(iii) চুম্বক | পৃষ্ঠা ৩৮-৪৮
(iii) চুম্বক | পৃষ্ঠা ৩৮-৪৮ - WBBSE - Class 7 - Default Subject
পরিবেশ ও বিজ্ঞান 🌿
চুম্বক
চুম্বকের বিভিন্ন ধর্ম
হাতেকলমে-1 🧲
উপকরণ: একটা ইরেজার, একটা লোহার পেরেক, একটা প্লাস্টিকের স্কেল, একটা কাঠ পেনসিল, একটা পেনসিল কম্পাস, একটা এক টাকার কয়েন, একটা গাছের পাতা, একটা স্টেইনলেস স্টিলের চামচ, একটা ব্লেড, একটা কাচের গ্লাস ও একটা চুম্বক।
একটা কাঠের টেবিলের উপরে সবকটা উপকরণ রাখো। শুধু দণ্ড চুম্বকটা তোমার হাতে নাও। এবার দণ্ড চুম্বকটাকে টেবিলের উপর রাখা প্রতিটি জিনিসের কাছে নিয়ে যাও।
💡 দণ্ড চুম্বক: দণ্ড চুম্বক হলো একটা আয়তঘনাকার চুম্বকিত ইস্পাতের দণ্ড। এই চুম্বক এক প্রকার কৃত্রিম চুম্বক।
খেয়াল করো, চুম্বকটা কোন কোন জিনিসকে আকর্ষণ করছে, আর কোন কোন জিনিসকে আকর্ষণ করছে না। এরপর নীচের সারণিটাকে পূরণ করো।
| নাম | উপযুক্ত স্থানে '✓' চিহ্ন দাও | জিনিসগুলো যে উপাদানে তৈরি সেই উপাদানের নাম |
|---|---|---|
| চুম্বক আকর্ষণ করছে | চুম্বক আকর্ষণ করছে না | |
| ইরেজার | ||
| লোহার পেরেক | ||
| প্লাস্টিক স্কেল | ||
| কাঠ পেনসিল | ||
| পেনসিল কম্পাস | ||
| টাকার কয়েন | ||
| গাছের পাতা | ||
| স্টিলের চামচ | ||
| ব্লেড | ||
| কাচের গ্লাস |
ভৌত পরিবেশ 🌍
চুম্বক যে যে পদার্থকে আকর্ষণ করে তাদের 'চৌম্বক পদার্থ' বলে। এদের বিশেষ উপায়ে চুম্বকে পরিণত করা যায়। যেমন: লোহা, নিকেল, কোবাল্ট, কোনো কোনো ধরনের ইস্পাত ইত্যাদি।
যে যে পদার্থকে চুম্বক আকর্ষণ করতে পারে না তাদের 'অচৌম্বক পদার্থ' বলে। যেমন: প্লাস্টিক, রবার, কাঠ, কাগজ ইত্যাদি।
একটা গল্প আছে। প্রায় 2500 বছর আগে ম্যাগনেস (Magnes) নামে এক মেষপালক পাহাড়ের কোলে এক তৃণভূমিতে মেষ পালন করছিল। হঠাৎ তার পায়ের জুতোয় একটা টান অনুভব করল। আসলে জুতোয় ছিল লোহার পেরেক। পেরেকটাকে একটা পাথর আকর্ষণ করার ফলেই ঘটনাটা ঘটেছিল। পরে জানা গেল, পাথরটা সব লোহাকেই আকর্ষণ করার ক্ষমতা রাখে।
ম্যাগনেসিয়া নামক অঞ্চলে এরকম প্রচুর পাথরের সন্ধান পাওয়া যায়। চুম্বকের ইংরাজি নাম ম্যাগনেট (Magnet) হওয়ার এটাই কারণ। এই পাথরের নাম হলো 'ম্যাগনেটাইট'। একে 'প্রাকৃতিক চুম্বক' বলে।
তাহলে জানা গেল, চুম্বক দুরকমের।
চুম্বক
| প্রাকৃতিক চুম্বক বা ম্যাগনেটাইট | কৃত্রিম চুম্বক |
|---|---|
| এই চুম্বক প্রকৃতিতে পাওয়া যায় বলে একে প্রাকৃতিক চুম্বক বলে। এই চুম্বক সহজে বাজারে কিনতে পাবে না। যেসব জায়গায় এই খনিজ দ্রব্যের খনি আছে সেখানেই শুধু এই পাথর পাওয়া সম্ভব। | চৌম্বক পদার্থকে বিশেষ উপায়ে চুম্বকে পরিণত করে এই চুম্বক তৈরি করা হয়। |
