৩. 🦋 লাল নীল — সুবলতা রায় — পৃষ্ঠা ১৭
৩. 🦋 লাল নীল — সুবলতা রায় — পৃষ্ঠা ১৭ - WBBPE - Grade 3 - বাংলা
লাল নীল
সুখলতা রাও
ঐ বনে যেখানে মানুষ যায় না, সেখানে একহাত লম্বা বামন বুড়োরা থাকে। 🌳 তারা ছোটো গাছগাছালির যত্ন করে, ফুলের গাছে জল দেয়, পোকা ফড়িংদের খবরদারি করে, প্রজাপতি পোঁছে। 🦋 তারা সবাই ভালোমানুষ। তবে কেউ কেউ একটু কুঁড়ে। কেউ একটু ঝগড়া করতে ভালোবাসে। 😇
লাল বুড়ো ছিল এরকম। সে লাল পোশাক পরত, একটা লাল থলি নিয়ে ঘুরে বেড়াত। 🎒 নীল বুড়ো নীল পোশাক পরত। সে ছিল খুব সাহসী। 💪 লাল বুড়ো তাকে ভালোবাসত না। 💔
বামন-বুড়োদের আর একটা কাজ ছিল—ফুলের রং দিয়ে, রঙিন নুড়ি পাথরের গুঁড়ো দিয়ে, গাছে গাছে ছবি বানাত তারা। 🎨
ফুলপরীরা ছোট ছোট পরি। 🧚♀️ তাদের আর বামন বুড়োদের ভিতরে গভীর বন্ধুত্ব। 🤝 জ্যোৎস্নারাতে পরীরা নেমে আসে পৃথিবীতে, ঘাসের উপর নাচে। 🌙 তখন ঘাসের ফড়িংগুলো লাফিয়ে লাফিয়ে উঠে ভয় লাগিয়ে দেয় পরীদের। 🦗 তাই বামন বুড়োরা সন্ধ্যার আগে, ফড়িংগুলোকে ধরে ধরে থলির ভিতর পুরে রাখে, সকাল হলে ছেড়ে দেয়। 🌅
🧚♀️ এক রাতে বামন বুড়োরা পরিদের ডাকল, এসে খাওয়া-দাওয়া করতে। ভোজের আয়োজন চলেছে। নীল বুড়ো সকাল থেকে কাজে লেগেছে। ছোটো ছোটো পাতার বাটিতে ফুলের মধু, ফুলের রস এনে জড়ো করেছে। লাল বুড়ো ফাঁকি দিয়ে আছে কোথায় লুকিয়ে।
সারা রাত মিলে খুব নাচগান-খাওয়া-দাওয়া করল। তারপর পরিদের যাবার পালা হল। জোনাকি পোকারা বাতি ধরল পথ দেখাতে (যেতে যেতে হঠাৎ পরিরা সবাই ভয় পেয়ে ‘ওরে মা রে! ওরা কারা রে?’ বলে চেঁচামেচি করে উঠল)। তাদের সামনে সাদা সাদা দুটো মস্তো কী যেন সব দাঁড়িয়ে আছে—গোল গোল চোখ বের করে তাকিয়ে দেখছে, কেউ কেউ বড়ো বড়ো দাঁত মেলে হাসছে।
🤔 ‘কী হল? কী হল?’ বলে বামন বুড়োরা ছুটে এল। নীল বুড়োর সাহস বেশি। ও সকলের আগে এগিয়ে গেল। ‘দ্যাখে—কতগুলো মস্তো মস্তো ব্যাঙের ছাতা! সেইসব ছাতা উপরে কালো আর লাল রং দিয়ে চোখ মুখ আঁকা। তাদেরই ভূতের মতো লাগছে দেখলে জোনাকির মিটিমিটি আলোতে।'
😡 বামন বুড়োরা রাগারাগি করছে, ‘কার এমন কাজ? অতিথিদের অপমান কে করেছে?’ নীল বুড়ো নিচু হয়ে দেখতে পেল, একটা ব্যাঙের ছাতার নীচে একটা লাল গুলি পড়ে আছে। তখন আর বুঝতে বাকি রইল না কার এ কাজ। পরিরা তাড়াতাড়ি চলে গেল বাড়ি। এরপর একদিন, পরিদের দেশ থেকে চিঠি এল—বামন বুড়োরা সেখানে যেতে আমন্ত্রণ করতে যাবে। সব বামন বুড়োর নামে আলাদা আলাদা চিঠি এল। নীল বুড়ো নামেও এল। লাল বুড়োর নামে এল না। সে একলা বসে এত কাঁদলে যে, তার চোখ-দুটো জবাফুলের মতো লাল হয়ে গেল।
পাঠ-সহায় 💡
লেখিকা-পরিচিতি ✍️
