15. সাজ ভেসে গেছে 🎭 | সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
15. সাজ ভেসে গেছে 🎭 | সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ - WBBSE - Class 10 - বাংলা
সাজ ভেসে গেছে 🎭
সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
'আজ্ঞে সার, নাম মইলোবাস, নিবাস সাকিন মাদারহাটি, পোস্টাআপিস গোকরোণ, থানা কান্দি, জেলা মুচ্ছিদাবাদ....'
-'ভালো। কী চাই?'
-'আজ্ঞে, সাহায্যো!'
-'সাহায্য? কেন? কীসের?'
-'আজ্ঞে সার, বেউলোর দলের।'
ব্লকের সরকারী সমাজ শিক্ষা সংগঠক ভুরু কুঁচকে তাকান।— 'সে আবার কী?' সঙ্গে এসেছে মতি চৌকিদার। সবিনয়ে হেসে বুঝিয়ে দেয়, 'বেউলানখিন্দর পালা সার। পেচণ্ড বান-বন্যেয় সাজের বাকসোপেঁটরা সব ভেসে গিয়েছে। দেখুন না, দরখাস্তে অঞ্চলপ্রধান সব নিকে দিয়েছেন। মইলোবাস, দরখাস্তটা আগে দাও সারকে।'
![Image of characters talking at a table]
অফিসার বাবুটি কলকাতার মানুষ। সবে চাকরি পেয়ে এই অখদ্যে জায়গায় এসেছেন। খিকখিক করে হাসেন।—‘তাই বলো। তা কী নাম বললে যেন!'
-মইলোবাস স্যাক, সার।'
অফিসার তাকান লোকটির দিকে। বছর বিয়াল্লিশের মধ্যেই বয়স সম্ভবত। বিশাল শরীর। গায়ে ময়লা হাতাগুটানো রঙিন পানজাবি, পরনে মালকোচা ধরনে ধুতি—এলাকার মাটির হলদে ছোপলাগা, পায়ে রবারের ফাটাফুটো স্যান্ডেল এবং কাঁধে তেমনি শ্রীহীন ঝোলা। লোকটার গায়ের রং তামাটে। খাড়া মস্তো নাক, বড়ো বড়ো কান, টানা চোখে হতচকিত বিহ্বলতা, কপালে তিনটে ভাঁজ। একমাথা বাবরি চুল। তিনি ফের হাসেন—'তুমি তো শিল্পী তাহলে। আর্টিস্ট! হ্যাঁ?'
মতি হাসে। মইলোবাসও সাহস পেয়ে হাসে। মতির সলাতেই এসেছে। মতি বলে—'হুকুম পেলে এক আসর গেয়ে দেবে, সার। কিন্তু পেচণ্ড বানে....'
মইলোবাস যুগিয়ে দেয়—'সাজ ভেসে গিয়েছে।'
অফিসার আরামে হেলান দিয়ে বলেন—'তো মইলোবাসটা কী, বলো তো?'
পিছনে থেকে তৃতীয় একজন, সে একেবারে তরুণ, কালো বেঁটে ও কুচ্ছিত চেহারা, পরনে ধুতি ও নীলচে হাফশার্ট, ব্যাখ্যা করে দেয়—'নাম সার মওলা বখ্শ। অশিক্ষিত লোক সব। কেউ ডাকে মৌলবাস, কেউ মইলোবাস।'
-'তুমি কে?'
-'আমি সার বাহাসতুল্লা। দলে বৈয়ালি করি।'
-'অ্যাঁ?'
এসব আঞ্চলিক টার্ম ভদ্রলোকের জানবার কথা নয়। মতি সব ব্যাখ্যা করে। > বৈয়ালি বা বাইয়ালি করা মানে প্রশ্ট করা। বাহাসতুল্লা অল্পস্বল্প লেখা-পড়া জানে। সে পালার হাতেলেখা মস্তো খাতা প্রশ্ট করে আসরে। তখন তাকে মাথায় হারিকেন চাপিয়ে আলো দেয় যে তার নাম নগেন বাগদি। আঙুলে সিঙ্গি মাছের কাঁটা ফুটে জ্বর হয়েছে বলে আসতে পারেনি। বানের জল নেমে গিয়ে খালে জলায় এখন বেশ মাছ হচ্ছে।
দরবার করতে আরও সব এসেছে। যে বেউলো সাজে, তার গায়ের রং কালো। হালকা গড়ন। মুখে মেয়েলি ছাঁদ। বছর পনেরো ষোলো বয়স হবে। নাম অমূল্য, জাতে বাউরী। আর লখিন্দর? সে না এসে পারে? দল-দল করেই তার বউ পালিয়েছে। তালাক দিতে হয়েছে। কারণ শ্বশুর লোকটা, ফরাজি সম্প্রদায়ের। তাদের কাছে গানবাজনা হারাম - নিষিদ্ধ। বিয়ের আগে জামাই দলের নিছক 'সাপোট্টার' ছিল। হঠাৎ আগের লখিন্দর খুনের মামলায় জেলে ঢুকল। ঢুকল তো ঢুকলই। ফিরতে বুড়ো হয়ে যাবে। তখন খোঁজো নতুন নখাইকে। লখিন্দর বা নখাই হবে সুপুরুষ – ঢলঢল রূপলাবণ্য, আসরে তাকে দেখাবে দ্বারকানদীর আদিম বিশুদ্ধ আকাশের সেই প্রকৃত চাঁদ (মাদারহাটির ধরণী তহশিলদার আজও বিশ্বাস করেন, সেই চাঁদে আমেরিকান বা রাশিয়ানদের বাবার সাধ্যি নেই পা বাড়ায় এবং সোনাই ফকির হুঁ হুঁ হেসে বলেছিল— 'এ চাঁদ কি সে চাঁদ বটে মানিকরা?') সেই চির অলৌকিক চাঁদ ঢুকবে আসরে, চাঁদসদাগরের চোখের মণি! আর চারু মাস্টারের বেহালা শুনে ছৈরদ্দির বিধবা মেয়েটা তখন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদবে। আসরে তখন বিপুল জ্যোৎস্নায় হাজার বছরের গ্রামীণ বিষাদ জেগে উঠবে। সে কী সহজ কথা? খোঁজো সেই আদরের নখাইকে। নখাই মিলেছিল। আকাশ আলি নাম। বাপের নাম আব্বাস হাজি। হজ করেছে-দাঁত পড়েছে। মোড়ায় বসে শণের দড়ি পাকায়। ছেলে নখাই সাজে তো কী করবে? যৈবনে মানুষ বুনো ঘোড়া। বয়স হলে তখন তৌবা করে মক্কা যাবে। ব্যাস!
