২. অধ্যায় | সময় ও গতি | পৃষ্ঠা ৭০-৮৪
২. অধ্যায় | সময় ও গতি | পৃষ্ঠা ৭০-৮৪ - WBBSE - Class 7 - Default Subject
⏳ সময় ও গতি
💡 গতির ধারণা
নীচের বর্ণনাগুলি থেকে উপযুক্ত উত্তর বেছে নিয়ে সারণিটি পূর্ণ করো।
- সরলরৈখিক গতি
- বৃত্তাকার পথে গতি
- ঘূর্ণন গতি
- ঘূর্ণন ও সরলরৈখিক গতির মিশ্রণ
- বক্রপথে গতি।
| বিভিন্ন ধরনের গতির উদাহরণ | কেমনভাবে গতিশীল |
|---|---|
| (1) রুলারের ধার বরাবর পেনসিল দিয়ে সোজা দাগ কাটার সময় পেনসিলের শিসের অগ্রভাগের গতি। | সরলরৈখিক গতি |
| (2) ঘড়ির কাঁটার অগ্রভাগের গতি। | |
| (3) ছাদ থেকে সামনের দিকে ছুড়ে দেওয়া পাথরের গতি | |
| (4) নাগরদোলার গতি | |
| (5) এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পাক খেতে থাকা লাট্টুর গতি | |
| (6) ঘড়ির পেন্ডুলামের গতি | |
| (7) সোজা রাস্তা বরাবর চলন্ত গাড়ির গতি | |
| (8) সরলরেখা বরাবর চলন্ত সাইকেলের চাকার গতি | |
| (9) স্ক্রু-ডাইভারের গতি | |
| (10) বৈদ্যুতিক পাখার গতি |
পাশে যে পাতার চিত্রটি আছে একটি পিঁপড়ে তার ধার বরাবর A থেকে B -তে যাচ্ছে। খাতায় তার গতিপথের চিত্র অঙ্কন করো।
পিঁপড়েটি যদি পাতার কিনারা ধরে না গিয়ে পাতার মোটা শিরা বরাবর A থেকে B -তে যেত তাহলে তার গতিপথের চিত্র কেমন হতো তা খাতায় আঁকো।
তোমার আঁকা চিত্র থেকে নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজো :
- প্রথমে A থেকে B -তে যাওয়ার সময় পিঁপড়ের গতিপথের অভিমুখ কি সবসময় একই দিকে ছিল?
- দ্বিতীয়বার তার গতির অভিমুখ কি সবসময় একই দিকে ছিল?
এইরকম আরো কয়েকটি উদাহরণ ভাবার চেষ্টা করো যেখানে এক জায়গা থেকে অন্য এক জায়গায় বিভিন্ন পথে যাওয়া যায়। প্রত্যেকটি উদাহরণের কথা খাতায় লেখো ও তার গতিপথের চিত্র আঁকবার চেষ্টা করো।
⏳ সময় ও গতি
আগের আলোচনায় পিঁপড়েটি প্রথমে যে পথে পাতার কিনারা বরাবর A থেকে B -তে পৌঁছোল তার সমগ্র দৈর্ঘ্য হলো পিঁপড়ের প্রকৃত অতিক্রান্ত দূরত্ব। এক্ষেত্রে পিঁপড়েটি যদিও AB সরলরেখা ধরে যায়নি, তবু AB সরলরেখার দৈর্ঘ্য এই যাত্রার একটি সামগ্রিক ধারণা দেয়। A থেকে B এর দিকে AB সরলরেখার এই মাপকে বলে সরণ। এক্ষেত্রে অতিক্রান্ত দূরত্ব ও সরণের মাপ আলাদা।
দ্বিতীয় ক্ষেত্রে A থেকে নির্দিষ্ট দিকে মুখ করে সরাসরি B -তে যাওয়ার যে পথ, তার দৈর্ঘ্য এবং ওই নির্দিষ্ট দিক একত্রে উল্লেখ করলে তাকে বলা হয় সরণ। এক্ষেত্রে অতিক্রান্ত দূরত্ব আর সরণের মাপ একই, কারণ পিঁপড়েটি সত্যি সত্যি AB সরলরেখা ধরেই গিয়েছিল।
অতএব দেখলে যে, কোনো গতির সময় আসল যাত্রাপথের দৈর্ঘ্য এবং সরণের দৈর্ঘ্য আলাদা হতে পারে বা একই হতে পারে। এই দুয়ের মধ্যে সরণ সরলরেখা বরাবর এবং তাই একটি নির্দিষ্ট দিক উল্লেখ করে গতির বর্ণনা দেওয়া যায়। যেমন A থেকে B -তে যাবার সময় যাত্রাপথ যখন পাতার ধার বরাবর, তখন পিঁপড়েটি আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে যাচ্ছে, ফলে এক এক সময় এক এক দিকে যাওয়ার প্রবণতা থাকছে। ফলে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সরলরেখাংশ এঁকে সরণ বুঝতে হচ্ছে। যেমন A থেকে P-তে বাঁকা পথে যাবার সময় AP সরলরেখাংশ এঁকে সরণ বুঝতে হবে। P থেকে Q-তে বাঁকা পথে যাবার সময় PQ সরলরেখাংশ এঁকে সরণ বুঝতে হবে।
