁচু ডালের পাতা খাওয়ার জন্য তাদের গলা ও অগ্রপদ লম্বা করতে হত। এইরকম ক্রমাগত ব্যবহারের ফলে জিরাফের গ্রীবা ও অগ্রপদ লম্বা হতে শুরু করে (ব্যবহারের সূত্র)। এই অর্জিত বৈশিষ্ট্যগুলি পরবর্তী উপত্যকা জিরাফগুলিতে অনবরত লম্বা হয়, যারা ভবিষ্যতে লম্বা গলায়ু হবে।

📌 ল্যামার্ক-এর মতবাদ (জিরাফের বিবর্তন):

  • জিরাফের পূর্বপুরুষ ছিল ছোটো গলাযুক্ত। উঁচু ডালের পাতা খাওয়ার জন্য গলা প্রসারিত করে।
  • পরবর্তী বংশধরদের মধ্যে প্রসারিত গলা বৈশিষ্ট্যটি বংশানুসৃত হয়েছিল।
  • অনবরত এই ঘটনা ঘটার ফলে বর্তমানের জিরাফ লম্বা গলায়ু হয়েছে (নতুন প্রজাতির সৃষ্টি)।

ল্যামার্কের মতে জিরাফের বিবর্তন

🐍 (ii) সাপের পা-এর অবলুপ্তি

সাপের পূর্বপুরুষের ছোটো পা ছিল। আর ছিল লম্বাকৃতি প্রাণী। বাসবিহীন ভূমিতে বসবাস করার কারণে তাদের পা ব্যবহার করা হতো না। আর ফলে সাপের পা ক্ষয় পেয়ে থাকে (ব্যবহারের সূত্র)। এইভাবে অর্জিত বৈশিষ্ট্যের বংশানুসরণের ফলে পরবর্তীকালে সাপের পা অবলুপ্ত হয়। 🦵➡️🚫

🦆 (iii) জলচর প্রাণীর লিপ্তপদ সৃষ্টি

হাঁস প্রভৃতি জলচর প্রাণীর পূর্বপুরুষদের লিপ্তপদ ছিল না। একটানা জলে সাঁতার কাটার সুবিধার জন্য এদের অগ্রপদের আঙ্গুলগুলির মাঝে পাতলা চামড়ার মতো করে সৃষ্টি হয় (ব্যবহারের সূত্র)। এই বৈশিষ্ট্য পরবর্তী জনগুলিতে সঞ্চারিত হয়। ফলস্বরূপ বর্তমানে সজল হাঁসে লিপ্তপদ দেখা যায়। 🌊🦆

🐎 (iv) আধুনিক ঘোড়ার শক্তিশালী পদ

আধুনিক ঘোড়ার পূর্বপুরুষেরা জঙ্গলের নরম মাটিতে বসবাস করত। পরবর্তীকালে শুকনো ও শক্ত ভূমিতে চলাচল সুবিধার জন্য তাদের পায়ের আঙ্গুলগুলির সংখ্যা হ্রাস পায়, এবং পায়ের উচ্চতা বৃদ্ধি পায় (ব্যবহার ও অব্যবহারের সূত্র)। 🐴

বর্তমানে, ল্যামার্কের তত্ত্বের শুধুমাত্র ঐতিহাসিক গুরুত্বই রয়েছে। আধুনিক জীববিদ্যার, বিশেষত জেনেটিক্সের অগ্রগতির ফলে অর্জিত বৈশিষ্ট্যের বৈজ্ঞানিক কারণ ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়েছে আধুনিক জীববিজ্ঞানে।

🔬 সক্রিয়তামূলক কাজ

মেন্ডেলের বংশানুসরণের ধারণাগুলি কীভাবে ল্যামার্কীয় বংশানুসরণের ধারণাকে খণ্ডন করে বলে তোমার মনে হয়? 🤔


অভিব্যক্তি ও অভিযোজন 🧬

অনুযায়ী, বিবর্তন একটি জটিল পদ্ধতি, অনেকগুলি ধারণার সমন্বয়। ল্যামার্কের সরল তত্ত্ব দ্বারা আমরা যে তথ্য পেয়েছিলাম, ডারউইন পরবর্তীতে প্রকৃতিবাদীরা ডারউইন বিবর্তনের উন্নততর ব্যাখ্যা দেন। এই সম্বন্ধে আমরা এখন জানব।

ডারউইনবাদ (Darwinism) 🧑‍🏫

চার্লস রবার্ট ডারউইন (1809-1882) নামক বিখ্যাত ইংরেজ প্রকৃতিবিদ প্রাকৃতিক নির্বাচনবাদ (Theory of Natural Selection) দ্বারা অভিব্যক্তির ব্যাখ্যা করেন। এইস এম বিগল নামক জাহাজে তিনি দীর্ঘ পাঁচ বছর আটলান্টিক মহাসাগরের দ্বীপসমূহ, দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল ও দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপগুলি পরিভ্রমণ করেন। পরিভ্রমণকালে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও সংগৃহীত নমুনাগুলির পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষানিরীক্ষা দ্বারা তিনি বেশ কিছু সিদ্ধান্তে উপনীত হন। 1859 সালে তাঁর বিখ্যাত বই অন দ্য অরজিন অফ স্পিসিস বাই মিনস অফ ন্যাচারাল সিলেকশন (On The Origin of Species By Means of Natural Selection) প্রকাশিত হয়।

📌 ডারউইনবাদ: ডারউইন লিখিত 'অন দ্য অরজিন অফ স্পিসিস বাই মিনস অফ ন্যাচারাল সিলেকশন' (1859) নামক বইয়ে বর্ণিত প্রাকৃতিক নির্বাচনবাদ সাধারণত ডারউইনবাদ বা ডারউইন তত্ত্ব নামে পরিচিত।

[a] ডারউইনবাদের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়বস্তুগুলি হল— (The main tenets of Darwinism are—)

  1. অত্যধিক মাত্রায় বংশবৃদ্ধি (Prodigality of reproduction) 📈: সমস্ত জীবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল প্রজনন দ্বারা অত্যধিক হারে বংশধর সৃষ্টি করা। জীবের সংখ্যা বৃদ্ধি সাধারণত জ্যামিতিক হারে ঘটে থাকে। যেমন—

    • একটি কড মাছ তার 90 বছরের জীবনকালে প্রায় 6টি প্রপত্য সৃষ্টি করে। এই হিসেবে একজোড়া কড থেকে 750 বছরে প্রায় 19 মিলিয়ন কড সৃষ্টি হয়। আবার, একটি কড এক বছরে প্রায় 6 মিলিয়ন ডিডাগ তৈরি করে।
  2. সীমিত খাদ্য ও বাসস্থান (Constancy of food and space) 🌍: জীবের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও খাদ্যের পরিমাণ এবং বাসস্থান সীমিত থাকে।

