22. প্রভাবতী সম্ভাষণ | ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
22. প্রভাবতী সম্ভাষণ | ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর - WBBSE - Class 10 - বাংলা
ষষ্ঠ পাঠ
প্রভাবতী সম্ভাষণ
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
বৎসে প্রভাবতি! তুমি, দয়া, মমতা ও বিবেচনায় বিসর্জন দিয়া, এ জন্মের মতো, সহসা সকলের দৃষ্টিপথের বহির্ভূত হইয়াছ। কিন্তু আমি, অনন্যচিত্ত হইয়া, অবিচলিত স্নেহভরে তোমার চিন্তায় নিরন্তর এরূপ নিবিষ্ট থাকি যে, তুমি এক মুহূর্তের নিমিত্ত, আমার দৃষ্টিপথের বহির্ভূত হইতে পার নাই। প্রতিক্ষণেই, আমার স্পষ্ট প্রতীতি হইতেছে – যেন, তুমি বসিয়া আছ, আমায় অন্য মনে চলিয়া যাইতে দেখিয়া, 'নীনা' বলিয়া, করপ্রসারণপূর্বক, কোলে লইয়া বলিতেছ। যেন, তুমি উপরের জানালা হইতে দেখিতে পাইয়া, 'আয় না' বলিয়া, সলীল করসঞ্চালন সহকারে, আমায় আহ্বান করিতেছ। যেন, আমি আহার করিতে গিয়া, আসনে উপবিষ্ট হইয়া, তোমার পূজ্যপাদ পিতামহদেবীকে, প্রভাবতী কোথায়, এই জিজ্ঞাসা করিতেছি। তুমি শ্রবণমাত্র, সত্ত্বর পদসঞ্চারে আসিয়া, 'এই আমি এসেছি' বলিয়া, প্রফুল্লবদনে, আমার ক্রোড়ে উপবেশন করিতেছ। যেন তুমি, আমার ক্রোড়ে বসিয়া আহার করিতে করিতে, 'শোলো' বলিয়া, আমার জানুতে মস্তক বিন্যস্ত করিয়া শয়ন করিতেছ। যেন, আমি আহারান্তে আসন হইতে উত্থিত হইবামাত্র, তুমি আমার সঙ্গে ঝগড়া করিতেছ; আর সকলে, সাতিশয় আহ্লাদিত মনে, সহাস্যবদনে, শ্রবণ ও অবলোকন করিতেছেন। যেন, আমি বিকালে বাড়ির ভিতরে জল খাইতেছি; তুমি ক্রোড়ে বসিয়া, আমার সঙ্গে জল খাইতেছ ; এবং জল খাওয়ার পর, আমি মুখে সুপারি দিবামাত্র, তুমি 'দুখুনি দে' বলিয়া, অঙ্গুলি দ্বারা, আমার মুখ হইতে সুপারি বহিষ্কৃত করিয়া লইতেছ। যেন, তুমি বাহিরে আসিবার নিমিত্ত, আমার ক্রোড়ে আরোহণ করিয়াছ, এবং সিঁড়ি নামিবার পূর্বক্ষণে, আমার চিবুকধারণপূর্বক, আকুল চিত্তে বলিতেছ, 'নাফাস্সি, পড়ে যাব'। আমি কৌতুক করিবার নিমিত্ত বলিতেছি না আমি লাফাব। তুমি অমনি, ঈষৎ কোপাবিষ্ট হইয়া, তোমার জননীর দিকে মুখ ফিরাইয়া বলিতেছ, 'দেখ দিখি মা, আমার কথা শোনে না'। যেন, তোমার দাদারা, উনি আর তোমায় ভালো বাসিবেন না, এই বলিয়া ভয়প্রদর্শন করিতেছে। তুমি তাহা পরিহাস বলিয়া বুঝিতে না পারিয়া, পাছে আমি আর না ভালোবাসি, এই আশঙ্কায় আকুলচিত্ত হইয়া, 'ভালো বস্ত্রি, ভালো বসি' এই কথা আমায় অনুপমেয় শিরশ্চালন সহকারে বারংবার বলিতেছ। যেন, আমি, খাব খাব বলিয়া, তোমার মুখচুম্বনের নিমিত্ত, আগ্রহপ্রদর্শন করিতেছি। তুমি, 'এই খা' বলিয়া, ডাইনের গাল ফিরাইয়া দিতেছ। আমি, ও খাব না বলিয়া, মুখ ফিরাইতেছি। তুমি, 'তবে এই খা' বলিয়া, বামের গাল ফিরাইয়া দিতেছ। আমি, ও খাব না বলিয়া, মুখ ফিরাইতেছি। অবশেষে, তুমি, আর কিছু না বলিয়া, আপন অধর আমার অধরে অর্পিত করিতেছ।