আকাশ আলি হিরো। তাই তার চুলে তেল বেশি। গায়ে আদ্দির পানজাবি- কিন্তু কুঁচকে জড়োসড়ো। হাতে ঘড়িও আছে। হজে গিয়ে বাপ এনেছিল। পায়ে কাদায় ভূত কাবুলি চপ্পল।
কিন্তু সে বড়ো লাজুক। পিছনেই আছে। দরজার কাছে। আর আছে ‘নারাণবাবু' তবলচি। বাবু মনে বাবুবাড়ির গাঁজাখোর উড়ুক্কু মাস্তান ছেলে। বাড়ি পাশের গাঁয়ে। ভদ্রলোকের গাঁ। বাবা ননী মুখুয্যে পোস্টমাস্টার ছিলেন। ছেলে নারাণ ক্লাস ফোরেই বেরিয়ে পড়েছে, স্বাধীনতার স্রোতে ভাসমান। মদতাড়িগাঁজাভাং জমিয়ে টেনেছে এই বয়সেই। কিন্তু সেও শিল্পী ছেলে। তবলায় ঠুংরিগাইয়ে ওস্তাদ হাবল গোঁসাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। গোঁসাই বলেছিলেন- 'আয় শালা, সঙ্গ ধর।' কিন্তু সমফাঁকের মুখে গোঁসাইয়ের থাপ্পড় মারা অভ্যেস। একে তো সব সময় মাথার মধ্যে ভোঁ বাজে। অগত্যা নারাণ জুটেছে বেউলো দলে। ব্লক আপিসে দলের সঙ্গে রিপ্রেজেন্টশনে এসেছে। কারণ সঙ্গে একজন বাবুটাবু থাকা ভালোই, যদি পাত্তা দেন ওনারা।
অফিসার বলেন- 'তাহলে তুমিই চাঁদ সদাগর?'
মইলোবাস সলজ্জ মাথা নাড়ে। মতি বলে- 'শুধু তাই না সার, ও ছিল একসময় এলাকার সেরা পালোয়ান। মালামোতে ওর জুড়ি ছিল না। সাতখানা মেডেল আছে ঘরে। লতুন গামছা যে কত পেয়েছিল, হিসেব নেই। মৌরীগাঁর বাবুরা পেতলের ঘড়া দিয়েছিলেন। ওনাদের গাঁয়ে হায়ার করে এনেছিল পচ্ছিমে পালোয়ান। ভকতরাম নাম। তাকেও ধুলোপিঠ করেছিল আমাদের মইলোবাস। কিন্তু শরীলে ব্যামো ঢুকল। এখন ভেতরটা ঝাঁঝরা...'
অফিসার কেমন করে জানবেন এসব? খরার দুতিনটে মাস বৃষ্টির আশায় গাঁয়ে-গাঁয়ে মালামো হয় দিনক্ষণ দেখে। একজোড়া ঢোল বাজে। ঢোলের বোল ভারি মজার :
চোল্ ঢিপাকাঠি ঢিপ্ ঢিপাং
ওই শালাকে চিৎপটাং...
জড়াজড়ি দুই জোয়ান মাটিতে দাপাদাপি তুলেছে, গগন-পবন দুভাই ঢুলি তাদের ঘিরে দ্রুততালে বাজাতে থাকে... চিৎপটাং....চিৎপটাং চিৎপটাং...এবং একজন চিৎপটাং হলেই ঢোলে তেহাইয়ের শ্বাসছাড়া আওয়াজটি ওঠে-ডুড়ুম! গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে ওঠে হাজার গ্রামীণ মানুষ: এই ও-ও-ও। গাঁয়ের বউঝি চমকে উঠেই হাসে। হাসিটি হাজার বছরের।
একদা মইলোবাস ছিল পালোয়ান। পালোয়ান ছাড়া চাঁদ সদাগর মানাবে কেন? সওয়া হাত বুকের ছাতি না হলে কেমন করে বেরোবে ও ভয়ঙ্কর গর্জন : 'সাবধানে চ্যাংমুড়ি কানি!'
মাথায় লাল ঝলমলে পাগড়ি, গায়ে লাল রেশমি বেনিয়ান রাংতার কাজ করা, পরনে মালকোচাকরা লাল কাপড়, আর হাতে হিন্তালের লাঠি। উঁচু হয়ে থাকা মুখ, পাকানো বিশাল গোঁপ, কপালে লাল ফোঁটা-সাজঘর থেকে হুংকার দিতে দিতে আসরে আসে- 'জয় শন্তো! জয় শন্তো!'
—'বলো হে চাঁদ সদাগর, একবার পার্ট বলো শুনি!'
মতি শশব্যস্তে বলে — 'নজ্জা করছে সার। সরকারি আপিস বটে কি না। আসরে হলে....'
—'উঁহু, একবার তো শুনি। নৈলে কেমন করে বুঝবো যে সত্যি আছে তোমাদের বেহুলার দল?'