হাতেকলমে 2 🧭
একটা দণ্ড চুম্বক নাও। মেঝের উপর চক দিয়ে উত্তর-দক্ষিণ বরাবর একটা সরলরেখাংশ আঁকো। এবার ওই রেখাংশের উত্তর প্রান্তে N ও দক্ষিণ প্রান্তে S লেখো।
এবার ছবির মতো করে SN রেখা বরাবর দণ্ড চুম্বকটাকে সুতো দিয়ে ঝুলিয়ে দাও। কাছাকাছি অন্য কোনো চুম্বক বা তড়িৎ প্রবাহিত হচ্ছে এমন বস্তু যেন না থাকে।
এবার চুম্বকটাকে একটু নাড়িয়ে ছেড়ে দাও। অবশেষে চুম্বক যখন সাম্যাবস্থায় এল- তুমি কী দেখতে পেলে?
পরিবেশ ও বিজ্ঞান 🌿
চুম্বকটা কি উত্তর-দক্ষিণ মুখ করে রয়েছে?
চুম্বকটাকে আবার একটু নাড়িয়ে সাম্য অবস্থায় আসতে দাও। এবার কী দেখতে পাচ্ছ?
প্রতিবারই কি চুম্বকটা উত্তর-দক্ষিণ মুখ করে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকছে?
তাহলে জানা গেল, চুম্বককে স্বাধীনভাবে ঘুরতে পারবে এমনভাবে ঝুলিয়ে দিলে তা সর্বদা 'উত্তর-দক্ষিণ' মুখ করে থাকে।
এবার ওই চুম্বকটাকে একটা থার্মোকলের টুকরোর উপর বসাও এবং থার্মোকলের টুকরোটা একটা প্লাস্টিকের জলভরা পাত্রে ভাসিয়ে দাও। জল স্থির হলে এবং চুম্বকসহ থার্মোকল সাম্য অবস্থায় এলে, চুম্বক কোন দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে লক্ষ করো।
এবার চুম্বকসহ থার্মোকলকে আস্তে করে ঘুরিয়ে দিয়ে ছেড়ে দাও। সাম্য অবস্থায় এলে লক্ষ করো চুম্বকটা কোন দিকে মুখ করে আছে।
স্বাধীনভাবে ভাসমান বা ঝুলন্ত চুম্বকের এই উত্তর-দক্ষিণ মুখ করে থাকার ধর্মকে চুম্বকের দিক-নির্দেশক ধর্ম বলে।
চুম্বক সংক্রান্ত নানা পরীক্ষানিরীক্ষা করার জন্য এক ধরনের খুব দরকারি চুম্বক পাওয়া যায়। এধরনের চুম্বককে 'চুম্বক শলাকা' বলে। চুম্বক শলাকা হলো আসলে একটা ছোট্ট হালকা চুম্বকিত ইস্পাতের পাত। দু-প্রান্ত সূচোলো এই চুম্বক একটা খাড়া দণ্ডের ওপর মুক্ত অবস্থায় রাখা হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে তা ছোট্ট কাচের বাক্সের মধ্যে রাখা থাকে। এই চুম্বক নানা মাপেও পাওয়া যায়।
হাতেকলমে 3 🔎
একটা লম্বা দণ্ড চুম্বক, কিছুটা লোহাচুর, একটা সাদা কাগজ নাও।
কাঠের টেবিলের উপর সাদা কাগজটা পাতো। এবার লোহাচুরগুলো সাদা কাগজের ওপর রাখো। এখন চুম্বকটার সারা গায়ে লোহাচুরগুলো মাখাতে চেষ্টা করো।
ভৌত পরিবেশ 🌍
এবার নীচের প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও। লোহাচুরগুলো কী চুম্বকের সব জায়গায় সমানভাবে আটকাচ্ছে? চুম্বকের কোন জায়গায় লোহাচুর সবচেয়ে বেশি আটকেছে? চুম্বকের কোন জায়গায় লোহাচুর সবচাইতে কম আটকেছে?