এইরূপে, আমি সর্বক্ষণ, তোমার অদ্ভুত মনোহর মূর্তি ও নিরতিশয়প্রীতিপদ অনুষ্ঠান সকল অবিকল প্রত্যক্ষ করিতেছি ; কেবল তোমার কোলে লইয়া, তোমার লাবণ্যপূর্ণ কোমল কলেবর পরিস্পর্শে, শরীর অমৃতরসে অভিষিক্ত করিতে পারিতেছি না। দৈবযোগে এক দিন, দিবাভাগে, আমার নিদ্রাবেশ ঘটিয়াছিল। কেবল, সেই দিন, সেই সময়ে, ক্ষণকালের জন্য, তোমায় পাইয়াছিলাম। দর্শনমাত্র, আহ্লাদে অধৈর্য হইয়া, অভূতপূর্ব আগ্রহ সহকারে ক্রোড়ে লইয়া, প্রগাঢ় স্নেহভরে বাহু দ্বারা পীড়নপূর্বক, সজল নয়নে তোমার মুখচুম্বনে প্রবৃত্ত হইতেছি, এমন সময়ে, এক ব্যক্তি, আহ্বান করিয়া, আমার নিদ্রাভঙ্গ করিলেন। এই আকষ্মিক মর্মভেদী নিদ্রাভঙ্গ দ্বারা, সেদিন, যে বিষম ক্ষোভ ও ভয়ানক মনস্তাপ পাইয়াছি, তাহা বলিয়া ব্যক্ত করিবার নহে। 💔
বৎসে! তোমার কিছুমাত্র দয়া ও মমতা নাই। যখন তুমি, এত সত্বর চলিয়া যাইবে বলিয়া, স্থির করিয়া রাখিয়াছিলে, তখন তোমার সংসারে না আসাই সর্বাংশে উচিত ছিল। তুমি স্বল্প সময়ের জন্য আসিয়া, সকলকে কেবল মর্মান্তিক বেদনা দিয়া গিয়াছ। আমি যে, তোমার অদর্শনে, কত যাতনাভোগ করিতেছি, তাহা তুমি একবারও ভাবিতেছ না।
বৎসে! কিছুদিন হইল আমি নানা কারণে সাতিশয় শোচনীয় অবস্থার অবস্থাপিত হইয়াছি। সংসার নিতান্ত বিরস ও বিষময় হইয়া উঠিয়াছে। কেবল এক পদার্থ ভিন্ন, আর কোনও বিষয়েই, কোনও অংশে, কিঞ্চিমাত্র সুখবোধ বা প্রীতিলাভ হইত না। তুমি আমার সেই পদার্থ ছিলে। ইদানীং, একমাত্র তোমায় অবলম্বন করিয়া, এই বিষময় সংসার অমৃতময় বোধ করিতেছিলাম। যখন, চিত্ত বিষম অসুখে ও উৎকট বিরাগে পরিপূর্ণ হইয়া, সংসার নিরবচ্ছিন্ন যন্ত্রণাভবন বলিয়া প্রতীয়মান হইত, সে সময়ে তোমায় কোলে লইলে, ও তোমার মুখচুম্বন করিলে, আমার সব শরীর তৎক্ষণাৎ যেন অমৃতরসে অভিষিক্ত হইত। বৎসে! তোমার কি অদ্ভুত মোহিনী শক্তি ছিল, বলিতে পারি না। তুমি অন্ধতমসাচ্ছন্ন গৃহে প্রদীপ্ত প্রদীপের এবং চিরশুষ্ক মরুভূমিতে প্রভূত প্রস্রবণের, কার্য করিতেছিলে। অধিক আর কি বলিব ইদানীং তুমিই আমার জীবনযাত্রায় একমাত্র অবলম্বন হইয়াছিলে। সুতরাং, তোমার অসদ্ভাবে, আমার কীদৃশ শোচনীয় অবস্থা ঘটিয়াছে, তাহা তুমি, ইচ্ছা করিলে, অনায়াসে, স্বীয় অনুভবপথে উপনীত করিতে পার। 💡
