Academy

5.3 পরিবেশ ও মানব জনসমষ্টি (Environment and human population) 🌍

5.3 পরিবেশ ও মানব জনসমষ্টি (Environment and human population) 🌍 - WBBSE - Class 10 - বিজ্ঞান

0

5.3 পরিবেশ ও মানব জনসমষ্টি (Environment and human population) 🌍

মানবসভ্যতার ইতিহাসে পৃথিবীর জনসংখ্যা বৃদ্ধি হয়েছিল ধীর গতিতে। পৃথিবীর জনসংখ্যা 1 বিলিয়ন হয়েছিল 1800 খ্রিস্টাব্দে নাগাদ। তারপর থেকে মানব জনসমষ্টি দ্রুত বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে জনসংখ্যা 804.5 কোটি (2023, ইউনাইটেড নেশনস পপুলেশন ফান্ড (UNFPA))। রাষ্ট্রপুঞ্জের সমীক্ষা অনুযায়ী 2050 সাল নাগাদ মানব পপুলেশন প্রায় 9.07 বিলিয়নে দাঁড়াবে। কিন্তু মোট জনসংখ্যা বাড়লেও পৃথিবীতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। মূলত মানব পপুলেশনের গড় বয়স বৃদ্ধি এর কারণ।

📌 মানব জনসংখ্যা সম্পর্কে অধ্যায়ন ও জ্ঞান অর্জনকে ডেমোগ্রাফি বলে।

💡 জানা আছে: বিশ্ব পপুলেশন দিবস 11 জুলাই।

মানব জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণ:

  1. চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতির ফলে মৃত্যু হার হ্রাস,
  2. শিক্ষার প্রসার ও বিবাহের বয়স বৃদ্ধি,
  3. খাদ্য উৎপাদনে জৈব প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের প্রয়োগ, ফলে খাদ্যের জোগান বৃদ্ধি,
  4. বাসস্থান, পরিকাঠামোর উন্নতি।

5.3.1 ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সমস্যা (Problem of over population) 📈

মানব জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলি সম্পর্কে নীচে আলোচনা করা হল।

1. প্রাকৃতিক সম্পদের অতিব্যবহার এবং তার হ্রাস: 🏞️

পৃথিবীতে প্রাকৃতিক সম্পদের পরিমাণ অফুরন্ত নয়। মানব জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও সম্পদের অতিব্যবহারের ফলে পৃথিবীতে বাণিজ্যিক প্রাকৃতিক সম্পদের মাত্রা প্রতিদিন হ্রাস পাচ্ছে। প্রাকৃতিক সম্পদের এই অপ্রতুলতার কারণে মানবসভ্যতা এক সংকটময় ভবিষ্যতের সামনে দাঁড়িয়েছে।

2. অরণ্য বিনাশ এবং বাস্তুতন্ত্রের ক্ষয়: 🌳➡️📉

জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শিল্পস্থাপন, যথেচ্ছ বনজ দ্রব্য (যেমন—কাষ্ঠ, মধু) আহরণ, কৃষিজমির বিস্তার, গবাদিপশুর চারণভূমি বৃদ্ধি প্রভৃতি নানা কারণে বর্তমানে অরণ্য বিনাশের মাত্রা বৃদ্ধি


পরিবেশ, তার সম্পদ এবং তাদের সংরক্ষণ 🌍

সারা বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় 130 মিলিয়ন মানবশিশু ভূমিষ্ঠ হয় (UNFPA) এবং 3-6 বিলিয়ন বৃক্ষ কাটা হচ্ছে। এই দুটি ঘটনাই ক্রমবর্ধমান। এছাড়াও বাস্তুতন্ত্রে অন্যান্য উপাদানের ক্ষয়, যেমন- ভূমি ক্ষয়, জীববৈচিত্র্য বিলুপ্তি, মরুভূমি বিস্তার, জল ও বায়ু দূষণ প্রধান কারণ ক্রমবর্ধমান মানবসংখ্যা ও তাদের নির্ভরতা ও স্বার্থপর কার্যকলাপ। 🌳

Deforestation অরণ্য বিনাশ

3. কৃষিভূমি হ্রাস 📉

জনসংখ্যার বৃদ্ধির সাথে সাথে মানুষের বাসস্থানের চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে মূলত শহরগুলির প্রান্তভাগে অবস্থিত কৃষিভূমি বেশিরভাগই বাসভূমিতে পরিবর্তিত হয়। দেখা গিয়েছে বড়ো শহরের তুলনায় ছোটো শহরগুলিতে জমি বেশি ব্যবহৃত হয়েছে। এছাড়াও অর্থনৈতিক উন্নয়নশীল স্থানে কৃষিভূমি পরিবর্তনের হার সর্বাধিক। এর ফলে পৃথিবী ব্যাপী খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। 🌾

4. মিষ্টি জলের অভাব 💧

পৃথিবীর মাত্র 3% হল মিষ্টি জল। এর মধ্যে 2.5% হল হিমবাহ এবং মেরু বরফ, ফলে তা দুষ্প্রাপ্য। পৃথিবীর সমগ্র সাধুজলের মাত্র 0.5% হল পানযোগ্য ও ব্যবহারযোগ্য। জনসংখ্যার ক্রমবৃদ্ধির ফলে কৃষি, শিল্প এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনে এই জলের ব্যবহার অত্যধিক বৃদ্ধি পাওয়ায় ভৌমজলের ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে।

5. বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তন এবং বিশ্ব উষ্ণায়ন ♨️

শিল্প, কৃষি ও মানব উন্নয়নের অন্যান্য বিভিন্ন কার্যকলাপের গ্রীনহাউস গ্যাসগুলি বায়ুমণ্ডলের ভৌত ও রাসায়নিক অবস্থার পরিবর্তন করে। তাপশক্তি ও পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনকেন্দ্র বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা বৃদ্ধি করে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যাই পরোক্ষভাবে এই পরিবর্তন ঘটায়। গ্রীনহাউস গ্যাসগুলি পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়িয়ে বিশ্ব উষ্ণায়ন ঘটায়। পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ভয়ানক ঘটনা ঘটছে। তাপপ্রবাহ, অতিবৃষ্টি, খরা, হারিকেন ও ঘূর্ণিঝড়ের প্রাদুর্ভাব অনেক বেড়ে গিয়েছে। হিমবাহ গলন, সমুদ্রের জলতল বৃদ্ধি জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম লক্ষণ। 🌡️

6. বায়ু এবং জলদূষণ 💨🌊

প্রাকৃতিক বা মনুষ্যসৃষ্ট কারণে কোনো তরল, গ্যাসীয় বা কঠিন ক্ষতিকার উপাদান বায়ুতে মিশে বায়ু দূষণ ও জলে মিশে জল দূষণ ঘটায়। একটি নির্দিষ্ট মাত্রার মধ্যে এই দূষকগুলি প্রকৃতির স্বনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দ্বারা অপসারিত হতে পারে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যের যোগান দিতে অধিক উৎপাদন জরুরি। ফলে নির্বিচারে উৎপাদন বৃদ্ধি ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষয়স পৃথিবীতে দূষণ বৃদ্ধি করছে।

7. জলাভূমি ধ্বংস 🌿

বিশ্বের জীববৈচিত্র্যের সর্ববৃহৎ আধার হল জলাভূমি। এছাড়াও জলাভূমি স্থানীয় আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। জলাভূমি, জলের দূষক উপাদানগুলি ধীরে ধীরে অপসারণ করে জল পরিশুদ্ধ করে তোলে। এই জন্য জলাভূমিকে প্রাকৃতিক বৃক্ক (nature's kidney) বলে। কিন্তু অধিক জনসংখ্যার প্রভাবে বাসস্থান নির্মাণ, শিল্পস্থাপন, নগরায়ন, কৃষিভূমির সম্প্রসারণের ঘটনায় সাম্প্রতিককালে পুকুর, হ্রদ ধ্বংস করা হচ্ছে। 🏞️