ফলে, A থেকে যাত্রা শুরুর সময় পিঁপড়েটির যাবার প্রবণতা P -এর দিকে, আবার P বিন্দু দিয়ে যাবার সময় যাবার প্রবণতা Q -এর দিকে ইত্যাদি। অতএব, আঁকাবাঁকা যাত্রাপথে, চলার দিক ঠিক কোনটি তা হয়তো ওই মুহূর্তে বলা যায়, কিন্তু শেষ অবধি ঠিক কোন দিকে যাওয়া হলো তা যাত্রাপথের শেষ বিন্দুটি না জানলে বলা যায় না। শেষ বিন্দুটি জানা হয়ে গেলে তখন বলা যায় যে, A থেকে B -এর দিকে যাওয়া হয়েছে। বোঝা গেল যে, সরণ জানা থাকলে তবেই যাত্রার অভিমুখ বলা যায়, অন্যথায় নয়।
ছবিতে যেমন দাগ দেওয়া আছে সেইরকমভাবে A থেকে B -তে যাওয়া হলে সরণ AB এবং তা A থেকে B -এর দিকে, তেমনি A থেকে P-তে যাওয়া হলে সরণ AP এবং তা A থেকে P -এর দিকে। একইভাবে P থেকে Q-তে যাবার সময়, সরণ PQ এবং তা P থেকে Q-এর দিকে ইত্যাদি।
তাহলে, কোনো একটি বস্তু যদি একটি বিন্দু M থেকে অন্য একটি বিন্দু N পর্যন্ত আঁকাবাঁকা পথে যাত্রা করে, আমরা বস্তুটির যাত্রাপথের দু-রকম দৈর্ঘ্যের হিসাব করতে পারি। একটি হলো আঁকাবাঁকা পথটির মোট দৈর্ঘ্য, আর অন্যটি হলো MN সরলরেখাংশের দৈর্ঘ্য, যদিও বস্তুটি MN সরলরেখা ধরে সত্যি সত্যি যাত্রা করেনি। এই MN সরলরেখাংশের দৈর্ঘ্য হলো বস্তুটির সরণের মাপ।
⚡ দ্রুতি, বেগ, ত্বরণ
যে-কোনো দূরত্ব অতিক্রম করতে একটা সময় লাগে। ঘড়ি ধরে সেই সময় মাপাও যায়। কিন্তু এখন প্রশ্ন, দূরত্ব
🧪 পরিবেশ ও বিজ্ঞান
বলতে আমরা ঠিক কি বুঝব? A থেকে P -তে যাবার সময় পাতার ধার ধরে গেলে বাঁকা রাস্তার পরিমাপ, না কি, A থেকে P পর্যন্ত সরলরেখাংশ AP -র পরিমাপ? একইভাবে A থেকে B -তে যাওয়ার সময় পাতার ধার বরাবর আঁকাবাঁকা পথটির পরিমাপ, না কি AB সরলরেখাংশের পরিমাপ? – আমরা যদি বক্র পথটির প্রকৃত দৈর্ঘ্য মাপি তাহলে সেই দূরত্বকে আমরা বলি প্রকৃত অতিক্রান্ত দূরত্ব এবং যদি সরলরেখাংশ বরাবর দৈর্ঘ্য মাপি তাকে বলি সরণ। এবার যদি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দূরত্ব কীভাবে বদলাচ্ছে তা হিসাব করতে চাই তাহলেও দু-ভাবে তা করতে পারি- সময়ের সঙ্গে প্রকৃত অতিক্রান্ত দূরত্ব কীভাবে বদলাচ্ছে এবং সরণ কীভাবে বদলাচ্ছে। দুটি হিসেব কিন্তু এক না-ও হতে পারে।
একটি উদাহরণ
| যাত্রাপথের মাপ | যেতে সময় |
|---|---|
| প্রকৃত দূরত্ব (সেমি) সরণ (সেমি) | লেগেছে |
| A থেকে P = 5 | AP = 2 |
| A থেকে Q = 10 | AQ=3 |
| A থেকে R = 15 | AR = 4 |
এখন যদি কেউ জানতে চায় যে প্রতি সেকেন্ডে পিঁপড়েটি কতটা দূরত্ব অতিক্রম করেছে, তাহলে দুটি উত্তর হতে পারে- একটিতে দূরত্ব বলতে প্রকৃত দূরত্ব, আর অন্যটিতে দূরত্ব বলতে সরণের মাপ ধরলে উত্তর আলাদা হবে, যদিও একই পিঁপড়ের একই গতি নিয়ে হিসেব হচ্ছে।
5 সেকেন্ডে পিঁপড়ের প্রকৃত অতিক্রান্ত দূরত্ব 5 সেমি অতএব 1 সেকেন্ডে পিঁপড়েটির প্রকৃত অতিক্রান্ত দূরত্ব = 5 সেমি / 5 = 1 সেমি
একই সঙ্গে বলা যায়, 5 সেকেন্ডে পিঁপড়েটির সরণ 2 সেমি অতএব 1 সেকেন্ডে পিঁপড়েটির সরণ = 2 সেমি / 5 = 0.4 সেমি
প্রথম হিসেবটিকে বলে গড় দ্রুতি এবং দ্বিতীয়টি হলো গড়বেগ। 'গড়' বলার কারণ এই যে, আমরা কোনো নির্দিষ্ট মুহূর্তে এই হিসেবে করছি না। সময়ের একটি ব্যবধানে এই হিসেবে করছি। এই 5 সেকেন্ডের মধ্যে প্রতিটি 1 সেকেন্ডে পিঁপড়েটি কি সমান দূরত্ব গেছে? না কি প্রথম 1 সেকেন্ডে যতটা গেছে, পরের 1 সেকেন্ডে তার চাইতে বেশি গেছে, তারপরের 1 সেকেন্ডে একটু কম গেছে... এরকম বিভিন্ন 1 সেকেন্ডে আলাদা আলাদা দূরত্ব গেছে? আমরা যে হিসেবে উপরে অঙ্ক কষে বের করলাম তাতে কিন্তু একটি হিসেবই বেরিয়েছে- প্রতি 1 সেকেন্ডে সরণ হয়েছে 0.4 সেমি এবং সেটা ওই 5 সেকেন্ডের ভেতরকার সব 1 সেকেন্ডের জন্য একই। প্রকৃত দূরত্বের বেলাতেও তাই। প্রতি 1 সেকেন্ডে 1 সেমি করে। এই যে আমরা একটা সার্বিক হিসেব পেলাম, ভেতরের আসল খুঁটিনাটি জানতে পারলাম না, সেজন্য এই হিসেব হলো গড় হিসেব।