উপরের পর্যবেক্ষণ থেকে চুম্বকের আকর্ষণ ক্ষমতা কোথায় সবচেয়ে বেশি বলে তোমার মনে হয়? চুম্বকের কোন জায়গায় আকর্ষণ ক্ষমতা সবচেয়ে কম বলে তোমার মনে হয়?
জেনে রাখা দরকার 📌
চুম্বকের দুই প্রান্তে যে দুই অঞ্চলে চুম্বকের আকর্ষণ ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি, সেই দুই অঞ্চলকে চুম্বকের 'মেরু' বলে। এই মেরু দুটিকে দুটি বিন্দু হিসেবে ভাবা যেতে পারে।
চুম্বকের ঠিক মাঝখানে চুম্বকের আকর্ষণ ক্ষমতা প্রায় নেই বললেই চলে। ওই অঞ্চলকে চুম্বকের উদাসীন অঞ্চল বলে।
হাতেকলমে 4 📏
একটা দণ্ড চুম্বক, দুটো চুম্বক শলাকা, একটা পেনসিল ও একটা সাদা কাগজ নাও। সাদা কাগজটা একটা টেবিলের উপর আটকে দাও। এবার দণ্ড চুম্বকটা কাগজের উপর রাখো। এরপর দণ্ড চুম্বকের N-মেরুর দুই কোণ বরাবর ছবির মতো করে চুম্বক শলাকা দুটি রাখো।
এখন পেনসিল দিয়ে দণ্ড চুম্বকটির ধার ঘেঁষে দাগ কাটো। তারপর চুম্বক শলাকাদুটোর দুই প্রান্তবিন্দুর অবস্থান পেনসিল দিয়ে সাদা কাগজটায় বিন্দু এঁকে চিহ্নিত করো। বিন্দুগুলিকে A, B ও C, D নাম দাও।
এবার BA ও DC যুক্ত করে বাড়িয়ে দাও। ওই সরল রেখাংশ দুটো যে বিন্দুতে (N) ছেদ করল, সেই বিন্দুটাই জ্যামিতিক ভাবে দণ্ড চুম্বকের উত্তর মেরুর অবস্থান।
পরিবেশ ও বিজ্ঞান 🌿
এরকম করে তুমি চুম্বকটার দক্ষিণ মেরুর অবস্থান নির্ণয় করো। চুম্বকের মেরুবিন্দু দুটি আসলে চুম্বকের দুই প্রান্তদেশের কাছাকাছি চুম্বকের ভেতরে অবস্থান করে।
উত্তর মেরু উদাসীন অঞ্চল দক্ষিণ মেরু
------------------------------------->
<-------------------------------------
জ্যামিতিক দৈর্ঘ্য
NS = চৌম্বক দৈর্ঘ্য
চুম্বকের এই দুই মেরুর মধ্যবর্তী দূরত্বকে চৌম্বক দূরত্ব বলে। এই দৈর্ঘ্য চুম্বকের জ্যামিতিক দৈর্ঘ্যের 0.86 গুণ। অর্থাৎ চৌম্বক দৈর্ঘ্য = চুম্বকটির জ্যামিতিক দৈর্ঘ্য × 0.86।
অবাধে ঝুলন্ত বা ভাসমান অবস্থায় চুম্বকের যে মেরু মোটামুটি উত্তর দিকে মুখ করে থাকে তাকে উত্তর সন্ধানী মেরু বা উত্তর মেরু (N) বলে। আর যে মেরু মোটামুটি দক্ষিণ দিকে মুখ করে থাকে তাকে দক্ষিণ সন্ধানী মেরু বা দক্ষিণ মেরু (S) বলে।
চুম্বকের উত্তর ও দক্ষিণ মেরু যোগ করলে যে সরলরেখাংশ (NS) পাওয়া যায় তাকে চৌম্বক অক্ষ বলে।
একটা চুম্বকের চারধারে যে স্থান জুড়ে ওই চুম্বকের আকর্ষণ বা বিকর্ষণ ধর্ম কাজ করে তাকে ওই চুম্বকের চৌম্বক ক্ষেত্র বলে।
হাতেকলমে 5 🔄
ছবির মতো করে বা অন্য কোনোভাবে সুতো দিয়ে একটা দণ্ড চুম্বককে ঝুলিয়ে দাও। খেয়াল রাখো যেন আশেপাশে কোনো চৌম্বক পদার্থ বা চুম্বক না থাকে।
চুম্বকটাকে সাম্য অবস্থায় আসতে দাও। এবার অন্য একটা দণ্ড চুম্বকের উত্তর মেরু (N) ঝুলন্ত চুম্বকের উত্তর মেরু (N)- এর কাছে নিয়ে যাও।
কী দেখতে পেলে? ঝুলন্ত চুম্বকের উত্তর মেরু সরে গেল কেন?
