Academy

(ii) আলো | পৃষ্ঠা ১৫-৩৭

(ii) আলো | পৃষ্ঠা ১৫-৩৭ - WBBSE - Class 7 - Default Subject

0

ভৌত পরিবেশ

✨ আলো

💡 প্রাত্যহিক জীবনে আলো সংক্রান্ত বিভিন্ন ঘটনা ও আলোর সরলরৈখিক গতি

  • জানালার একটু দূরে উজ্জ্বল রোদে ঘরের মধ্যে তুমি পড়তে বসেছ। এমন সময় তোমার মা জানালার পাশে এসে দাঁড়ালেন। ব্যাস, উজ্জ্বল রোদের বদলে একটা ছায়া এসে হাজির। এখন সব আবছা আবছা হয়ে গেল।
  • অনিরুদ্ধ দুপুরবেলা ঝিলপাড়ের বটগাছের তলায় বসেছিল। তন্ময় হয়ে দেখছিল জলে ঢেউ-এর খেলা। কিন্তু হঠাৎই চোখ যেন আলোয় ধাঁধিয়ে উঠছিল। তখন ঢেউগুলোকে চকচকে লাগছিল।
  • আনোয়ারা খালি বালতিটা যখন জল দিয়ে ভরতি করল তখন হঠাৎই বালতিটার উপর থেকে দেখে ও অবাক হয়ে গেল। বালতির গভীরতা যেন কমে গেছে মনে হচ্ছে।
  • সুজাতা একদিন দুপুরবেলা বিছানায় শুয়ে ছিল। ঘুম আসছিল না। হঠাৎই দেখতে পেল ভেন্টিলেটর দিয়ে সূর্যের আলো উলটো দিকের দেয়ালে পড়ে কতগুলো গোল গোল আলোর চাকতি তৈরি করেছে। কিন্তু ওইরকম গোল গোল আকৃতি কেন?
  • পুকুরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় প্রত্যুষ প্রতিদিন দেখে পুকুরে গাছের আর পুকুর পাড়ের বাড়িগুলোর কেমন সুন্দর ছবি পড়ে। পুকুরটা ঠিক যেন একটা আয়না।
  • আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সুমি ভাবে ও যখন ওর ডান হাত নাড়ে তখন আয়নায় ওর ছবিটা একই রকমভাবে তার বাঁ-হাত নাড়ে কেন?
  • একটা সোজা লাঠিকে লম্বভাবে মাটিতে পুঁতে রেখেছিল মৃণ্ময়। প্রতিদিন ওটার ওপর রোদ পড়ে। মৃণ্ময় প্রতিদিন ওর ছায়াটা লক্ষ করে। ছায়াটা কখনও ছোটো হয় কখনও বা বড়ো। কিন্তু মৃণ্ময় অবাক হয়ে দেখে, সূর্য যখন মাথার ঠিক উপরে, তখন লাঠির প্রায় কোনো ছায়াই পড়ে না।
  • অরুণিমা একদিন জলভরতি বালতির মধ্যে একটা লাঠি ডুবিয়ে দেখে যে লাঠিটা যেন বাঁকা। কিন্তু যেই না লাঠিটাকে জলের ওপরে তুলল অমনি ওটা আবার সোজা হয়ে গেল।

এরকম কত ঘটনাই আমরা দেখি প্রতিদিন আমাদের চারপাশে। এসবই আলোর খেলা। আলো সম্বন্ধে জানলে, এসব ঘটনা কেন ঘটে তা বোঝা যায়। আমরা এখন সেটাই করব – জানব আলোর নানা কথা।

দিনেরবেলা আমরা ঘরের ভিতর সব কিছু দেখতে পাই – খাট, আলমারি, চেয়ার, টেবিল সব কিছু। আর যখন রাত্রি নেমে আসে, ঘরের ভিতরের আলো নিভে যায়, চাঁদের আলো বা রাস্তার আলো জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকতে পারে না, তখন আমরা ঘরের ভিতরের কোনো জিনিসই দেখতে পাই না। আন্দাজে ঠাহর করে চলতে হয়। অথচ যদি একটা জোনাকি পোকা কোনোভাবে ঘরে ঢুকে পড়ে সেটাকে দেখতে আমাদের কোনো অসুবিধা হয় না।

পরিবেশ ও বিজ্ঞান

এবার ভেবে বলো তো, জোনাকি পোকাটাকে তুমি দেখতে পেলে কেন?

অন্য জিনিসগুলোকে দিনেরবেলায় দেখতে পেলেও রাত্রিবেলায় অন্ধকারে দেখতে পাওনি কেন?

রাত্রিবেলাতেও যদি তুমি ওই জিনিসগুলোকে দেখতে চাও, তাহলে তোমার কী চাই?

তাহলে দেখা গেল কিছু কিছু বস্তু আছে যাদের নিজস্ব আলো আছে অর্থাৎ এই বস্তুগুলো থেকে নিজস্ব আলো নির্গত হয়। এই বস্তুগুলোকে 'স্বপ্রভ বস্তু' বা 'আলোক উৎস' বলে। যেমন – সূর্য, তারা, জোনাকি ইত্যাদি।

আবার যে বস্তুগুলোর নিজস্ব আলো নেই সেই বস্তুগুলোকে 'অপ্রভ বস্তু' বলে। যেমন - ইট, কাঠ, পাথর ইত্যাদি।

নীচের সারণিটা পূরণ করো। ঠিক স্থানে ✅ দাও।

বস্তুস্বপ্রভঅপ্রভ
কেরোসিন লম্ফ
পেন
জামার বোতাম
মোমবাতি (জ্বলন্ত)
জোনাকি
ছাতা
তারা
চশমা
সূর্য
চাঁদ

আলোর উৎস যদি আকারে খুব ছোটো হয়, আমরা অনেক সময় তাকে বিন্দু-উৎস বলি। একটি টর্চের আলোর সামনে কালো কার্ডবোর্ড রেখে ওই বোর্ডের গায়ে পিন দিয়ে একটি ছিদ্র করা হলো। ওই ছিদ্র দিয়ে যখন টর্চের আলো বেরিয়ে আসছে তখন ছিদ্রটিকে বিন্দু আলোকউৎস বলে ভাবা যেতে পারে। তবে একথা ভুললে চলবে না যে জ্যামিতিতে আমরা বিন্দু বলতে যা বুঝি সেরকম অনেক বিন্দু মিলেই আসলে এইসব বিন্দু উৎসগুলো তৈরি। খুঁটিয়ে বিচার করলে তাই ওই কার্ডবোর্ডের ছিদ্র বিশুদ্ধ অর্থে বিন্দু-উৎস নয়।

ভৌত পরিবেশ

স্বপ্রভ বস্তু নিজে যেমন আলোর উৎস, তেমনি অপ্রভ বস্তুও আলোর উৎস হিসেবে আচরণ করতে পারে। কোনো স্বপ্রভ বস্তু থেকে আলো অপ্রভ বস্তুতে পড়লে ঠিকরে বেরোয়। যেমন স্টিলের বাসন একটি অপ্রভ বস্তু, কিন্তু তাতে সূর্যের আলো পড়ে সেই আলো ঠিকরে দেয়ালে যখন পড়ে তখন স্টিলের বাসনটিই আলোর উৎসের মতো আচরণ করে।

'বিন্দু আলোক উৎসের' চেয়ে আকারে বড়ো আলোক উৎসকে 'বিস্তৃত আলোক উৎস' বলে। যেমন- টর্চ, সূর্য, বৈদ্যুতিক বালব ইত্যাদি।

কাচের জানালা বন্ধ করে রাখলেও বাইরের রোদ তা দিয়ে ঘরে ঢোকে। কিন্তু কাঠের জানালায় তো তা হয় না। আলো সবরকম পদার্থের মধ্যে দিয়ে যেতে পারে না।

ভেবে দেখত, জলের মধ্যে দিয়ে কি আলো যেতে পারে? তুমি কি জল ভরতি পাত্রের তলদেশ বাইরে থেকে দেখতে পাও?