⏳ সময় ও গতি
কোনো গতিশীল বস্তু এক সেকেন্ডে কতটা দূরত্ব অতিক্রম করল (তা সে প্রকৃত অতিক্রান্ত দূরত্বই হোক বা সরণই হোক) তা থেকে বস্তুটি কত দ্রুত চলছে তার হিসেব পাওয়া যায়।
ট্রেনে বা বাসে চড়ার সময় তুমি নিশ্চয়ই খেয়াল করেছ যে, প্রথম চালু হবার পর ট্রেন বা বাসের গতি ক্রমশ বাড়তে থাকে অর্থাৎ আরো বেশি জোরে চলতে থাকে। এই সময় ট্রেন বা বাসের বেগ আগে যা ছিল পরে তার চাইতে বেশি হয়। ঠিক তেমনি যখন স্টেশনে বা বাস স্টপে থামার দরকার হয় তখন গাড়িটির গতি ক্রমশ কমতে থাকে। এক সেকেন্ডে আগে যতটা দূরত্ব অতিক্রম করছিল পরে তার চাইতে কম দূরত্ব অতিক্রম করে। অর্থাৎ আগে যা বেগ ছিল পরে সেই বেগ কমে যায়।
বেগ বাড়তে অথবা কমতে থাকার সময় এক সেকেন্ডে বেগ কতটা বাড়ল বা কতটা কমল তার পরিমাণকে বলে ত্বরণ (Acceleration)। তুমি একটা সাইকেলে চড়ে এক সেকেন্ডে 5 মিটার বেগে চলছিলে। হঠাৎ আকাশে মেঘ দেখে তুমি বুঝতে পারলে বৃষ্টি আসছে। বৃষ্টি নামার আগে বাড়িতে পৌঁছোতে হলে বেগ বাড়াতে হবে। অবশেষে বেগ বাড়িয়ে 1 সেকেন্ডে ৪ মিটার করলে। এই বেগ বাড়াতে তোমার সময় লাগল 3 সেকেন্ড।
- তাহলে, প্রথমে তোমার বেগ ছিল প্রতি সেকেন্ডে 5 মিটার অর্থাৎ 5 মি/সেকেন্ড
- 3 সেকেন্ড পর তোমার বেগ হলো প্রতি সেকেন্ডে ৪ মিটার অর্থাৎ ৪ মি/সেকেন্ড
- 3 সেকেন্ড সময়ে বেগের পরিবর্তন = (পরের বেগ) – (আগের বেগ) = (৪ মি/সেকেন্ড) - (5 মি/সেকেন্ড) = 3 মি/সেকেন্ড
অতএব, 1 সেকেন্ড সময়ে বেগের পরিবর্তন = 3 মি/সেকেন্ড / 3 = 1 মি/সেকেন্ড। ∴ এক্ষেত্রে বেগ পরিবর্তনের হার = 1 মি/সেকেন্ড। অর্থাৎ এক্ষেত্রে তোমার ত্বরণ = 1 মি/সেকেন্ড²।
যখন তুমি বাড়ির অনেকটা কাছাকাছি পৌঁছে গেলে তখন সাইকেলের ব্রেক কষলে সাইকেলের বেগ কমতে থাকল। এইভাবে 2 সেকেন্ড পর সাইকেল নিয়ে তুমি বাড়ির কাছে এসে দাঁড়িয়ে পড়লে।
- অর্থাৎ এখন তোমার সাইকেলের বেগ হলো শূন্য (zero)।
- এক্ষেত্রে প্রথমে তোমার বেগ ছিল ৪ মি/সেকেন্ড।
- 2 সেকেন্ড পর তোমার বেগ হলো 0 মি/সেকেন্ড।
- 2 সেকেন্ড সময়ে বেগের পরিবর্তন = (পরের বেগ) – (আগের বেগ) = 0 মি/সেকেন্ড – ৪ মি/সেকেন্ড = – ৪ মি/সেকেন্ড
অতএব, 1 সেকেন্ড সময়ে বেগের পরিবর্তন = -৪ মি/সেকেন্ড / 2 = – 4 মি/সেকেন্ড ∴ এক্ষেত্রে বেগ পরিবর্তনের হার = – 4 মি/সেকেন্ড²
🧪 পরিবেশ ও বিজ্ঞান
এক্ষেত্রে ত্বরণ ঋণাত্মক। একে ঋণাত্মক ত্বরণ বা মন্দন (Retardation) বলে।
এই যে আমরা ত্বরণ হিসেব করলাম, এটাও কিন্তু গড় হিসেব। একটি সময়ের ব্যবধানে করা সামগ্রিক হিসেব, নির্দিষ্ট কোনো মুহূর্তের হিসেব নয়।
📌 বলের ধারণা ও নিউটনের গতিসূত্রের ধারণা, বলের পরিমাপ
একটা রবারের বলকে সমান মেঝের উপর দিয়ে গড়িয়ে দাও। এবার ফিতে বা স্কেল দিয়ে মেপে দেখো বলটা কতদূর গেল।
এখন ঘাস আছে এমন মাঠের উপর দিয়ে ওই বলটাকে একই জোরে গড়িয়ে দাও। এবারও মেপে দেখো বলটা কতদূর গেল।
- মেঝের উপর দিয়ে বলটা যতদূর গেল, ঘাসের উপর দিয়ে ততটা যেতে পারল না কেন?
- বলটা (Ball) দুই ক্ষেত্রেই এক সময় থেমে গিয়েছিল। তাহলে কি বলটা গড়াবার সময় বাধা পেয়েছিল? বলটা চলতে বাধা পেয়েছিল বলেই কি থেমে গেল?
- কোন ক্ষেত্রে বলটা (Ball) বেশি বাধা পেয়েছিল?
- ভেবে বলো তো বল (Ball)টা যদি কোনো বাধা না পেত তবে কী হতো?
⏳ সময় ও গতি
হাতেকলমে 1
টেবিলের উপর একটা বাঁধানো বই রাখো। এবার বইটাকে বাঁ হাত দিয়ে পাশ থেকে ডানদিকে ঠেলো। বইটা কোন দিকে সরে গেল?