সমস্যা বটে। মতি বলে- 'তিন-পুরুষের দল, সার। নিবাস আলি গোমস্তা পালাটা নেকেছিলেন আমার কত্তাবাবার আমলে। সেই খাতা এখনও আছে। তা থেকে নক্লে নিয়ে চলছে। বিশ্বাস না হলে এনকোয়ারি করে আসুন।'
বৈয়াল বাহাসতুল্লা বলে—'আমার দাদো এখনও বেঁচে আছে, সার। তার মুখেই শুনবেন। ছেলেবেলায় তিনি বেউলো সাজতেন! তেমন বেউলো আর হবে না সার। মৌরীতলার বাবুদের কেষ্টযাত্রার দল ছিল। ওনারা দুবছর আটকে রেখে রাধিকে করেছিলেন। শেষে গাঁসুদ্ধ লোক আসর থেকে তুলে নিয়ে আসে। খুব হ্যাঙ্গামা হয়েছিল সার। বাঁশির মতো গলা, আর চেহারাও সার তেমনি। এখন দেখলে মিথ্যে লাগবে।'
বিরক্ত অফিসার বলেন— 'ঠিক আছে। দেখব'খন। কিন্তু হবে কিনা বলতে পারছি না। এখন এসব ব্যাপার আপাতত বন্ধ।'
মইলোবাস অভিমানে মুখ খোলে আবার। -লক্ষ্মীনারাণপুরের মনিরুদ্দি কেষ্টযাত্রার সাজ কিনতে টাকা পেয়েছে। বাবুদের যাত্রার দল তো সব গাঁয়ে টাকা পাচ্ছে। মনিরুদ্দি আমার ভাইরাভাই সার। সে বললে তোমরাও পাবে। তাই এলাম। আসতাম না-বানে যে সাজের বাকসো ভেসে গেল। মাদারহাটিতে এক বুক পানি হয়েছিল, এনকুরি করুন। করে দেখুন!'
অফিসার তাকিয়ে থাকেন। ভাবেন। তারপর একটু হেসে বলেন- 'চৌকিদার, তুমি কীসের পার্ট করো বললে না তো?'
মতি চৌকিদার-সে সরকারি লোক, পরনে রাজপোশাক, তার দাপটে মাদারহাটি থরথর করে কাঁপে। তারও কালো মুখে লজ্জার রং ঝলকে ওঠে। মাথা নীচু করে বলে— 'আমি সার সঙাল। সঙ দিই। কমিক পার্টও করি। লেজ লাগিয়ে হনুমান সাজি। চাঁদ সদাগরের লৌকো ডুবিয়ে দিই! আবার ফটিকচাঁদ কুম্ভকারও সাজি। কখনও বিবেকও হই। গান গাই।'
-'বাঃ! তাহলে তুমিই একটা গান শোনাও।'
-'আজ্ঞে?'
সকৌতুকে অফিসার বলেন- 'না শোনালে দরখাস্ত পড়ে থাকবে, চৌকিদার।'
অগত্যা একটু কেসে এবং এদিক-ওদিক তাকিয়ে মতি সলজ্জ হেসে বলে— ‘বরঞ্চ ফটিকচাঁদের গানটাই গাই, সার।'
-'বেশ, গাও।'
মতি আচমকা লাফ দিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে গেয়ে ওঠে:
ও কে ডাকলে রে ফটিকচাঁদ পিসে/
আষাঢ় মাসে চাক ঘোরে না রইয়েছি বসে/
ওকে ডাকলে রে-এ-এ এ/....
আপিসসুদ্ধ তোলপাড় অমনি। এ-ঘর-ও-ঘর কেরানিবাবুরা বেরিয়ে আসেন। বিডিও সায়েব বাইরে। কৃষি অফিসার উঁকি মারেন। প্রৌঢ় হেডক্লার্ক বিরক্ত হয়ে গজগজ করেন। কিন্তু ফাইলের একঘেয়েমি হঠাৎ এক আজগুবি ঘটনার তলায় চাপা পড়ে তো মন্দ না। ভিড় জমেছে বারান্দা অব্দি। আরে বাবা, এতো শহরের কেতাদুরস্ত আপিস নয়। মাঠের মধ্যে একতালা কিছু দালান। পিছনে খাল। দিনমান চাষাভূষো লোকের আনাগোনা। আবহাওয়াটাই এ রকম। মিছিল, দাবিদাওয়া, রিলিফ, সেচ, সার, কতরকম ফরিস্তি। তার সঙ্গে কালচার। হ্যাঁ, ফোক কালচার। জাতীয় সড়কের ধারে এই বাঁজাডাঙায় এক সময় ফণিমনসা কেয়া ঝোপ আর বাজপড়া তালগাছ ছিল। সেখানে এখন এই সব বাড়ি আর ফুলবাগিচা। ইউক্যালিপ্টাসের চিরোল পাতা কাঁপে হাওয়ায়। খালের সাঁকোতে জিপের চাকা ঘটঘটাং আওয়াজ তুলে কংক্রিটে গিয়ে উধাও হয়। মাথার ওপর বিদ্যুতের তার। দূর মাঠের দিগন্তে বিশাল মঞ্চের সারি। ফলকে লেখা আছে 'এগারো হাজার ভোেল্ট, সাবধান'। তার নীচে মড়ার মুণ্ডু আর দুটো আড়াআড়ি হাড়। তার আশেপাশে নির্ভীক চাষা লাঙল ঠেলে - উরত্র হট্ হেট্ হেট্...
ততক্ষণে চাঁদ সদাগরও তৈরি। মতির সাহসে সাহস। সামনে এক পা বাড়িয়ে দৈত্যের মতো লোকটা বিকট গর্জে বলে উঠেছে : 'খবর্দার চ্যাংমুড়ি কানি! প্রাণ যদি চলে যায়, পুবের সূর্ষু যদি ওঠে পচ্চিমে, শিব ছাড়া ভজব না-পস্টো কথা কহে দিলাম। দূর হয়ে যাও! দূর দূর দূর...' এবং তারপর যেন পোজপশ্চার দেখিয়ে বুকের পাশে হাত চেপে চুপ করে গেছে।
হো হো করে হাসেন বাবুরা। কেউ-কেউ বলেন- বরং বেহুলার গান শোনাও হে! বেহুলা কই? আসেনি?