বায়ু, স্বচ্ছ কাচ, জল ইত্যাদি বস্তুগুলোকে 'স্বচ্ছ বস্তু' বা 'স্বচ্ছ মাধ্যম' বলে। এধরনের বস্তুর মধ্যে দিয়ে আলো সহজেই যাতায়াত করতে পারে। আবার, কাঠ, দেয়াল, লোহা ইত্যাদি যেসব বস্তুর মধ্যে দিয়ে আলো একেবারেই চলাচল করতে পারে না, তাদের 'অস্বচ্ছ বস্তু' বা 'অস্বচ্ছ মাধ্যম' বলে।

জানালা বন্ধ রয়েছে। জানালায় ঘষা কাচ লাগানো। জানালার বাইরে কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। আবছা একটা মূর্তি। ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। জানালা বন্ধ অবস্থায় যখন ওই কাচ দিয়ে ঘরে রোদ আসে, তখন হালকা, ফিকে হওয়া রোদ আসে। আসলে ঘষা কাচ, কুয়াশা, ট্রেসিং পেপার ইত্যাদি বস্তুর মধ্যে দিয়ে আলো যাতায়াত করতে পারলেও, ভালোভাবে পারে না। তাই এই সমস্ত বস্তু বা মাধ্যমকে বলে 'ঈষৎ স্বচ্ছ বস্তু' বা 'ঈষৎ স্বচ্ছ মাধ্যম'।

📌 দরকারি কথা

কোনো মাধ্যম ছাড়াও আলো চলাচল করতে পারে। সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যে এক বিরাট অংশে কোনো মাধ্যম থাকে না। তবু প্রতিদিন সূর্য থেকে আলো পৃথিবীতে এসে পৌঁছোয়।

➡️ আলোর সরলরৈখিক গতি

🧪 হাতেকলমে 1

একটা শক্ত ও সোজা দু-মুখ খোলা পাইপ নাও। এবার এক চোখ বন্ধ করে পাইপটার মধ্য দিয়ে একটা জ্বলন্ত মোমবাতির শিখাকে দেখার চেষ্টা করো।

পরিবেশ ও বিজ্ঞান

এবার একটা বাঁকা পাইপ নাও। পাইপটার মধ্য দিয়ে আগের মতো করেই শিখাটাকে দেখার চেষ্টা করো।

বাঁকানো পাইপের মধ্য দিয়ে মোমবাতির শিখাটাকে আর দেখতে পাচ্ছ কি? কেন এমন হলো ভাবত।

কোনো বস্তুকে দেখতে হলে ওই বস্তু থেকে আলো এসে আমাদের চোখে পড়তে হবে। তবেই সেই বস্তুকে দেখা সম্ভব।

প্রথম ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছে।

তাহলে, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে কি মোমবাতির শিখা থেকে আসা আলো তোমার চোখ অবধি পৌঁছোতে পারেনি?

কেন পারল না? আলো কি তবে আসার পথে কোথাও বাধা পেয়েছে? কেনই বা বাধা পেল?

প্রথম ও দ্বিতীয় ক্ষেত্রের আলোর যাত্রাপথের মধ্যে পার্থক্য কোথায়?

পাইপটা সোজা থাকায় আলো প্রথম ক্ষেত্রে শিখা থেকে চোখে পৌঁছোতে পেরেছে, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে পাইপটা ছিল বাঁকা। আর তাই দ্বিতীয় ক্ষেত্রে আলো চোখে এসে পৌঁছোতে পারেনি।

তাহলে বলা যায়ঃ

আলো সরলরেখায় চলাচল করে। এটা আলোর একটা ধর্ম।

আলোর আচার-আচরণকে বুঝতে আমরা জ্যামিতির চিত্রের সাহায্য নিই। আলোর যাত্রাপথকে ওই চিত্রে তির চিহ্ন যুক্ত সরলরেখার সাহায্যে বোঝানো হয়।

আলোর চলার পথকে তির চিহ্ন যুক্ত যে কাল্পনিক সরলরেখা দিয়ে বোঝানো হয়, তাকে 'আলোক রশ্মি' (Ray of light) বলে। একটি আলোকরশ্মি বলে বাস্তবে কিছু নেই।

একসঙ্গে অসংখ্য আলোক রশ্মিকে, 'আলোক রশ্মিগুচ্ছ' (Beam of light) বলে।

আলোক রশ্মিগুচ্ছ তিন ধরনের হয়।

  • সমান্তরাল আলোক রশ্মিগুচ্ছ
  • অপসারী আলোক রশ্মিগুচ্ছ
  • অভিসারী আলোক রশ্মিগুচ্ছ

ভৌত পরিবেশ

🌓 প্রচ্ছায়া ও উপচ্ছায়া

সন্ধ্যা নেমে এসেছে। তোমার ঘরে টিউবলাইট (অথবা আলোর অন্য কোনো উৎস) জ্বলছে। তুমি লাইটটার ঠিক উলটো দিকের দেয়ালের কাছে তোমার হাত রাখলে। সঙ্গে সঙ্গে দেয়ালে তোমার হাতের তালুর আকৃতি একটা অন্ধকার জায়গা গঠিত হলো। তোমার হাতের তুলনায় আকৃতিটা একটু বড়ো। ভালোভাবে লক্ষ করে দেখলে দেখা যায়, ওই অন্ধকার আকৃতির মাঝখানের অংশ বেশ গাঢ়। আর ওই গাঢ় অন্ধকার অংশকে ঘিরে রয়েছে একটা আবছা অন্ধকার অংশ।

ওই গাঢ় অন্ধকার অংশটা হলো ছায়া বা প্রচ্ছায়া। আর প্রচ্ছায়াকে ঘিরে থাকা আবছা অন্ধকার অংশটা হলো উপচ্ছায়া

তুমি হাতটা যত দেয়ালের কাছে নিচ্ছ, দেখবে ছায়া তত ছোটো হচ্ছে। আর উপচ্ছায়াও কমছে। যখন হাত দেয়ালের খুব কাছে, তখন উপচ্ছায়া একেবারেই নেই। শুধুই প্রচ্ছায়া।

আবার হাত যত দেয়াল থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছ, তুমি দেখবে ছায়ার অংশটা ক্রমেই ছোটো হচ্ছে আর উপচ্ছায়া ক্রমেই বড়ো হচ্ছে।

কী দেখতে পেলে? দেয়ালে শুধুই তোমার হাতের ছায়া। উপচ্ছায়া অনুপস্থিত।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, আলোক উৎস বড়ো হলে প্রচ্ছায়া আর উপচ্ছায়া দুটোই গঠিত হয়। আবার উৎস যদি বিন্দু উৎস বা ছোটো উৎস হয় তখন উপচ্ছায়া গঠিত হয় না। শুধুই ছায়া গঠিত হয়।

পরিবেশ ও বিজ্ঞান

এবার হাতকে মোমবাতির কাছে নিয়ে যাও। কী দেখতে পাচ্ছ? ছায়া ক্রমশ বড়ো হতে থাকছে। হাত আবার আগের স্থানে নিয়ে এসো।

এবার, হাতকে দেয়ালের কাছে নিয়ে যেতে থাকো। কী দেখছ? ছায়া ক্রমশ ছোটো হচ্ছে। দেয়ালে স্পর্শ করার ঠিক আগের মুহূর্তে ছায়ার দৈর্ঘ্য ও হাতের দৈর্ঘ্য সমান হয়ে গেল।

এবার মোমবাতিটা হাতের কাছ থেকে দূরে সরাতে থাকো। কী দেখতে পেলে? ছায়া ক্রমেই ছোটো হতে থাকছে। মোমবাতিকে আবার আগের স্থানে নিয়ে এসো।