এবার একইরকমভাবে বইটাকে ডান হাত দিয়ে উলটোদিকে ঠেলো। এবার বইটা কোন দিকে সরলো?
এবার, দু-হাত দিয়ে বইটার দু-পাশ থেকে পরস্পর উলটো দিকে ঠেলো। এমনভাবে ঠেলো যাতে বইটা কোনো দিকেই সরে না যায়।
ভেবে দেখো বইটা কোনোদিকেই না সরে যাওয়ার কারণ কী?
যদি কোনো একদিকের ঠেলা, অন্য দিকে ঠেলার চেয়ে বেশি জোরালো হতো, তবে কী হতো? এরকম ঠেলা বা ধাক্কা-কে আমরা বলি বল (force)।
তাহলে দেখা গেল, কোনো বস্তুর ওপর পরস্পর বিপরীত দিক থেকে সমমানের বল (force) প্রয়োগ করলে, বস্তুটার ওপর 'সার্বিক বল' শূন্য হয়ে যায়।
রঞ্জনা পড়ার টেবিলে পড়তে বসে ভাবে ওর বিজ্ঞান বইটাকে যদি ও কোনোদিন না সরায় এবং অন্য কেউও যদি তা না করে তবে ওর বিজ্ঞান বইটা কী চিরকালই ওই অবস্থায় থাকবে?
ভেবে দেখো, রঞ্জনার প্রশ্নের জবাব দিতে পারো কিনা।
টেবিলের উপরে রাখা তোমার বিজ্ঞান বইটা তুমি সরাতে চাইলে তোমাকে কী করতে হবে?
বল প্রয়োগে বস্তুর গতি সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে ইংরেজ বিজ্ঞানী স্যার আইজাক নিউটন তিনটি সূত্র বলে গিয়েছেন। চলো ওই সূত্রগুলো নিয়ে আলোচনা করি।
🧪 পরিবেশ ও বিজ্ঞান
🧑🔬 স্যার আইজাক নিউটন
1642 খ্রিস্টাব্দে 25 ডিসেম্বর ইংল্যান্ডের উলসথর্প গ্রামে এক চাষির পরিবারে জন্ম। 1665 খ্রিস্টাব্দে কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজ থেকে বি.এ. ডিগ্রি লাভ। 1669 খ্রিস্টাব্দে মাত্র 27 বছর বয়সে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের পদে যোগদান করেন।
তাঁর গতিসূত্র, মহাকর্ষসূত্র, সূর্যরশ্মির বর্ণালি, আলোর কণিকাতত্ত্ব, দ্বিপদ উপপাদ্য, ক্যালকুলাস বিজ্ঞান ও গণিতের জগতে নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। তিনি 1672 খ্রিস্টাব্দ থেকে টানা 25 বছর রয়্যাল সোসাইটির সভাপতির পদ অলংকৃত করেন। 1727 খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর লেখা বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ 'প্রিন্সিপিয়া'।
⚖️ নিউটনের প্রথম গতিসূত্রের ধারণা :
কোনো বস্তুর ওপর যদি বাইরে থেকে বল প্রয়োগ না করা হয়, তাহলে-
(i) স্থির বস্তু চিরকাল স্থিরই থেকে যাবে, (ii) আর গতিশীল বস্তু আগে থেকেই যে দিকে যে বেগ নিয়ে চলছিল সেদিকে সেই বেগ নিয়ে চিরকাল চলতে থাকে।
তাহলে দেখা গেল যে,
বাইরে থেকে বল প্রয়োগ না করা হলে, কোনো স্থির বস্তু হয় চিরকাল স্থির, বা সমবেগে সরলরেখা বরাবর গতিশীল কোনো বস্তু চিরকাল ওই একই গতিতে একই সরলরেখা ধরে চলতে থাকে। স্থির থাকা বা একই বেগে চলতে থাকার এই ধর্মকে বলে বস্তুর জাড্য। স্থির থাকার ধর্মকে স্থিতিজাড্য। আর সমবেগে গতিশীল থাকার ধর্মকে গতিজাড্য বলা হয়। আর বাইরে থেকে যা প্রয়োগ করলে এই অবস্থা বদলে দেওয়া যায় তাকে বলে বল।
🚶 আমাদের প্রতিদিনের জীবনে জাড্য
- স্থির বাস হঠাৎ চলতে আরম্ভ করলে কোনো কিছু না ধরে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রী পিছনদিকে হেলে পড়ে। কোনো কিছু ধরে থাকা যাত্রীদেরও ওই একইরকম অনুভূতি হয়। থেমে থাকা বাসে যাত্রীরাও থেমে থাকে। সব কিছু তখন স্থির অবস্থায় রয়েছে। বাস হঠাৎ চলতে শুরু করল, ফলে বাসের স্থির অবস্থা পালটে গেল। বাসের সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীদের পা চলতে শুরু করল কারণ পা বাসের মেঝের সংস্পর্শে আছে। কিন্তু যাত্রীদের বাকি শরীর স্থির থাকতে চাইল। অতএব পায়ের সঙ্গে সঙ্গে এগোল না। যাত্রীরা তাই পিছনের দিকে হেলে পড়ল।
⏳ সময় ও গতি
-
তোমরা নিশ্চয়ই লক্ষ করেছ কাক (বা অন্য কোনো পাখি) উড়তে উড়তে ডানা ঝাপটানো বন্ধ করে দিয়েও দিব্যি ডানা মেলে বাতাসে ভাসতে ভাসতে অনেকটা এগিয়ে যায়-
ডানা ঝাপটানো বন্ধ করেও কাকটা কি করে ভাসতে ভাসতে অতটা এগিয়ে গেল বলো তো?