  3. অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম (Struggle for existence) ⚔️: জীবের সংখ্যা বেশি হারে বাড়লেও খাদ্য ও বাসস্থানের সীমাবদ্ধতার দরুন জীবকে বেঁচে থাকার জন্য কঠিন প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হয়। এই সংগ্রাম তিন প্রকার—

    • (1) অন্তঃপ্রজাতি সংগ্রাম (Intraspecific struggle): একই প্রজাতির অন্তর্গত জীবগুলি একই স্থানে বসবাস করে। তাদের খাদ্যের প্রকৃতিও এক হয়। তাই নিজেদের মধ্যেই তারা খাদ্য ও বাসস্থানের জন্য প্রতিযোগিতা শুরু করে। একে অন্তঃপ্রজাতি সংগ্রাম বলে। যেমন— একেটি প্রকারের হরিণেরা।
    • (2) আন্তঃপ্রজাতি সংগ্রাম (Interspecific struggle): দুই বা ততোধিক প্রজাতির অন্তর্গত জীবগুলির বাঁচার জন্য যে সংগ্রাম, তাকে আন্তঃপ্রজাতি সংগ্রাম বলে। যেমন—
      • একই ইঁদুর খাওয়ার জন্য পেঁচা ও বাজপাখির মধ্যে সংগ্রাম।
      • একই শিকার খাওয়ার জন্য সিংহ ও হায়নার মধ্যে সংগ্রাম।
    • (3) পরিবেশের সঙ্গে সংগ্রাম (Struggle with environment): খরা, অনাবৃষ্টি, বন্যা, শৈত্য, ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত প্রভৃতি প্রতিকূল পরিবেশ জীবেরাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বিঘ্নিত করে। নিজ নিজ অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য জীবেরা প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে অনবরত সংগ্রাম করে চলেছে।

🧪 জীবনবিজ্ঞান ও পরিবেশ • দশম শ্রেণি

হিসেবে বলা যায় যে, প্রচণ্ড গ্রীষ্ম ও মারাত্মক তুষার ঝড়ে উভয় আমেরিকায় কোয়েল পাখির বিলুপ্তি ঘটেছে।

💡 (iv) প্রকরণ বা ভেদ ও তার বংশানুসরণ (Variations and their inheritance)

ডারউইনের মতে, পৃথিবীতে দুটি জীব অবিকল একই হতে পারে না। এদের মধ্যে কিছু না কিছু পার্থক্য থাকবেই। জীব দুটির মধ্যে পরিদৃষ্ট এই ধরনের পার্থক্যকেই প্রকরণ বা ভেদ বলে। অনুকূল ভেদ অভিযোজনের জন্য জীবনসংগ্রামে জীবকে সহায়তা করে। ডারউইনের মতে, অনবরত বিভিন্ন সংগ্রামের ফলে জীবদেহে প্রকরণের সৃষ্টি হয়, যা জননকালে অপত্যের দেহে সঞ্চারিত হয়। পরে এটি জীবের বৈশিষ্টরূপে প্রকাশ পায়। ডারউইনের মতে, এইভাবে জীবদেহে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিবর্তন নতুন প্রজাতির উদ্ভাবের প্রথম সোপান করে।

🌳 (v) প্রাকৃতিক নির্বাচন ও যোগ্যতমের উদবর্তন (Natural selection and survival of the fittest)

অভিযোজনের জন্য সংগ্রামের সময় উদ্ভূত সমস্ত প্রকরণের মধ্যে কেবলমাত্র জীবনসংগ্রামের পক্ষে সহায়ক প্রকরণযুক্ত জীবগুলি পৃথিবীতে বেঁচে থাকে, প্রজনন করে ও অস্তিত্ব রক্ষা করতে সক্ষম হয়। তিনি পরিবেশে কিছু জীবের এভাবে টিকে থাকার ঘটনাকেই প্রাকৃতিক নির্বাচন বলে অভিহিত করেন। অনুকূল প্রকরণযুক্ত যেসব জীবগুলি প্রকৃতিতে নির্বাচিত হয়, তাদেরই উদবর্তন ঘটে। একেই বিজ্ঞানী হার্বার্ট স্পেন্সার যোগ্যতমের উদবর্তন বলে উল্লেখ করেছেন।

🐣 (vi) নতুন প্রজাতির উৎপত্তি (Origin of new species)

দীর্ঘ ভৌগোলিক সময়কালে কোনো একটি জীবের প্রজাতির ক্ষেত্রে প্রকরণগুলি বংশানুক্রমে সঞ্চারিত হয়ে ক্রমশ তার পূর্বপুরুষ থেকে আলাদা হয়ে যায়। এইভাবে সুদীর্ঘ সময়কাল ধরে পূর্বপুরুষ থেকে পৃথক ও অধিক অভিযোজিত জীবকে নতুন প্রজাতি বলে গণ্য করা হয়।

🦒 ডারউইন-এর মতবাদ

  1. জিরাফের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কয়েকজন অন্যদের তুলনায় লম্বা গলাযুক্ত ছিল (প্রকরণ)। তারা খাদ্য পেল (সংগ্রাম)।
  2. অপেক্ষাকৃত লম্বা গলাযুক্ত জিরাফরা বেঁচে থাকে ও অধিক অপত্যের জন্ম দেয় (প্রাকৃতিক নির্বাচন ও যোগ্যতমের উদবর্তন)।
  3. কয়েক প্রজন্ম ধরে বারবার এই ঘটনা ঘটার ফলে বর্তমানের লম্বা গলার জিরাফের আগমন (নতুন প্রজাতির সৃষ্টি)।

ডারউইনের মতবাদ অনুযায়ী জিরাফের বিবর্তন

খাবার অথবা প্রজনন করতে সক্ষম হল না। এরা ক্রমশ অবলুপ্ত হয়ে গেল। অন্যদিকে লম্বা গলাযুক্ত প্রকরণযুক্ত জিরাফগুলি যথেষ্ট খেতে পেয়ে অনেক সংখ্যক অপত্য সৃষ্টি করল। এভাবেই সুঅভিযোজিত, যোগ্যতম লম্বা গলাযুক্ত প্রাণী প্রকৃতি দ্বারা নির্বাচিত হল ও ভৌগোলিক সময়কালে নতুন লম্বা গলাবিশিষ্ট জিরাফ প্রজাতির সৃষ্টি করল। এইভাবে প্রাকৃতিক নির্বাচন দ্বারা বর্তমানের লম্বা গলাযুক্ত জিরাফের সৃষ্টি হয়েছে (উদবর্তন)।