ভৌত পরিবেশ

এখন, মোমবাতিটাকে হাতের কাছে আনতে থাকো। কী লক্ষ করছ? ছায়া ক্রমশ বড়ো হচ্ছে।

পরীক্ষাটা এবার ঘরের মাঝখানটায় করো। মোমবাতিটাকে টেবিলের কিনারায় বসাও। তার সামনে হাতটা ধরো। এবার বন্ধুকে বলো একটা বড়ো ক্যালেন্ডার উলটোপিঠ করে তোমার হাতের পিছনে একটু দূরে ধরতে। সঙ্গে সঙ্গে ওই ক্যালেন্ডারের ওপরে তোমার হাতের ছায়া গঠিত হবে। (চিত্র -1)

এবার, ক্যালেন্ডারটা হাতের কাছ থেকে দূরে সরাতে থাকো। কী দেখছ? ছায়াটা ক্রমশ বড়ো হচ্ছে। (চিত্র -2) ক্যালেন্ডার আগের স্থানে নিয়ে এসো।

এখন ক্যালেন্ডারটা হাতের দিকে এগিয়ে আনতে থাকো। এবার দেখতে পাবে ছায়া ক্রমশ ছোটো হচ্ছে। (চিত্র -3) ক্যালেন্ডার হাতকে স্পর্শ করার ঠিক আগের মুহূর্তে হাতের দৈর্ঘ্য ও ছায়ার দৈর্ঘ্য সমান হয়ে যাবে। (চিত্র -4)

পরিবেশ ও বিজ্ঞান

তোমরা জেনেছ আলো সরলরেখায় গমন করে। তাই আলোর চলার পথে কোনো অস্বচ্ছ বস্তু ধরলে, আলো বাধা পায়। আর সামনে এগোতে পারে না। কিন্তু বাধা না পাওয়া আলো সরলরেখা ধরে সামনে এগিয়ে যায়। ফলে বস্তুটার পেছনে কোনো পর্দা ধরলে তাতে বস্তুটার আকৃতিবিশিষ্ট অন্ধকার অংশ গঠিত হয়।

তাহলে দেখা গেল আলো সরলরেখায় গমন করে বলেই বস্তুর 'ছায়া' বা 'প্রচ্ছায়া' গঠিত হয়।

বিস্তৃত আলোক উৎসের ক্ষেত্রে গঠিত হয় উপচ্ছায়া। এক্ষেত্রেও আলোর সরলরৈখিক গতিই দায়ী। আসলে, উপচ্ছায়া অংশে আলোক উৎসের কিছু অংশ থেকে আলো প্রবেশ করার সুযোগ পায়। তাই সেখানে অন্ধকার গাঢ় হতে পারে না।

ছবিতে দেখো AB অস্বচ্ছ বস্তু। P-বিন্দু উৎস থেকে আসা আলোকরশ্মিগুচ্ছ AB-র ধার ঘেঁসে PAA' ও PBB' পথে পর্দায় গিয়ে পড়েছে। APB ফানেল আকৃতির অংশের কোনো আলোকরশ্মিই পর্দায় পৌঁছোতে পারেনি। কারণ তারা AB- অস্বচ্ছ বস্তুতে বাধা পাচ্ছে। বাকি আলোক রশ্মিগুচ্ছ পর্দায় পৌঁছোতে কোনো বাধা পায়নি। ফলে তারা পর্দাকে আলোকিত করতে পেরেছে। ফলে পর্দার যে অংশ (A'B') কোনো আলো পেল না তা অন্ধকার হয়ে গেছে। এই অংশটা হলো বস্তুর ছায়া বা প্রচ্ছায়া

এবার এসো একটা বিস্তৃত আলোক উৎস নেওয়া যাক।

PQ বিস্তৃত আলোক উৎস। এই আলোক উৎসকে অসংখ্য বিন্দু আলোক উৎসের সমষ্টি ধরা যেতে পারে। P বিন্দু থেকে আসা APB ফানেল আকৃতির অংশের আলোক রশ্মিগুচ্ছের কোনো অংশই পর্দায় পৌঁছোতে পারেনি। কারণ তারা AB অস্বচ্ছ বস্তুতে বাধা পেয়েছে। তাই GF অংশে ছায়া সৃষ্টি হয়েছে। আবার একইরকম ভাবে Q বিন্দু থেকে আসা AQB ফানেল আকৃতির অংশের আলোকরশ্মিগুচ্ছের কোনো অংশই পর্দায় পৌঁছোতে পারেনি। কারণ AB-তে তারা বাধা পায়। ফলে EH অংশে অন্ধকার গঠিত হয়েছে।

ভৌত পরিবেশ

কিন্তু GH অংশে PQ আলোক উৎসের থেকে আসা কোনো আলোক রশ্মিই পৌঁছোতে পারেনি। তাই ওই অংশে গাঢ় ছায়া তৈরি হয়েছে। আবার GE অংশে, আলোক উৎসের নীচের দিক থেকে কোনো আলোই পর্দায় পৌঁছোতে পারেনি। কিন্তু ওপরের অংশ থেকে আলো পৌঁছোতে পেরেছে। তাই GE অংশের অন্ধকার গাঢ় হতে পারেনি। একই ঘটনা ঘটে FH অংশে। FH অংশে, আলোক উৎসের ওপরের অংশ থেকে কোনো আলো এসে পর্দায় পৌঁছোতে পারেনি। কিন্তু নীচের অংশ থেকে আলো ওই অংশে আসতে পেরেছে। ফলে FH অংশও গাঢ় অন্ধকার হতে পারেনি।

তাই GE ও FH অংশে গঠিত হয়েছে উপচ্ছায়া। আর GH অংশে গঠিত হয়েছে প্রচ্ছায়া বা ছায়া

📸 সূচিছিদ্র ক্যামেরা

🧪 হাতেকলমে 2

ঘরের দেয়ালের কাছে একটা টেবিল নাও। ওই টেবিলের উপর একটা জ্বলন্ত মোমবাতি বসাও। একটা কার্ডবোর্ড নাও। একটা সরু পেরেক দিয়ে বোর্ডটার মাঝখানে একটা ছিদ্র করো। ঘর অন্ধকার করে দাও, মোমবাতির শিখা ও দেয়ালের মাঝে কার্ডবোর্ডটিকে ধরো। খেয়াল রাখো যেন কার্ডবোর্ডের ছিদ্রটা ও মোমবাতির শিখা একই উচ্চতায় থাকে।

এবার সামনের দেয়ালটা লক্ষ করো।

কী দেখতে পাচ্ছ?

দেয়ালে উলটানো মোমবাতির শিখার ছবি কী করে গঠিত হলো?

মোমবাতির শিখা থেকে চারদিকে আলো ছড়াচ্ছে। কিন্তু সব আলোকরশ্মি কার্ডবোর্ডের ছিদ্রটি দিয়ে যাচ্ছে না। P-ছিদ্রের মধ্য দিয়ে মোমবাতির শিখার নীচের দিকের A বিন্দু থেকে আসা আলোকরশ্মি AA' পথে দেয়ালের উপর A' বিন্দুতে পৌঁছোয়। একইভাবে শিখার ওপরের দিকের B বিন্দু থেকে আসা আলোকরশ্মি BB' পথে দেয়ালের উপর B' বিন্দুতে পৌঁছোয়। একইভাবে শিখার অন্যান্য বিন্দু থেকে আসা একটি করে রশ্মি ছিদ্র P-দিয়ে গিয়ে দেয়ালে পৌঁছোয়। ফলে দেয়ালের উপর AB শিখার উলটানো প্রতিকৃতি B'A' পাওয়া যায়। আলো সরলরেখায় চলাচল করে বলেই এটা হয়