পাখিটা যখন উড়ছে তখন সে গতিশীল, ফলে পাখি উড়তে উড়তে ডানা ঝাপটানো বন্ধ করে দিলেও তার গোটা শরীরটা গতিজাড্যের জন্য তখনও সমবেগ বজায় রাখতে চেষ্টা করে, ফলে পাখিটা শুধু ডানা মেলে (না ঝাপটিয়েও) অনেকটা দূর এগিয়ে যেতে পারে।
হাতেকলমে 2
তোমার টেবিলের ফাঁকা ড্রয়ারটার বেশিরভাগ অংশটা খোলো। এবার একটা পেনসিল পাশের ছবির মতো করে রাখো।
পেনসিলটাকে দেখা যায় এমনভাবে রেখে ড্রয়ারটা একটু জোরে বন্ধ করো আবার খোলো।
কী দেখতে পেলে? বন্ধ করার সময় পেনসিলটা কোন দিকে গড়াচ্ছে? খোলার সময় পেনসিলটা কোন দিকে গড়াচ্ছে? কেন এমন হলো?
হাতেকলমে 3
একটা খাতার পাতা যত বড়ো হয় তত বড়ো কাগজ নাও। ছবির মতো করে কাগজটা টেবিলের ওপর রাখো। এবার ওই কাগজের ওপরে তোমার পেনসিল বাক্সটা রাখো। এখন ওই কাগজের একটা প্রান্ত ধরে কাগজটাকে এক ঝটকায় এমনভাবে টানো যাতে পেনসিল বাক্সটা যেখানে ছিল সেখানেই থাকে এবং নড়ে না যায়।
ভেবে বলো তো এরকম হলো কেন? নিউটনের প্রথম সূত্রে তোমরা জাড্য ধর্মের কথা জেনেছ। ওই সূত্র ব্যবহার করে এই ঘটনা কেন ঘটল বলতে পারো কি?
🧪 পরিবেশ ও বিজ্ঞান
ভালোভাবে চিন্তা করে দেখো তো নীচের ঘটনাগুলোতে জাড্য ধর্ম (গতিজাড্য বা স্থিতিজাড্য) খুঁজে পাও কিনা? বিষয়গুলো নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করো।
- কুলো দিয়ে চাল ঝাড়া (চাল থেকে ধানের তুষ বার করা) হয়।
- চলন্ত অটোরিকশা হঠাৎ বাধ্য হয়ে ব্রেক কষে থেমে গেলে, যাত্রীরা সামনের দিকে (অটোরিকশার গতির দিকে) ঝুঁকে পড়ে।
- সাইকেল চালাতে চালাতে পা চালানো থামিয়ে দিলেও সাইকেল সঙ্গে সঙ্গে থেমে যায় না, পা না চালিয়েও বেশ খানিকটা এগিয়ে যাওয়া যায়।
- কোটের ধুলো ঝাড়তে কোটকে ঝাড়া দেওয়া হয়।
- ধুলোমাখা কোটের উপর লাঠি দিয়ে আঘাত করলে (খুব জোরে নয়) ধুলো কোট থেকে আলাদা হয়ে পড়ে।
- স্পোর্টসের মাঠে লং জাম্প দেবার সময়, প্রতিযোগী অনেকটা দূর থেকে দৌড়ে আসে।
- দেয়ালের গায়ে ডাস্টার ঝাড়া হয়।
⚖️ নিউটনের দ্বিতীয় গতিসূত্রের ধারণা :
নিউটনের প্রথম গতিসূত্র থেকে আমরা জেনেছি, বাইরে থেকে 'বল' প্রয়োগ করা হলে একটি বস্তুর বেগ বদলে যায়। নিউটনের দ্বিতীয় গতিসূত্র অনুসরণ করে বলা যায়, (i) একটি নির্দিষ্ট ভরের বস্তুর ওপর প্রয়োগ করা বল যত বাড়ানো হবে, 1 সেকেন্ডে বস্তুটির বেগের পরিবর্তনও (অর্থাৎ ত্বরণ) তত বাড়বে। প্রযুক্ত বলের পরিমাণ দ্বিগুণ হলে, উৎপন্ন ত্বরণও দ্বিগুণ হবে। অর্থাৎ বল ও ত্বরণ -এর মধ্যে সরল সম্পর্ক রয়েছে। (ii) বল প্রয়োগের অভিমুখ যে দিকে, উৎপন্ন ত্বরণের অভিমুখও সেই দিকে। অর্থাৎ প্রযুক্ত বলের দিকেই বস্তুর বেগ বৃদ্ধি পায়।
🧮 নিউটনের দ্বিতীয় গতিসূত্র অনুসরণ করে প্রযুক্ত বলের মান নির্ণয়ের সমীকরণ :
প্রযুক্ত বল = বস্তুর ভর × এক সেকেন্ডে বস্তুর বেগের পরিবর্তন = বস্তুর ভর × বস্তুতে উৎপন্ন ত্বরণ (যেহেতু, 1 সেকেন্ডে বেগের পরিবর্তন = ত্বরণ)
F = m × a [F-বল, m-ভর, a- ত্বরণ]
SI পদ্ধতিতে বলের (Force) একক 1 নিউটন। 1 নিউটন = 1kg × 1 মিটার/সেকেন্ড²
⏳ সময় ও গতি
🔄 নিউটনের তৃতীয় গতিসূত্রের ধারণা :
রেশমা দিদিমণির সঙ্গে গিয়েছিল কলকাতায়। বাড়িতে ফেরার পথে রেশমা যখন সবার শেষে লাফ দিয়ে নৌকা থেকে নামল তখন রেশমা অবাক হয়ে গেল – কী আশ্চর্য, নৌকাটা জলে পিছিয়ে যাচ্ছে কেন?