শিশুসাহিএক, সমাজসেবিকা সুহলতা রায় ছিলেন সাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর কন্যা। সুকুমার রায় তাঁর ভ্রাতা। ১৮৮৮ সালের ২০ অক্টোবর সুকুমার রায় কলকাতায় জন্ম গ্রহণ করেন। সুকুমার রায় বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় সাহিত্যেচর্চা করেন এবং প্রায় কুড়িটি গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর শিশুপাঠ্য গ্রন্থগুলি বিপুল প্রশংসা লাভ করে। তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থ হল: লালিপুলের দেশ, নিজে পড়, নিজে শেখ, গল্প আর গল্প (১৯১২), খোকা আলোলিয়া (১৯১৯), নতুন পড়া (১৯২২), সোনার ময়ূর, নতুন ছড়া (১৯৩২), বিদেশি ছড়া (১৯৩৫), নানান দেশের রূপকথা, পথের আলো, ঈশ্বরের গল্প, হিতোপদেশের গল্প ইত্যাদি। ১৯৩৬ সালের ১ জুলাই তাঁর জীবনাবসান ঘটে।
গল্পের মূল্যবান 🌟
‘লাল নীল’ গল্পটি রূপকথার। গভীর বনে বাস করত অলস লাল বুড়োরা। সেখানে থাকত অলস লালবুড়ো আর সাহসী নীল বুড়ো। লালবুড়ো একরাতে অতিথি বন্ধু ফুলপরিদের ভয় দেখায়। পরে পরিরা সকল বামন বুড়োকে নিজেদের দেশে নিমন্ত্রণ জানালেও লাল বুড়োর নামে কোনো চিঠি পাঠায় না। অনুশোচনায় লাল বুড়ো কাঁদতে থাকে। দুর্বলকে ভয় দেখানো উচিত নয়, তাকে রক্ষা করাই সকলের ধর্ম। অপরকে সাহায্য করার, বন্ধুত্বের মান্যতা দেওয়ার মতো মহৎ ধর্ম কথা শেখানো হয়েছে গল্পটির মাধ্যমে।
গল্পের নামকরণ: 📖
গল্পে লাল বুড়ো আর নীল বুড়োর কথা লিপিবদ্ধ হয়েছে। নীল বুড়ো বেশ ভালো। সে খুব সাহসী। লাল বুড়োটা কিছুটা স্বার্থপর। পরিরা বনে যেত, লাল বুড়ো তাদের ভয় দেখিয়েছিল। সে বাঘের ছাতার উপর কালো আর লাল রং দিয়ে চোখমুখ এঁকেছিল। এই দেখে পরিরা ভয় পেয়েছিল। এরপর পরিরা বামন বুড়োদের নিমন্ত্রণ করল তাদের দেশে। সকলের নামে আলাদা আলাদা চিঠি এল। কেবল লাল বুড়োর নামে এল না। তখন লাল বুড়ো কাঁদতে বসল। লাল বুড়ো আর নীল বুড়োর চারিত্রিক-বৈশিষ্ট্য গল্পে ধরা পড়েছে বলে গল্পের নামকরণ করা হয়েছে 'লাল নীল'।
শব্দার্থ ও টীকা: 📚
- গভীর – নিবিড় বা গহন।
- বামন – কম উচ্চতা বিশিষ্ট।
- পোঁষে – পালন করে।
- কুঁড়ে – অলস।
- রগড় – মজা বা খেয়ালি।
- সাহসী – সাহস আছে যার।
- পুঁটিমাছ – ছোটো ছোটো পাথর।
- জোৎস্না রাতে – চাঁদের আলো আছে এমন রাতে।
- ফুলপরি – ফুলের মতো সুন্দর পরি।
- ডারি – খুব।
- বাতি – আলো।
- মস্ত – অনেক বড়ো।
- অতিথি – আগন্তুক।
- আমোদ – মজা।
অনুশীলনী ✨
🌿 ১. সঠিক উত্তরটি খুঁজে নিয়ে লেখো: 🤔
১.১ বামন বুড়ো থাকত—
- (ক) গভীর বনে
- ✅ (খ) বনের ধারে
- (গ) পরিদের দেশে
১.২ লাল বুড়ো ছিল—
- ✅ (ক) সাহসী
- (খ) ভীতু
- (গ) কুঁড়ে
১.৩ তারা তুলি বানাত—
- ✅ (ক) টুনটুনির পালক দিয়ে
- (খ) তুলো দিয়ে
- (গ) গাছের পাতা দিয়ে
১.৪ ভূতের মতো দাঁড়িয়ে ছিল যেগুলি, সেগুলি আসলে—
- (ক) সাদা পরির দল
- ✅ (খ) বাঘের ছাতা
- (গ) বামন বুড়ো
১.৫ সাহস বেশি—
- (ক) নীল বুড়োর
- ✅ (খ) লাল বুড়োর
- (গ) ফুল পরিদের
১.৬ বাঘের ছাতার নীচে পড়ে আছে—
- (ক) নীল থলি
- (খ) সবুজ থলি
- ✅ (গ) লাল থলি
💬 ২. এক কথায় উত্তর দাও:
(ক) বামন বুড়োরা কত হত লম্বা?