বাউরির ছেলে অমূল্য একটু কেসে এক কানের পেছনে হাত রেখে গেয়ে ওঠে :
একো মাসো দুয়ো রে মাসো
তিনো মাসো যায় রে সোনার কমলা ।।
জলে ভেইস্যে যায় রে সোনার কমলা।।
ও কী, জলে ভেইস্যে যায় রে
সোনার কমলা।'
সত্যি বড়ো মিঠে গলা। সুরে আদিম আবেগ আছে একটা। দুয়েকজন বাবুর ফোক সঙের বাতিক আছে। তাঁরা অভিভূত হন। একজন বলেন- 'আমাগো পূর্ববঙ্গে মুসলমানেরাও এগুলা গাইত। আর গাজির গানও ছিল। তহন আমরা সব পোলাপান! এক্কেরে এইটুকুখানি!'
সমাজশিক্ষা সংগঠক বলেন-'রিয়েলি, আমার ধারণাও ছিল না এসব। মুসলমানেরাও বেহুলা-কেষ্টযাত্রা করে? মাই গুডনেস্! শরৎ চাটুয্যের ওই এক গহর ছিল। ভাবতুম, নিছক গুল! অথচ... ভাবা যায় না!'
মাদারহাটির বেহুলা দলটি মুখ তাকাতাকি করে। ছ'মাইল জলকাদার মাঠ ভেঙে এসেছে! সময়টা হেমন্ত। রোদ এখনও কড়া। দরদর করে ঘাম ঝরায়। সবুজ মাঠ এবার পলির রঙে হলুদ। পচা ধানপাতার কটু গন্ধ ছড়াচ্ছে। গাঁয়ে ফিরে এক দফা কটু-কাটব্য শুনতে হবে বুড়োদের। আর কিছু বলার কথা ছিল না? সাজ কেনার সাহায্য চাইতে গেলে এই দুঃসময়ে? ঘরে-ঘরে মুখ চুন, খড়িপড়া চেহারা, রিলিফের পথ চেয়ে উসখুস করছে প্রতীক্ষায়। আর এই দুঃসময়ে কিনা বেউলো দলের সাজ ভেসে গেছে, সাহায্য চাই? লক্ষ্মী-নারাণপুরের মনিরুদ্দি মাস্টার কেষ্টযাত্রার সাজ সাহায্য পেয়েছে, ভালো কথা। সেখানে তো বানবন্যা হয়নি। ডাঙা দেশ। শুখা-খরা নেই। ক্যানেলের জলে চাষ হয়। তাই বলে ডুবো দেশ মাদারহাটির তো এ সখ মানায় না-
তবে সে জন্যে এদের মুখ তাকাতাকি নয়। সার যে গহরের নাম করলেন, তাই শুনে। তার সঙ্গে চাটুয্যেও বললেন। এতেই সব প্রাঞ্জল হয়েছে। নতুন গাঁর গহর আলি পাক্কা ছড়াদার অর্থাৎ কবিয়াল। তার গুরু চাটুয্যে বটেন, তবে শরৎচন্দ্র নন-পূর্ণচন্দ্র। পূর্ণবাবু এখন বুড়োমানুষ। তার ওপর সেবার গাজনে নিজের বেহাইয়ের নামে (কেলেঙ্কারির) সঙের গান বেঁধে জামাই চটান এবং মেয়ের দুর্ভোগ বাধিয়ে বসেন। শেষে অব্দি মেয়ের মাথায় হাত রেখে প্রতিজ্ঞা করেছেন, এই শেষ। ওদিকে গহরের রবরবা বেড়ে যায়। সেই গহরেরও এবার বরাত মন্দ। নতুন গাঁ ডুবেছে। গহর বুক চাপড়ে কেঁদেছে। সদ্য কিনে আনা ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণখানাও সর্বনাশা দ্বারকা ভাসিয়ে নিল! রামায়ণ-মহাভারত গেল যাক। ওস্তাদ চাটুয্যে বলেছেন—আমাদের-আমার-গুলো নিয়ে যেও। পদ্মপুরাণ, মার্কণ্ডেয় পুরাণ, কালিকাপুরাণ, প্রভাসখন্ড চেয়ে-চিন্তে কদিনে ধারে যোগাড় করেছে রমজান দোকানীর কাছে। দোকানীর কারবার নুন তেলের। যৌবনে সখ ছিল ছড়াদার হবে। হতে পারেনি। কিন্তু শাস্ত্র-পুরাণতত্ত্বে মহা ধুরন্ধর সে। বড়ো বড়ো কবির আসরে প্রখ্যাত কবিয়ালদেরও আসর থেকে উঠে আচমকা
এমন প্রশ্ন করে, ঘোল খাইয়ে ছাড়ে। এদিকে সন্ধ্যার নমাজের আজান শুনলে মাথায় টুপি দিয়ে মসজিদে যায়। তার তিন ছেলেও ও সব তত্ত্বে বিশারদ। বোলানের দল করেছে। তারা আসরে প্রতিপক্ষকে কাবু করতে চায়। পাল্টা কাবু হলে বাপের কাছে দৌড়ে আসে।.... হ্যাঁ গো, কুশঘাসের জন্ম কীসে বলে দাও তো শিগগির? রমজান হেসে বলে-বরাহ অবতারের তিন গাছা লোম তুলে রেখেছিলেন মহামুনি বাল্মীকি। তাই থেকে কুশ। তবে পাল্লাদারকে শুধোস তো বাবা, আদিতে যখন নিরাকার, তখন ভগবান ভাসলেন বটপত্রে। বটগাছ নিরাকার ব্রহ্মাণ্ডে তাহলে এল কোত্থেকে? এমনি সব পৌরাণিক রহস্যের জগতে বাস তাদের। একখানা ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ বন্যায় ভেসে গেলে একটা রহস্যময় ভূভাগ হারিয়ে গেল সামনে থেকে। সবে সৃষ্টি বর্ণনাটা পড়া হয়েছিল গহরের। এই দুঃসময়ে দশটা টাকা পাবে কোথায়?