8. খাদ্যসংকট 🍎

অত্যধিক হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি হল বর্তমান পৃথিবীর অন্যতম প্রধান সমস্যা। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন ও তার সঠিক বণ্টনের অভাবে নানা দেশে নানা সময়ে খাদ্যসংকট দেখা দেয়। এছাড়াও খরা, বন্যা, কোভিডের মতো অতিমারীতে এ সমস্যা আরও বাড়ে। সংযুক্ত রাষ্ট্রপুঞ্জের (UN) বিশ্ব খাদ্য প্রোগ্রাম (World Food Programme)-এর হিসাব অনুযায়ী 2023 সালে প্রায় 345 মিলিয়ন/34.5 কোটি মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীন। 🆘

Malnourished child খাদ্যসংকটের শিকার: অপুষ্টি শিশু


5.3.2 পরিবেশ এবং মানবস্বাস্থ্য (Environment and human health)

পরিবেশের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনে মানবস্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শ্বসনতন্ত্র যেমন মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য বিঘ্নিত করে, তেমনি বায়ুদূষণ ফুসফুসের বহু রোগ সৃষ্টি করে থাকে। এখানে ফুসফুসের রোগ ও ক্যানসার সম্বন্ধে আলোচিত হলো।

1. ফুসফুসের রোগ 🫁

শ্বাসবায়ুর গুণগতমান হ্রাস পাওয়ায় মানুষের শ্বসনতন্ত্রে বিভিন্ন রোগ দেখা যায়। নীচে ফুসফুসের কয়েকটি রোগ সম্বন্ধে আলোচনা করা হলো।

📌 জেনে রাখো:

  • (i) বিশ্ব পরিবেশ দিবস 5 জুন।
  • (ii) বিশ্ব অ্যাজমা দিবস 5 মে।

[a] অ্যাজমা বা হাঁপানি (Asthma) 🌬️

অ্যাজমা একটি দীর্ঘস্থায়ী (chronic) শ্বাসতন্ত্রীয় রোগ। এই রোগে শ্বাসনালী প্রদাহজনিত কারণে স্ফীত হয়ে বায়ু চলাচলের পথ রুদ্ধ করে ও শ্বাসকষ্টসহ অন্যান্য সমস্যার সৃষ্টি হয়। হাঁপানি রোগে শ্বাসকষ্ট, হাঁচি, বুকে চাপ ও দমবন্ধ হয়ে আসা প্রভৃতি অনুভূত হয়।

রোগের কারণ (Causes of the disease):

  • (i) পরিবেশগত কারণ—প্রকৃতিতে অবস্থিত বিভিন্ন অ্যালারজেন (যে উপাদানগুলি অ্যালার্জি তৈরি করতে সক্ষম)-এর সংস্পর্শে রোগটি বৃদ্ধি পায়। যেমন—উদ্ভিদের পরাগরেণু ও ছত্রাকরেণু, প্রাণীর মল, ধুলো প্রভৃতি। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রকার শৌষধক, যেমন—ওজোন, ফরম্যালডিহাইড, PAN (পারঅক্সিসাইটিট্রাইল নাইট্রোট) প্রভৃতি অ্যালারজেনের প্রভাব বাড়িয়ে দিয়ে অ্যাজমার প্রকোপ বৃদ্ধি করে।
  • (ii) মনুষ্যসৃষ্ট কারণ—কলকারখানা বা গৃহে কয়লা, পেট্রোল তেলের দহনে সৃষ্ট ধোঁয়া, কারখানায় সৃষ্ট সালফার ডাইঅক্সাইড (SO₂), নাইট্রোজেনের অক্সাইড (NOx), SPM প্রভৃতি অ্যাজমার প্রভাব বাড়ায়। এ ছাড়াও বংশগতভাবে হাঁপানির প্রকোপ দেখা যায়।

[b] ব্রঙ্কাইটিস (Bronchitis) 🤧

ব্রঙ্কাইটিস হল শ্বাসতন্ত্রীয় রোগ, যাতে ফুসফুসের ব্রঙ্কাস ও ব্রঙ্কিওলগুলির শ্লেষ্মাপর্দায় প্রদাহ ঘটে, ফলে তা শ্লেষ্মাপূর্ণ হয় ও প্রবল কাশি ও কাশির সঙ্গে কফ বের হয়। এ ছাড়াও এই রোগে দমবন্ধভাব, শ্বাসে ঘড়ঘড় শব্দ ও হালকা জ্বর হতে পারে। ব্রঙ্কাইটিস দু-প্রকার যথা—তীব্র (acute) ব্রঙ্কাইটিস এবং দীর্ঘস্থায়ী (chronic) ব্রঙ্কাইটিস

রোগের কারণ (Causes of the disease): ব্রঙ্কাইটিসের মূল কারণ ভাইরাস হলেও পরিবেশদূষণ রোগটির সৃষ্টি ও বৃদ্ধিতে বিপজ্জনক ভূমিকা নেয়। এর পরিবেশগত প্রধান কারণগুলি হল—

  • (i) রাসায়নিক দূষক—বিভিন্ন রাসায়নিকের সূক্ষ্মকণা, যেমন—অ্যাসবেস্টস-এর সূক্ষ্ম গুঁড়ো, কয়লা, তুলো, ল্যাক্টোজ, সিলিকাতন্তু মিশ্রিত ধুলোর প্রভাবে ব্রঙ্কাইটিস রোগ দেখা যায়। দীর্ঘস্থায়ী ব্রঙ্কাইটিসের প্রধান কারণ হল ধোঁয়া।
  • (ii) ধোঁয়া—দীর্ঘস্থায়ী ব্রঙ্কাইটিস-এ অ্যালভিওলাই বিনষ্ট হয়। সিগারেটের ধোঁয়া, দমকলকর্মী ও খনিকর্মীদের কাজের সময় নির্গত ধোঁয়া থেকে এই রোগটির সৃষ্টি হয়। মূলত ধোঁয়া এবং আসবরণী কলার সিলিয়াগুলিকে বিনষ্ট করে ধূলিকণা ও অন্যান্য অ্যালারজেনকে শ্বাসনালী থেকে বের হতে সাহায্য করে। ধোঁয়া এই সিলিয়াগুলিকে বিনষ্ট করে দেয়, যার ফলে ব্রঙ্কাইটিস রোগটি ঘটে।

2. ক্যান্সার ♋

যে রোগে দেহের কলাকোষ অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিভাজিত হয় এবং তা সারাদেহে ছড়িয়ে পড়ে (মেটাস্ট্যাসিস) অন্যান্য কলার ক্ষতিসাধন করে, তাকে ক্যানসার বলে।

[a] রোগের প্রকৃতি (Nature of the disease)

ক্যানসার রোগটি জিন ও পরিবেশগত কারণের সমন্বয়ে ঘটে। যে সমস্ত পরিবেশগত অবিচ্ছিন্ন...