দিদিমণি বললেন, ভালো করে ভেবে দেখো, নৌকাটা তো আর এমনি এমনি সরে যায়নি।
রেশমা বলল, নিশ্চয়ই কেউ না কেউ নৌকাটাকে পিছনদিকে ঠেলে দিয়েছে। তবে কে ঠেলল? আমিই তো সব শেষে নামলাম।
তবে তুমিই বল প্রয়োগ করেছ। কারণ তুমি আর নৌকা ছাড়া সেখানে তৃতীয় কেউ তো ছিল না।
আমি তো লাফ দিয়ে নেমেছিলাম! ও ! বুঝতে পেরেছি আমি লাফ দিয়ে নামার সময় নৌকাটাকে তো পিছনদিকে ঠেলেছিলাম।
ঠিক ধরেছ, ওই ঠেলাই নৌকাটাকে পিছনদিকে সরিয়ে দিয়েছে।
তাহলে আমি কীভাবে সামনের দিকে লাফাতে পারলাম? আমাকে তো কেউ সামনের দিকে ঠেলে দেয়নি!
দিদিমণি হেসে বললেন, তোমার প্রশ্নেই তোমার উত্তর লুকিয়ে আছে।
আমার প্রশ্নে কী উত্তর আছে দিদি, আর একটু পরিষ্কার করে বলবেন।
তার মানে তোমাকে কেউ ঠেলেছেই ঠেলেছে।
আমার পিছনে নৌকা ছাড়া আর তো কেউ ছিল না! তাহলে কি নৌকাটাই আমাকে ঠেলল।
একদম ঠিক। ওই নৌকাই, তোমার দেওয়া বলের ঠিক উলটো দিকে, সমান জোরে, তোমার পায়ে বলপ্রয়োগ করেছে। আর ওই বল তোমাকে সামনের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
ভারি মজার ব্যাপার তো। তাহলে আমি যেখানেই বল প্রয়োগ করি না কেন, সেও আমায় সমান জোরে আমার দেওয়া বলের উলটোদিকে বল প্রয়োেগ করবে?
স্যার আইজাক নিউটন তাঁর তৃতীয় গতিসূত্রে সে কথাই তো বলেছেন। কী রকম?
নিউটন বলেছেন – '> প্রত্যেক ক্রিয়ারই সমান ও বিপরীতমুখী একটা প্রতিক্রিয়া বল আছে।'
তাহলে দিদি আমার আর নৌকার বলের মধ্যে কোনটা 'ক্রিয়া' আর কোনটা 'প্রতিক্রিয়া'?
আসলে ক্রিয়া আর প্রতিক্রিয়া ওভাবে আলাদা করে চিহ্নিত করা যায় না। কারণ 'ক্রিয়া' আর 'প্রতিক্রিয়া'
🧪 পরিবেশ ও বিজ্ঞান
সবসময় একসঙ্গেই ঘটে। একটা আগে আর একটা পরে, এভাবে নয়। তাই যে-কোনো একটা 'ক্রিয়া' হলে, অন্যটা হবে তার 'প্রতিক্রিয়া'।
তাহলে দিদি এই 'ক্রিয়া' আর 'প্রতিক্রিয়া' আলাদা আলাদা বস্তুর উপর কাজ করে, তাই না।
ঠিক ধরেছ, তোমার বল প্রয়োগ হয়েছে নৌকার ওপর, আর নৌকার বল প্রয়োগ হয়েছে তোমার পায়ের উপর।
নীচের ঘটনাগুলোতে নিউটনের তৃতীয় সূত্র কীভাবে কাজ করছে বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করে বোঝার চেষ্টা করো।
- আমরা যখন হাঁটি
- জলে মাছ সাঁতার কাটে।
💪 শক্তি ও কার্য
তুমি অনেকক্ষণ না খেয়ে থাকলে, তোমার কাজ করার সামর্থ্য কমে যায়। এরপর যখন তুমি খাবার খাও তখন আবার কাজ করার 'সামর্থ্য' ফিরে পাও কি?
খাবার থেকে আমরা নিশ্চয়ই এমন কিছু পাই যা আমাদের 'কাজ করার সামর্থ্য' জোগায়। খাবার থেকে আমরা পাই শক্তি। কাজ করার সামর্থ্যই হলো শক্তি।
-
মোটামুটি ভারী 10টা বই আর 10টা খাতা জোগাড় করো। তোমার স্কুলের ব্যাগের মধ্যে 10টা বই আর 10টা খাতা ভরো। এবার ব্যাগটা মেঝে থেকে চেয়ারের উপর তোলো। তারপর ব্যাগটা মেঝে থেকে আলমারির উপর তোলো।
এখন বলো (i) পৃথিবীর টানের (মানে ব্যাগের ওজনের) উলটোদিকে ব্যাগটাকে ওঠাতে দুই ক্ষেত্রেই কী তোমাকে সমান 'বল' প্রয়োগ করতে হয়েছে? (ii) কোন ক্ষেত্রে তোমাকে বেশি 'পরিশ্রম' করতে হয়েছে?
-
তুমি তোমার ওই স্কুল ব্যাগে আবার 10টা বই 10টা খাতা নাও। এখন ব্যাগটা মেঝে থেকে টেবিলে তোলো। এবার ব্যাগ থেকে 10টা খাতা ও 5 টা বই নামিয়ে রাখো। তারপর আবার মেঝে থেকে ব্যাগটা টেবিলে তোলো।
এখন বলো (i) ব্যাগের ওজনের উলটোদিকে কোন ক্ষেত্রে তোমাকে বেশি 'বল' প্রয়োগ করতে হলো?
⏳ সময় ও গতি
(ii) কোন ক্ষেত্রে তোমাকে বেশি 'পরিশ্রম' করতে হলো?