🔬 [b] 'ল্যামার্কের জিরাফ' উদাহরণের ডারউইনীয় ব্যাখ্যা

বিজ্ঞানী ডারউইন, ল্যামার্কের জিরাফ উদাহরটির প্রাকৃতিক নির্বাচনবাদ অনুযায়ী ব্যাখ্যা দেন। তাঁর মতে প্রাচীন পৃথিবীতে একটি জিরাফের পপুলেশনের মধ্যে বিভিন্ন জিরাফের গলার উচ্চতা বিভিন্ন ছিল (প্রকরণ)। এর মধ্যে যেগুলির গলা যথেষ্ট লম্বা ছিল না তারা উঁচু গাছের পাতার নাগাল পেতো না। ফলে তারা গাছের পাতা যথেষ্ট খেতে না পেয়ে মারা যেত। অন্যদিকে লম্বা গলা প্রকরণযুক্ত জিরাফগুলি যথেষ্ট খাদ্য পেয়ে বেঁচে থাকত এবং বেশি সংখ্যক অপত্য জন্ম দিত। এইভাবে প্রকৃতি লম্বা গলাযুক্ত জিরাফদের নির্বাচন করেছে এবং বর্তমানের লম্বা গলাযুক্ত জিরাফেরা এসেছে।

🧬 নয়া ডারউইনবাদ (Neo-Darwinism)

ডা. হিউগো দ্য ভ্রিস, হ্যালডেন, ডব্ঝানস্কি প্রমুখ বিজ্ঞানীরা আধুনিক জীববিদ্যা, জেনেটিক্স, অণুজীববিদ্যা প্রভৃতি আধুনিক জীববিজ্ঞানের আলোকে ডারউইনবাদকে ব্যাখ্যা করেন। একে নয়া ডারউইনবাদ বলা হয়। এই মতবাদ অনুযায়ী প্রকরণের উৎস হিসেবে পরিবৃত্তিকে প্রাধান্য চিহ্নিত করা হয়।

🛑 [c] ডারউইনবাদের সীমাবদ্ধতা:

(i) জীবদেহে প্রকরণের উৎপত্তি ও তার বংশানুক্রমিক সঞ্চারণ সম্বন্ধে ডারউইন


📌 অভিব্যক্তি ও অভিযোজন (Evolution and Adaptation)

(ii) ডারউইন কেবল যোগ্যতমের উদ্বর্তন নিয়েই ভেবেছিলেন, কিন্তু যোগ্যতমের আবির্ভাব (arrival of the fittest) নিয়ে তিনি কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। (iii) কেবলমাত্র বেঁচে থাকার পক্ষে অনুপযুক্ত জীবরাই প্রজননে কম সক্ষম হয় না বা মারা যায় তা নয়। অনেক সময় প্রাকৃতিক বিপর্যয় (যেমন—বন্যা বা ভূমিকম্প) যোগ্যতম জীবরাই মারা যায়। অর্থাৎ, জীবের মৃত্যুতে অনেক সময় প্রাকৃতিক নির্বাচন কার্যকরী হয় না। (iv) অভিব্যক্তির অন্যতম মূল উৎস হল মিউটেশন বা পরিব্যক্তি। আকস্মিক ঘটা এই পরিবর্তনগুলিকে ডারউইন 'প্রকৃতির খেলা' বলে উপেক্ষা করেন।

💡 4.1.5 অভিব্যক্তির সপক্ষে প্রমাণ (Evidences in favour of theory of evolution)

অভিব্যক্তি একটি বৈজ্ঞানিক সত্য, কিন্তু মূলত প্রমাণ আমাদের ওপরই তা নির্ভরশীল। এই তথ্যের সপক্ষে যে প্রমাণগুলি গুরুত্বপূর্ণ তা নীচে আলোচিত হল।

🧪 1. জীবাশ্মগত প্রমাণ:

জীববিদ্যার যে শাখায় জীবাশ্ম নমুনা নিরীক্ষণ করে জীবের অতীত ও অভিব্যক্তি সম্বন্ধে ধারণা করা হয়, তাকে প্রত্নজীববিদ্যা বা প্যালিন্টোলজি বলে।

দীর্ঘকাল চাপা পড়ে থাকা জীবের সম্পূর্ণ বা আংশিক প্রস্তরীভূত দেহাবশেষকে জীবাশ্ম বলে। যেমন—পাথরের স্তরে প্রাচীন জীবের সম্পূর্ণ বা আংশিক দেহাবশেষ।

জীবাশ্ম থেকে প্রাচীন জীবের প্রকৃতি, পরিবেশ, বসবাস এবং সময়কাল সম্পর্কে জানা যায়। নীচে জীবাশ্মগত প্রমাণ হিসাবে ঘোড়ার বিবর্তনের ইতিহাস আলোচনা করা হল।

ঘোড়ার জীবাশ্মের ইতিহাস:

আদিকাল থেকে প্রতিটি যুগের ঘোড়ার জীবাশ্ম পাওয়া গিয়েছে বলে ঘোড়ার বিবর্তন ক্রমপর্যায়ে সম্পূর্ণভাবে বোঝা সম্ভব হয়েছে। ঘোড়ার উত্পত্তি এবং ক্রমপরিবার্তিত রূপগুলি জানা সম্ভব হয়েছে।

  • (i) উত্পত্তি: প্রত্নজীববিদ ওথানিয়েল চার্লস মার্শ 1879 খ্রিস্টাব্দে প্রথম ঘোড়ার বিবর্তন বর্ণনা করেন। প্রায় 55 মিলিয়ন বছর পূর্বে সিনোজোয়িক যুগে (Era) প্রথম ঘোড়ার উত্পত্তি হয়। ঘোড়ার বিবর্তনের প্রতিটি পর্যায়ের জীবাশ্ম উত্তর আমেরিকার নানা স্থান থেকে পাওয়া গিয়েছে।

  • (ii) ঘোড়ার ক্রমিক জীবাশ্মসমূহ: ঘোড়ার অভিব্যক্তিতে বসবাসের পরিবেশে পরিবর্তনের জন্য ঘোড়ার ক্রমিক বিবর্তন হয়। প্রথম অবস্থায় তাদের আকার ছোটো ও আঙুলযুক্ত ক্ষুদ্র পা থাকলেও পরে তৃণভূমি সৃষ্টি হলে তারা বড়ো ও শক্তিশালী হয় ওঠে। তাদের পায়ের তৃতীয় আঙুলটি ক্ষুর হিসেবে পরিবর্তিত হয়। ঘোড়ার বিবর্তন ক্রমপর্যায়ে উদ্ভূত বিভিন্ন ঘোড়া ও তাদের পরিবর্তনের বিষয়ে আলোচনা করলে বিবর্তন সম্পর্কে ধারণা করা যায়। নীচে বিভিন্ন সময়ে প্রাপ্ত ঘোড়ার জীবাশ্মের গঠনগত বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করা হল:

    1. ইওহিপ্পাস বা ইওরিয়াম (Eohippus or Eohippos):