জুতোর বাক্সের মতো বড়ো একটি বাক্স নাও। ছবিতে যেমন দেখানো হয়েছে তেমনভাবে বাক্সটির একদিকের দেয়ালে সুচ বা সরু পেরেক দিয়ে একটি ছোট্ট ফুটো করো। বাক্সের ঠিক উলটো দিকের দেয়ালটি কেটে বাদ দিয়ে সেখানে ট্রেসিং পেপার বা ঘষা কাচ দিয়ে একটি দেয়াল বানাও। এবার অন্ধকার ঘরে গিয়ে বাক্সের দেয়ালের ওই ফুটোর কাছে একটি মোমবাতির শিখা ধরো। দেখত উলটোদিকের ট্রেসিং পেপার বা ঘষা কাচের দেয়ালে মোমবাতির শিখার উলটানো প্রতিকৃতি দেখতে পাও কিনা। এই বাক্সটিই হলো তোমার সূচিছিদ্র ক্যামেরা। আগের পরীক্ষায় নেওয়া ছিদ্রসহ কার্ডবোর্ড ও দেয়াল মিলে একসঙ্গে ওই ক্যামেরা তৈরি হয়েছিল। আগের পরীক্ষায় তুমি মোমবাতি, কার্ডবোর্ড সরিয়ে ভালোভাবে লক্ষ করো। শিখাকে ছিদ্র থেকে যত দূরে সরাবে প্রতিকৃতি তত ছোটো হবে।

পরিবেশ ও বিজ্ঞান

শিখাকে ছিদ্রের যত কাছে আনবে, প্রতিকৃতি তত বড়ো হবে।

শিখা ও ছিদ্রের দূরত্ব অপরিবর্তিত রেখে, ছিদ্র থেকে পর্দার দূরত্ব (অর্থাৎ ক্যামেরার দৈর্ঘ্য) যত বাড়ানো হবে প্রতিকৃতি তত বড়ো হবে।

যদি ছিদ্র ও পর্দার দূরত্ব কমে, তবে প্রতিকৃতি ছোটো হয়ে যাবে।

ছিদ্রকে বড়ো করে দেখো তো প্রতিকৃতির কিছু পরিবর্তন হয় কিনা?

আসলে, ছিদ্র বড়ো হলে তা অসংখ্য ছোটো ছোটো ছিদ্রের সমষ্টিরূপেই কাজ করে। প্রতিটি সূক্ষ্ম ছিদ্র একএকটি আলাদা আলাদা স্পষ্ট প্রতিকৃতি তৈরি করে। ফলে সমস্ত প্রতিকৃতি মিলেমিশে একটা অস্পষ্ট প্রতিকৃতি তৈরি হয়।

ভৌত পরিবেশ

স্বাভাবিকভাবেই ছিদ্র যত ছোটো হবে, প্রতিকৃতি তত সূক্ষ্ম হবে।

সূচিছিদ্র ক্যামেরায় বস্তুর প্রতিকৃতি গঠিত হয় মাত্র, তা মোটেই প্রতিবিম্ব নয়। এই ক্যামেরায় ফিলম লাগিয়ে ছবি তুলতে অনেক সময় লাগে, কারণ অনেকক্ষণ আলোকে ভিতরে প্রবেশ করাতে হয়।

তোমরা নিশ্চয়ই খেয়াল করেছ, বড়ো গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো প্রবেশ করে মাটিতে গোল গোল অসংখ্য আলোর পটি তৈরি করে। ওগুলো আসলে সূর্যের প্রতিকৃতি বা ছবি

কোন ক্যামেরায় সূর্যের এই ছবি উঠল বলো তো?

জানালা বা ভেন্টিলেটরের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো প্রবেশ করে ঘরের মেঝেতে বা দেয়ালে ওইরকম গোল গোল সূর্যের প্রতিকৃতি তৈরি করে।

এখানে ক্যামেরা কোনটি বলো তো?

একটা লাঠিকে লম্বভাবে মাটিতে পুঁতে দাঁড় করিয়ে রাখো। সারাদিন লাঠির ছায়াটাকে লক্ষ রাখো। এবার নীচের প্রশ্ন দুটোর উত্তর দাও।

লাঠির ছায়ার দৈর্ঘ্য–

  • কখন সবচেয়ে ছোটো?
  • কখন সবচেয়ে বড়ো?

অন্ধকার ঘরে টেবিলের উপর একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখো। বাতিটার সামনে একটা থালা কীভাবে ধরলে দেয়ালে নীচের আকৃতির ছায়া পাবে?

  1. সম্পূর্ণ বৃত্তাকার
  2. লম্বাটে গোল
  3. একটা সরু দণ্ডের মতো।

অন্ধকার ঘরে, একটা টর্চ বা মোমবাতি জ্বালাও। এবার তার সামনে তোমার দু-হাতের তালু ও আঙুল নানাভাবে ধরো। এখন সামনের দেয়ালে তার ছায়াটিকে লক্ষ করো।

পরিবেশ ও বিজ্ঞান

🪞 আলোর প্রতিফলন

🧪 হাতেকলমে 3

একটা ছোটো আয়না নাও। তোমার ঘরের ভিতর প্রবেশ করা উজ্জ্বল রোদের মধ্যে আয়নাটাকে ধরো। এবার আয়নাটাকে খুব ধীরে ধীরে সামান্য একটু এদিক-ওদিক করে ঘোরাও।

দেয়ালে কী দেখতে পাচ্ছ? ওই দেয়ালটাতে আলো এল কোত্থেকে?

আয়নাটা সামান্য নাড়ালে দেয়ালের ওই আলোও নড়ে ওঠে কেন?

তাহলে কি সূর্যের আলো ওই আয়নাতে পড়ে ফিরে গিয়ে দেয়ালে পৌঁছেছে?

আয়নাতে পড়ে আলোর এই যে ফিরে আসা, এই ঘটনাকে বলে আলোর প্রতিফলন (Reflection of light)।

চলো একটা পরীক্ষা করা যাক:

একটা সাদা শক্ত কাগজে একটা সরলরেখাংশ XY নাও (ছবিতে দেখো)। এখন ওই রেখাংশে একটা চাঁদা বসিয়ে ০° থেকে 180° পর্যন্ত চিহ্নিত করো এবং 60° কোণটি আঁকো। (ছবি দেখো)।

এবার কাগজটা টেবিলের ওপর পেতে দাও। একটা চিরুনি নাও, এবং ওই চিরুনির দাঁতগুলো কালো মোটা কাগজ দিয়ে এমনভাবে ঢেকে দাও যেন মাঝখানের একটামাত্র ফাঁক ঢাকা না পড়ে।

কাগজের উপর আঁকা সরলরেখা বরাবর একটা ছোট আয়না দাঁড় করাও। এমন একটি আয়না নিতে হবে যার চারদিকে কোনো ফ্রেম নেই।

এবার, চিরুনিটি কাগজের ওপর এমনভাবে দাঁড় করাও যাতে দাঁতগুলোর মাঝখানে ফাঁকা (না ঢাকা) জায়গাটি কোনো একটি কোণের (ধরি 60°) দাগের উপরে থাকে (ছবি দেখো)।

এবারে ঘর অন্ধকার করে সরু মুখওয়ালা টর্চটি জ্বালাও ও টর্চের আলো চিরুনির ওই ফাঁকা জায়গায় ফেলো। খেয়াল রাখো যাতে আলোর একটি রেখা চিরুনির ওপাশে আয়নার ওপর এমন জায়গায় পড়ে, যেখানে 90° চিহ্নিত রেখাটি আয়নাকে ছুঁয়েছে।

ভৌত পরিবেশ

খেয়াল করে দেখো 60° (বা অন্য কোনো কোণ) করে আয়নায় পড়া আলো আয়না থেকে প্রতিফলিত হয়ে উলটো দিকের 60° (বা অন্য কোনো কোণ) চিহ্নিত দাগের ওপর দিয়েই যাচ্ছে।

টেবিলে পাতা কাগজটা যদি উঁচুনীচু থাকে তাহলে আলোর রেখা কাগজের উপরে ভালোভাবে দেখা যাবে না। তাই সতর্ক থাকবে, যেন টেবিলে পাতা কাগজের তলে ঢেউ খেলানো না থাকে।

এবার, কাগজের উপর থেকে সব কিছু সরিয়ে দাও। একটা স্কেল দিয়ে আলোর আসার ও যাওয়ার পথ সরলরেখাংশ দিয়ে চিহ্নিত করো।