পরিবেশ, তার সম্পদ এবং তাদের সংরক্ষণ\n(Environment, its resources and their conservation)\n\n(টক্সিন—দেহে পক্ষে ক্ষতিকারক উপাদান) মানবদেহে ক্যানসার সৃষ্টি করতে সক্ষম, তাদের কার্সিনোজেন বলে। কার্সিনোজেনগুলি অনেকক্ষেত্রে ক্যানসার সৃষ্টিকারী জিনকে সক্রিয় করে বা অ্যাঙ্কো-জিন-এ পরিবর্তিত করে।\n\n### (b) ক্যানসারের কারণ: 🦠\n1. কীটনাশক ও আগাছানাশক: কীটনাশক (যেমন—ম্যালাথিয়ন, DDT, ডায়াজিনন), আগাছানাশক (যেমন—গ্লাইফোসেট) ক্যানসার সৃষ্টি করে।\n2. তেজস্ক্রিয় পদার্থ: খনিতে কর্মরত শ্রমিকরা রেডন নামক তেজস্ক্রিয় গ্যাসের সংস্পর্শে এলে তাঁদের ফুসফুস ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।\n3. ধূমপান: ফুসফুসের ক্যানসারের মূল কারণ হল সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় ধূমপান। সিগারেটের ধোঁয়ায় অসংখ্য কার্সিনোজেন পাওয়া যায় (যেমন—নিকোটিন, টার, অ্যাসিটালডিহাইড, ভিনাইল ক্লোরাইড, ফর্মালডিহাইড ইত্যাদি)।\n4. তামাক সেবন: নিয়মিতভাবে তামাক বা তামাকজাত পদার্থ (যেমন—খৈনি, গুটকা, জর্দা, গুড়াখু, তামাক মিশ্রিত পানমশলা) চিবোলে মুখের ভিতর ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।\n\n(Image: ফুসফুসের ক্যানসার)\n\n## 5.4 জীববৈচিত্র্য এবং সংরক্ষণ (Biodiversity and conservation) 🌱\n\nজীববৈচিত্র্য পৃথিবীতে মানুষসহ সমস্ত জীবেরই নিজ নিজ বাস্তুতান্ত্রিক ভূমিকা আছে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে পৃথিবীতে নানা ধরনের উদ্ভিদ এবং প্রাণীর সংখ্যা ক্রমশ কমে আসছে। তাই সুষ্ঠু পদ্ধতিতে ক্ষয়িষ্ণু জীব প্রজাতিদের সংরক্ষণ প্রয়োজন। জীবের বৈচিত্র্য ও তাদের সংরক্ষণের বিষয়ে নীচে সংক্ষেপে আলোচনা করা হল।\n\n### 5.4.1 🧬 জীববৈচিত্র্য (Biodiversity)\n\nগ্রিক bios শব্দের অর্থ হল জীবন বা প্রাণ এবং diversity শব্দের অর্থ বৈচিত্র্যজীববৈচিত্র্য শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন ডব্লিউ জি রোসেন (1985)জীববৈচিত্র্য হল সুস্থ ও কার্যকর বাস্তুতন্ত্রের ভিত্তি। জীববৈচিত্র্য বলতে বস্তুত প্রতিটি বাস্তুতন্ত্রের বিভিন্ন প্রকার জীবের উপস্থিতিকে বোঝানো হয়।\n\n> 💡 জীববৈচিত্র্য: স্থলভূমি, সমুদ্র বা অন্য জলাভূমির বাস্তুতন্ত্রে উপস্থিত বিভিন্ন জীবের প্রজাতিগত, আন্তঃপ্রজাতিগত এবং বাস্তুতান্ত্রিক বিভিন্নতাকে জীববৈচিত্র্য বলে।\n\nপৃথিবীতে মোট জীবের সংখ্যা সঠিকভাবে বলা সম্ভব নয়। এখন পর্যন্ত প্রায় 1.9 মিলিয়ন প্রজাতির অস্তিত্ব জানা গেছে। কিন্তু এর থেকে আদৌ পৃথিবীর মোট প্রজাতির সম্বন্ধে ধারণা করা সম্ভব নয়। বিশ্বের জীববৈচিত্র্যপূর্ণ বিভিন্ন দেশের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, চিন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মাদাগাস্কার, মেক্সিকো প্রভৃতি প্রধান। উল্লেখ্য, পৃথিবীর সমস্ত জীবপ্রজাতির 70% উপস্থিত মাত্র 17টি দেশে। এই অধিক প্রজাতি বৈচিত্র্যযুক্ত দেশগুলিকে অতিবৈচিত্র্যশালী দেশ বা মেগা-ডাইভারসিটি দেশ বলে। উদাহরণ—ভারত, চিন, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল।\n\nআমাদের দেশ পৃথিবীর 17টি অতিবৈচিত্র্যশালী (mega-diversity) অঞ্চলের অন্তর্গত। ভারতের উত্তর-পূর্ব হিমালয় অঞ্চলও এর মধ্যে পড়ে।\n\n### 📌 জীববৈচিত্র্যের তিনটি প্রকারভেদ:\n1. জিনগত বৈচিত্র্য: একটি প্রজাতির মধ্যে যাবতীয় জিনগত বৈচিত্র্য যা তাদের ফিনোটাইপিককে পরস্পরের থেকে পৃথক করে।\n2. প্রজাতিগত বৈচিত্র্য: কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে অবস্থিত বিভিন্ন জীবপ্রজাতির উপস্থিতি এবং তাদের আপেক্ষিক প্রাচুর্য।\n3. বাস্তুতান্ত্রিক বৈচিত্র্য: একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের বায়ুতন্ত্র এই প্রকার বৈচিত্র্যের বিষয়।


ছাত্ৰ জীববিজ্ঞান ও পরিবেশ • দশম শ্রেণি

পশ্চিমঘাট বনাঞ্চল, আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, গুজরাট ও তামিলনাড়ুর সামুদ্রিক প্রবাল প্রাচীর প্রচুর পরিমাণে জীববৈচিত্র্য দেখা যায়। ভূপৃষ্ঠের মাত্র 2.4% অঞ্চল ভারতের অধীন, কিন্তু পৃথিবীর 7-8% জীববৈচিত্র্য ভারতেই দেখা যায়। উল্লেখযোগ্য, ভারত হল পৃথিবীর অষ্টম সর্বাধিক জীববৈচিত্র্যপূর্ণ দেশ। 🌍

জীববৈচিত্র্যের গুরুত্ব: 📌

বিভিন্নক্ষেত্রে জীববৈচিত্র্যের গুরুত্ব সম্পর্কে নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হল।

[a] খাদ্য উৎপাদন 🍎

মানুষসহ সকল জীব তাদের খাদ্যের জন্য সরাসরি প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। জীববৈচিত্র্যের জন্যই মানুষ তার ক্রমবর্ধমান খাদ্য চাহিদা মেটাতে সক্ষম হয়। বিভিন্ন খাদ্য-উপাদান, যেমন – ভিটামিন, খনিজ লবণ ও শক্তিসমৃদ্ধ খাদ্যের মূল যোগানদার হল নানারকমের জীব। এ ছাড়া খরা, বন্যা এবং রোগ প্রতিরোধী শস্য জীববৈচিত্র্যের ফলেই সৃষ্টি সম্ভব হয়েছে। মাছ ও জলজ প্রাণী, পোলট্রি পাখি, মাংস ও দুধ উৎপাদক প্রাণীজীববৈচিত্র্য সামগ্রিকভাবে পৃথিবীর খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

[b] ঔষধ প্রস্তুতি 🧪

চিকিৎসায় ব্যবহৃত বহু ঔষধ হল জীবজাত। সিনকোনা গাছের ছাল থেকে তৈরি কুইনাইন ম্যালেরিয়ার ওষুধরূপে, সর্পগন্ধা গাছের মূলের ছাল থেকে প্রাপ্ত রেসারপিন উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ তৈরিতে, ধুতরো ফলের বীজ থেকে প্রাপ্ত ডাটুরিন হাঁপানি ও সর্দি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। তুলসী, কালমেঘ, নিম প্রভৃতি ভেষজ উদ্ভিদগুলিও বিভিন্ন ঔষধ প্রস্তুতিতে সাহায্য করে। পেনিসিলিন-সহ অন্যান্য উপকারী ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া এবং বিভিন্ন প্রাণিজ উপাদানও ঔষধ প্রস্তুতিতে ব্যবহার করা হয়।