কিন্তু, এক বিষয় ভাবিয়া, আমি কিয়ৎ অংশে, বীতশোক ও আশ্বাসিত হইয়াছি। বৎসে! তুমি এমন শুভক্ষণে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলে যে, ব্যক্তিমাত্রেই, তোমার অদ্ভুত মনোহর মূর্তি ও প্রভূতমাধুরীপূর্ণ ভাবভঙ্গী দৃষ্টিগোচর করিয়া, নিরতিশয় পুলকিত ও চমৎকৃত হইতেন। তুমি সকলের নয়নতারা ছিলে। সকলেই তোমায় আপন প্রাণ অপেক্ষা প্রিয় জ্ঞান করিতেন। এই নগরের অনেক পরিবারের সহিত আমার প্রণয় ও পরিচয় আছে; কিন্তু কোনও পরিবারেই, তোমার ন্যায়, অবিসংবাদে সব-সাধারণের নিরতিশয় স্নেহভূমি ও আদরভাজন অপত্য, এ পর্যন্ত, আমার দৃষ্টিপথে পতিত হয় নাই। তুমি যে স্বল্পকাল সংসারে ছিলে, তাহা আদরে আদরে অতিবাহিত করিয়া গিয়াছে, অস্নেহ বা অনাদর কাহারে বলে এক মুহূর্তের নিমিত্ত, তোমায় তাহার অনুমাত্র অনুভব করিতে হয় নাই।
কিন্তু এই নৃশংস সংসারে দীর্ঘকাল অবস্থিতি করিলে, উত্তরকালে তোমার ভাগ্যে কী ঘটত তাহার কিছুমাত্র স্থিরতা নাই। হয়ত, ভাগ্যগুণে সৎপাত্রে প্রতিপাদিত্য ও সৎ পরিবারে প্রতিষ্ঠাতা, হইয়া অবিচ্ছিন্ন সুখসম্ভোগে কালহরণ করিতে; নয়ত ভাগ্যদোষে, অসৎ পাত্রের হস্তগতা ও অসৎ পরিবারের করাল কবলে পতিতা হইয়া অবিচ্ছিন্ন দুঃখসম্ভোগে কালাতিপাত করিতে হইত। যদি, পরমযত্নে ও পরম আদরে পরিবর্ধিত করিয়া, পরিশেষে, তুমি অবস্থার বৈগুণ্যনিবন্ধন দুঃসহ ক্লেশপরম্পরায় কালযাপন করিতেছ, ইহা দেখিতে হইত, তাহা হইলে আমাদের হৃদয় বিদীর্ণ হইয়া যাইত। বোধ হয়, তোমার অতর্কিত অন্তর্ধাননিবন্ধন যাতনা অপেক্ষা, সে যাতনা বহু সহস্র গুণে গরীয়সী হইত। তুমি, স্বল্পকালে সংসারব্রতের উদ্যাপন করিয়া, আমাদের সেই সম্ভাবিত অতি বিষম আন্তরিক যাতনাভোগের সম্পূর্ণরূপ অপসারণ করিয়াছ। তোমায় যে, ক্ষণকালের জন্য, কাহারও নিকট কোনও অংশে, অনুমাত্র অস্নেহ বা অনাদরের আস্পদ হইতে হইল না, আদরে আদরে নরলীলা সম্পন্ন করিয়া গেলে, ইহা ভাবিয়া, আমি আমার অবোধ মনকে কথঞ্চিৎ প্রবোধ দিতে পারিব।
বিশেষত দীর্ঘকাল নরলোকবাসিনী হইলে, অপরিহরণীয় পরিণয়পাশে বদ্ধ হইয়া, প্রৌঢ় অবস্থায়, তোমার যে সকল লীলা ও অনুষ্ঠান করিতে হইত, নিতান্ত শৈশব অবস্থাতেই, তুমি তৎসমুদয় সম্যক সম্পন্ন করিয়া গিয়াছ। স্বভাবসিদ্ধ অদ্ভুত কল্পনাশক্তির প্রভাববলে, তুমি শ্বশুরালয় প্রভৃতি উদ্ভাবিত করিয়া লইয়াছিলে। কখনও কখনও, স্নেহ ও মমতার আতিশয্যপ্রদর্শনপূর্বক, ঐকান্তিক ভাবে, তনয়ের লালনপালনে বিলক্ষণ ব্যাপৃত হইতে। কখনও কখনও, 'তাহার কঠিন পীড়া হইয়াছে' বলিয়া দুর্ভাবনায় অভিভূত হইয়া, বিষণ্ণ বদনে, ধরাসনে শয়ন করিয়া থাকিতে। কখনও কখনও, 'শ্বশুরালয় হইতে অশুভ সংবাদ আসিয়াছে' বলিয়া ম্লান বদনে ও আকুল হৃদয়ে, কালযাপন করিতে। কখনও কখনও, 'স্বামী আসিয়াছেন' বলিয়া, ঘোমটা