যে পথ ধরে আলো আয়নায় এসে পড়েছে তাকে 'আপতিত আলোকরশ্মি' (Incident Ray) বলে (AB)। আয়নায় পড়ে আলো যে পথ ধরে ফিরে যায় তাকে 'প্রতিফলিত আলোকরশ্মি' (Reflected Ray) বলে (BC)। আয়নার উপর যে বিন্দুতে আপতিত আলো এসে পড়েছে তাকে আপতন বিন্দু (Point of incidence) বলে (B)। আয়নার অবস্থান যে সরলরেখাংশ দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে (XY) তা প্রতিফলক (Reflector) বোঝাচ্ছে। প্রতিফলকের উপর আপতন বিন্দুতে আঁকা লম্বকে (BD) 'অভিলম্ব' (Normal) বলে। অভিলম্ব ও আপতিত রশ্মির মাঝের কোণকে 'আপতন কোণ' (Angle of incidence, ∠ ABD = ∠ i) বলে। (এক্ষেত্রে ∠ i = 30°)

পরিবেশ ও বিজ্ঞান

অভিলম্ব ও প্রতিফলিত রশ্মির মাঝের কোণকে 'প্রতিফলন কোণ' (Angle of reflection, ∠ CBD = ∠ r) বলে।

এবার ভালো করে দেখো তো আপতন ও প্রতিফলন কোণের মান, কোনটা কত?

উ: আপতন কোণ = 30° প্রতিফলন কোণ = 30° [ফাঁকা স্থান পূরণ করো]

তাহলে বলা যায় আপতন কোণ ও প্রতিফলন কোণের মান সমান হয়। - এটি প্রতিফলনের একটি নিয়ম।

এই পরীক্ষায় নিশ্চয়ই লক্ষ করেছ যে কাগজের তলের ওপরেই আপতিত ও প্রতিফলিত আলোর রেখা অবস্থান করছে। কাগজে ঢেউ খেলানো থাকলে বা কোথাও উঁচুনীচু থাকলে রেখাগুলি কাগজে ভালোভাবে পড়ছে না।

তাহলে বলা যায়, আপতিত রশ্মি, প্রতিফলিত রশ্মি ও প্রতিফলকের উপর আপতন বিন্দুতে আঁকা অভিলম্ব একই সমতলে থাকে। এটিও প্রতিফলনের অন্য একটি নিয়ম।

যখন মসৃণ তলে আলোর প্রতিফলন ঘটে তখন সেই প্রতিফলন হলো নিয়মিত প্রতিফলন (Regular Reflection of Light)। যেমন- আয়নায় প্রতিফলন, চকচকে স্টিলের মসৃণ বাটিতে প্রতিফলন।

সমতল দর্পণে নিয়মিত প্রতিফলনের সময় আপতিত আলোর রশ্মিগুচ্ছ একটি বিশেষ ধরনের হলে প্রতিফলনের পরেও সেই রশ্মিগুচ্ছ ওই বিশেষ ধরনেরই হয় যেমন, সমান্তরাল বা অভিসারী বা অপসারী।

ধরো, তুমি অপসারী রশ্মিগুচ্ছ পাঠালে। প্রতিফলনের পর তা আয়না থেকে অপসারী হয়েই ফিরবে যদি আয়নাটি সমতল হয়। কিন্তু যদি আয়নাটির তল বক্র হয় তাহলে অবশ্য প্রতিফলিত রশ্মিগুচ্ছ অপসারী না হয়ে সমান্তরাল বা অভিসারীও হতে পারে। প্রতিফলিত রশ্মিগুচ্ছের ধরন কেমন হবে তা নির্ভর করে আয়নাটির বক্রতা কেমন তার ওপর।

যখন অমসৃণ তলে আলোর প্রতিফলন ঘটে তখন সেই প্রতিফলনকে বিক্ষিপ্ত প্রতিফলন (Diffused Reflection of light) বলে। যেমন – গাছপালা, মাটি, ঘরের দেয়াল, সিনেমার পর্দা ইত্যাদির উপর আলোর প্রতিফলন।

  • নিয়মিত প্রতিফলন: কোনো মসৃণ তলে প্রতিফলন সাধারণ ভাবে নিয়মিত প্রতিফলন। যেমন সমতল বা বক্রতল আয়নায় প্রতিফলন।

ভৌত পরিবেশ

  • বিক্ষিপ্ত প্রতিফলন: এই প্রতিফলনে আপতিত রশ্মিগুচ্ছ সমান্তরাল হলেও প্রতিফলনের পর তারা আর সমান্তরাল থাকে না। বিক্ষিপ্তভাবে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

তবে দুই ক্ষেত্রেই প্রতিটি আলোকরশ্মি প্রতিফলনের দুটি সূত্রই মেনে চলে।

নিয়মিত ও বিক্ষিপ্ত প্রতিফলনের কয়েকটি উদাহরণ খাতায় লিখে ফেলো।

💧 আলোর প্রতিসরণ

🧪 হাতেকলমে 4

একটা কাচের গ্লাসে কিছুটা জল নাও। ওপর থেকে জলের যে তল দেখতে পাচ্ছ তা বায়ু ও জলকে আলাদা করেছে। জলের এই তল হলো বায়ু ও জলের বিভেদ তল। এবার ওই গ্লাসের মধ্যে ধীরে ধীরে গা চুঁইয়ে অল্প নীল কেরোসিন তেল নাও।

এবার গ্লাসের পাশ থেকে জলের ভিতর দিয়ে ওপরের দিকে তাকাও। কী দেখতে পাচ্ছ?

যে নীলরঙের গোল তলটা দেখতে পাচ্ছ সেটা 'কেরোসিন ও জলের বিভেদতল'।

জল যেখানে শেষ হয়েছে আর কেরোসিন যেখান থেকে শুরু হয়েছে অর্থাৎ দুই আলাদা আলাদা ঘনত্বের মাধ্যমের সংযোগস্থলে যে তল, তাকেই ওই মাধ্যম দুটোর 'বিভেদতল' বলে।

পরিবেশ ও বিজ্ঞান

🧪 হাতেকলমে 5

নীচের পরীক্ষাটি তোমরা দেখবে, নিজে হাতে করবে না। তোমাদের শিক্ষক বা শিক্ষিকা ক্লাসে করে দেখাবেন। উপকরণ: একটা কাচের ব্লক বা বুদবুদহীন নিরেট পেপারওয়েট বা কাচের ব্লক, একটা লেজার টর্চ, সাদা একটা পর্দা।

তোমাদের শিক্ষক/শিক্ষিকা লেজার টর্চটা জ্বালিয়ে দেয়ালের দিকে ধরলেন। ফলে দেয়ালে একটা আলোর বিন্দু তৈরি হলো। কিন্তু টর্চটা মাস্টারমশাই বা দিদিমণির হাতে থাকায় আলোক বিন্দুটা নড়ছে। তাই একটা টেবিলের ওপর টর্চটা রাখা হলো। এবার টর্চটা স্থির হলো। তাই আলোর বিন্দুটাও স্থির হলো। দেয়ালে বিন্দুটাকে 'A' লিখে চিহ্নিত করা হলো। এরপর কাচের ব্লক বা পেপারওয়েটটা ওই আলোর পথে ধরা হলো। আলো এবার কাচের মধ্যে দিয়ে গিয়ে দেয়ালে পড়েছে। এবার দেয়ালের দিকে তাকিয়ে দেখত আলোর বিন্দুটা দেয়ালে 'A' - চিহ্নিত জায়গাতেই পড়ল, না সরে গেল?

আলোক বিন্দুটা সরে গেল কেন? ভাবো।

তাহলে কি আলো তার গতিপথ পরিবর্তন করল? কেন করল? ভাবো।

এবার কাচের ব্লক বা পেপারওয়েট সরিয়ে দাও।

এবার কী দেখলে? আলোক বিন্দু কি আবার আগের অবস্থানে ফিরে গেল?

তাহলে কি ওই কাচের ব্লক বা পেপারওয়েটটাই এজন্য দায়ী?