[c] বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষা ⚖️

বাস্তুতন্ত্রে নানারকম উদ্ভিদ, উৎপাদকরূপে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জলজ, স্থলজ, ক্ষুদ্র, বৃহৎ নানাপ্রকার উদ্ভিদ, খাদ্য জীবদের শক্তি সরবরাহ করে থাকে। বিভিন্ন প্রাণীরাও বাস্তুতন্ত্রে নির্দিষ্ট ভূমিকা থাকে। প্রত্যেক জীব বাস্তুতান্ত্রিকভাবে একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। কোনো বাস্তুতন্ত্রের খাদ্যশৃঙ্খলের অন্তর্গত যে-কোনো একটি জীব বাস্তুতন্ত্র থেকে বিলুপ্ত হলে সামগ্রিকভাবে বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এইভাবে জীববৈচিত্র্য নির্দিষ্ট কোনো বাস্তুতন্ত্রের স্থিতিশীলতা বজায় রাখে। 💡 পুষ্ঠিগত ভূমিকা ছাড়াও পরিবেশে O₂, CO₂ গ্যাসগুলির ভারসাম্য রক্ষায় জীববৈচিত্র্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

[d] জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ 🌡️

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা চাপে এবং দ্রুত নগরায়ণের ফলে জীববৈচিত্র্যের পরিবর্তন ঘটছে। ক্রান্তীয় বনাঞ্চল বহুমাত্রায় CO₂ শোষণ করে বিশ্ব উষ্ণায়ন প্রতিরোধ করে। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে বনাঞ্চল ভূমজল সংগ্রহ করে তা বাষ্পমোচন করে এবং বৃষ্টিপাত ঘটাতে সাহায্য করে। উদ্ভিদবৈচিত্র্য বৃষ্টিপাত নিয়ন্ত্রণ দ্বারা কোনো নির্দিষ্ট পরিবেশের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে।

[e] অর্থনৈতিক গুরুত্ব 💰

  1. গৃহসামগ্রী এবং আসবাব তৈরি: আসবাব সামগ্রী তৈরিতে শাল, সেগুন, শিরিষ প্রভৃতি বৃক্ষের কাঠ ব্যবহৃত হয়। এইসব উদ্ভিদের কাঠ নিয়ন্ত্রিতভাবে সংগ্রহ ও ব্যবহার মানবসমাজের উন্নয়নে অপরিহার্য। তা ছাড়া চন্দন কাঠ, পাইন গাছের কাঠ গৃহস্থালির সামগ্রী তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে কাঠের ব্যবহার কমিয়ে নানা রাসায়নিক, যেমন ভিনাইল, অ্যালুমিনিয়াম, ফাইবার, PVC প্রভৃতির ব্যবহার বাড়ছে।
  2. কাগজ প্রস্তুতি: কাগজ প্রস্তুতিতে মণ্ড (paper pulp) প্রকৃতপক্ষে উদ্ভিদের সেলুলোজ তন্তু। বাঁশ, পাট গাছ, তুলা, আখ, গম ও ধানের খড় প্রভৃতি থেকে এই সেলুলোজ-নির্ভর মণ্ড তৈরি হয়। এই সেলুলোজ তন্তুর বিশ্লেষণের জন্য কাগজ শিল্পে বিভিন্ন...

🌳 পরিবেশ, তার সম্পদ এবং তাদের সংরক্ষণ

  • ফাইব্রোলাইটিক ব্যাকটেরিয়া 🦠
    • যেমন—Bacteroides ruminicola জাত উৎসেচক বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়।
    • Bacillus subtilis নামক ব্যাকটেরিয়া কাগজের রিং-এ ব্যবহৃত হয়।
  • (iii) আঠা তৈরি: শজনে, বাবলা, শিরিষ, জিওল প্রভৃতি গাছের বাকল থেকে গঁদ নিঃসৃত হয়, যা আঠা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
  • (iv) রজন সংগ্রহ: রজন একপ্রকার শাঁক, জলে অদ্রাব্য উদ্ভিজ্জ রেচন পদার্থ, যা উদ্ভিদের কাণ্ড ও শাখাপ্রশাখার রজননালী থেকে সংগ্রহ করা হয়। পাইন গাছের রজন তাপিন তেল তৈরিতে লাগে যা বাণিজ্যে ব্যবহৃত হয়। হিং নামক রজন রান্নায় সুগন্ধি রূপে ব্যবহৃত হয়। শাল গাছ থেকে প্রাপ্ত রজন ধুনো প্রস্তুতিতে ব্যবহৃত হয়।
  • (v) মোম তৈরি: মোম তৈরির উপাদান প্যারাফিন মূলত উদ্ভিজ্জ জীবজাত। পেট্রোলিয়াম বা কয়লা থেকে উৎপন্ন প্যারাফিন মোমবাতি, বৈদ্যুতিক অন্তরক রূপে ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া প্রাণীজ মোমও মোমবাতি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
  • (vi) সিল্ক উৎপাদন 🧵: Bombyx mori (ভূঁতজাত বা মালবেরি রেশম), Antheraea mylitta (তসর রেশম), Antheraea assamensis (মুগা রেশম) নামক রেশম মথের রেশমগ্রন্থি থেকে প্রাপ্ত সিল্ক বা রেশম পৃথিবীব্যাপী উৎকৃষ্ট বস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
  • (vii) উল উৎপাদন 🐑: উল বা পশম পাওয়া যায় ভেড়া (মেরিনো উল), খরগোশ (ক্যাশমিয়ার উল), খরগোশ (অ্যাংগোরা উল) প্রভৃতি থেকে। সারা পৃথিবীতে শীতের পোশাক তৈরিতে উলের চাহিদা রয়েছে।
  • (viii) মুক্তা উৎপাদন 💎: মুক্তা একটি জনপ্রিয় অলংকার উপাদান। Pinctada fucata, Pinctada maxima প্রভৃতি মুক্তা ঝিনুকের প্রজাতি থেকে মুক্তা পাওয়া যায়।

মুক্তা ও সিল্ক সুতা

🎨 শিল্প এবং সাহিত্যে প্রভাব

মানুষ শুধু জৈবিক ক্রিয়ায় বাঁচে না। জীবনের মান উন্নয়নে তার কাছে নান্দনিকতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাহিত্য, চিত্রকলা, ভাস্কর্য, গীত-বাদ্য প্রভৃতি মানুষের সমস্ত নান্দনিকতা দিকগুলিতে প্রাণ এবং তার বৈচিত্র্য বিভিন্ন প্রভাব বিস্তার করে।


📌 5.4.2 জীববৈচিত্র্যের হটস্পট (Biodiversity hotspot)

ব্রিটিশ পরিবেশ বিজ্ঞানী নরম্যান মায়ার্স (Norman Myers) 1988 খ্রিস্টাব্দে ‘দ্য এনভায়রনমেন্টালিস্ট’ নামক পত্রিকায় সর্বপ্রথম জীববৈচিত্র্যের হটস্পট ধারণাটি প্রবর্তন করেন। উদ্ভিদ প্রজাতির প্রাচুর্য আর ক্ষয়ের মাত্রা বিচার করে মায়ার্স সর্বাধিক বিপদগ্রস্ত বাস্তুতান্ত্রিক অঞ্চলগুলিকে হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করেন।