➡️ এক হাত।
(খ) নীল পোশাক কে পরত?
➡️ নীল বুড়ো।
(গ) বামন বুড়োরা কোথায় ছবি আঁকত?
➡️ গাছে গাছে।
(ঘ) কাদের সঙ্গে বামন বুড়োদের বন্ধুত্ব ছিল?
➡️ ফুলপরিদের সঙ্গে।
(ঙ) ফুলপরীরা কখন পৃথিবীতে নেমে আসে?
➡️ জোৎস্না রাতে।
(চ) কার নামে চিঠি এল না?
➡️ লাল বুড়োর।
(ছ) ‘সে সকলের আগে এগিয়ে গেল’—কে এগিয়ে গেল?
➡️ নীল বুড়ো।
📝 ৩. দু-তিনটি বাক্যে উত্তর দাও:
(ক) বামন বুড়োরা কেমন মানুষ ছিল?
➡️ তারা ভালোমানুষ ছিল। কেউ কেউ একটু কুঁড়ে, কেউ আবার ঝগড়া করতে ভালোবাসত। তারা গাছপালা ও ফুলের যত্ন নিত।
(খ) লাল বুড়োর পরিচয় দাও।
➡️ লাল বুড়ো লাল পোশাক পরত এবং লাল থলি নিয়ে ঘুরত। সে অলস ও কুঁড়ে ছিল এবং নীল বুড়োকে ভালোবাসত না।
(গ) কীভাবে, কোথায়, কারা ছবি আঁকত?
➡️ বামন বুড়োরা ফুলের রং ও নুড়ি পাথরের গুঁড়ো দিয়ে গাছে গাছে ছবি আঁকত।
(ঘ) কারা কীভাবে পরিদের ভয় দেখাত?
➡️ লাল বুড়ো বাঘের ছাতায় কালো ও লাল রঙে চোখ-মুখ এঁকে পরিদের ভয় দেখিয়েছিল।
(ঙ) ‘সাদা ভূত’ কী?
➡️ জোনাকির আলোয় দেখা সাদা ব্যাঙের ছাতাগুলোকেই পরিরা ‘সাদা ভূত’ ভেবেছিল।
💡 ৫. সংক্ষিপ্ত উত্তর দাও:
(ক) বামন বুড়োরা কোথায় থাকত এবং কী করত?
➡️ তারা গভীর বনে থাকত। গাছগাছালির যত্ন নিত, ফুলে জল দিত, প্রজাপতি পোষাত, ছবি আঁকত।
(খ) কারা কোথা থেকে আয়োজন করেছিল?
➡️ বামন বুড়োরা পরিদের খাওয়ানোর ভোজের আয়োজন করেছিল।
(গ) ফুলপরীরা ভয় পেল কেন?
➡️ কারণ তারা জোনাকির আলোয় সাদা ব্যাঙের ছাতাকে ভূত ভেবে ভয় পেয়েছিল।
(ঘ) পরিদের দেশ থেকে চিঠি এনে কী জানা গেল?