আলোকরশ্মি কোনো মাধ্যম দিয়ে যেতে যেতে যদি অন্য কোনো আলাদা মাধ্যমে প্রবেশ করে, তখন ওই মাধ্যম দুটির বিভেদতল থেকে আলোর গতিপথের পরিবর্তন ঘটে। এই ঘটনাকে আলোর প্রতিসরণ বলে।

ভৌত পরিবেশ

🌊 আলোর প্রতিসরণ

  • OB - প্রতিসৃত রশ্মি
  • ∠AOC - আপতন কোণ (i)
  • ∠DOB - প্রতিসরণ কোণ (r)
  • EOF - মাধ্যমদ্বয়ের বিভেদতল
  • COD - অভিলম্ব।

চিত্র 1 -এ আলোকরশ্মি মাধ্যম 1-থেকে মাধ্যম 2-তে প্রবেশ করেছে ও অভিলম্ব থেকে দূরে সরে গেছে। যে মাধ্যমে প্রবেশ করলে আলোকরশ্মি অভিলম্ব থেকে দূরে সরে যায় সেই মাধ্যমটিকে আলোর ক্ষেত্রে লঘুতর মাধ্যম বলা হয়। এখানে মাধ্যম 2, মাধ্যম 1-এর চেয়ে লঘুতর।

চিত্র 2-এ আলোকরশ্মি মাধ্যম 2-তে প্রবেশ করার পর অভিলম্বের দিকে সরে গেছে। যে মাধ্যমে প্রবেশ করলে আলোকরশ্মি অভিলম্বের দিকে সরে যায় সেই মাধ্যমকে আলোর ক্ষেত্রে ঘনতর মাধ্যম বলা হয়। এক্ষেত্রে মাধ্যম 2, মাধ্যম 1-এর চেয়ে ঘনতর।

ধরা যাক, আলোক রশ্মিগুচ্ছ কোনো মাধ্যম দিয়ে চলতে চলতে দ্বিতীয় কোনো ভিন্ন ঘনত্বের মাধ্যমে যাত্রা করছে। দেখা যায় ওই আলোক রশ্মিগুচ্ছের কিছু অংশ মাধ্যমদ্বয়ের বিভেদতল থেকে পুনরায় প্রথম মাধ্যমে ফিরে আসে। এই ঘটনাটাই আলোর প্রতিফলন

আলোক রশ্মিগুচ্ছের বাকি অংশ দ্বিতীয় মাধ্যমে প্রবেশের পর আগেকার যাত্রাপথ থেকে সরে যায় ও নতুন সরলরেখা বরাবর চলে। এই ঘটনাকে বলে আলোর প্রতিসরণ

পরিবেশ ও বিজ্ঞান

🖼️ প্রতিবিম্ব

🧪 হাতেকলমে 6

একটা আয়নার সামনে একটু কোণ করে (ছবির মতো) একটা টর্চ ধরো।

এবার টর্চটা জ্বালাও।

কী দেখলে?

আয়নায় টর্চের আলোর প্রতিফলন ঘটে আলো যে দিকে বেরিয়ে এল, তোমার চোখকে সেদিকে নিয়ে যাও। এবার ওই দিক থেকে আয়নার মধ্যে তাকাও। কী দেখতে পাচ্ছ?

তোমার কি মনে হচ্ছে আলোটা আয়নার ভিতরে থাকা একটা টর্চ থেকে আসছে?

সত্যিই কি আলো আয়নার ভিতরে থাকা টর্চ থেকে আসছে?

সত্যিই কি আয়নার ভিতরে কোনো টর্চ আছে?

আয়নার ভিতরে যে টর্চটা তুমি দেখেছ, সেটা আসলে তোমার হাতে থাকা (আয়নার বাইরে) টর্চটার প্রতিবিম্ব। এই ঘটনাটা ঘটেছে আলোর প্রতিফলন ধর্মের জন্য।

যে-কোনো চকচকে তলের উপর বস্তু থেকে আসা আলোকরশ্মির প্রতিফলনের ফলে এমনই প্রতিবিম্ব গঠিত হয়। বস্তুটি চকচকে তলটির যে দিকে থাকে, বস্তুর প্রতিবিম্ব ঠিক তার উলটোদিকে তৈরি হয়।

আলোকরশ্মির চিত্র এঁকে প্রতিবিম্ব তৈরি হওয়ার ঘটনাকে ব্যাখ্যা করা হয়। P - বস্তু, P'-প্রতিবিম্ব, MM'- আয়না।

যে-কোনো চকচকে তল – সানগ্লাসের কাচ, চকচকে পালিশ করা টেবিল, পুকুরের জল, জানালার গাঢ় রঙের চকচকে কাচ ইত্যাদির মধ্যে এমন প্রতিবিম্ব গঠিত হওয়া সম্ভব।

পরিবেশ ও বিজ্ঞান

🧪 হাতেকলমে 7

তুমি একটা বড়ো আয়নার সামনে দাঁড়াও। আয়নায় গঠিত হওয়া তোমার প্রতিবিম্বের দিকে লক্ষ করো।

তোমার আর তোমার প্রতিবিম্বের উচ্চতা কি এক?

এবার একটা পেন হাতে নিয়ে আয়নাটার উপর শুইয়ে দিয়ে, আঙুল দিয়ে চেপে ধরো।

এবার দেখত তোমার আঙুলে চাপা পেন (আয়নার বাইরে) আর আয়নার ভিতরকার পেনের প্রতিবিম্ব একেবারে সমান মাপের কিনা?

আয়নায় গঠিত 'প্রতিবিম্ব'ও 'বস্তুর মাপ' (Size) সমান।

এবার একটি আয়না থেকে তুমি ঠিক মেপে মেপে 'চার পা' পিছিয়ে এসে দাঁড়াও।

এবার এক পা এক পা করে আয়নার দিকে এগোতে থাকো, আর তোমার প্রতিবিম্বের দিকে লক্ষ রাখো।

প্রতিবিম্বও কি তোমার সঙ্গে সঙ্গে এক পা এক পা করেই তোমার দিকে এগোচ্ছে?

তুমি আয়না পর্যন্ত পৌঁছোতে যত দূরত্ব অতিক্রম করলে তোমার প্রতিবিম্বও কী আয়না পর্যন্ত পৌঁছোতে তত দূরত্বই অতিক্রম করল ?

তাহলে বলা যায়, 'বস্তু থেকে আয়না ও আয়না থেকে প্রতিবিম্বের দূরত্ব সমান'।

তোমার ডান হাতটা দিয়ে আয়নাটাকে স্পর্শ করো। -প্রতিবিম্ব কোন হাত দিয়ে আয়নাটাকে স্পর্শ করল?

তোমার বাঁ পা-টা একটু ওঠাও। তোমার প্রতিবিম্বের কোন পা উঠল?

তবে বলা যায় আয়নায় বস্তুর প্রতিবিম্বের পার্শ্ব পরিবর্তন হয়। অর্থাৎ ডান দিকটা বাঁ দিক ও বাঁ দিকটা ডান দিক মনে হয়। কিন্তু উপরটা উপর দিকে এবং নীচেরটা নীচের দিকেই থাকে। অর্থাৎ আয়নায় গঠিত প্রতিবিম্ব সমশীর্ষ

আয়নায় প্রতিফলনের ফলে, A থেকে Z পর্যন্ত কোন কোন অক্ষরের প্রতিবিম্বের পার্শ্বপরিবর্তন হয় তা ভেবে লেখো।

AMBULANCE কথাটা অ্যাম্বুলেন্স গাড়িতে উলটে লেখা থাকে কেন? দলে আলোচনা করে উত্তর খাতায় লেখো।

🧪 হাতেকলমে ৪

একটা কাচের গ্লাসের মধ্যে একটা পেন বা সোজা কাঠি রাখো।

পরিবেশ ও বিজ্ঞান

এবার গ্লাসটাতে কিছুটা জল ঢালো। পেন বা কাঠিটার কোনো অংশে কি কিছু পরিবর্তন লক্ষ করছ? পরিবর্তন হলে সেটা কোন অংশে?