দিয়া সঙ্কুচিত ভাবে, এক পার্শ্বে দণ্ডায়মান থাকিতে; এবং, সেই সময়ে, কেহ কিছু জিজ্ঞাসা করিলে, লজ্জাশীলা কুলমহিলার ন্যায়, অতি মৃদু স্বরে উত্তর দিতে। কখনও কখনও, ‘পুত্রটি একলা পুকুরের ধারে গিয়াছিল, আর একটু হইলেই ডুবিয়া পড়িত', এই বলিয়া, সাতিশয় শোকাভিভূত হইয়া, নিরতিশয় আকুলতা প্রদর্শন করিতে। কখনও কখনও, 'শ্বাশুড়ির পীড়ার সংবাদ আসিয়াছে' বলিয়া, অবিলম্বে শ্বশুরালয়ে যাইবার নিমিত্ত, সজ্জা করিতে।
এইরূপে, তুমি সংসারযাত্রা সংক্রান্ত সকল লীলা সম্পন্ন করিয়া গিয়াছ। বোধ হয়, যদি এই পাপিষ্ঠ নৃশংস নরলোকে অধিক দিন থাক, উত্তরকালে বিবিধ যাতনাভোগ একান্ত অপরিহার্য, ইহা নিশ্চিত বুঝিতে পারিয়াছিলে। এই জন্যই, ঈদৃশ স্বল্প সময়ে, যথাসম্ভব, সাংসারিক ব্যাপার সকল সম্পন্ন করিয়া, সত্বর অন্তর্হিত হইয়াছ। তুমি স্বল্প কালে নরলোক হইতে অপসৃত হইয়া, আমার বোধে, অতি সুবোধের কাজ করিয়াছ। অধিক কাল থাকিলে, আর কি অধিক সুখভোগ করিতে ; হয়ত, অদৃষ্টবৈগুণ্যবশত, অশেষবিধ যাতনাভোগের একশেষ ঘটিত। সংসার যেরূপ বিরুদ্ধ স্থান, তাহাতে, তুমি দীর্ঘজীবনী হইলে, কখনই, সুখে ও স্বচ্ছন্দে, জীবনযাত্রার সমাধান করিতে পারিত না।
কিন্তু, এক বিষয়ে, আমার হৃদয়ে নিরতিশয় ক্ষোভ জন্মিয়া রহিয়াছে। অন্তিম পীড়াকালে, তুমি উৎকট পিপাসায় সাতিশয় আকুল হইয়া, জলপানের নিমিত্ত, নিতান্ত লালায়িত হইয়া ছিলে। কিন্তু, অধিক জল দেওয়া চিকিৎসকের মতানুযায়ী নয় বলিয়া, তোমায় ইচ্ছানুরূপ জল দিতে পারি নাই। ঔষধ সেবনান্তে, কিঞ্চিৎ দিবার পর আকুল বচনে, 'আর খাব' 'আর খাব' বলিয়া জলের নিমিত্ত যৎপরোনাস্তি লালসাপ্রদর্শন করিতে। কিন্তু আমি, ইচ্ছানুরুপ, জলপ্রদানের পরিবর্তে, তোমায় কেবল প্রবঞ্চনাবাক্যে সান্ত্বনাপ্রদানের চেষ্টা করিতাম। যদি তৎকালে জানিতে পারিতাম, তুমি অবধারিত পলায়ন করিবে, তাহা হইলে, কখনই, তোমার পিপাসার যন্ত্রণায় অস্থির ও কাতর হইতে দিতাম না ; ইচ্ছানুরূপ জলপান করাইয়া নিঃসন্দেহে, তোমার উৎকট পিপাসা নিবন্ধন অসহ্য যাতনার সর্বতোভাবে নিবারণ করিতাম। সে যাহা হউক, বৎসে! তুমি উৎকট পিপাসায় সাতিশয় আকুল হইয়া, জলপ্রার্থনাকালে আমার দিকে, বারংবার যে কাতর দৃষ্টিপাত করিয়াছিলে, তাহা আমার হৃদয়ে বিষদিগ্ধ শল্যের ন্যায়, চিরদিনের নিমিত্ত হইয়া রহিয়াছে। যদি তোমার সকল কাণ্ড বিস্মৃত হই, ঐ মর্মভেদী কাতর দৃষ্টিপাত, এক মূহূর্তের নিমিত্ত, আমার স্মৃতিপথ হইতে অপসারিত হইবেক না। যদি তাহা বিস্মৃত হইতে পারি, তাহা হইলে, আমার মতো পামর ও পাষণ্ড ভূমণ্ডলে আর নাই। 💔