      • আজ 55 মিলিয়ন বছর আগে ইওসিন সময়কালে (Epoch)-এ ঘোড়ার আদিম পূর্বপুরুষ হিরাকোথেরিয়াম-এর আবির্ভাব ঘটে। একে ডন হর্স (dawn horse) বলে অভিহিত করা হয়।
      • এদের আকার ছিল শিয়ালের মতো ও উচ্চতা ছিল প্রায় 28 cm।
      • এদের অগ্রপদে 4টি ও পশ্চাদপদে 3টি করে আঙুল ছিল।
      • শরীরের তুলনায় মাথা, গলা ও পা ছোটো ছিল।
      • প্রাণীটি ঘন ঝোপঝাড়ের মধ্যে লুকিয়ে থাকত।
    2. মেসোহিপ্পাস (Mesohippus):

      • আজ থেকে প্রায় 40 মিলিয়ন বছর আগে অলিগোসিন সময়কালে মেসোহিপ্পাস নামক ঘোড়ার পূর্বপুরুষের আবির্ভাব ঘটে।
      • এইসময় জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে তৃণভূমি সৃষ্টি হয়। তাই মেসোহিপ্পাসের অগ্রপদে পায়ের মধ্যের আঙুলটি বড়ো হয়ে ওঠে।

🔬 জীবনবিজ্ঞান ও পরিবেশ • দশম শ্রেণি (পৃষ্ঠা - 100)

🐎 ঘোড়ার ক্রমবিবর্তন (Evolution of the Horse)

📌 ঘোড়ার বিবর্তন হলো একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত যা দেখায় কিভাবে সময়ের সাথে সাথে প্রাণী প্রজাতিরা পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেয় এবং পরিবর্তিত হয়। প্রায় ৫০ মিলিয়ন বছর ধরে ঘোড়ার উচ্চতা, পায়ের আঙুলের সংখ্যা এবং দাঁতের গঠনে অনেক পরিবর্তন এসেছে।

নিম্নে ঘোড়ার বিবর্তনের বিভিন্ন পর্যায়গুলি আলোচনা করা হলো:

1. ইওহিপ্পাস (Eohippus) বা হাইরাকোথেরিয়াম (Hyracotherium) 🐾

  • সময়কাল: প্রায় 5️⃣0️⃣ মিলিয়ন বছর আগে ইওসিন (Eocene) যুগে এর আবির্ভাব ঘটে।
  • উচ্চতা: এদের উচ্চতা ছিল প্রায় 60 cm
  • পায়ের গঠন: এদের অগ্রপদে 4️⃣টি এবং পশ্চাৎপদে 3️⃣টি আঙুল ছিল। প্রতিটি আঙুলই মাটি স্পর্শ করত। এটি ছিল সমস্ত প্রজাতির মধ্যে সবচেয়ে ছোট ঘোড়া
  • অন্যান্য বৈশিষ্ট্য: এদেরকে 'মধ্যবর্তী ঘোড়া' (intermediate horse) এবং 'রোমন্থনকারী ঘোড়া' (ruminating horse) বলা হতো।

2. মেসোহিপ্পাস (Mesohippus) 🏞️

  • সময়কাল: প্রায় 3️⃣5️⃣ মিলিয়ন বছর আগে ইওসিন (Eocene) যুগে এর আবির্ভাব হয়।
  • উচ্চতা: এদের উচ্চতা ছিল প্রায় 60 cm
  • পায়ের গঠন: এদের অগ্রপদ ও পশ্চাৎপদ উভয়টিতেই 3️⃣টি করে কার্যকরী আঙুল এবং 1️⃣টি করে লুপ্তপ্রায় চতুর্থ আঙুল ছিল। এদের মধ্যম আঙুলটি লম্বা ও মোটা ছিল।
  • অন্যান্য বৈশিষ্ট্য: এদের পার্শ্ব আঙুলগুলো আকারে ছোট হতে শুরু করে এবং মস্তিষ্কের আকার বৃদ্ধি পায়।

3. মেরিচিপ্পাস (Merychippus) 🌲

  • সময়কাল: প্রায় 2️⃣5️⃣ মিলিয়ন বছর আগে মায়োসিন (Miocene) যুগে এদের আবির্ভাব ঘটে।
  • উচ্চতা: এদের উচ্চতা ছিল প্রায় 100 cm
  • পায়ের গঠন: এদের প্রতিটি পায়ে 3️⃣টি করে আঙুল থাকত। তৃতীয় (মধ্যম) আঙুলটি লম্বা ও মোটা ছিল এবং মাটি স্পর্শ করত। অন্য দুটি পার্শ্ব আঙুল অপেক্ষাকৃত ছোট ছিল এবং মাটি থেকে সামান্য উপরে থাকত। এদের পায়ে ক্ষুর (hooves) তৈরি হতে শুরু করে।

4. প্লিওহিপ্পাস (Pliohippus) 🏃‍♂️

  • সময়কাল: প্রায় 1️⃣0️⃣ মিলিয়ন বছর আগে প্লিওসিন (Pliocene) যুগে প্লিওহিপ্পাস-এর আবির্ভাব হয়।
  • উচ্চতা: এদের উচ্চতা ছিল প্রায় 108 cm
  • পায়ের গঠন: এদের তৃতীয় আঙুল হাঁটার সময় মাটি স্পর্শ করত, যা এদেরকে প্রথম এক-আঙুলযুক্ত ঘোড়া করে তোলে। দ্বিতীয় ও চতুর্থ আঙুলগুলি লুপ্তপ্রায় হয়ে পাশে বিন্যস্ত থাকত। তৃতীয় আঙুলের হাড়টি মোটা ও মজবুত হয়েছিল।
  • অন্যান্য বৈশিষ্ট্য: এদের দেখতে প্রায় বর্তমান ঘোড়ার মতোই ছিল।

5. ইকুয়াস (Equus) বা আধুনিক ঘোড়া 🐴

  • সময়কাল: প্রায় 1️⃣ মিলিয়ন বছর আগে প্লেস্টোসিন (Pleistocene) যুগে প্লিওহিপ্পাস থেকে ইকুয়াস-এর উৎপত্তি হয়।
  • উচ্চতা: এদের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় 150 cm হয়।
  • পায়ের গঠন: এদের প্রতিটি পায়ে ক্ষুর দ্বারা আবৃত একটি মাত্র সচল আঙুল দেখা যায়। বাকি আঙুলগুলি ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে গেছে।
  • বিস্তার: ইকুয়াস উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।

📊 ঘোড়ার বিবর্তনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনসমূহ (Significant Evolutionary Changes in Horse)

ঘোড়ার বিবর্তনের দীর্ঘ ধারায় নিম্নলিখিত গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলি লক্ষ্য করা যায়:

  1. উচ্চতা ও আকারের ক্রমবৃদ্ধি: 📈 সময়ের সাথে সাথে ঘোড়ার উচ্চতা ও সামগ্রিক আকার বেড়েছে।
  2. পার্শ্ব আঙুলের ক্রমক্ষয়: 📉 আদিম ঘোড়ার একাধিক আঙুল থেকে বিবর্তনের মাধ্যমে পার্শ্বীয় আঙুলগুলি ক্রমশ ছোট হয়ে লুপ্ত হয়েছে এবং মাঝের আঙুলটি শক্তিশালী ক্ষুরে পরিবর্তিত হয়েছে।
  3. দৌড়ের জন্য অগ্র ও পশ্চাৎপদের ক্রমবৃদ্ধি: 🦵 দৌড়ানোর সুবিধার জন্য অগ্রপদ ও পশ্চাৎপদের হাড়গুলি লম্বা ও শক্তিশালী হয়েছে।
  4. মস্তিষ্কের আকার বৃদ্ধি ও বুদ্ধিমান হওয়া: 🧠 মস্তিষ্কের আকার বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ঘোড়াকে আরও বুদ্ধিমান ও দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল করেছে।
  5. খাদ্যাভ্যাসের উপযোগী দাঁতের গঠন: 🦷 চারণভূমির ঘাস খাওয়ার জন্য দাঁতের গঠন আরও উপযোগী ও মজবুত হয়েছে।

🔬 2. তুলনামূলক শারীরস্থানিক প্রমাণ (Comparative Anatomical Evidence)

বিভিন্ন জীবের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গঠন, উৎপত্তি ও কার্যকারিতার মধ্যে সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য সংক্রান্ত আলোচনাকে তুলনামূলক শারীরস্থান বলে। 🧠 এটি বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে বিবর্তনগত সম্পর্ক ও তাদের শারীরিক কাঠামোর জটিলতা বুঝতে সাহায্য করে।

বিভিন্ন শ্রেণির মেরুদণ্ডী প্রাণীর হৃৎপিণ্ড, মস্তিষ্ক, বৃক্ক, পায়ের অস্থি ও পেশির গঠন পর্যালোচনা করলে ক্রমশ্যঃ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত গঠনগত জটিলতা সম্পর্কে জানা যায়। এখানে তিনটি প্রধান শারীরস্থানিক প্রমাণ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে:

  • ১. সমসংস্থ অঙ্গ (Homologous Organs): 🤝 যেসব অঙ্গের উৎপত্তি ও গঠনগত বৈশিষ্ট্য একই, কিন্তু কাজ ভিন্ন, তাদের সমসংস্থ অঙ্গ বলে। (যেমন: ঘোড়ার অগ্রপদ ও মানুষের হাত)
  • ২. নিষ্ক্রিয় অঙ্গ (Vestigial Organs): 🧐 যেসব অঙ্গ পূর্বপুরুষে কার্যকরী ছিল কিন্তু বর্তমানে তাদের কার্যকারিতা লুপ্ত হয়েছে বা খুবই সামান্য, তাদের নিষ্ক্রিয় অঙ্গ বলে। (যেমন: মানুষের অ্যাপেন্ডিক্স)
  • ৩. মেরুদণ্ডী প্রাণীর হৃৎপিণ্ডের গঠন: ❤️ বিভিন্ন মেরুদণ্ডী প্রাণীর (যেমন মাছ, উভচর, সরীসৃপ, পাখি ও স্তন্যপায়ী) হৃৎপিণ্ডের গঠনগত তুলনা তাদের বিবর্তনগত সম্পর্ক এবং জটিলতার বৃদ্ধি প্রদর্শন করে।

অভিব্যক্তি ও অভিযোজন 📖 (Page 101)

[a] সমসংস্থ অঙ্গ (Homologous organ) 💡

বিভিন্ন জীবদেহের যেসব অঙ্গের উৎপত্তি ও অভ্যন্তরীণ গঠন এক কিন্তু বিভিন্ন পরিবেশে অভিযোজনের জন্য বাহ্যিক গঠন ও কার্যগত দিক থেকে তারা আলাদা, তাদের সমসংস্থ অঙ্গ বলে।

📌 সমসংস্থ অঙ্গের কয়েকটি উদাহরণ:

  • প্রাণীর সমসংস্থ অঙ্গ: বাদুড়ের ডানা, তিমির ফ্লিপার বা ক্ষিপার, ঘোড়ার অগ্রপদ এবং মানুষের হাত সমসংস্থ অঙ্গের উদাহরণ। এই অঙ্গগুলির কাজ একেকটি আলাদা হলেও এই অঙ্গগুলি প্রকৃতপক্ষে হিউমেরাস, রেডিয়াসআলনা, কার্পাল, মেটাকার্পাল, ফ্যালানজেস নামক অস্থি নিয়ে গঠিত। এই অগ্রপদগুলি প্রতিটি ক্ষেত্রেই পেন্টাড্যাকটাইল গঠন নামক হাড়ের সাথে সংযুক্ত থাকে। এইসব অঙ্গগুলির শ্রেণিগত দিক এবং গঠনগত দিক একইরকম থাকে। অর্থাৎ, তাদের উৎপত্তি ও বিকাশ একইরকম। তবে বিভিন্ন পরিবেশে বসবাসের জন্য এই অঙ্গ ভিন্নভাবে অভিযোজিত হয় ও তাদের কার্যগত দিক পরিবর্তিত হয়। বাদুড়ের অগ্রপদ ওড়ার জন্য, তিমির ফ্লিপার সাঁতারের জন্য, ঘোড়া ও বিড়ালের অগ্রপদ দৌড়ানোর জন্য ও মানুষের অগ্রপদ কোনো জিনিস ধরা ও অন্যান্য সৃজনশীল কাজের জন্য পরিবর্তিত হয়েছে। তাই তাদের কাজ ভিন্ন হওয়ায়, এদের বাহ্যিক গঠনে পার্থক্য দেখা যায়।

  • উদ্ভিদের সমসংস্থ অঙ্গ:

    1. কান্ডের পরিবর্তন: ফণীমনসার পর্ণকাণ্ড, আলুর গ্রন্থিকান্ড, আদার গ্রন্থিকান্ড, ঝুমকোলতার আকর্ষণ, সেলার শাখাপত্র – এরা প্রত্যেকে উৎপত্তিগতভাবে উদ্ভিদের কান্ড, যদিও কার্যগতভাবে এরা ভিন্ন।
    2. পরিবর্তিত পাতা: ফণীমনসার পত্রকন্টক, শতমূলীর পর্ণকাণ্ড এবং বুনো মটর উদ্ভিদের শাখা আকর্ষণ কাজ আলাদা হলেও এরা সকলেই উদ্ভিদের পরিবর্তিত পাতা।

🧬 অভিব্যক্তি ও সমসংস্থ অঙ্গের সম্পর্ক:

সমসংস্থ অঙ্গগুলি থেকে বোঝা যায় যে সংশ্লিষ্ট অঙ্গ তথা জীবগুলি উৎপত্তিগতভাবে এক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন প্রাকৃতিক পরিবেশে ছড়িয়ে গিয়ে অভিযোজিত হওয়ার ফলে বর্তমানে তাদের গঠন ভিন্নভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। তাই সমসংস্থ অঙ্গগুলি অপসারী অভিযোজন এবং অপসারী অভিব্যক্তির নির্দেশ করে। অর্থাৎ, যে প্রকার অভিযোজিত কোনো এক প্রজাতির জীব ভিন্ন ভিন্ন প্রাকৃতিক পরিবেশে অভিযোজিত হওয়ার দরুন নতুন নতুন প্রজাতির সৃষ্টি করে, তাকে অপসারী অভিব্যক্তি বলে।

[b] সমবৃত্তীয় অঙ্গ (Analogous organ) 🎯

বিভিন্ন জীবদেহের যেসব অঙ্গগুলি উৎপত্তি ও অভ্যন্তরীণভাবে ভিন্ন হলেও একই পরিবেশে অভিযোজনের দরুন বাহ্যিক গঠন ও কার্যগতভাবে এক হয়, তাদের সমবৃত্তীয় অঙ্গ বলে।

📌 সমবৃত্তীয় অঙ্গের কয়েকটি উদাহরণ:

  1. প্রাণীর সমবৃত্তীয় অঙ্গ: পতঙ্গ, পাখি, বাদুড় প্রভৃতি প্রাণীর ডানা ওড়ার জন্য ব্যবহৃত হলেও এদের উৎপত্তি ও অভ্যন্তরীণ গঠন ভিন্ন। পতঙ্গের ডানা বহির্বকঙ্কাল বা কিউটিকলের প্রসারিত অংশ। পাখির ডানায় কোনো বহির্বকঙ্কাল থাকে না, কিন্তু পালক থাকে। বাদুড়ের ডানাও পাখিদের ডানা থেকে ভিন্ন।

102

অধ্যায় জীববিজ্ঞান ও পরিবেশ • দশম শ্রেণি

আমাদের চারপাশে নানা প্রকার জীবদেহ দেখা যায়। এদের মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে বিভিন্ন অঙ্গের গঠন ও উৎপত্তিগত মিল দেখা যায়, আবার কিছু ক্ষেত্রে কাজের মিল দেখা যায়। এদের নিয়ে নিচে আলোচনা করা হলো:

🧪 ১. সমসংস্থ অঙ্গ (Homologous Organs)

যেসব অঙ্গের উৎপত্তি ও গঠনগত দিক থেকে মিল থাকলেও, কাজের দিক থেকে ভিন্নতা দেখা যায়, তাদের সমসংস্থ অঙ্গ বলে। যেমন: বাদুড়ের ডানা ও মানুষের হাত উৎপত্তিগতভাবে এক, কিন্তু কাজের দিক থেকে ভিন্ন।

  • (i) বাদুড়ের ডানা ও মানুষের হাত: উভয়ই কশেরুকা প্রাণীর অগ্রপদ, এদের অস্থির বিন্যাসও এক। কিন্তু বাদুড়ের ডানা উড়তে সাহায্য করে, আর মানুষের হাত বিভিন্ন কাজ করে।
  • (ii) উদ্ভিদের ক্ষেত্রে, মটর গাছের আকর্ষ ও ক্যাকটাসের কাঁটা: মটর গাছের আকর্ষ দুর্বল কাণ্ডকে আঁকড়ে ধরে গাছে উঠতে সাহায্য করে, অন্যদিকে ক্যাকটাসের কাঁটা আত্মরক্ষায় ও বাষ্পমোচন রোধে সাহায্য করে।

🦋 ২. সমবৃত্তীয় অঙ্গ (Analogous Organs)

যেসব অঙ্গের উৎপত্তি ও গঠনগত দিক থেকে ভিন্ন হলেও, কাজের দিক থেকে মিল দেখা যায়, তাদের সমবৃত্তীয় অঙ্গ বলে।

  • (i) মৌমাছির ডানা ও বাদুড়ের ডানা: মৌমাছির ডানা চিটিন-জাতীয় উপাঙ্গ, আর বাদুড়ের ডানা হল অস্থি-যুক্ত অগ্রপদ। দুটোর গঠন ভিন্ন, কিন্তু উভয়ই উড়তে সাহায্য করে।
  • (ii) উদ্ভিদের ক্ষেত্রে, আলু ও মিষ্টি আলুর প্রধান কান্ড: আলু মাটির নিচে পরিবর্তিত কান্ড, আর মিষ্টি আলু পরিবর্তিত মূল। দুটোর কাজ খাদ্য সঞ্চয়, কিন্তু উৎপত্তি ভিন্ন।

🤝 সমসংস্থ ও সমবৃত্তীয় অঙ্গের সম্পর্ক

সমসংস্থ অঙ্গগুলির বিভিন্ন উদাহরণ থেকে দেখা যায় যে, বিভিন্ন জীবের অঙ্গগুলি গঠন ও উৎপত্তিগতভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ হলেও অতীতে একই পূর্বপুরুষ থেকে উদ্ভূত হয়ে একেক রকম কাজ করার জন্য অভিযোজিত হয়েছে। এই প্রক্রিয়াকে অপসারী অভিযোজন বলে। অর্থাত্‍, যে প্রকার অভিযোজনগত কারণে জীবের বাহ্যিক গঠন ও কার্যগতভাবে এক হয়, তাকে অভিসারী অভিযোজন বলে।

📊 সমসংস্থ ও সমবৃত্তীয় অঙ্গের পার্থক্য

বিষয়সমসংস্থ অঙ্গসমবৃত্তীয় অঙ্গ
1. উৎপত্তিউৎপত্তিগতভাবে একউৎপত্তিগতভাবে ভিন্ন
2. কাজকার্যগতভাবে আলাদাকার্যগতভাবে এক
3. বিবর্তনগত প্রকৃতিঅপসারী অভিযোজনঅভিসারী অভিযোজন

📌 [গ] নিষ্ক্রিয় অঙ্গ (Vestigial organs)

জীবদেহে যে সমস্ত অঙ্গ তাদের পূর্বপুরুষের দেহে এবং সম্পর্কিত অন্য জীবের দেহে কর্মক্ষম থাকলেও, সংশ্লিষ্ট জীবটার দেহে কর্মক্ষমতা হারিয়ে নিষ্ক্রিয় ও লুপ্তপ্রায় অঙ্গে পরিণত হয়েছে, তাদের নিষ্ক্রিয় অঙ্গ বা লুপ্তপ্রায় অঙ্গ বলে।

🧬 প্রাণীর লুপ্তপ্রায় অঙ্গের কয়েকটি উদাহরণ:

  1. মানুষের লুপ্তপ্রায় অঙ্গ:
    • (i) অ্যাপেন্ডিক্স: মানুষের ক্ষুদ্রান্ত্র ও বৃহদন্ত্রের সংযোগস্থলে অবস্থিত স্যাকাসের ছোটো সরু অংশটি হলো অ্যাপেন্ডিক্স। এই অঙ্গটি মানুষের দেহে কোনো কাজ না করলেও তৃণভোজী, রোমন্থক প্রভৃতি প্রাণীদের ক্ষেত্রে তা সক্রিয়ভাবে সেলুলোজ-জাতীয় খাদ্য পরিপাকে অংশ নেয়।
    • (ii) কানের পিন্ডার সক্রিয় হাড়: মানুষের ক্ষেত্রে কানের পিন্ডার সক্রিয় হাড় সেকমাসে নিষ্ক্রিয় পিসিমরা হয়ে থাকে।
    • (iii) নিকটিটেটর পর্দা (চোখের তৃতীয় পর্দা): মানুষের চোখের সক্রিয় নিকটিটেটর পর্দা মানুষের ক্ষেত্রে চোখের দ্বারা ছোটো লাল রঙের নিষ্ক্রিয় অঙ্গে পরিণত হয়। একই চোখের

🧬 অভিযুক্তি ও অভিযোজন (Adaptation & Evolution)

তৃতীয় পর্দা বলা হয়।

  1. মানুষের কর্টিসের পেশী: পচনের ধন প্রভৃতি শুষ্ক অঙ্গ হিসাবে উপস্থিত থাকে।
  2. উভচর, এম প্রভৃতি দৌড়বাজ পাখির ডানা: ব্যবহার এর ফলে নিষ্ক্রিয় অঙ্গে পরিণত হয়।
  3. উদ্ভিদের ক্ষেত্রে লুপ্তপ্রায় অঙ্গ:
    1. ভূমিস্তুত কাণ্ড: যেমন—আদা, হলুদ প্রভৃতি শাঁসপত্র, শুঁয়োপোকা এবং অভিযোজন।
    2. কালকাছন্দ ফুলের পুংকেশর: ১০টি পুংকেশরের মধ্যে ৪টি সম্পূর্ণ প্রজনন ও নিষ্ক্রিয় অঙ্গ। এদেরকে স্ট্যামিনয়েড বলা হয়।
  4. অভিযুক্তি ও লুপ্তপ্রায় অঙ্গের সম্পর্ক: লুপ্তপ্রায় অঙ্গগুলি বিবর্তনের প্রমাণ বহন করে। অভিযুক্তি ধারণার প্রমাণ হিসাবে বলা যায় যে, লুপ্তপ্রায় অঙ্গ ব্যবহারকারী জীবের উৎপত্তি ঘটেছে এমন উত্তরাধিকারী জীব থেকে যার দেহে উক্ত অঙ্গটি সক্রিয় ছিল।

💖 (d) মেরুদণ্ডী প্রাণীদের হৃৎপিণ্ডের গঠন (Structure of Vertebrate Hearts)

মাছ, উভচর, সরীসৃপ ও স্তন্যপায়ী প্রভৃতি বিভিন্ন মেরুদণ্ডী প্রাণীর হৃৎপিণ্ডের ক্ষেত্রে গঠনগত জটিলতা ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। যথা—

  1. মাছের হৃৎপিণ্ড: দুটি প্রকোষ্ঠ—একটি অলিন্দ ও একটি নিলয় বর্তমান। মাছের হৃৎপিণ্ডের মধ্যে দিয়ে কেবলমাত্র কম অক্সিজেন-যুক্ত রক্ত (বা অধিক কার্বন ডাইঅক্সাইড-যুক্ত রক্ত) প্রবাহিত হয়।
  2. উভচর শ্রেণির প্রাণীর হৃৎপিণ্ড: তিনটি প্রকোষ্ঠ থাকে। এগুলি হল দুটি অলিন্দ ও একটি নিলয়। ব্যাঙের ক্ষেত্রে কেবলমাত্র নিলয়ে অধিক অক্সিজেন-যুক্ত ও কম অক্সিজেন-যুক্ত রক্তের সামান্য মিশ্রণ ঘটে। অর্থাৎ, এদের হৃৎপিণ্ড একটি তুলনামূলকভাবে উন্নত হৃৎপিণ্ড।
  3. সরীসৃপ: সরীসৃপ শ্রেণির প্রাণীর হৃৎপিণ্ডে আরও উন্নত বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। এদের হৃৎপিণ্ড অসম্পূর্ণ চারটি প্রকোষ্ঠ থাকে অর্থাৎ, এগুলি হল দুটি অলিন্দ ও অসম্পূর্ণভাবে বিভক্ত দুটি নিলয় (ব্যতিক্রম কুমির)। নিলয়ে অসম্পূর্ণ প্রাচীর থাকে বলে অধিক অক্সিজেন-যুক্ত এবং কম অক্সিজেন-যুক্ত রক্তের মিশ্রণ কম হয়।
  4. পাখি ও স্তন্যপায়ী: পাখি ও স্তন্যপায়ীদের হৃৎপিণ্ড চারটি প্রকোষ্ঠবিশিষ্ট হয়। ফলে এদের হৃৎপিণ্ডে অধিক অক্সিজেন-যুক্ত রক্ত ও কম অক্সিজেন-যুক্ত রক্ত একেবারেই মিশ্রিত হতে পারে না। অর্থাৎ, এদের হৃৎপিণ্ড সবচেয়ে উন্নত।

চিত্র: মেরুদণ্ডী প্রাণীদের হৃৎপিণ্ডের গঠন (Diagram: Structure of Vertebrate Hearts)

সূচক: ➡️ রক্ত প্রবাহের গতিপথ (Direction of blood flow)

💡 জ্ঞাতব্য (To Be Noted)

  1. ভেনাস হৃৎপিণ্ড (Venous Heart): মাছের হৃৎপিণ্ড শিরা থেকে অধিক CO₂-যুক্ত রক্ত গ্রহণ করে ও ফুলকায় অক্সিজেন সংগ্রহের জন্য পাঠায় বলে তাকে ভেনাস হৃৎপিণ্ড বলে।
  2. একচক্রী হৃৎপিণ্ড (Single-cycle Heart): রক্ত একবার মাত্র চক্রাকারে প্রবাহিত হয় বলে মাছের হৃৎপিণ্ডকে একচক্রী হৃৎপিণ্ড বলে (সরলতর জীব)।
  3. দ্বিচক্রী হৃৎপিণ্ড (Double-cycle Heart): প্রতিবার হৃদস্পন্দনে মানুষ ও পাখির হৃৎপিণ্ডে রক্ত দুটিচক্র (O₂-যুক্ত, CO₂-যুক্ত) আবর্তিত হয় (একবার ফুসফুসে যায়, আর একবার সারা দেহে)। এজন্য এদের দ্বিচক্রী হৃৎপিণ্ড বলে (জটিলতর জীব)।