✨ হটস্পট নির্ধারণের শর্ত:

  1. হটস্পট হওয়ার প্রাথমিক শর্ত হল এন্ডেমিজম। অর্থাৎ, যে অঞ্চলটির কথা বলা হচ্ছে, সেখানকার সব প্রজাতিকেই প্রাথমিকভাবে স্থানীয় প্রজাতি বা সেখান থেকে উদ্ভুত প্রজাতি হতে হবে।
  2. অন্য কোনো অঞ্চল থেকে ওই নির্দিষ্ট অঞ্চলে প্রজাতির অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে প্রজাতির সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটানো হটস্পট হওয়ার পূর্ব শর্ত হবে না।

💡 জেনে রাখো: এন্ডেমিক প্রজাতি বলতে কোনো একটি বিশেষ ভৌগোলিক অঞ্চলে সীমাবদ্ধ স্থানীয়ভাবে সীমাবদ্ধ প্রজাতিকে বোঝায়। যেমন—মুগা রেশম কেবল অসম রাজ্যেই পাওয়া যায়। তাই মুগা মথ হল একপ্রকার এন্ডেমিক প্রজাতির উদাহরণ।

পরবর্তীকালে কনজারভেশন ইন্টারন্যাশনাল নামক আমেরিকান পরিবেশ-সংক্রান্ত সংস্থা জীববৈচিত্র্যের হটস্পট রূপে স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য আরও দুটি বিশেষ শর্ত আরোপ করে—

  • (i) হটস্পট অঞ্চলে অন্তত 1500টি

📚 ছায়া জীববিজ্ঞান ও পরিবেশ • দশম শ্রেণি (Page 126)

সংবহনকলাযুক্ত স্থানীয় (এনডেমিক) উদ্ভিদ প্রজাতির অস্তিত্ব থাকবে। এই সংখ্যা সমগ্র বিশ্বে প্রাপ্ত সংবহনকলাযুক্ত উদ্ভিদ প্রজাতির 0.5%-এর বেশি হতে হবে। (ii) হটস্পট অঞ্চলের আদি বাসিন্দাদের ন্যূনতম 70% প্রজাতি যেন লুপ্ত হয়ে থাকে।

📌 জীববৈচিত্র্য হটস্পট: জীববৈচিত্র্যের প্রাচুর্যপূর্ণ সর্বাধিক বিপন্ন ও প্রাকৃতিক এলাকাকে জীববৈচিত্র্য হটস্পট বলে।

🌍 হটস্পট সংখ্যা ও বিস্তার

বর্তমান বিশ্বে হটস্পট সংখ্যা হল 34। পৃথিবীর স্থলভাগের 2%-এর কম অংশ এর অন্তর্গত।

🇮🇳 ভারতের হটস্পট অঞ্চলসমূহ

ভারতের চারটি হটস্পট অঞ্চল বর্তমান—

  • পূর্ব হিমালয়
  • ইন্দো-বার্মা
  • পশ্চিমঘাট ও শ্রীলঙ্কা
  • সুন্দাল্যান্ড

Map: ভারতের 4টি হটস্পট অঞ্চল

লেজেন্ড:

  • 🟥 পশ্চিমঘাট ও শ্রীলঙ্কা
  • 🟧 সুন্দাল্যান্ড
  • 🟩 পূর্ব হিমালয়
  • 🟦 ইন্দো-বার্মা

[a] ⛰️ পূর্ব হিমালয়

ভারতের উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলি, যেমন—সিকিম, অসম, অরুণাচল প্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাংশ এর অন্তর্ভুক্ত।

  1. বৈশিষ্ট্য: ভারতীয় অংশে 5800 উদ্ভিদ প্রজাতির বিন্যাস, যার 2000টি প্রজাতি এনডেমিক। প্রাচীন সপুষ্পক উদ্ভিদ-প্রজাতির জন্য এই স্থানকে প্রজাতিভবনের উৎপত্তিস্থল বলে। এখানে 45টি স্তন্যপায়ী, 50টি পাখি, 17টি সরীসৃপ36টি উভচরি প্রজাতির 163টি বিপন্ন প্রজাতি বাস করে।
  2. উদাহরণ: রডোডেনড্রন, সিনকোনা, কলসপত্রী (উদ্ভিদ), একশৃঙ্গ গণ্ডার, রেড পান্ডা, মো-লেপার্ড, সোনালি লেঙ্গুর (প্রাণী)।

[b] 🌳 ইন্দো-বার্মা

মনিপুর, মিজোরাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড ও দক্ষিণ অসম-এর কিছু অঞ্চল এই হটস্পট-এর অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়া দক্ষিণ চিন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু অঞ্চল এই হটস্পটের অন্তর্ভুক্ত।

  1. বৈশিষ্ট্য: এই অঞ্চলে 13500 প্রজাতির উদ্ভিদ আছে যার মধ্যে 7000টি প্রজাতি এনডেমিক। এখানে স্তন্যপায়ী প্রাণীর প্রজাতি সংখ্যা প্রায় 430 (70টি এনডেমিক), পাখি প্রজাতির সংখ্যা 1260 (60টি এনডেমিক)।
  2. উদাহরণ: বিভিন্ন প্রকার অর্কিডের প্রজাতি (উদ্ভিদ), সোনালি গ্রীষ্ম মায়া, সায়ামিস কুমির (প্রাণী)।

[c] 🌊 পশ্চিমঘাট ও শ্রীলঙ্কা

দক্ষিণ-পশ্চিম ভারতের পশ্চিমঘাট পর্বতমালা এবং উত্তর-পশ্চিম শ্রীলঙ্কার উচ্চভূমির বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে এর বিস্তার। ভারতের গুজরাট, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক এবং কেরল রাজ্য এই অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত।

  1. বৈশিষ্ট্য: এই অঞ্চলে 5000 প্রজাতির সংবহনকলাযুক্ত উদ্ভিদ (1700টি এনডেমিক), 140টি স্তন্যপায়ী (প্রায় 20টি এনডেমিক), 450টি পাখি প্রজাতি (35টি এনডেমিক) বর্তমান।
  2. উদাহরণ: Magnolia nilagirica, লাল চন্দন, Ixora elongata প্রভৃতি উদ্ভিদ এবং মালাবার লার্জ-স্পটেড সিভেট এবং লায়ন-টেল্ড ম্যাকাক প্রভৃতি প্রাণী।

💡 হটস্পটের গুরুত্ব

  1. হটস্পটগুলি সংরক্ষণ করলে প্রজাতি বৈচিত্র্য বজায় থাকে। পরবর্তীতে তা অন্যস্থানে প্রসারণের সম্ভাবনা থাকে।
  2. মানুষসহ সমস্ত জীবের অস্তিত্ব বজায় রাখতে জীববৈচিত্র্য তথা হটস্পটগুলির সংরক্ষণ জরুরি।

🌍 পরিবেশ, তার সম্পদ এবং তাদের সংরক্ষণ (Environment, its resources and their conservation) 📖

(Page 127)

(d) সূচনাল্যান্ড: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সুমাত্রা ও বোর্নিও এবং ভারতের নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ এর অন্তর্ভুক্ত।

  • (i) বৈশিষ্ট্য: এই অঞ্চলে মোট 25,000 প্রজাতির সংবহনকলাযুক্ত উদ্ভিদ (15,000টি এনডেমিক), 380টি স্তন্যপায়ী (170টি এনডেমিক), 770টি পাখি প্রজাতি (150টি এনডেমিক) বর্তমান।
  • (ii) উদাহরণ: Heritiera littoralis (সুন্দরী গাছ), Abroma augusta প্রভৃতি উদ্ভিদ এবং নিকোবারি পায়রা, নিকোবারি হরিণ, ওরাং ওটাং প্রভৃতি প্রাণী।