বৎসে! আমি যে তোমায় আন্তরিকভাবে ভালো বাসিতাম, তাহা তুমি বিলক্ষণ জান। আর তুমি যে আমায় আন্তরিকভাবে ভালোবাসিতে, তাহা আমি বিলক্ষণ জানি। আমি তোমায় অধিকক্ষণ না দেখিলে, যার পর নাই অসুখী ও উৎকণ্ঠিত হইতাম। তুমিও, আমায় অধিকক্ষণ না দেখিতে পাইলে যার পর নাই অসুখী ও উৎকণ্ঠিত হইতে; এবং আমি কোথায় গিয়াছি, কখন আসিব, আসিতে এত বিলম্ব হইতেছে কেন, অনুক্ষণ এই অনুসন্ধান করতে। এক্ষণে, এত দিন তোমায় দেখিতে না পাইয়া আমি অতি বিষম অসুখে কালযাপন করিতেছি। কিন্তু, তুমি এত দিন আমায় না দেখিয়া, কীভাবে কালযাপন করিতেছ, তাহা জানিতে পারিতেছি না। বৎসে ! যদিও তুমি, নিতান্ত নির্মম হইয়া, এ জন্মের মতো, অন্তর্হিত হইয়া, এবং আমার নিমিত্ত আকুলচিত্ত হইতেছ কিনা, জানতে পারিতেছি না; আর হয়ত, এতদিনে আমায় সম্পূর্ণরূপে বিস্মৃত হইয়াছ; কিন্তু, আমি তোমার, কস্মিন কালেও বিস্মৃত হইতে পারিব না। তোমার অদ্ভুত মনোহর মূর্তি, চিরদিনের নিমিত্ত, আমার চিত্রপটে চিত্রিত থাকিবেক। কালক্রমে পাছে তোমায় বিস্মৃত হই, এই আশঙ্কায়, তোমার যার পর নাই চিত্ততারিণী ও চমৎকারিণী লীলা সংক্ষেপে লিপিবদ্ধ করিলাম। সতত পাঠ করিয়া, তোমায় সর্বক্ষণ স্মৃতিপথে জাগরুক রাখিব, তাহা হইলে, আর আমার তোমায় বিস্মৃত হইবার অণুমাত্র আশঙ্কা রহিল না। 📌
বৎসে! তোমায় আর অধিক বিরক্ত করিব না; একমাত্র বাসনা ব্যক্ত করিয়া বিরত হই – যদি তুমি পুনরায় নরলোকে আবির্ভূত হও, দোহাই ধর্মের এইটি করিও যাঁহারা তোমার স্নেহপাশে বদ্ধ হইবেন, যেন তাঁহাদিগকে, আমাদের মতো, অবিরত দুঃসহ শোকদহনে দগ্ধ হইয়া, যাবজ্জীবন যাতনাভোগ করিতে না হয়।
(সম্পাদিত)
📚 ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১)
জন্ম মেদিনীপুরের বীরসিংহ গ্রামে। বাল্যকাল থেকেই অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। সংস্কৃত কলেজ থেকে বিদ্যাসাগর উপাধি লাভ করেন। পরবর্তীকালে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ হন। শিক্ষাবিস্তার, স্ত্রী-শিক্ষার প্রসার ছাড়াও বিধবাবিবাহ প্রচলন, বহুবিবাহ-রোধ ইত্যাদি বহুবিধ সমাজ-সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর রচিত মৌলিক ও অনূদিত বহু গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
- 'আখ্যানমঞ্জরী'
- 'বোধোদয়'
- 'ঋজুপাঠ'
- 'কথামালা'
- 'বর্ণ পরিচয়'
- 'বেতাল পঞ্চবিংশতি'
- 'শকুন্তলা'
- 'সীতার বনবাস'
- 'ভ্রান্তিবিলাস'
- 'সংস্কৃত ভাষা ও সংস্কৃত সাহিত্যশাস্ত্র বিষয়ক প্রস্তাব'
- 'প্রভাবতী সম্ভাষণ'
তাঁর রচনা একদিকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে তেজস্বী প্রতিবাদ, অন্যদিকে মানবিকতার উজ্জ্বল প্রভায় ভাস্বর।
CONTENT MANAGER