ভৌত পরিবেশ 🌍
তাহলে কী ঝুলন্ত চুম্বকের উত্তর মেরুর উপর কেউ 'বল' প্রয়োগ করেছে? এই বল কোথা থেকে প্রযুক্ত হলো? কাছাকাছি দ্বিতীয় চুম্বকের উত্তর মেরু ছাড়া আর তো কিছু ছিল না। তবে কি দ্বিতীয় চুম্বকের উত্তর মেরুই এই বল প্রয়োগ করেছে?
তাহলে বোঝা গেল, একটা চুম্বকের উত্তর মেরু অপর চুম্বকের উত্তর মেরুকে বিকর্ষণ করে।
এবার সাম্য অবস্থায় চুম্বকের দক্ষিণ মেরুর (S) কাছে হাতের চুম্বকের দক্ষিণ (S) মেরুটাকে ধরো।
এক্ষেত্রে কী দেখতে পেলে? এ থেকে তুমি কী সিদ্ধান্তে আসতে পারো?
অতএব বোঝা গেল চুম্বকের সমমেরু পরস্পরকে বিকর্ষণ করে। অর্থাৎ S-মেরু, S-মেরুকে এবং N-মেরু, N মেরুকে বিকর্ষণ করে।
এবার ঝুলন্ত চুম্বকের N মেরুর কাছে, দ্বিতীয় চুম্বকের S-মেরু নিয়ে যাও।
কী দেখতে পাচ্ছ?
ঝুলন্ত চুম্বকের S মেরু তোমার হাতের চুম্বকের N মেরুর কাছে সরে এল কেন? এই দুই বিপরীত মেরুর (N ও S) মধ্যে কোনো ধরনের বল কাজ করছে কি? (আকর্ষণ বল না বিকর্ষণ বল?)
এবার হাতের দণ্ড চুম্বকের N মেরু সাম্য অবস্থায় ঝুলন্ত দণ্ড চুম্বকের S মেরুর কাছে ধরো।
এখন কী দেখতে পেলে? এবারেও কি পরস্পর দুই বিপরীত মেরু (N ও S) পরস্পরকে আকর্ষণ করল?
অতএব জানা গেল চুম্বকের বিপরীত মেরু (N ও S) পরস্পর পরস্পরকে আকর্ষণ করে।
ঝুলন্ত চুম্বকটির কাছে অন্য চুম্বকের বিপরীত মেরু নিয়ে আসায় আকর্ষণ হলো। যদি কোনো একটি লোহার দণ্ড বা স্টিলের দণ্ড আনা হতো তাহলেও তো আকর্ষণই হতো। তাহলে আকর্ষণ হচ্ছে দেখে কি জোর দিয়ে বলা যাবে যে দ্বিতীয় বস্তুটিও চুম্বক?
এবার ভেবে দেখো যদি বিকর্ষণ হতো তাহলে দ্বিতীয় বস্তুটির বিষয়ে তুমি কী বলতে? চুম্বক, না লোহা বা স্টিলের দণ্ড?
কোনো বস্তু চুম্বক কিনা তা জানতে আকর্ষণ, না বিকর্ষণ কোনটি বেশি নির্ভরযোগ্য বলে তোমার মনে হয়?
