10. আফ্রিকা | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 🕊️
10. আফ্রিকা | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 🕊️ - WBBSE - Class 10 - বাংলা
তৃতীয় পাঠ
আফ্রিকা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 🕊️
উদ্ভ্রান্ত সেই আদিম যুগে স্রষ্টা যখন নিজের প্রতি অসন্তোষে নতুন সৃষ্টিকে বারবার করছিলেন বিধ্বস্ত, তাঁর সেই অধৈর্যে ঘন-ঘন মাথা নাড়ার দিনে রুদ্র সমুদ্রের বাহু প্রাচী ধরিত্রীর বুকের থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল তোমাকে, আফ্রিকা— বাঁধলে তোমাকে বনস্পতির নিবিড় পাহারায় কৃপণ আলোর অন্তঃপুরে।
সেখানে নিভৃত অবকাশে তুমি সংগ্রহ করছিলে দুর্গমের রহস্য, চিনছিলে জলস্থল-আকাশের দুর্বোধ সংকেত, প্রকৃতির দৃষ্টি-অতীত জাদু মন্ত্র জাগাচ্ছিল, তোমার চেতনাতীত মনে। বিদ্রূপ করছিলে ভীষণকে বিরূপের ছদ্মবেশে, শঙ্কাকে চাচ্ছিলে হার মানাতে আপনাকে উগ্র ক'রে বিভীষিকার প্রচণ্ড মহিমায় তাণ্ডবের দুন্দুভিনাদে।।
হায় ছায়াবৃতা, কালো ঘোমটার নীচে অপরিচিত ছিল তোমার মানবরূপ উপেক্ষার আবিল দৃষ্টিতে।
এল ওরা লোহার হাতকড়ি নিয়ে, নখ যাদের তীক্ষ্ম তোমার নেকড়ের চেয়ে, এল মানুষ-ধরার দল গর্বে যারা অন্ধ তোমার সূর্যহারা অরণ্যের চেয়ে।
📌 সভ্যের বর্বর লোভ নগ্ন করল আপন নির্লজ্জ অমানুষতা। তোমার ভাষাহীন ক্রন্দনে বাষ্পাকুল অরণ্যপথে পঙ্কিল হলো ধূলি তোমার রক্তে অশ্রুতে মিশে, দস্যু-পায়ের কাঁটা-মারা জুতোর তলায় বীভৎস কাদার পিন্ড চিরচিহ্ন দিয়ে গেল তোমার অপমানিত ইতিহাসে।।
সমুদ্রপারে সেই মুহূর্তেই তাদের পাড়ায় পাড়ায় মন্দিরে বাজছিল পূজার ঘণ্টা সকালে সন্ধ্যায় দয়াময় দেবতার নামে; শিশুরা খেলছিল মায়ের কোলে;
কবির সংগীতে বেজে উঠেছিল সুন্দরের আরাধনা ।।
আজ যখন পশ্চিম দিগন্তে প্রদোষকাল ঝঞ্ঝাবাতাসে রুদ্ধশ্বাস, যখন গুপ্ত গহ্বর থেকে পশুরা বেরিয়ে এল— অশুভ ধ্বনিতে ঘোষণা করল দিনের অন্তিমকাল, এসো যুগান্তের কবি, আসন্ন সন্ধ্যার শেষ রশ্মিপাতে দাঁড়াও ওই মানহারা মানবীর দ্বারে; বলো 'ক্ষমা করো'- হিংস্র প্রলাপের মধ্যে সেই হোক তোমার সভ্যতার শেষ পুণ্যবাণী।।
📝 রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১)
জন্ম কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে। অল্পবয়স থেকেই ঠাকুরবাড়ি থেকে প্রকাশিত ভারতী ও বালক পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। দীর্ঘ জীবনে অজস্র কবিতা, গান, ছোটোগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক লিখেছেন, ছবি এঁকেছেন। এশিয়ার মধ্যে তিনিই প্রথম নোবেল পুরস্কার পান ১৯১৩ সালে 'Song Offerings' এর জন্যে। দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র ভারত আর বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত তাঁর রচনা।
কবির প্রথম জীবনে লেখা কাব্যগ্রন্থগুলি হলো:
- 'সন্ধ্যাসঙ্গীত'
- 'প্রভাতসঙ্গীত'
- 'ছবি ও গান'
- 'ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী'
- 'কড়ি ও কোমল'
১৮৮৮ থেকে ১৮৯৬ মাত্র আট বছরে কবি প্রতিভার যে অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটেছে তারই চিহ্ন সুমুদ্রিত এই পর্বের চারখানি কাব্যগ্রন্থে:
- 'মানসী'
- 'সোনারতরী'
- 'চিত্রা'
- 'চৈতালি'
এই পর্বের কাব্যগুলিতে কবির আত্মোপলব্ধিই শুধু নয়, তাঁর কাব্যে নির্মাণ কৌশলেরও যথেষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়। আবেগ, গভীর আত্মপ্রত্যয়, জীবন জিজ্ঞাসা, কল্পনার পক্ষ বিস্তার, শিল্পরূপ নির্মাণে দক্ষতা, ভাষা ও ছন্দের ওপর আধিপত্য প্রভৃতি কবির যাবতীয় গুণাবলির প্রকাশ ঘটেছে এই পর্বের কবিতাবলিতে।
এরপর কবি রচনা করেন কণিকা, কথা ও কাহিনী, কল্পনা, ক্ষণিকা ও নৈবেদ্য। গীতাঞ্জলি পর্বের প্রধান তিনখানি কাব্যগ্রন্থ:
- গীতাঞ্জলি
- গীতিমাল্য
- গীতালি
১৯১৬ তে বলাকা, ১৯২৫ এ পূরবী এবং ১৯২৯-এ মহুয়া রচনা করেন কবি রবীন্দ্রনাথ। 'পুনশ্চ' থেকে রবীন্দ্রকাব্যের শেষ পর্বের শুরু। এ পর্বের উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলি হলো:
- 'শেষ সপ্তক'
- 'প্রান্তিক'
- 'নবজাতক'
- 'সানাই'
- 'রোগশয্যায়'
- 'আরোগ্য' ইত্যাদি।
CONTENT MANAGER