পেন বা কাঠিটার নীচের অংশ যেখান থেকে জলের ভেতরে আছে সেখান থেকে পেন বা কাঠিটাকে বাঁকা লাগছে কেন?

পেন বা কাঠিটাকে জল থেকে তুলে দেখো তো পেন বা কাঠিটা সত্যিই বেঁকেছে কিনা?

আসলে গ্লাসে জল ভরার পরই যেহেতু ঘটনাটা ঘটেছে, আবার জল থেকে পেন বা কাঠি তুলে নিলে পেন বা কাঠিটা যেহেতু সোজাই থাকে, তাহলে বোঝা যাচ্ছে, গ্লাসে জল ঢালাই এর কারণ।

আসলে গ্লাসে জল ঢালার পর গ্লাসের ভিতরে দুটো মাধ্যম থাকে। (1) জল (ঘনতর মাধ্যম) ও (2) বায়ু (লঘুতর মাধ্যম)।

পেন বা কাঠির জলের তলার অংশ থেকে আলো যখন জল (ঘনতর মাধ্যম) পেরিয়ে বায়ুতে (লঘুতর মাধ্যম) পৌঁছোয় তখন মাধ্যম দুটির বিভেদতল থেকে আলো বেঁকে গিয়ে তোমার চোখে এসে পড়ে। তোমার চোখ তখন আসল পেন বা কাঠিটার নিমজ্জিত অংশ নয়, পেন বা কাঠির নিমজ্জিত অংশের প্রতিবিম্বটি দেখো। প্রতিসরণের জন্যও প্রতিবিম্ব তৈরি হয়।

🧪 হাতেকলমে 9

একটা খালি বালতি নাও। একটা পেনসিল দিয়ে বালতির ভিতরের দেয়ালে উপরের দিকে একটা দাগ দাও (ছবি দেখো)। এবার একটা সোজা লাঠি দিয়ে বালতির তলা থেকে ওই পেনসিলের দাগ অবধি মেপে লাঠির গায়েও একই উচ্চতায় পেনসিলের দাগ দাও। এরপর লাঠিটা তুলে নাও।

এবার বালতিতে ওই দাগ অবধি জল ঢালো। বালতির উপর থেকে তাকাও।

কী দেখছ? বালতিটার তল কিছুটা উপরে উঠে এসেছে বলে মনে হচ্ছে কি? বালতিটা কম গভীর লাগছে?

এবার জল থাকা অবস্থায় লাঠিটা দিয়ে বালতির দাগ অংশের উচ্চতা আবার মাপো।

কী দেখলে? কাঠির দাগের সঙ্গে বালতির দাগ মিলে যাচ্ছে। তবে বালতির তল কি সত্যি সত্যি উপরে উঠে আসেনি?

আসলে প্রতিসরণের জন্য এই ঘটনাটা ঘটেছে। বালতির তলদেশ থেকে আসা আলোক রশ্মিগুচ্ছ যখনই জল (ঘনতর মাধ্যম), পেরিয়ে বায়ুতে (লঘুতর মাধ্যম) প্রবেশ করে, সেইসময় মাধ্যমদ্বয়ের বিভেদতল থেকে আলোক রশ্মিগুচ্ছ অভিলম্ব থেকে দূরে সরে যায়। ফলে বেঁকে যাওয়া প্রতিসৃত রশ্মিগুচ্ছ যখন তোমার চোখে এসে পড়ে তখন তুমি ওই তলের প্রতিবিম্বকে দেখো, যা প্রকৃত তলদেশের কিছুটা উপরে অবস্থান করছে বলে মনে হয়। তাই তোমার মনে হয়েছে তলটা উপরে উঠে এসেছে।

ভৌত পরিবেশ

🌈 বর্ণালি

🧪 হাতেকলমে 10

জানালার ফাঁক দিয়ে তোমার ক্লাসরুমের মেঝেতে, যেখানে কড়া রোদ এসে পড়েছে, সেখানে একটা সাদা কাগজ বিছিয়ে দাও। এবার একটা প্রিজম নিয়ে ওই আলোর পথে সাদা কাগজটার কাছাকাছি ধরো।

কী দেখতে পাচ্ছ?

এত রং কোথা থেকে এল? ভালো করে দেখো কি কি রং তুমি ওই রঙিন আলোর মধ্যে দেখতে পাচ্ছ।

সূর্যের আলো আসলে অনেক আলাদা রং-এর আলোর সমষ্টি। এধরনের আলোকে যৌগিক আলো বলে। সূর্যের আলো কাচের প্রিজমের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় ওই বিভিন্ন রং-এর আলো আলাদা হয়ে যায়। আমরা ওই রংগুলোর মধ্যে চোখে দেখে মোটামুটিভাবে সাতটা রং-এর আলো আলাদা করতে পারি। এই সাতটা আলাদা হওয়া আলোর পটিকে একসঙ্গে বলে 'বর্ণালি'। আর যৌগিক আলো থেকে এইভাবে বিভিন্ন রং-এর আলোগুলোর আলাদা হয়ে যাওয়ার ঘটনাকে বিচ্ছুরণ বলে। 1666 খ্রিস্টাব্দে বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন বিচ্ছুরণ আবিষ্কার করেন। সূর্যের আলোর মধ্যে থাকা এই সাতটা রং-এর আলোগুলো হলো-

  1. বেগুনি (Violet) 🟣
  2. নীল (Indigo) 🔵
  3. আসমানি (Blue) 🟦
  4. সবুজ (Green) 🟢
  5. হলুদ (Yellow) 🟡
  6. কমলা (Orange) 🟠
  7. লাল (Red) 🔴

কিন্তু এই বিচ্ছুরণ পদ্ধতিতে বর্ণালির সাতটা রং-এর আলোর পটিকে পরিষ্কারভাবে দেখতে পাবে না। তার কারণ হলো আলোর পটিগুলো একটার উপর আর একটা এসে পড়তে পারে। ফলে মাঝের বর্ণগুলো ভালোভাবে দেখা যায় না।

তুমি আকাশে কখনও রংধনু দেখেছ?

আকাশের রংধনু আসলে সূর্যের সাদা আলোর বিচ্ছুরণের প্রাকৃতিক ঘটনা মাত্র।

রংধনু সাধারণত বৃষ্টির পর বিকেলের আকাশে দেখতে পাওয়া যায়। আকাশে ভাসমান জলকণা থাকে। ওই জলকণার মধ্যে দিয়ে সূর্যের আলো যাওয়ার সময় বিচ্ছুরণের ফলে আকাশে যে সাতটা আলোর পটি গঠিত হয় সেটাই রংধনু।

পরিবেশ ও বিজ্ঞান

☢️ অদৃশ্য আলোর ক্ষতিকারক প্রভাব

অতিবেগুনি রশ্মি:

সূর্য থেকে যে আলো এসে পৃথিবীতে পড়ে তার সবটুকু আমরা চোখে দেখতে পাই না, অদৃশ্য আলোও কিছু আছে। চোখে দেখতে না পেলেও অদৃশ্য আলো যে আছেই বিজ্ঞানীদের কাছে তার অনেক প্রমাণ আছে। অদৃশ্য আলোর একটা অংশ হলো অতিবেগুনি আলো, ইংরেজিতে আল্ট্রাভায়োলেট লাইট (ultraviolet light)। এর শক্তি দৃশ্যমান আলোর চেয়ে অনেক বেশি, তাই জীবন্ত কোশের পক্ষে অতিবেগুনি আলো অত্যন্ত ক্ষতিকারক। সরাসরি চোখে পড়লে চোখের লেন্সের ক্ষতি হয়, চোখের মধ্যের যে আলোক সংবেদী স্তর (বা রেটিনা) আছে তারও ক্ষতি করে। এছাড়াও চামড়ায় সূর্যালোকের অতিবেগুনি রশ্মি পড়লে চামড়ার ক্যানসারও হতে পারে। তাহলে জীবজগৎ সূর্যালোকের অতিবেগুনি রশ্মির হাত থেকে বাঁচবে কী করে? পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের উপরদিকে ওজোন গ্যাসের স্তর আছে। এই ওজোন স্তর সূর্যরশ্মির অতিবেগুনি রশ্মিকে আসতে বাধা দেয়। তা না হলে আমাদের খুবই বিপদ হতো।