পরিবেশ ও বিজ্ঞান 🌿
হাতেকলমে 6 🔗
একটা শক্তিশালী দণ্ড চুম্বক, একটা লোহার দণ্ড, কয়েকটা ছোটো লোহার পেরেক আর একটা চুম্বক শলাকা নাও।
একটা লোহার পেরেক আর একটা পেরেকের সঙ্গে স্পর্শ করো। কী দেখতে পেলে? ওই পেরেক কি অন্য পেরেককে আকর্ষণ করল?
এবার ছবির মতো করে দণ্ড চুম্বকটাকে ধরো। এবার যে-কোনো মেরু, ধরা যাক 'N' মেরুর নীচে একটা লোহার পেরেক স্পর্শ করে ছেড়ে দাও। পেরেকটা দণ্ড চুম্বকের সঙ্গে আটকে যাবে।
এখন আর একটা পেরেক প্রথম পেরেকটার তলায় স্পর্শ করে ছেড়ে দাও। এবার কী দেখতে পাচ্ছ? দ্বিতীয় পেরেকটা প্রথম পেরেকটার তলায় স্পর্শ করে ঝুলছে কেন? কেন পড়ে যাচ্ছে না? তবে কী প্রথম পেরেকটা দ্বিতীয় পেরেকটাকে আকর্ষণ করছে? কেন?
এভাবে আর কয়েকটা পেরেক নিয়ে দেখো তো একটা পেরেকের চেন তৈরি করতে পারো কিনা।
এবার খুব সাবধানে অন্য হাত দিয়ে প্রথম পেরেকটাকে ধরো (সাবধানে, যাতে নাড়াচাড়ায় পেরেকের চেন থেকে পেরেক খসে না পড়ে)। এখন আস্তে করে দণ্ড চুম্বকটাকে সরিয়ে নাও।
এখন কী দেখতে পাচ্ছ? পেরেকগুলো সব খসে পড়ে গেল কেন?
তোমরা জানো, চুম্বক লোহাকে আকর্ষণ করে। লোহা লোহাকে আকর্ষণ করে না। তাই প্রথম ক্ষেত্রে, একটা লোহার পেরেক আর একটা লোহার পেরেককে আকর্ষণ করেনি।
দ্বিতীয় ক্ষেত্রে, প্রথম লোহার পেরেক দ্বিতীয়টাকে আকর্ষণ করে। কিন্তু সেক্ষেত্রে প্রথম পেরেকটাকে দণ্ড চুম্বক আকর্ষণ করে রেখেছিল। দণ্ড চুম্বক সরিয়ে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রথম পেরেকটার আকর্ষণ ক্ষমতাও চলে যায়। তাহলে নিশ্চয়ই দণ্ড চুম্বকটার জন্যই প্রথম পেরেকটা দ্বিতীয় পেরেককে আকর্ষণ করার ক্ষমতা অর্জন করেছিল।
আসলে, দণ্ড চুম্বকের প্রভাবে প্রথম পেরেকটা সাময়িকভাবে চুম্বকে পরিণত হয়। এই ঘটনাকে 'চৌম্বক আবেশ' বলে।
এভাবে 'আবেশের' ফলে চুম্বকে পরিণত হওয়া প্রথম পেরেকের প্রভাবে দ্বিতীয় পেরেকটিতে চুম্বকত্ব আবেশিত হয়, তার প্রভাবে তৃতীয় পেরেক চুম্বকে পরিণত হয়। এভাবেই পেরেকের চেনটা তৈরি হয়েছিল।
এই পরীক্ষা থেকে আমরা আরও জানতে পারলাম যে, চুম্বক যখন কোনো চৌম্বক পদার্থকে আকর্ষণ করে, তার আগে ওই চৌম্বক পদার্থকে আবেশিত করে চুম্বকে পরিণত করে। তাই বলা যায়, 'আকর্ষণের পূর্বে আবেশ হয়'।
ভৌত পরিবেশ 🌍
হাতেকলমে 7 💔
একটা দণ্ড চুম্বক নাও। এর একপ্রান্তে উত্তর মেরু আর এক প্রান্তে দক্ষিণ মেরু। এবার, চুম্বকটাকে মাঝখান থেকে দুই টুকরো করো। দেখত চুম্বকটার উত্তর ও দক্ষিণ মেরুকে আলাদা করা গেল কিনা?