তল্লাটে একখানা আছে বটে, তার খোঁজ গহর রাখে। গুনুটির মুকুন্দ রাজবংশীর। একবার মেডেল আর কলা আসরে ঝুলিয়ে কবির লড়াই চলেছে ঈশানপুরের মেলায়। বিপক্ষ কবিয়াল প্রশ্ন করেছে, ব্রহ্মার কন্যার নাম কী? জবাব জানে না গহর। রসিক শ্রোতা মুকুন্দ আসরেই বসে ছিল। বলেছিল-নামটা আম্মো জানি। পেটে আসছে, মুখে আসছে না। ঘরে শাস্তর আছে আমার। না বলতে পারলে কলা পাবে গহর। কাকুতি মিনতি করে মুকুন্দকে রাজি করাল। দুজনে চুপিচুপি শেষরাতে জলকাদা ভেঙে গুনুটি গেল। লম্ফ জ্বেলে নামটা খুঁজল। হুঁ সন্ধ্যা। দুজনে আসরে ফিরল আবার। গহর সেবার মেডেল পেয়েছিল। সেই থেকে দুজনে বড়ো ভাব। কিন্তু ওই পর্যন্তই। মুকুন্দ প্রাণ গেলেও বই হাতছাড়া করবে না।
এসব খবর কিছু গোপন থাকে না তল্লাটে। গাইয়ে-বাজিয়েদের কাজ মানুষ নিয়ে, মানুষের সঙ্গে। আবেগবান হৃদয়। সহজেই সব গলগল করে উগলে দেয়, সমস্যা বা সুখ দুঃখ। কে না জানে সর্বনাশা বানের পর গহর হাহাকার করে বলে বেড়াচ্ছে, আমার মাগ ছেলে ভেসে গেল না কেন? আমি ভাসলাম না কেন? হায় রে হায়, আমার বুকের নিধি ভেসে গেল...
তাহলে কি সরকার বাহাদুরের দয়া হয়েছে হতভাগা ছড়াদারের প্রতি? মাদারহাটির সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিরা মুখ তাকাতাকি করে। খুশি হয়। আশা জাগে। মতি চৌকিদার বলে- 'গহর টাকা পেল, সার?'
শুনেই অফিসার হো হো করে হাসেন। এত জোরে হাসেন! দলসুদ্ধ চোখে পলক পড়ে না। এ হাসি কীসের বোঝে না তারা। একটু পরে হঠাৎ গম্ভীর হয়ে তিনি বলেন- 'গহরকে চেনো?'
মতি বলে- 'চিনি সার। লতুন গাঁর। উঠি কবেল। ভালো গায়।'
অতি গম্ভীর অফিসার মাথা দুলিয়ে বলেন- 'সে গহর নয়। যাক গে, শোনো! এখন তো ফ্লাড্ রিলিফের সময়। এখন কালচারাল ব্যাপারে টাকা-পয়সা দেওয়া আপাতত বন্ধ। কয়েক মাস যাক। এসো। দেখব'খন।'
সকাতরে মইলোবাস বলে- 'সামনে মাসে লবান্ন হবে সার। তখন বায়না পাব। কী নিয়ে গান করব?'
—'নবান্ন?' উনি একটু হাসেন আবার। 'ধান তো পচে গেছে। নবান্ন কীসের?'
গতিক বুঝে মতি ব্যাখ্যা করে- 'ডুবো দেশে বান হয়েছে। কিন্তু ডাঙাদেশে তো ধান হয়েছে সার। সেখানে লবান্ন হবে। মাদারহাটির বেউলো না শুনে লবান্ন হবেই না। খুব নামকরা দল। অঞ্চলে পেধান...'
অফিসারটি ঘড়ি দেখে বিরক্ত হলো এবার।- 'যারা বায়না দেবে, তাদেরই বলো গে না বাবা! আপাতত কোনো উপায় নেই। আচ্ছা, তোমরা এসো। আমি বেরোেব...'
সামনে অঘ্রান। এবার অঘ্রানে ডাঙাদেশে অর্থাৎ উঁচু মাটির এলাকায় শুভদিন বেছে বেছে নবান্ন উৎসব হবে গাঁয়ে-গাঁয়ে। হিন্দু-মুসলমান সবারই উৎসব। মুসলমানরা জামাই আনবে। কত খাওয়া-দাওয়া হবে। হবে না শুধু মাদারহাটি-নতুন গাঁ-ন'পাড়া- রামেশ্বরপুর এলাকার বানভাসা গাঁগুলোতে। পচা ধানের কটু গন্ধে বাতাস ভরা এখানে। বাবুরা লঙ্গরখানা খুলেছেন ইতিমধ্যে অনেক জায়গায়। টেস্ট রিলিফের কাজও চলছে অল্পস্বল্প। মাদারহাটির কাদা এখনও শুকোয়নি। ধসে যাওয়া ঘরের উঠোনে অনেক পরিবার খয়রাতি তেরপলের তলায় বাস করছে। কিছু জোতজমিওলা গেরস্থর উঁচু ভিটের বাড়ি এখনও টিকে আছে। বেউলো দলের দু-চারজনেরও দৈবাৎ টিকেছে। ঘর গেছে স্বয়ং চাঁদ সদাগরের। তার ঘরেই ছিল সাজের বাক্স। গাঁয়ের শেষে ঢালু জমিতে তার বাড়ি। নিশুতি রাতে আচমকা বিলের জল হু হু করে এসে ধাক্কা মেরেছিল। কোনোমতে বউ আর চার-পাঁচটা কাচ্চাবাচ্চাকে জানে বাঁচাতে পেরেছিল। তার প্রায় সবই ভেসে গেছে। কিন্তু গতর আছে যখন, সব করে নেবে। আবার ঘর বানাতে পারবে। জমিতে চৈতালি ফলাতে পারবে। তাই সে নিয়ে ভাবনা নেই-ভাবনা সাজ ভেসে গেছে। দেড়-দুশো টাকার কমে এ বাজারে পুরো সাজ হবে না। কিছুটা চাঁদায়, কিছুটা কয়েক আসরের বায়নার টাকা জমিয়ে আগের বছর নতুন সাজ কেনা হয়েছিল। হারমোনিয়াম তবলা ঢোল কত্তালগুলো ভাগ্যিস ছিল আকাশ আলির বাড়ি। উঁচু ভিটে তাদের। সামনের খামার বা উঠোনটাও উঁচু। সেখানে বৃষ্টিহীন রাতে ‘রিহাস্যাল' চলে। তাই ও বাড়ি ছিল যন্তরগুলো। যদি সাজের বাক্সটাও রাখা হতো সেখানে, এই বিপদ ঘটত না। তবে এখন আর পস্তে কী হবে?