ছাত্র জীবনবিজ্ঞান ও পরিবেশ • দশম শ্রেণি

💡 বিবর্তনগত গুরুত্ব: (Evolutionary Significance:)

  1. উপরোক্ত মেরুদণ্ডী প্রাণীগুলির হৃৎপিণ্ডের মৌলিক গঠন এক হলেও ক্রমশ তা জটিল হয়েছে। অর্থাৎ, বোঝা যায় যে একটি সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তনের পথে ক্রমশ জীবের উৎপত্তি ঘটেছে।
  2. মাছ, উভচর, সরীসৃপ ও স্তন্যপায়ী প্রাণীরা অভিব্যক্তির পথে মেরুদণ্ডী প্রাণীর বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধি বিশেষ।
  3. হৃৎপিণ্ডের গঠনগত ও কার্যগত বিকাশ অনুযায়ী পৃথিবীতে এদের আগমন ক্রম বোঝা যায়। অর্থাৎ, এদের আগমনের ক্রম হল—
    • মাছ ➡️ উভচর ➡️ সরীসৃপ ➡️ পাখি ➡️ স্তন্যপায়ী
  4. হৃৎপিণ্ডের এই ক্রম পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে মেরুদণ্ডী প্রাণীর ক্রমবিকাশের যে ধারা বোঝা যায়, তা হল—
    • জলজ জীবন ➡️ উভচর জীবন ➡️ পূর্ণ স্থলচর জীবন

3. তুলনামূলক ভূণতত্ত্ব (Comparative embryology) 🔬

জীববিজ্ঞানের যে শাখায় প্রাণীর ভ্রূণের বিকাশ স্তরগুলির তুলনামূলক অধ্যায়ন করা হয়, তাকে তুলনামূলক ভূণতত্ত্ব বলে। ভ্রূণ হল মাতৃদেহ বা ডিমের ভিতর বর্ধিত জীব। বিভিন্ন মেরুদণ্ডী প্রাণী, যেমন—মাছ, উভচর, সরীসৃপ, পাখি ও স্তন্যপায়ীর ভ্রূণের বিকাশে কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। এগুলি প্রমাণ করে যে, প্রাণীগুলির উৎপত্তি একই সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে হয়েছে। এরকম কয়েকটি বৈশিষ্ট্য হল—

(চিত্র: বিভিন্ন মেরুদণ্ডী প্রাণীর ভূণ - যেখানে গলবিলীয় খাঁজ ও ল্যাজ সদৃশ অংশ দেখানো হয়েছে, যেমন মাছ, সরীসৃপ, পাখি ও মানুষ)

[a] গলবিলীয় বহিঃস্থ ফুলকা খাঁজ এবং অন্তঃস্থ যুগ্ম ফুলকাথলি:

মাছ থেকে স্তন্যপায়ী অবধি সমস্ত মেরুদণ্ডী প্রাণীর ভূণের প্রাথমিক পর্যায়ে গলবিলীয় বহিঃস্থ ফুলকা খাঁজ দেখা যায়। মাথার নিচে পার্শ্বীয়ভাবে এই খাঁজ তৈরি হয়। প্রকৃতপক্ষে ভূণে গলবিলের ভিতরের দিকে গলবিলীয় অন্তঃস্থগত স্ফীতি হয়ে যুগ্ম ফুলকাথলি গঠন করে। ফলে বাইরের দিকে বহিঃস্থ ফুলকা খাঁজ তৈরি হয়। গলবিলের বহিঃস্থ ফুলকা খাঁজ এবং অন্তঃস্থ যুগ্ম ফুলকাথলিকে একত্রে গলবিলীয় যন্ত্র বা ফ্যারিঞ্জিয়াল অ্যাপারেটাস (pharyngeal apparatus) বলা হয়। 🐟 মাছের ক্ষেত্রে এই অংশটি ফুলকা ও কানকোতে পরিণত হয়। কিন্তু স্থলজ মেরুদণ্ডীতে ফুলকা থাকে না। তাই তাদের ক্ষেত্রে গলবিলীয় খাঁজটি পরিবর্তিত হয়ে থাইরয়েড, থাইমাসপ্যারাথাইরয়েড গ্রন্থি তৈরি করে।

[b] ল্যাজ সদৃশ গঠন ও মায়োটোম পেশি:

বিভিন্ন মেরুদণ্ডী প্রাণীর ভূণে ল্যাজ সদৃশ গঠন দেখা যায়। সমস্ত মেরুদণ্ডী প্রাণীর ভূণে ল্যাজ সদৃশ পেশি বিন্যাস মায়োটোম নামক পেশি বিন্যাস থাকে। ল্যাজ সদৃশ অংশের উৎপত্তি এবং তাতে মায়োটোম পেশির বিন্যাসে যে মিল দেখা যায় তা সমস্ত মেরুদণ্ডী প্রাণীর অভিব্যক্তিত সম্পর্ক সূচিত করে।

💡 জান-বার-বিকাশ বিজ্ঞানী আর্নস্ট হেকেল ভূণতত্ত্বের সাহায্যে অভিব্যক্তির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বায়োজেনেটিক সূত্র প্রবর্তন করেন। তিনি আঠারোটি প্রাণীর ছটি ভূণ পর্যায়ের (মোট ২৪টি) ছবি প্রকাশ করে দেখান যে তাদের মধ্যে সাদৃশ্যের বিশেষ প্যাটার্ন আছে। তাঁর প্রণীত বায়োজেনেটিক সূত্র অনুযায়ী—‘জীবজনি জাতিজনিকে পুনরাবৃত্তি ঘটায়’ (ontogeny recapitulates phylogeny) অর্থাৎ প্রতিটি জীবের ভূণের পরিষ্ফুরণের পর্যায়গুলি (অন্টোজেনি) ওই প্রজাতির অভিব্যক্তির পর্যায়গুলির (ফাইলোজেনি) মধ্যে দিয়ে যায়। বর্তমানে ত্রুটিপূর্ণ ও অতিরঞ্জিত বলে পরিত্যক্ত হয়েছে।

অভি prakš ও অভিযোজন 🌿 (Evolution and Adaptation)

Page 105

বিবর্তনগত গুরুত্ব (Evolutionary Significance) 💡

  • (i) তুলনামূলক ভ্রূণতত্ত্ব থেকে বিভিন্ন মেরুদণ্ডী প্রাণীদের ভ্রূণের পরিষ্ফুরণের পারস্পরিক সম্পর্ক সম্বন্ধে ধারণা করা সম্ভব হয়েছে।
  • (ii) তুলনামূলক ভ্রূণতত্ত্ব থেকে বিভিন্ন মেরুদণ্ডী প্রাণিগুলি যে একটি সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তনের ফলে সৃষ্টি হয়েছে তাও অনুমান করা যায়।

CONTENT MANAGER

Sattar Uddin SohelSattar Uddin Sohel