একটা চুম্বকশলাকা দিয়ে পরীক্ষা করে দেখো, টুকরোদুটোর প্রত্যেকটার দুই প্রান্তে বিপরীত মেরুর (N ও S) সৃষ্টি হয়েছে।
এবার ওই দুই টুকরোর প্রত্যেকটাকে দুই টুকরো করে দেখো, N ও S মেরুকে আলাদা করা যায় কিনা।
প্রতি টুকরো আলাদা করে চুম্বক শলাকা দিয়ে পরীক্ষা করে দেখো, আবার ওই টুকরোতে N ও S মেরু সৃষ্টি হয়ে গেছে।
তাহলে বোঝা গেল, আলাদাভাবে শুধু একটা চৌম্বক মেরুর অস্তিত্ব সম্ভব নয়।
এক নজরে চুম্বকের বিভিন্ন ধর্ম ✨
- চুম্বকের আকর্ষণ ধর্ম।
- দিক নির্দেশক ধর্ম।
- সমমেরু পরস্পরকে বিকর্ষণ ও বিপরীতমেরু পরস্পরকে আকর্ষণ করে।
- আবেশী ধর্ম।
- আগে আবেশ পরে আকর্ষণ হয়।
- চুম্বকের সর্বদা দুটি বিপরীত মেরু থাকে।
- একক মেরুর অস্তিত্ব নেই।
পৃথিবী নিজেই কি একটি চুম্বক? 🌏
একটি ঝুলন্ত দণ্ড চুম্বক উত্তর-দক্ষিণ মুখ করে আছে। পকেটে অন্য একটি চুম্বক নিয়ে তোমার বন্ধু যদি ওই ঝুলন্ত চুম্বকটির সামনে গিয়ে দাঁড়ায় তাহলে কী হবে?
ঝুলন্ত চুম্বকটি কি উত্তর-দক্ষিণ মুখ করে থাকবে?
তাহলে ভেবে দেখত কিসের প্রভাবে একটি ঝুলন্ত চুম্বক তার ঝুলে থাকার দিক পরিবর্তন করে?
এবার ভাবো, যখন আশেপাশে কোনো চুম্বক নেই তখন ঝুলন্ত চুম্বক দণ্ড যেমন তেমনভাবে না থেকে শুধু উত্তর-দক্ষিণ মুখ করে থাকে কেন? তাহলে কি এমন অন্য কোনো চুম্বক আছে যা এইভাবে যে-কোনো ঝুলন্ত চুম্বক দণ্ডকে যেমন তেমনভাবে থাকতে দিচ্ছে না?— পৃথিবীই হলো সেই চুম্বক।
পৃথিবী যে নিজেই একটা চুম্বক তার সপক্ষে অনেক প্রমাণ আছে।
পরিবেশ ও বিজ্ঞান 🌿
ভৌগোলিক উত্তর মেরু
\ /
\ /
\ /
চুম্বকীয় উত্তর মেরু
|
|
| চুম্বকীয় দক্ষিণ মেরু
|
/ \
/ \
/ \
ভৌগোলিক দক্ষিণ মেরু
একটা লোহার দণ্ডকে বহুদিন ধরে পৃথিবীর উত্তর- দক্ষিণ দিক বরাবর রেখে দিলে দেখা যায় ওই দণ্ডের মধ্যে ক্ষীণ চুম্বকত্ব সৃষ্টি হয়েছে। দণ্ডটার উত্তরমুখী প্রান্তে 'উত্তর মেরু' আর দক্ষিণমুখী প্রান্তে 'দক্ষিণ মেরু' সৃষ্টি হয়।
ভাবো তো, কোনো চুম্বককে অবাধে ঝুলে থাকতে দিলে তা উত্তর-দক্ষিণ মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকে কেন?
আমরা জেনেছি চুম্বকের বিপরীত মেরু পরস্পরকে আকর্ষণ করে। এবার ভেবে দেখো, পৃথিবীর ভৌগোলিক উত্তর মেরুতে কি কোনো চুম্বক মেরু আছে? একইভাবে পৃথিবীর ভৌগোলিক দক্ষিণ মেরুতেও কি কোনো চুম্বক মেরু আছে?