➡️ পরিদের দেশ থেকে নিমন্ত্রণ চিঠি এল, কিন্তু লাল বুড়োর নামে এল না।
(ঙ) বামন বুড়োরা কী করত সংক্ষেপে লেখো।
➡️ তারা বনে গাছের যত্ন নিত, ফুলের রঙে ছবি আঁকত এবং পরিদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করত।
✍️ ৬. নিজের ভাষায় উত্তর লেখো:
(ক) বামন বুড়োদের জীবন সম্পর্কে বর্ণনা করো। ➡️ তারা গভীর বনে থাকত। ছোটো গাছের যত্ন নিত, ফুলে জল দিত, পোকা ফড়িংয়ের দেখাশোনা করত। পরিদের সঙ্গে তাদের গভীর বন্ধুত্ব ছিল।
(খ) লাল বুড়ো আর নীল বুড়ো কেমন ছিল? কাকে বেশি ভালো লেগেছে? ➡️ লাল বুড়ো অলস ও কুঁড়ে ছিল, নীল বুড়ো সাহসী ও কর্মঠ। আমার কাছে নীল বুড়ো বেশি ভালো লেগেছে, কারণ সে পরিশ্রমী ও সাহসী ছিল।
(গ) লাল বুড়োর নামে চিঠি এল না কেন? ➡️ কারণ সে পরিদের ভয় দেখিয়ে দুষ্টুমি করেছিল। তাই পরিরা তাকে নিমন্ত্রণ করেনি।
✅❌ ৭. সঠিক ও ভুল নির্ধারণ করো:
| বাক্য | চিহ্ন |
|---|---|
| (ক) বামন বুড়োরা প্রজাপতি পোষে। | ✅ |
| (খ) বামন বুড়োরা কেউ ভালোমানুষ ছিল না। | ❌ |
| (গ) গাছের পাতায় পরীরা ছবি আঁকত। | ❌ |
| (ঘ) নীল বুড়ো ভীষণ ভয় পেত। | ❌ |
| (ঙ) ব্যাঙের ছাতার নিচে ছিল লাল থলি। | ✅ |
🧩 ৮. শূন্যস্থান পূরণ করো:
(ক) তারা ছোটো গাছগাছালির যত্ন করে।
(খ) টুনটুনি পাখির পালক দিয়ে তুলি বানাত তারা।
(গ) জোৎস্না রাতে ফুলপরীরা ঘাসের উপর নাচত।
(ঘ) নীল বুড়োর সাহস বেশি।
(ঙ) কতোগুলো মস্ত মস্ত ব্যাঙের ছাতা।
📖 ৯. শব্দার্থ:
| শব্দ | অর্থ |
|---|---|
| বামন | খর্বকায় মানুষ |
| পোঁচে | মুছে বা পরিষ্কার করে |
| ভোজ | আহারের উৎসব |
| জাঁকালো | আড়ম্বরপূর্ণ বা চমকদার |
↔️ ১০. বিপরীত শব্দ:
| শব্দ | বিপরীত |
|---|---|
| লম্বা | খাটো |
| ভালোমানুষ | বদমানুষ |
| কালো | সাদা |
| ভয় | সাহস |
🔄 ১১. পদ পরিবর্তন করো:
| মূল শব্দ | পরিবর্তিত রূপ |
|---|---|
| ফুল | ফুলপরী |
| কাজ | কর্মঠ |
| ভয় | ভীত |
| দাঁত | দন্ত |
| অতিথি | আতিথেয় |
🔡 ১২. এলোমেলো বর্ণ সাজিয়ে শব্দ তৈরি করো:
| এলোমেলো | সঠিক শব্দ |
|---|---|
| লি ছ ছা গা গা | গাছগাছালি |
| ন রো জ আ | আয়োজন |
| রি ফু প ল | ফুলপরি |
| ত সা ড়ু দা | সাদা বুড়ো |
✍️ ১৩. বাক্য রচনা করো:
| শব্দ | বাক্য |
|---|---|
| ফড়িং | বাগানে ফড়িং উড়ে বেড়াচ্ছে। |
| সাহসী | নীল বুড়ো খুব সাহসী ছিল। |
| ভোজ | আজ বনে ভোজের আয়োজন হয়েছে। |
| রাগারাগি | অকারণে রাগারাগি করা ঠিক নয়। |
| চিঠি | পরিদের দেশ থেকে চিঠি এল। |
🌟 মূল শিক্ষা:
অন্যকে ভয় দেখানো বা কষ্ট দেওয়া ভুল। সাহস, পরিশ্রম ও বন্ধুত্ব — এই তিন গুণেই মানুষ সত্যিকারের বড়ো হয়।
CONTENT MANAGER