1 নং পরীক্ষায় দেখা গেল একই ওজনের বস্তুকে যত বেশি উঁচুতে তোলা যায় তত বেশি পরিশ্রম করতে হয়। যদিও দুই ক্ষেত্রেই সমান সমান বল প্রয়োগ করতে হয়েছে।
2 নং পরীক্ষা থেকে দেখা গেল বিভিন্ন ওজনের বস্তুকে একই উচ্চতায় তোলার সময় যে বস্তু যত বেশি ভারী তার জন্য তত বেশি বল লাগে ও পরিশ্রমও বেশি করতে হয়।
1 ও ২ নং পরীক্ষা দুটির অভিজ্ঞতা থেকে তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছ যে সাধারণভাবে যে কাজে 'পরিশ্রম বেশি' সে কাজের জন্য তোমার শক্তিও বেশি খরচ করতে হয়।
যেখানে 'শক্তি বেশি' খরচ করতে হয় সেখানে কাজের পরিমাণও বেশি হয়।
তাহলে দেখা গেল যে ক্ষেত্রে বেশি উঁচুতে বস্তুকে তোলা হচ্ছে, সে ক্ষেত্রে কাজের পরিমাণও বেশি হচ্ছে (1 নং পরীক্ষা)।
আবার যেখানে 'বেশি বল' প্রয়োগ করা হচ্ছে, সেখানেও 'কাজের পরিমাণ' বেশি হচ্ছে (পরীক্ষা নং 2)
তাহলে ভেবে দেখত কাজের পরিমাণ কোন কোন বিষয়ের উপর নির্ভর করছে?
পদার্থবিজ্ঞানে কাজের পরিমাণ নির্ণয় করার জন্যে নীচের সম্পর্কটি ব্যবহার করা হয় -
কাজের পরিমাণ = (প্রযুক্ত বল) × (প্রযুক্ত বলের প্রভাবে বস্তুর সরণের পরিমাণ)
W = F × d
- W = কাজ
- F = বল
- d = সরণ
📏 SI পদ্ধতিতে কাজ মাপার একক
এক নিউটন বল প্রয়োগ করে যদি একটি বস্তুকে বল প্রয়োগের দিকে এক মিটার সরানো হয় তবে এক জুল পরিমাণ কাজ করা হয়েছে বলা হয়। এক জুল হলো কাজ পরিমাপের SI একক।
W = F × d 1 জুল = 1 নিউটন × 1 মিটার
🧪 আরো কিছু পরীক্ষা :
উপকরণ: দুটো দুই কিলোগ্রামের আর একটা এক কিলোগ্রামের বাটখারা, দুটো সমান উচ্চতার টেবিল।
- তুমি আর তোমার বন্ধু মেঝেতে রাখা একটা করে 2 কিলোগ্রামের বাটখারা নিয়ে একই টেবিলের উপর
🧪 পরিবেশ ও বিজ্ঞান
তুলে রাখলে। - তাহলে তুমি আর তোমার বন্ধু 'সমান পরিমাণ' কাজ করলে।
-
এবার মেঝেতে একটা 2kg আর একটা 1kg -র বাটখারা রাখো। এখন, তুমি 2kg -র বাটখারাটি নিয়ে টেবিলের উপর তুলে রাখলে। আর তোমার বন্ধু 1kg -র বাটখারাটি টেবিলের উপর তুলে রাখল। - তাহলে তুমি, তোমার বন্ধুর কাজের ২ গুণ কাজ করেছ।
-
একটা টেবিলের উপর আর একটা সম উচ্চতার টেবিল বা সম উচ্চতার টুল উঠিয়ে রাখা হলো। মেঝের উপর দুটো 2 kg -র বাটখারা আছে।
এবার তুমি মেঝে থেকে একটা বাটখারা নিয়ে নীচের টেবিলে তুলে রাখো। তোমার বন্ধু অন্য বাটখারাটি নিয়ে উপরের টেবিলের উপর রাখল। —স্বভাবতই এখানে তোমার বন্ধু তোমার কাজের 2-গুণ কাজ করেছে।
-
একটা স্প্রিং নিয়ে দু-দিক থেকে টান দাও ।
কি দেখতে পেলে? স্প্রিংটা কি সামগ্রিকভাবে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে গেল অর্থাৎ স্থান পরিবর্তন করল? না কি স্প্রিংটাব শুধুমাত্র আকৃতির পরিবর্তন হলো?
এক্ষেত্রে বল প্রয়োগের ফলে কাজ হলো কি?
বল প্রয়োগের ফলে কোনো বস্তুর সামগ্রিকভাবে স্থান পরিবর্তন না হলেও যদি বস্তুর আকার বা আয়তনের পরিবর্তন হয় তাহলেও বলা হয় প্রযুক্ত বল কাজ করেছে।
-
ছবির মতো দেখতে একটি পিচকিরি নাও, সেটির মুখে একটি বেলুন ছবির মতো করে আটকাও। এবার পিচকিরির হাতলটি ভেতর দিকে ঠেলো।
কী দেখতে পেলে? বেলুন লাগানো সমগ্র পিচকিরিটি কি এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরে গেল? বেলুনটা ফুলল কেন? তোমার বল কিসের ওপর প্রযুক্ত হলো? তোমার প্রযুক্ত বলের দ্বারা কি কোনো কাজ হলো?
⏳ সময় ও গতি
এক্ষেত্রেও দেখা গেল বল প্রয়োগের ফলে বস্তু সামগ্রিকভাবে স্থান পরিবর্তন করল না কিন্তু তোমার প্রযুক্ত বল পিচকিরির ভিতরে বায়ুর উপর চাপ সৃষ্টি করায় বায়ু সংকুচিত হয়ে পিচকিরির মুখ দিয়ে বেরিয়ে বেলুনের ভেতর প্রবেশ করেছে। ছোটো ছোটো সরণের ফলে বেলুনের আকৃতিগত পরিবর্তন ঘটেছে। ফলে বেলুন ফুলে উঠেছে। তাই এখানেও বল প্রয়োগের ফলে কাজ হয়েছে।
স্প্রিং-এর ক্ষেত্রেও স্প্রিং-এর সামগ্রিক সরণ না হলেও তার ভিতরকার ছোটো ছোটো অংশের স্থান পরিবর্তনের ফলে কাজ হয়েছে (W=F×d), যা স্প্রিংটির আকৃতিগত পরিবর্তন ঘটিয়েছে।
-
একটা চেয়ারে বসে জোরে শ্বাস নাও।
কিছু অনুভব করতে পারলে? তোমার বুক কি উঠছে নামছে মনে হচ্ছে? এই ওঠানামার জন্য 'বল' কে প্রয়োগ করছে? কোথায় প্রয়োগ করছে? এই বলের প্রভাবে কোনো কাজ হচ্ছে কি?