5.4.3 😥 জীববৈচিত্র্য হ্রাস (Loss of biodiversity)

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও তাদের কৃতকার্যের ফলে জীববৈচিত্র্য ক্রমাগত হ্রাস হচ্ছে। জীববৈচিত্র্য হ্রাসের প্রধান কারণগুলি সম্পর্কে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হল।

1. 🏗️ জমি ব্যবহারের ধরন পরিবর্তন (Changes in land use patterns)

প্রবল জনসংখ্যা চাপে নতুন জনবসতি গড়ে তোলার জন্য জমি ব্যবহারের ধরন পরিবর্তন হয়েছে। যেমন—

  • (i) বহুসংখ্যক মানুষের যাতায়াতের সুবিধার জন্য বনাঞ্চলের মধ্যে দিয়ে অসংখ্য রাস্তা নির্মাণের দ্বারা বন্য প্রাণীদের আবাসস্থল হ্রাস পেয়েছে।
  • (ii) বাঁধ নির্মাণে অববাহিকা অঞ্চল প্লাবিত হয়ে অনেক জীবের মৃত্যু ঘটে
  • (iii) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলে বন্য উদ্ভিদ ও প্রাণীদের বসতি বিনাশ হয় ও দূষণের প্রভাব বেড়ে চলেছে। এর ফলে জীববৈচিত্র্য হ্রাস পায়।
  • (iv) নগরায়ণের কারণে বনাঞ্চল অপসারণের সঙ্গে সঙ্গে বহু উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে

2. 🏹 শিকার ও চোরা শিকার (Hunting and Poaching)

জীববৈচিত্র্য হ্রাসের অন্যতম কারণ হল শিকার ও চোরা শিকার। যেমন—

  • (i) সুন্দরবন অঞ্চলে খাদ্যের লোভে চোরা শিকারি করে হরিণের মাংস বিক্রি, পশ্চিমবঙ্গ বিভাগে বিভিন্ন প্রজাতির কচ্ছপের মাংস বিক্রি, এই প্রজাতিগুলিকে বিলুপ্তপ্রায় করে তুলেছে।
  • (ii) চন্দন কাঠ (বিলুপ্ত প্রায়), সাপ, বাঘের চামড়া, কুমিরের চামড়া ও ময়ূরের পালক প্রভৃতির বাজারদর অত্যন্ত বেশি থাকায় অর্থের লোভে এই প্রাকৃতিক সম্পদগুলি বেআইনিভাবে নষ্ট করা হচ্ছে।
  • (iii) প্রাচীনকাল থেকেই বন্যপ্রাণী শিকার মানবসমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনোদন হিসাবে স্বীকৃত। ভারতে একশৃঙ্গ গণ্ডার, হাতি, বাঘ ইত্যাদি হত্যা এইসব প্রাণীর অবলুপ্তির কারণ হয়ে উঠেছে।

3. 🌡️ বিশ্ব উন্নয়ন ও জলবায়ুর পরিবর্তন (Global development and climate change)

মূলত বিভিন্ন গ্রিনহাউস গ্যাসগুলি (কার্বন ডাইঅক্সাইড, মিথেন, কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড ইত্যাদি)-র ক্রিয়া পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে জীববৈচিত্র্য বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যেমন—

  • (i) সমুদ্রের জলতল বৃদ্ধি পাওয়ায় পৃথিবীর স্থলভাগের বেশ কিছু অংশ, বিশেষত উপকূলবর্তী অঞ্চল জলে নিমজ্জিত হচ্ছে, ফলে জীবের বাসস্থান বিনষ্ট হয়ে জীববৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে। এই কারণেই সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্য তথা তার জীববৈচিত্র্য চিরতরে বিনষ্ট হতে পারে।
  • (ii) বিশ্ব উন্নয়নের ফলে বিশ্বের জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে, যার ফলে, মেরু বরফ গলনজনিত বিপর্যয় নেমে এসেছে। ফলে মেরু ভাল্লুক, আর্কটিক ফক্স (আর্কটিক), ...

📸 চিত্র: বরফ গলন ও বিশ্ব উন্নয়নের শিকার— (ক) মেরু ভাল্লুক, (খ) আর্কটিক ফক্স, (গ) ম্যানগ্রোভ (সুন্দরবন)


📖 দ্বাদশ জীববিজ্ঞান ও পরিবেশ • দশম শ্রেণি (128)

পেঙ্গুইন (আর্কাটিক), মেরু-শোল (পূর্ব হিমালয়) প্রভৃতি প্রাণীরা তাদের বাসস্থান হারাচ্ছে। ভারতে মৌসুমি বায়ুর চরিত্র পাল্টে যাচ্ছে। এর ফলে বিভিন্ন জায়গায় খাদ্য ও বন্যপ্রাণীর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে এবং জীববৈচিত্র্য হ্রাস পাচ্ছে।

💡 কোরাল রিফ (Coral Reefs): সমুদ্রের জলের তাপমাত্রার বৃদ্ধিতে কোরালের বর্ণ সাদাটে হয়ে যায়, যাকে কোরাল ব্লিচিং বলে। কোরালে অবস্থিত মিয়োজীবী জুজ্যান্থেলার নামক শৈবাল প্রাকৃতিক ভারসাম্যে অংশগ্রহণ করে। কোরালের তাপমাত্রার কারণে সমুদ্রের জলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে, ওই অঞ্চলে জল শ্যাওলার সংখ্যা কমে যায়, যা কোরালের জন্য ক্ষতিকর।

🌍 জীববৈচিত্র্য হ্রাসের কারণসমূহ

  • (iii) তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে জীবানুজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এর জীববৈচিত্র্য কমে আসছে।
  • (iv) জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পার্বত্য অঞ্চলে উন্নত উদ্ভিদ ও প্রাণিকূল (পূর্ব হিমালয়ের স্ট্যাম্পট) চূড়ান্ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

4. দূষণ (Pollution) 🏭

  • (i) জল বা বায়ুতে অতিরিক্ত মাত্রায় দূষণের উপস্থিতি সরাসরি জীবের ক্ষতি করে।
  • (ii) জলজ বাস্তুতন্ত্র (স্বাদু জলের) ওপর পরিমাণে জৈবিক ও খনিজ পরিশোধক সহিত হওয়ায় জলজ বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
  • (iii) দূষণের ফলে ওজন স্তরের অবক্ষয়ে সূর্যালোকের অতিবেগুনি রশ্মি পৃথিবীতে প্রবেশ করে। এর ফলে জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

5. অতিব্যবহার (Over-exploitation) 📉

  • (i) বনের কাঠ জ্বালানির কাজে ব্যবহারের দরুন বহু উদ্ভিদ প্রজাতির সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
  • (ii) সর্পগন্ধা, ঘৃতকুমারী ইত্যাদি ভেষজ উদ্ভিদের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের সংখ্যা ও বৈচিত্র্য ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে।
  • (iii) একইভাবে সমুদ্রের জল ব্যবহার করে অপরিণত ইলিশ মাছ ধরার ফলে তাদের সংখ্যাও যথেষ্ট হ্রাস পেয়েছে।

6. প্রাকৃতিক দুর্যোগ (Natural Disasters) 🌪️

জীববৈচিত্র্য হ্রাসের অন্যতম প্রধান কারণ হল খড়, বন্যা, ভূমিকম্প, সুনামি, ভূমধ্যসাগর প্রভৃতি। এইসকল প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবে বিভিন্ন জীবের প্রজাতি বিশেষ করে এনডেমিক প্রজাতি বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। বিপন্ন প্রজাতির পপুলেশন প্রাকৃতিক দুর্যোগে আরও সংকুচিত হয়ে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