আসলে, চুম্বকের উত্তর মেরু বলে আমরা চুম্বকের যে প্রান্তকে নির্দেশ করি তা হলো 'উত্তর সন্ধানী মেরু'। আর অপরটি 'দক্ষিণ সন্ধানী মেরু'। সংক্ষিপ্ত করার জন্য এদের আমরা যথাক্রমে 'উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরু' বলি।
তড়িৎ-চুম্বক ⚡
একটা লোহার দণ্ড, একটা লম্বা অন্তরিত (প্লাস্টিকের আস্তরণ দেওয়া) তামার তার, একটা সুইচ, একটা শক্তিশালী ব্যাটারি আর একটা চুম্বক শলাকা নাও। লোহার উপর অন্তরিত তামার তার জড়িয়ে নাও। তারের দুই প্রান্ত ব্যাটারির ধনাত্মক ও ঋণাত্মক প্রান্তে সুইচসহ ছবির মতো করে যোগ করো। শলাকাটিকে তার জড়ানো লোহার দণ্ডের সামনে এনে সুইচ অন করো। বোঝার চেষ্টা করো শলাকার কাছাকাছি থাকা প্রান্তটিতে কোন ধরনের মেরুর সৃষ্টি হয়েছে।
ব্যাটারির সঙ্গে যুক্ত তারের প্রান্তদুটোকে উলটে দাও। এবার সুইচ অন করে আবার দেখো, শলাকাটির কোন মেরু দণ্ডটির কোন প্রান্ত দ্বারা আকর্ষিত বা বিকর্ষিত হচ্ছে। চুম্বক শলাকার বিক্ষেপ ঘটল কেন?
চুম্বক শলাকার মেরুতে কে আকর্ষণ বা বিকর্ষণ বল প্রয়োগ করল? এবার সুইচ অফ করে তড়িৎ প্রবাহ বন্ধ করে দাও। চুম্বক শলাকা আবার স্বাভাবিক অবস্থানে ফিরে এল কেন?
তাহলে কি তারের মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহের ফলে লোহার দণ্ড চুম্বকে পরিণত হয়েছিল?
এই ধরনের চুম্বককে তড়িৎ-চুম্বক বলে।
ভৌত পরিবেশ 🌍
চুম্বক ও তড়িৎ-চুম্বকের ব্যবহার 🛠️
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে চুম্বকের নানাবিধ ব্যবহার আছে। তার কয়েকটা নীচে দেওয়া হলো।
- নৌকম্পাস: সমুদ্রবক্ষে দিক নির্দেশের জন্য নাবিকরা 'নৌকম্পাস' ব্যবহার করেন। এতে একটা সূক্ষ্মাগ্র ধাতবদণ্ডের উপর একটা চুম্বক শলাকা বসানো থাকে।
- অডিয়ো বা ভিডিয়ো ক্যাসেট: এর মধ্যে যে প্লাস্টিকের টেপ থাকে তার উপর চুম্বকিত পদার্থের আস্তরণ থাকে।
- A.T.M. (AUTOMATED TELLER MACHINE) কার্ড ও ক্রেডিট কার্ড: এতে চুম্বকিত স্ট্রিপ (Magnetic strip) -এর ব্যবহার হয়।
- কমপিউটারের হার্ডডিস্ক (Hard disk): প্লাস্টিকের চাকতির উপর চুম্বকিত পদার্থের কোটিং বা আস্তরণ থাকে।
- খেলনা: বিভিন্ন খেলনাতে চুম্বকের ব্যবহার দেখা যায়।
- চিকিৎসা: চোখের ভিতর থেকে লোহার সূক্ষ্ম চূর্ণ বার করতে ডাক্তাররা এক বিশেষ তড়িৎ চুম্বক যন্ত্র ব্যবহার করেন।
- লাউড স্পিকার: লাউড স্পিকারে চুম্বকের ব্যবহার আছে।
- সাইকেলের ডায়নামো: সাইকেলের ডায়নামোতে চুম্বকের ব্যবহার হয়।
- ইলেকট্রিক মিটার: ইলেকট্রিক মিটারে চুম্বক ব্যবহৃত হয়।
- ফ্রিজের দরজা: ফ্রিজের দরজায় চুম্বক ব্যবহৃত হয়।