বুকে হাড় ও পেশি দিয়ে তৈরি একটা খাঁচা আছে, যার ভেতর থাকে ফুসফুস। নিশ্বাস প্রশ্বাসের সময় বিভিন্ন পেশির সংকোচন প্রসারণের ফলে ফুসফুসেরও সংকোচন-প্রসারণ হয়। ফলে ফুসফুসের আকার ও আয়তনের পরিবর্তন হয়।
এখানে পেশির বলের দ্বারা কাজ হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে ফুসফুসের সামগ্রিকভাবে স্থান পরিবর্তন অর্থাৎ সরণ হয় না – কিন্তু 'কাজ' হয়ে থাকে।
যদি ভালোভাবে খেয়াল করো তবে বুঝতে পারবে যে, পেশির বল কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্রিয়াশীল হয় ফুসফুসের ভিতরের বায়ুর উপর। ফলে বায়ু শরীরের বাইরে বেরিয়ে আসে অথবা ভেতরে প্রবেশ করে এবং এভাবে 'কাজ' সংঘটিত হয়। কিন্তু এসবের কিছুই আমাদের চোখে পড়ে না বলে আমরা তা বুঝতে পারি না।
-
তুমি একটা দেয়ালকে অনেকক্ষণ ধরে ঠেললে।
তোমার দেওয়া বলের অভিমুখে দেয়ালের কি কোনো সরণ হয়েছে? দেয়ালের আকার বা আয়তনের কি কোনো পরিবর্তন হয়েছে? তুমি কি ক্লান্ত হয়েছ? ঠেলার সময় তোমার হৃৎস্পন্দন কি বেড়ে গিয়েছে? ঠেলার সময় কি তোমার নিশ্বাস-প্রশ্বাসের হার বেড়ে গিয়েছিল? তোমার শরীরের কোনো অংশ কি গরম হয়ে গিয়েছিল?
🧪 পরিবেশ ও বিজ্ঞান
দেয়ালে বল প্রয়োগ করার জন্য তোমার কি শক্তি খরচ করতে হয়েছে?
শরীরের ক্লান্তি, হৃৎস্পন্দনের হার বৃদ্ধি, শ্বাস-প্রশ্বাসের হার বৃদ্ধি, গা গরম হওয়া ইত্যাদি বুঝতে সাহায্য করে যে শরীরের ভেতর শক্তি খরচ হয়েছে।
আবার যেহেতু কাজ করার সামর্থ্যকেই শক্তি বলে সেহেতু শক্তি যখন ব্যবহার করা হয়েছে তখন অবশ্যই কাজ হয়েছে।
এবার একটা চক নিয়ে দেয়ালের একটা অংশে ভালো করে ঘষো যাতে ওই জায়গাটা সাদা হয়ে যায়। এখন ওই সাদা অংশে দেয়ালটাকে ঠেলো।
- দেয়ালটা কি সরলো?
- দেয়ালের ওই স্থানটা (যেখানে বল প্রয়োগ করেছিলে) কি ভেতরে ঢুকে গেল?
- দেয়ালের ওই স্থানের চকের গুঁড়োর কিছু অংশ কি উঠে গেছে? কোথায় উঠে গেছে?
- এবার তোমার হাতটা ভালো করে দেখো তো সেখানে (তালুতে) চকের দাগ লেগেছে কিনা?
- তুমি যখন দেয়ালটাকে ঠেলছিলে তখন কি তোমার হাতের তালুর মাংসপেশি কিছুটা চেপটে গিয়েছিল?
- এবার ভেবে বলো তো দেয়ালটা যদি রাবারের তৈরি হতো, তবে ঠেলার স্থানটা কি ভেতরে ঢুকে যেত?
দেয়ালে বল প্রয়োগ করার সময় যেমন হাতের তালুর মাংস পেশির আকারের পরিবর্তন হয়, তেমনই দেয়ালের ওই স্থানেও (চাপ দেওয়া স্থানে) আকৃতিগত কিছু পরিবর্তন হয়। কিন্তু এই পরিবর্তন এত সামান্য যে তা আমরা খালি চোখে দেখতে পাই না। সে কারণেই চকের গুঁড়ো ব্যবহার করে আমরা দেখার চেষ্টা করেছি যে বল প্রয়োগে সেখানেও সরণ হয়। তাই তোমার হাতে চকের দাগ দেয়াল থেকে উঠে এসেছিল।
দেয়ালে বল প্রয়োগ করার জন্যে পেশিকোশে দরকার হয়ে পড়ে অতিরিক্ত শক্তি। কোশে কোশে শ্বসন কার্য বেড়ে যায়, ফলে খাদ্য ও অক্সিজেনের চাহিদাও বেড়ে যায়। এর ফলে বেড়ে যায় হৃৎস্পন্দন, বেড়ে যায় রক্তবাহে রক্তচাপ, বেড়ে যায় নিশ্বাস-প্রশ্বাসের হার। পেশিকোশের দরকার শক্তি কিন্তু সেখানে অক্সিজেনের জোগান প্রয়োজনের তুলনায় কম। শক্তির চাহিদা মেটাতে কোশে কোশে শুরু হয় এক বিশেষ ধরনের শ্বসন। তারফলেই পেশিকোশে জমতে থাকে ল্যাকটিক অ্যাসিড। আর পেশিকোশে এই ল্যাকটিক অ্যাসিড জমার ফলে পেশিতে ব্যথার অনুভূতি জাগে। শ্বসনের হার বেড়ে যাওয়ার জন্য তাপ শক্তিও বেশি পরিমাণে উৎপন্ন হয়। তাই আমাদের শরীরও গরম হয়।
কিন্তু এতসব কি আমাদের চোখে পড়ে? তাই ওসব কাজ আমরা দেখতে পাই না, ঠিক যেমন পিচকিরির ভেতরকার কাজ, ফুসফুসের ভেতরকার কাজ আমাদের চোখে ধরা পড়ে না।
CONTENT MANAGER