ওজোন স্তর আছে বলে নিশ্চিন্ত হবার দিন আর নেই। মানুষের কর্মকাণ্ডে এমন সব গ্যাসীয় পদার্থ ওজোন স্তরে পৌঁছোচ্ছে যারা ওজোন অণুকে ভেঙে দেয়, বা তৈরি হতেও বাধা দেয়। এর ফলে ধীরে ধীরে ওজোন স্তর নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমাদের চামড়ার মেলানিন বলে একরকমের রঞ্জক পদার্থ তৈরি হয়। চামড়ায় অতিবেগুনি রশ্মি এসে পড়লে তাকে শুষে নিয়ে মেলানিন আমাদের চামড়ার নীচের কোশগুলোকে বাঁচিয়ে দেয়। মেলানিন বেশি থাকলে চামড়া বাদামি বা কালো হয়ে যায়। লক্ষ করে দেখো, আফ্রিকা পৃথিবীর নিরক্ষীয় অঞ্চলে, তাই সেখানে সূর্য রশ্মি খুব প্রখর। সেখানকার কালো মানুষদের চামড়ার মেলানিনের পরিমাণও তাই অনেক বেশি। বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশের সাদা চামড়ার মানুষদের চামড়ায় কিন্তু মেলানিনের পরিমাণ অনেক কম। তাই সাদা চামড়ার মানুষদের অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি। অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে কোশের খুব দরকারি ডি.এন.এ অণুর (DNA) ক্ষতি হয়। ওজোন স্তর ক্রমশ ক্ষয় হয়ে যাওয়ার ফলে পৃথিবীতে চামড়ার ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে।

এক্স রশ্মি:

তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে হাত ভাঙলে, বা পড়ে গিয়ে কোমরে চোট পেলে ডাক্তারবাবু 'এক্স-রে' করিয়ে আসতে বলেন। এক্স-রশ্মি (X-Ray) কী? 'রে' মানে রশ্মি বা আলো। এক্স রেও একরকমের অদৃশ্য আলো। এক্স-রশ্মি চামড়া আর মাংস ভেদ করে যেতে পারে। এক্স রশ্মি হাড়ের মধ্যে দিয়ে চলে যেতে পারে না তাই হাড়ের কোনখানটা ভেঙেছে বা ক্ষয়ে গেছে তা ছবি তুলে বোঝা যায়। এক্স-রশ্মিও কিন্তু দীর্ঘ ব্যবহারে ক্যানসার সৃষ্টি করে। এই কারণেই গর্ভস্থ শিশুর এক্স-রে করা উচিত নয়। যেসব কর্মী এক্স-রশ্মি মেশিন চালনা করেন উপযুক্ত সাবধানতা না নিলে তাঁদের ক্যানসার হতে দেখা যায়।

🌿 জীবের শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়ায় আলোর ভূমিকা

টুকুন উঠোনের পাশে টবের মাটিতে কয়েকটা বীজ ফেলেছিল। দিন কয়েক পর লক্ষ করল বীজ থেকে একটা ছোটো চারা বেরিয়েছে। আর ক্রমশ ওই চারার ডগার দিকটা অন্ধকার স্যাঁতসেঁতে জায়গা থেকে আলোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে (ছবিতে লক্ষ করো আলো বামদিক থেকে আসছে আর গাছ সেদিকে বেঁকে যাচ্ছে)।

ভৌত পরিবেশ

আলো ছাড়া গাছের খাদ্য তৈরি করা সম্ভব নয়। অন্ধকারে উদ্ভিদ বেঁচে থাকতে পারে না। ইটের নীচে বেশ কয়েকদিন চাপা পড়লে ঘাসগুলোর রং পরিবর্তন হয়। বেশিদিন চাপা পড়ে থাকলে মরেও যায়। উদ্ভিদের সবুজ অঙ্গগুলো আলোকশক্তি শোষণ করে তাকে খাদ্যের শক্তি পরিণত করে। তারপর ওই খাদ্য ভেঙে পাওয়া শক্তিকে কাজে লাগিয়ে উদ্ভিদের নানা অঙ্গে সাড়া জাগে।

কেমন এই সাড়া এসো দেখা যাক।

বিভিন্ন দেশে শীত ও গরমকালে দিনের দৈর্ঘ্যের পার্থক্য ঘটে। এজন্য গরমকাল আর শীতকালে ভিন্ন ভিন্ন ফুল ফোটে।

  • গরমকালে ফোটে এমন কয়েকটি ফুলের নাম লেখো।
  • শীতকালে ফোটে এমন কয়েকটি ফুলের নাম লেখো।

📚 টুকরো কথা

গম, ভুট্টা, পালং ও মুলোগাছে দিনের দৈর্ঘ্য 12 ঘন্টার বেশি হলে তবে ফুল ফোটে। আবার চন্দ্রমল্লিকা, ডালিয়া, আখ ও আলুগাছে দিনের দৈর্ঘ্য 12 ঘন্টার কম হলে তবে ফুল ফোটে। আর টম্যাটো, সূর্যমুখী গাছের ফুল ফোটা দিনের দৈর্ঘ্যের কমা-বাড়ার ওপর নির্ভরশীল।

তোমার জানা দুটি করে গাছের নাম লেখো যাদের ফুল ফোটার জন্য:

  • 12 ঘন্টার বেশি আলোর প্রয়োজন হয়।
  • 12 ঘন্টার কম আলোর প্রয়োজন হয়।

প্রাণীজগতেও আলোর নানা প্রভাব দেখা যায়। আলো কম পেলে স্যামন মাছের বাচ্চারা মরে যায়। সূর্যের আলো কম পেলে গিরগিটি, সাপ ও আরো কত প্রাণী (ছুঁচো, ভালুক, ব্যাং) শীতঘুমে চলে যায়। ডানদিকের নীচের ছবিতে এক ধরনের ব্যাং কীভাবে নিজের পুরো দেহকে লুকিয়ে ফেলেছে দেখো। গুহাবাসী অনেক প্রাণীকে আলোতে আনলে তাদের চামড়ায় রঙিন পদার্থ তৈরি হতে শুরু হয়। সূর্য যখন মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়ে তখন পঙ্গপালের চলাফেরা বন্ধ হয়ে যায়। কোনো কোনো প্রাণী খোলস ছাড়া বা চামড়ার নীচে ফ্যাট জমা হওয়ার প্রক্রিয়াও আলোর প্রভাবে ঘটে। পরিযায়ী পাখিদের খুব শীতের জায়গা থেকে অপেক্ষাকৃত গরম জায়গায় উড়ে যাওয়া সূর্যের আলোর তীব্রতার উপর নির্ভর করে। জোনাকির মতো অনেক প্রাণী আবার আলো তৈরি করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করে।

এবার শিক্ষক/শিক্ষিকার সঙ্গে বা বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করে নীচের প্রভাবগুলির উদাহরণ তোমার চারপাশের পরিবেশের বিভিন্ন জীব থেকে খুঁজে বার করার চেষ্টা করো। (মাছ, পিঁপড়ে, পাখি, আরশোলা, ব্যাং, কেঁচো বা তোমার পরিচিত প্রাণী।)

  • আলোর প্রভাবে জীবের চলাফেরা।
  • আলোর প্রভাবে জীবের ডিম পাড়া।
  • আলোর প্রভাবে জীবের চোখের রং পরিবর্তিত হওয়া।
  • আলোর প্রভাবে জীবের চামড়ার রং বদলে যাওয়া।

CONTENT MANAGER

Sattar Uddin SohelSattar Uddin Sohel