বিনিসাজে গাইতে গেলে কেউ শুনবেই না পালা। কেন শুনবে? নগদ পাঁচ টাকা বায়না, তিন ধামা মুড়ি, আধ টিন গুড়- তার ওপর বিড়িও আছে। দুরের গাঁ হলে তো ডাল ভাতও খাওয়াতে হয়। এত সব খরচ করে লোকে সাজের ঝলমলানি দেখবে না? তা ছাড়া তলোয়ার? হায় হায়! ও দুটোও বাক্সের মধ্যে ভরা ছিল! মুকুট ছিল। ঝকমকে ত্রিশূল ছিল। বল্লম ছিল। পুঁতির মালা ছিল। হা বাবা আল্লা ভগবান! এর চেয়ে চাঁদ সদাগরকে ভাসিয়ে নিলি না ক্যানে?
মাঠের পথে দলটা গাঁয়ে ফিরে চলেছে। হতাশ, ক্লান্ত, চুপচাপ। মইলোবাস মাথাটা ঝুলিয়ে হাঁটছে সবার পিছনে। তার মনে অপরাধবোধ প্রচণ্ড। তার ঘরেই তো সাজের বাক্স ছিল। এখন ব্যর্থ দরবারের পর সেই অপরাধবোধ আরও তীব্র হচ্ছে। চাঁদ সদাগর সে। তার আত্মায় দাঁড়িয়ে আছে এক অহঙ্কারী উদ্ধত বিশাল পুরুষ-ক্রমশ দিনে দিনে সে তাকে দেখতে পেয়েছে। আসরে জনমণ্ডলীর সামনে যখন সেই ভিতরের পুরুষ পা ফেলে হাঁটে-সাজঘর থেকে আসরে, তার মনে হয় কাকেও পরোয়া করার নেই। গায়ে সাজ চড়ালে দফাদার কনস্টেবল দারোগা এস-ডি-ও ম্যাজিস্ট্রেট বাহাদুর তাবৎ সরকারি ব্যক্তি ও ক্ষমতাকে সে গ্রাহ্যই করবে না! আর তখন সে তো এ যুগের মানুষ নয়! তখন তার সাত ছেলে সাত সাতটা বাণিজ্যতরি নিয়ে সমুদ্দুরে চলেছে। তরি ডুবে যাওয়ার খবর দিয়েছে বিবেক। তো কীসের পরোয়া? জয় শন্তো জয় শন্তো! চ্যাংমুড়ি কানিকে পুজো করবে তাই বলে? হাতের হিন্তাল যষ্টি নাড়া দিয়ে গর্জন করেছে সে। তার ঠোঁটে ঘৃণা, চোখে ঘৃণা। হুঁ, এখন বাবুই হও, লাট বেলাটিই হও-তফাত যাও। চাঁদ সদাগর জানে শুধু একজনকে। তিনি শম্ভু - শিব। দেবাদিদেব মহাদেব। এই ভাই বইয়াল! আস্তে। পাট মুখস্থ আছে। গায়ে সাজ চড়ালেই সব মুখের ডগায় ভেসে আসে। সাজ চড়ালেই তাকে 'সে' এসে ভর করে—যে মাথা নোয়াতে জানে না। সাজ চড়িয়ে সে স্পষ্ট দেখতে পায়
কঠিনতম লোহার বাসরঘর- দেয়াল ঘুরে হিন্তাল কাঠ কাঁধে নিয়ে পাহারা দেয়। হায়, সেই ঘরে ছিদ্র ছিল। সোনার নখাই নীলবর্ণ হলো। চাঁদ সদাগরের মাথা ঝুলে পড়ে।— 'আঃ আঃ আহা হা!'
—'কী হলো হে মইলোবাস? পাট বুলো নাকি?'
মতি চৌকিদার পিছন ঘুরে বলে। কেউ কেউ হাসে। মইলোবাস বলে, 'না।'
-'কী বুলছ মনে হলো?'
- 'হুঁ, একটা কথা ভাই চৌকিদার।'
— 'বুলো।'
এখন নিজেদের ভাষায় কথা বলছে ওরা। এ তো বাবু ভদ্রজনের সঙ্গে কথা বলা নয়, আপিস-কাছারিও নয়। এখন মাতৃভাষায় না বললে সুখ নেই। ওকে চুপ করে থাকতে দেখে মতি আবার বলে- 'বুলো হে কথাটা!'
-'যদি সাজের বাকসোটা আকাশের ঘরেই থাকত!'
মতি ভর্ৎসনা করে- 'আবার উই কথা? সেই এক কথা?'
-'ই দুঃখুটা মলেও যাবে না ভাই!'