7. বহিরাগত প্রজাতির অনুপ্রবেশ (Invasion by Alien Species) 👽

  • (i) জাহাজে আগত আমেরিকান আরশোলা Periplaneta americana ভারতীয় আরশোলা Blatta orientalis প্রজাতিকে দ্রুত বিনষ্ট করছে।
  • (ii) কচুরিপানা দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ভারতসহ সমগ্র এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। সুন্দর ফুলের জন্য প্রথমে সমাদৃত হলেও এরা স্টোলন দ্বারা দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে। এরা জলে সূর্যালোক প্রবেশে বাধা দিয়ে, দ্রবীভূত O₂ হ্রাস করে (জৈব লোড বৃদ্ধি দ্বারা) অন্য প্রজাতিগুলির বিলুপ্তি ঘটাচ্ছে।
  • (iii) Lantana camara বা পুটিস নামক একপ্রকার কাঁটাজাতীয় গুল্ম প্রজাতির গাছ 1809 খ্রিস্টাব্দে মেক্সিকো থেকে আমাদের দেশে প্রবেশ করে। এই গুল্মের বিস্তার আমাদের দেশীয় ভেষজ গুল্মগুলিকে বিপথার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
  • (iv) Parthenium hysterophorus একটি বহিরাগত বীরুৎ প্রকৃতির উদ্ভিদ যা আমদানিকৃত গমের মাধ্যমে আমেরিকা থেকে এদেশে আসে। এর ভয়াবহ বিস্তারের জন্য বহু ভারতীয় বীরুৎ প্রকৃতির উদ্ভিদ আজ বিপন্ন।

🔬 জ্ঞান-বিজ্ঞান (Science Corner)

আফ্রিকা জাত

তেলাপিয়া, হাইব্রিড মাগুর প্রভৃতি হল ইনভেসিস স্পিসিস বা বহিরাগত প্রজাতির মাছ। এই মাছগুলি দেশি ছোট মাছকে খেয়ে নেয়, তাছাড়াও এদের প্রজনন হার ও খাদ্যাভাব মাত্রা অত্যাধিক হওয়ায় মৌরলা, পুটি, বোলে মাছ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে তাদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গিয়েছে।

5.4.4 🌳 সুন্দরবনের পরিবেশগত সমস্যা (Environmental problem in Sunderbans)

সুন্দরবন অঞ্চলটি পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ অরণ্যাভূমি। সমগ্র সুন্দরবনের এক-তৃতীয়াংশ ভারতে পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণপ্রান্তে অবস্থিত। মূলত গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা ও মেঘনা নদীর মোহনা অঞ্চলে সৃষ্ট ব-দ্বীপে এই বনাঞ্চল অবস্থিত।


পরিবেশ, তার সম্পদ এবং তাদের সংরক্ষণ 🌍

1997 সালে এই অঞ্চলটিকে UNESCO বিশ্ব ঐতিহ্যস্থান (world heritage site) বলে ঘোষণা করেছে। এই অঞ্চলের প্রায় 10,200 km² অঞ্চল আছে ঢাকা যার 4200 km² অংশ ভারতীয় সুন্দরবন।

সুন্দরবনের পরিবেশগত গুরুত্ব: 🏞️

  1. সুন্দরবন বিরল ও বিপন্ন জীবের আবাসস্থল। এর জীববৈচিত্র্য অনন্য। এটি রয়্যাল বেঙ্গল বাঘ, গাঙ্গেয় ডলফিন, কুমির প্রভৃতি প্রাণী ও সুন্দরী, বাইন, গেঁওয়া, হেতাল প্রভৃতি প্রায় 300 ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের আবাসস্থল।
  2. সুন্দরবন বিধ্বংসী ঝড়, জোয়ার, প্লাবনের হাত থেকে তীরবর্তী অঞ্চলকে রক্ষা করে।
  3. স্থানীয় মানুষদের বনজ সম্পদের স্থায়ী যোগান দিয়ে অর্থনৈতিক চাহিদা পূরণ করে এই বাদাবন।

বর্তমানে সুন্দরবন অঞ্চল ক্রমশ ছোটো হয়ে আসছে এবং এর জীববৈচিত্র্যও আজ সংকটের মুখে। সুন্দরবনের বিভিন্ন পরিবেশগত সমস্যাগুলি নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হল: 🚨

  1. নগরায়ণের জন্য লবণাক্ত উদ্ভিদ ধ্বংস: 📉 মানুষের বিবেচনাহীন কর্মকাণ্ডে সুন্দরবনের তীরবর্তী অঞ্চলে অতিরিক্ত হারে বসতি স্থাপন, নগরায়ণ প্রভৃতি কারণে লবণাক্ত উদ্ভিদের সংখ্যা ক্রমাগতভাবে হ্রাস পাচ্ছে। এ ছাড়া সাইক্লোন, সমুদ্রজলের উচ্চতা বৃদ্ধি, মাটির অতিরিক্ত লবণাক্ত অবস্থা সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ ধ্বংসের অন্যতম কারণ।
  2. কৃষিজাত সমস্যা: 🌾
    • (i) শুধু বৃষ্টির স্বাদু জলের ওপর নির্ভর করে এখানে কৃষিকাজ হয়। বন্যার সময়ে লবণাক্ত জল প্রবেশ করে এবং চাষের জমির উর্বরতা হ্রাস করে।
    • (ii) যোগাযোগের অসুবিধার কারণে লবণ সহনক্ষম ধান ভ্যারাইটিগুলি এখানে সহজলভ্য নয়।
  3. মিষ্টি জলের সংকট: 💧
    • (i) সমুদ্র তীরবর্তী এই অঞ্চলে মিষ্টি জল বা স্বাদু জলের অভাব অত্যন্ত প্রকট। ভৌমজলস্তর সমুদ্রের নিকটবর্তী হওয়ায় ও জোয়ারের কারণে এই অঞ্চলের জল লবণাক্ত হয়।
    • (ii) সুন্দরবনে বহু নদীতে স্বাদু জলের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে। 8টি প্রধান নদীর মধ্যে কেবলমাত্র ইছামতী, রায়মঙ্গল এবং হুগলি নদী মোটামুটি স্বাদু জল বহন করে।
  4. বাসস্থান ধ্বংস: 🏗️
    • (i) বন্যা, সাইক্লোন-জনিত কারণে সুন্দরবনে ভূমি ক্ষয় হয়।
    • (ii) বনের কাঠসম্পদ আহরণের ফলে সুন্দরী ও অন্যান্য প্রায় 64টি ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের সংখ্যাও ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে।
    • (iii) জনসংখ্যায় দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষি, গোচারণ ও নগরায়ণের জন্যও ম্যানগ্রোভ বিপুলমাত্রায় হ্রাস হচ্ছে। এর ফলে সুন্দরবনের আয়তন তার চরিত্র হারিয়ে ফেলেছে।
    • (iv) সমুদ্রের জলতল বৃদ্ধিতে সুন্দরবন ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে।
  5. দূষণ: 🏭
    • (i) হলদিয়া এবং কলকাতা অঞ্চলের কলকারখানা থেকে নির্গত শিল্পজাত বর্জ্যগুলি নদী দ্বারা বাহিত হয়ে এসে এই অঞ্চলে জলদূষণ ঘটায়। ফলে এই অঞ্চলে বসবাসকারী জীবদের দেহে বিভিন্ন ভারী ধাতুগুলি, যেমন—কপার, ক্যাডমিয়াম, লেড-এর বিপজ্জনক মাত্রায় জৈবসংবর্ধন ঘটছে।
    • (ii) হলদিয়া বন্দর নির্মাণ হওয়ায় জাহাজ, স্টিমার প্রভৃতি থেকে অতিরিক্ত তেল, গ্রিজ জল মুক্ত হয়ে জলদূষণ ঘটায়।
    • (iii) এ ছাড়াও কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহৃত সার ও কীটনাশক, পর্যটন সৃষ্ট দূষক (প্লাস্টিকের প্যাকেট, বোতল, কাগজ প্রভৃতি) দূষণগুলিও সুন্দরবনের জলদূষণ ঘটিয়ে থাকে।
    • (iv) সুন্দরবনের কাছে বাংলাদেশের রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রজাত ছাই ও বিষাক্ত গ্যাস পরিবেশ সংক্রান্ত সমস্যা সৃষ্টি করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
  6. খাদ্য-খাদকের সংখ্যার ভারসাম্য ব্যাঘাত: ⚖️
    • (i) সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রে ক্রমাগত স্বাদু জলের অভাব ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির জন্য ভূপ্রকৃতি অনেক অংশে বিনষ্ট হয়েছে। ফলে বিভিন্ন প্রাণী, যেমন—বুনো মহিষ, চিতল হরিণ, গন্ডার প্রভৃতি