- ইলেকট্রিক কলিংবেল: ইলেকট্রিক কলিংবেলে তড়িৎ চুম্বক ব্যবহৃত হয়।
- ইলেকট্রিক মোটর: ইলেকট্রিক মোটরে তড়িৎ চুম্বক ব্যবহৃত হয়।
চুম্বক ব্যবহৃত হয়েছে এমন জিনিস খুব সাবধানে ব্যবহার করা দরকার।
সতর্কতা:
- চুম্বক ব্যবহৃত হয়েছে এমন কোনো বস্তু কোনোভাবেই যেন খুব বেশি উত্তপ্ত না হয়। তাপের প্রভাবে চুম্বকের চুম্বকত্ব বিনষ্ট হতে পারে।
- দুটি ATM কার্ড বা ক্রেডিট কার্ডের যেদিকে চুম্বক স্ট্রিপ আছে সেই দিক মুখোমুখি একসঙ্গে যেন না থাকে।
- লাউড স্পিকার, টি.ভি, রেডিয়ো, কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক ইত্যাদির কাছে যেন কোনো শক্তিশালী চুম্বক না থাকে।
পরিবেশ ও বিজ্ঞান 🌿
জীবের শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়ায় চৌম্বক ক্ষেত্রের ভূমিকা 🐾
জীবজগৎকে ধরে রেখেছে যে পৃথিবী সে নিজেই একটা বিশাল চুম্বক। কোনো কোনো জীবের ওপর চৌম্বক শক্তির প্রভাব বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন। অনেক জীবের ক্ষেত্রে এখনও এর প্রভাব আমাদের অজানা থেকে গেছে।
ভূচুম্বকের বলরেখা: ভূচুম্বকের বলরেখা উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত বিস্তৃত।
আমরা পরিযায়ী পাখিদের কথা জানি। পরিযায়ী কিছু কচ্ছপও আছে। তারা পৃথিবীর চৌম্বক বলরেখা অনুসরণ করে আদি বাসভূমি থেকে শীতে পাড়ি দেয় এমন কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলে যেখানে গরম তুলনামূলকভাবে বেশি। আবার শীতের শেষে ওইভাবেই উৎসে ফিরে আসে।
মহাজাগতিক রশ্মি (cosmic ray): মহাবিশ্ব থেকে এক ধরনের রশ্মি ক্রমাগত পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসে। এদের অধিকাংশই হলো তড়িতযুক্ত কণিকা। ভূ-চৌম্বক ক্ষেত্রের সঙ্গে এদের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ঘটে। ফলে মেরু অঞ্চল ঘিরে দুটি বিকিরণ বলয় (ভ্যান-অ্যালেন বিকিরণ বলয়) তৈরি হয় এবং উৎপন্ন হয় মেরু জ্যোতি বা অরোরা। এই জ্যোতি ওই অঞ্চলের জীবজগতের কাজে লাগে।
কী করে একটি প্রাণী সরাসরি এই চৌম্বক ক্ষেত্রকে চিনতে পারে?
ম্যাগনেটাইটের অস্তিত্ব: পায়রার খুলি ও মস্তিষ্কের মাঝে একটা খুব ছোটো কালো গঠন আছে। এর মধ্যে ম্যাগনেটাইট নামে এক ধরনের চৌম্বকীয় বস্তু আছে। ঘরে ফেরা পায়রারা মেঘলা অন্ধকার দিনে কোনো পরিচিত চিহ্ন না দেখতে পেলেও ঠিকঠাক ঘরে ফিরে আসে। কিছুক্ষণ এদিক সেদিক ওড়ার পর তারা সঠিক দিকে চলতে শুরু করে। মজার ব্যাপার হলো, এদের মাথায় এক টুকরো চুম্বক লাগিয়ে দিলে চলার দিক পরিবর্তিত হয়। কোনো কোনো শামুক, মৌমাছিদের মধ্যেও ম্যাগনেটাইটের অস্তিত্বের কথা জানা গেছে।
CONTENT MANAGER