-'আবার কিনব। ভগবান মুখ তুলে তাকাক।'
চুপ করে যায় বিশালদেহী মানুষটা। আবার ভেসে ওঠে কিছু প্রতিচ্ছবি- সামিয়ানার তলায় হ্যাসাগের শনশন শব্দ ভাসে, চারপাশে মুগ্ধ শ্রোতা, চারু মাস্টারের বেহালা বাজে করুণ সুরে। আর সাজঘর থেকে ঝলমল লাল পোশাকে হিন্তালের লাঠি নেড়ে এগিয়ে আসে চাঁদ সদাগর। কী তার রূপ! মুহূর্তে আসর চুপ। কেঁদে ওঠা বাচ্চার মুখে মায়ের থাবা পড়ে। জয় শন্তো! জয় শন্তো! যেন আকাশে মেঘ ডাকে।... ‘সাজের বাকসোটা!'
-'আবার? তুমার মাথাটা খারাপ হয়ে যাবে, মইলোবাস। সাবোধান।'
আবার চুপ। ক্রমশ মাঠ ধাপে ধাপে নেমে গেছে নাবাল অঞ্চলের দিকে। দেখতে দেখতে সূর্যও ডুবেছে। ধূসর আলোয় দূরের গ্রাম কালো হয়ে আসছে। ধানপচার গন্ধ, পলির গন্ধ, মরা জানোয়ারের হাড়গোড়ের গন্ধ। নাক ঢেকে দলটা চুপচাপ থাকে। সবার পিছনে মইলোবাস।
এবং একটু পরেই- 'আঃ আহা হা হা!'
মতি একবার ঘোরে। কিন্তু কিছু বলে না। কী বলবে? হাহাকার তো তার বুকেও কম জমে নেই। ডাঙাদেশে নবান্নের মরশুম এবার তাদের ফাঁকা যাবে। অন্য দল এসে গাইবে। তারা হবে শ্রোতা। গভীর ঈর্ষায় চনমন করবে। ফটিকচাঁদ কুমোর তার মতো করুক না, কে করে! তার মতো হনুমান সাজুক না, কে সাজে!
আবার পিছনে ডুকরে ওঠা চাপা আক্ষেপ-আঃ হা হা হা!
মতি চৌকিদার অফিসারকে বলছিল-এখন শরীলে ব্যামো। ভেতরটা ঝাঁঝরা। ঝাঁঝরাই বটে। সাত বছর ধরে মইলোবাস চাঁদ সদাগরের পার্ট করে আসছে। এ সাত বছর সে মালামো লড়েনি। সাত বছর আগের জ্যৈষ্ঠে তার শেষ লড়াই হয়েছে গঙ্গার পূর্বপারের প্রখ্যাত কুস্তিগির মোহিনীবাবুর সঙ্গে। কী সব মারাত্মক প্যাঁচ জানত
মোহিনীবাবু! এমনভাবে ফেলে দিল যে তারপর বাড়ি ফিরে থুথুর সঙ্গে রক্ত ওঠে। প্রথমটা গ্রাহ্য করেনি। পরে বুকে ব্যথা বাড়লে ডাক্তার দেখিয়েছিল। বুকের ছবি তুলতে হয়েছিল। পাঁজরের একটা কাঠি ভেঙে গেছে। সেই ভাঙা পাঁজর নিয়ে সাত বছর কাটাচ্ছে। কলজেতেও একটু দাগ পড়েছে। এখনও গতর খাটতে মাঝে মাঝে টাটানি টের পায়। বোঝা তুলতে কষ্ট হয়। জোরে চেঁচাতে গিয়েও দম আটকায়।
অথচ যেদিন থেকে চাঁদ সদাগরের সাজ গায়ে চড়াল, যেন ভাঙা ঝাঁঝরা শরীলের মধ্যে এসে দাঁড়াল এক বিশাল শক্তিধর পুরুষ। যতক্ষণ সাজ গায়ে থাকে, ততক্ষণ সে সেই বীর্যবান দুর্ধর্ষ পুরুষ। মেঘের মতো হাঁকলেও দম আটকায় না। আসরে দেবী মনসার সামনে ভাঙা পাঁজরে হাতের থাপ্পর মেরে সগর্জনে বলে- 'সাতটা পুত্রসন্তান আমার, সাতখানি বন্ধের পাঁজর। ভাঙবি তো ভাঙ রে বুড়ি চ্যাংমুড়ি, তবু কভু ভুরুক্ষেপ নাই!' সামনের মাটিতে জোরে লাথি মারে সে। টেরই পায় না কলেজটা চড়াৎ করে ওঠে কি না। কিন্তু আসরের পর দিনে মাঠের জমিতে হাল বাইবার সময় হঠাৎ খামচানি ব্যথা বুকের মধ্যিখানে—হাত চেপে সে বলদ ডাকায়-ইরর্ হেট্ হেট্
সেই ব্যথাটা এতক্ষণে অন্ধকার মাঠে জেগে উঠেছে। মইলোবাস ককিয়ে উঠছে পাঁজরে হাত চেপে- 'আঃ হাহাহা!'
মতি ভাবছে সাজের বাকসোর দুঃখে ককাচ্ছে লোকটা, বাহাসতুল্লাও তাই ভাবছে। আকাশ আলি, নারাণবাবু—আর সবাই। জলকাদায় পা ফেলার শব্দ উঠছে। চারদিকে জোনাকি উড়ছে। দূরে শেয়াল ডেকে উঠল। খালে এক কোমর জল। একে-একে পার হয়ে যায় সবাই। ওপারে বাঁধ। জায়গায়-জায়গায় ধসে গেছে। আর মোটে এক মাইল দূরে গাঁ। বাঁধে উঠে মতি চৌকিদার বলে— ‘এসো, বিড়ি খেয়ে লিই।'
দেশলাই জ্বালে কেউ কেউ। বিড়ি ধরায়। বৈয়াল বলে- 'চাঁদ সগাদর! বিড়ি লাও হে!'
মতিও ডাকে—'কই হে নখাইয়ের বাপ! ধুয়োমুখ করো!'