130

🌿 জীববিদ্যা ও পরিবেশ • দশম শ্রেণি

প্রাণী এই অঞ্চলে বিলুপ্ত হয়েছে। (ii) এ ছাড়া জলবায়ুর কারণে এবং পর্যাপ্ত খাদ্যের অভাবে প্রাণীর বেঁচে থাকা ও সংখ্যা উভয়ই যথেষ্ট হ্রাস পেয়েছে।

🌊 7. সমুদ্রজলের উচ্চতা বৃদ্ধির ফল জীববৈচিত্র্যের বিনাশ

📌 বিপদাপন্ন কিছু দ্বীপ: নিম্নলিখিত কিছু দ্বীপ বিপদজনক অবস্থায় আছে:

  • মোরায়ামারা
  • জলদাপাড়া
  • সুন্দরবন
  • আলবেলি

বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য পৃথিবীর তাপমাত্রা গত শতকে প্রায় 0.6°C বৃদ্ধি পেয়েছে। এই কারণে মেরু প্রদেশ সহ উপকূলবর্তী অঞ্চল ক্রমশ জলে নিমজ্জিত হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে বিগত 25 বছরে সুন্দরবন অঞ্চলে প্রায় 5.5 km² এবং 8mm/বছর হারে সমুদ্রের জলতল বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলস্বরূপ প্রায় 5.5 km² দ্বীপশৃঙ্খল প্রতিবছর সমুদ্রের নীচে চলে যাচ্ছে বলে অনুমান করা হয়েছে।

💡 5.4.5 জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ (Conservation of biodiversity)

সুষ্ঠুভাবে জীবনযাপন করার জন্য মানুষ জীববৈচিত্র্যের ওপর নির্ভরশীল। জীববৈচিত্র্য মানুষের স্বাস্থ্য, খাদ্যের সম্পদ এবং বেড়ে নেওয়ার স্বাধীনতাকে বর্ধিত করে। জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়ক্ষতি তাই মানুষের সমস্ত জীবজগতকে সামগ্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই বাস্তুতন্ত্রের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ একান্ত আবশ্যক।

📝 জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ (Biodiversity Conservation): যে পদ্ধতির দ্বারা জীববৈচিত্র্যের বৈজ্ঞানিক ব্যবহার, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার ব্যবস্থা করা হয় এবং জীববৈচিত্র্যকে ক্ষতিকারক প্রভাব, অপব্যবহার ও ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা হয়, তাকে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ বলে।

জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ প্রধানত দু-ভাবে করা হয়, যথা—

  • ইন-সিটু সংরক্ষণ (In-situ conservation): প্রাকৃতিক পরিবেশে জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা।
  • এক্স-সিটু সংরক্ষণ (Ex-situ conservation): প্রাকৃতিক পরিবেশের বাইরে কৃত্রিম উপায়ে জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা।
ইন-সিটু সংরক্ষণ এর উদাহরণএক্স-সিটু সংরক্ষণ এর উদাহরণ
জাতীয় উদ্যান, অভয়ারণ্য, রিজার্ভ ফরেস্ট বা সংরক্ষিত বন, বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভচিড়িয়াখানা, বোটানিক্যাল গার্ডেন, স্পার্ম ব্যাংক, জুও ব্যাংক, ক্রায়োসংরক্ষণ, ক্যাপিটিভি ব্রিডিং

🏕️ 1. ইন-সিটু সংরক্ষণ (In-situ conservation)

🌿 ইন-সিটু সংরক্ষণ: যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কোনো জীবকে তার স্বাভাবিক প্রাকৃতিক বাসস্থানে সংরক্ষিত করা হয়, তাকে ইন-সিটু সংরক্ষণ বলে।

জাতীয় পার্ক বা উদ্যান, অভয়ারণ্য, রিজার্ভ ফরেস্ট বা সংরক্ষিত বন, বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ প্রভৃতি ইন-সিটু সংরক্ষণের বিভিন্ন পথ।

🏞️ [a] জাতীয় উদ্যান (National park)

কেন্দ্রীয় সরকার অধিষ্ঠিত ও নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলে বন্যপ্রাণী এবং বনজ সম্পদের চিরস্থায়ী সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়, তাকে জাতীয় উদ্যান বলে।

বৈশিষ্ট্য:

  1. এই অঞ্চলে শিকার করা, চাষ করা, গবাদিপশু ও গবাদিপশুর প্রবেশ নিষিদ্ধ।
  2. এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীবজ সম্পদকে জাতীয় পর্যায়ে সংরক্ষণ করা হয়।

উদাহরণ:

  • জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান (পশ্চিমবঙ্গ)
  • জিম করবেট জাতীয় উদ্যান (উত্তরাখণ্ড)

💡 ভারতে প্রথম জাতীয় উদ্যান 1936 সালে হিমালয়ের পাদদেশে হেইলি জাতীয় উদ্যান নামে স্থাপিত হয়। বর্তমানে এটি করবেট ন্যাশনাল পার্ক নামে পরিচিত।

🦁 [b] অভয়ারণ্য (Sanctuary)

রাজ্য সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন যে অরণ্যে বন্যপ্রাণী নির্ভয়ে বিচরণ করে, স্বাধীনভাবে জন্মগ্রহণ করে, বন্যপ্রাণী হত্যা বা শিকার এবং জনসমাগম প্রবেশ নিষিদ্ধ, তাকে অভয়ারণ্য বলে।

বৈশিষ্ট্য:

  1. মুখ্য বন আধিকারিক বা সরকারি কার্যালয়ের অনুমতি ছাড়া অভয়ারণ্যে প্রবেশ নিষিদ্ধ।
  2. এই অঞ্চলে বন্যপ্রাণী হত্যা বা শিকার করা নিষেধ।

উদাহরণ:

  • চাঁদপামারি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য (পশ্চিমবঙ্গ)
  • গির অভয়ারণ্য (গুজরাট)
🌲 [c] সংরক্ষিত বনাঞ্চল (Reserve forest)

রাজ্য সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন যে অরণ্যে সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষেধ, যেখানে কাঠ কাটা, শিকার করা, গৃহপালিত পশুচারণ বিশেষ সরকারি অনুমতি ব্যতিরেকে নিষিদ্ধ, তাকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল বলে।

CONTENT MANAGER

Sattar Uddin SohelSattar Uddin Sohel