আকাশভরা নক্ষত্রপুঞ্জ এই হেমন্তের রাতে। বাঁধের ওপর শুকনো মাটিতে বসে পড়েছে সবাই। নক্ষত্র দেখতে বিড়ি টানছে। পাশে জুতো রেখেছে। কাপড় ঊরুর ওপর গোজা-যা জলকাদা! নীচে ঘন পাটবন। বন্যায় গলা অব্দি ডুবেছিল। অন্ধকার পাটবনের ওপর জোনাকির আলো। আকাশ আলি দেখতে দেখতে ডাকে—'পিতাঠাকুর, উই দ্যাখো তুমার সাজ!' আবার মুখ তুলে আকাশ দেখে আকাশ আলি বা লখিন্দর হাসতে হাসতে ডাকে—'পিতাঠাকুর হে! পরবে নাকি উই সাজ? নকশাখানা দেখো!'
রসিক মতি রসিকতায় সাড়া দিয়ে বলে- 'তুমার পিতাঠাকুরের নাল রং পছন্দ। সেবারে খাগড়ার বাজারে সাহাবাবুর সাজের দোকানে আমার পছন্দ হলো একখানা জামা। ওইরকম কালোর ওপরে সোনালি কাজকরা। বুইলে? খাঁটি বেলবেট। আমি বুললাম—দাম? তো পঞ্চাশ টাকা। তো বুললাম, মইলোবাস, টাকা থাকলে ই সাটজাই লিতাম। তুমাকে যা মানাত! হুঁ! ঘাড় নেড়ে বুললে-আমার নাল রং পছন্দ!'
বৈয়াল বলে- 'পালোয়ান লাল রঙেরই ভক্ত!'
আকাশ ফের ডাকে—‘কই বাপ পিতাঠাকুর, নখাই এত ডাকছে, কথা বুলো না ক্যানে?'
তারপর খোঁজ পড়ে যায়। সবাই ডাকাডাকি করে। দলে তো নেই, কখন পিছিয়ে পড়েছে দেখ দিকি! মতি
চেঁচিয়ে ডাকে-'মইলোবাস হে! হেই-ই-ই...'
অন্ধকার স্যাঁতস্যাঁতে জলকাদার পৃথিবীতে ডাকটা কেঁপে কেঁপে মিলিয়ে যায়। ওই পরিব্যাপ্ত অন্ধকারে কোথায় একা থেকে গেল এক অভিমানী ক্ষুব্ধ সাজহীন বিশাল মানুষ?
ফটিক কুম্ভকার, নখাই আর বৈয়াল খালের জলে নামে। পাড়ে উঠে তিনজনে একগলায় ডাকে—'হেই-ই-ই-ই...'
আলের পথে পা বাড়াতেই ঠোক্কর খেয়ে মতি পড়ে যায়। চেঁচিয়ে ওঠে- 'মইলোবাস! ও মইলোবাস! পড়ে আছ ক্যানে ভাই? কী হলো তুমার? কী হয়েছে?'
নখাই দেশলাই জ্বালে। মুখের ওপর। ঠোঁটের দুপাস রক্ত নিয়ে হাঁফাচ্ছে বিশাল সেই পুরুষ-নাকি বিশাল সেই পুরুষের খড়মাটির টাট—সাজহীন। অনেক কষ্টে বলে—‘পা পিছলে পড়েছিলাম।... আমি বাঁচব না হে... বাঁচব না!'
মতি কেঁদে কেটে বলে- 'রেতের বেলা জলকাদার রাস্তায় অমন করে হাঁটে ভাই? বুয়েছি, বুয়েছি! উই কথাটাই তুমাকে খেলে হে! উই ভাবনাটাই তুমার বিনেশ কল্লে! আঃ হা হা!'
তিনজনে ধরাধরি করে বয়ে নিয়ে চলে চাঁদ সদাগরকে। পাঁজরভাঙা, কলজেয় দাগধরা শরীর থেকে গভীরতর দুঃখের মতো রক্ত গড়ায় কষ বেয়ে। এবার প্রকৃতি নিজের হাতে তাকে শেষবার লাল পোশাক পরিয়ে দিচ্ছেন। তবু সে বিড়বিড় করে বার বার- 'সাজের বাকসোটা ভেসে গেল হে! সাজের বাকসোটা...'
সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ (১৯৩০-২০১২) 📝
মুরশিদাবাদ জেলার খোশবাসপুর গ্রামে জন্ম। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান ঔপন্যাসিক ও ছোটোগল্পকার। তাঁর প্রথম উপন্যাস 'নীলঘরের নটী' (১৯৬৬)। বহু উপন্যাস, গল্প ও প্রবন্ধ লিখেছেন। তাঁর লেখা কয়েকেটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস:
- 'কৃষ্ণা বাড়ি ফেরেনি'
- 'বিপজ্জনক'
- 'সোনার ঠাকুর'
- 'তৃণভূমি'
- 'অলীক মানুষ'
- 'নির্বাসনের দিন'
- 'সাজঘর'
- 'চেরাপুঞ্জির পথে শীত'
- 'স্রোত'
- 'পুষ্পবনে হত্যাকান্ড'
- 'লড়াই'
- 'শূন্যের খেলা'
- 'বুঢ়াপীড়ের দরগতিলায়'
প্রভৃতি তাঁর লেখা বিখ্যাত গল্প। 'কর্ণেল' তাঁর সৃষ্ট শিশু-কিশোরসাহিত্যের একটি জনপ্রিয় চরিত্র। সাহিত্য রচনার স্বীকৃতিতে তিনি 'ভূয়ালকা পুরস্কার', 'বঙ্কিম পুরস্কার', 'সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার', 'নরসিংহদাস স্মৃতি পুরস্কার', 'শরৎচন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার', 'শৈলজানন্দ স্মৃতি পুরস্কার' প্রভৃতি লাভ করেন।
CONTENT MANAGER