Academy

৫। নদী (৪৭)

৫। নদী (৪৭) - WBBSE - Class 7 - ভূগোল

0

🌊 নদী

পাহাড়ের মাথায় একটা বড়ো পাথরের ওপর বসে আছে 'হৈ'। চারদিকে ঘন সবুজ পাইনের বন... নীচের উপত্যকার দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছে সে।

হঠাৎ লাফাতে লাফাতে 'চৈ' এসে বলল- "ওহে ভাবুক, কী এত দেখছো?"

'হৈ' উত্তর দিল- "দূরে ঐ উপত্যকা দিয়ে বয়ে চলা নদীটাকে।"

'চৈ' অবাক হয়ে প্রশ্ন করল- "নদী? ওখানে অত বড়ো নদী এল কোথা থেকে?"

'হৈ' বোঝালো- "এই পাহাড় থেকে যে ছোটো জলধারাটা বয়ে চলেছে, সেটা ওই নদীতে গিয়ে মিশেছে। ...... সব নদীই এরকম ছোটো জলধারা থেকে শুরু হয়। ধীরে ধীরে অনেকগুলো জলধারা একসঙ্গে মিশে একটা বড়ো জলধারা বা 'নদী' তৈরি হয়।"

'চৈ'-এর ঠিক বিশ্বাস হলো না, সে আরও অস্থির হয়ে বলল- "আমি দেখব কোথায় জলধারা গুলো মেশে---কীভাবে নদী তৈরি হয়!"

তারপর মহা উৎসাহে 'হৈ' আর 'চৈ' ঐ জলধারার ধার ধরে পাহাড় বেয়ে নীচের দিকে নামতে লাগলো। এভাবে চলতে চলতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো – একজায়গায় জলের তীব্র আওয়াজে থামল 'চৈ'। দেখল – আরেকটা জলধারা এসে পড়েছে তাদের জলধারাটায়।

এরকম অনেকগুলো জলধারা পেরিয়ে প্রায় সন্ধের মুখে একটা সমতল জায়গায় এসে থামল তারা, বুঝল – এটাই পাহাড়ের নীচের সেই উপত্যকাটা! কিছু দূরেই জলের বিরাট গর্জন শোনা যাচ্ছে – আশপাশের পাহাড় থেকে অনেকগুলো জলধারা এসে তৈরি করেছে বিরাট এক জলধারা!

'চৈ' উল্লাসে চিৎকার করে উঠল- "নদী! নদী!"

প্রবলবেগে সেই নদী বয়ে চলেছে উপত্যকার মধ্যে দিয়ে আরও নীচু অঞ্চলের দিকে – হয়তো কোনো সমুদ্রের দিকে-----

💡 গল্পটা নদীর সৃষ্টির গল্প। সহজে বললে – পার্বত্য অঞ্চলে বিভিন্ন দিক থেকে প্রবাহিত ছোটো ছোটো জলধারাগুলো যখন পরস্পর মিলিত হয়ে ভূমির ঢাল অনুসারে উঁচু থেকে নীচু স্থানের দিকে বয়ে চলে, তখন নদীর সৃষ্টি হয়।


🌍 ভূগোল

  • নদী যেখানে সৃষ্টি হয়, সেই জায়গাকে নদীর উৎস (Source) বলে। সাধারণত পাহাড়-পর্বত বা মালভূমির মতো কোনো উঁচু জায়গায় নদীর উৎপত্তি বা সৃষ্টি হয়। গঙ্গোত্রী হিমবাহের 'গোমুখ' থেকে ভারতের প্রধান নদী গঙ্গার উৎপত্তি হয়েছে।
  • যেখানে গিয়ে নদী শেষ হয়, অর্থাৎ নদী কোনো সাগর-উপসাগর, হ্রদ, জলাশয় বা অন্য কোনো নদীতে গিয়ে মেশে, সেই জায়গাকে নদীর মোহনা (Mouth) বলে। পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে গঙ্গা নদীর মোহনা।

📌 নদী হলো স্বাভাবিক প্রবহমান জলধারা, যা অভিকর্ষের টানে ভূমির ঢাল অনুসারে উৎস থেকে মোহনার দিকে বয়ে চলে।

পৃথিবীর প্রধান প্রধান নদী

পৃথিবীর প্রধান নদীগুলোর নাম (দৈর্ঘ্য অনুসারে)কোন মহাদেশে অবস্থিতদৈর্ঘ্য (কিলোমিটার)
১. নীলআফ্রিকা৬,৬৫০
২. আমাজনদ:আমেরিকা৬,৩০০
৩. ইয়াংসিকিয়াংএশিয়া৫,৫৩০
৪. মিসিসিপিউ: আমেরিকা৪,০৯০
৫. মিসৌরিউ: আমেরিকা৩,৭৭০
৬. মারে ডার্লিংওশিয়ানিয়া৩,৭২০
৭. ভলগাইউরোপ৩,৭০০

📏 নদীগুলো কতটা লম্বা? এঁকে ফেলতে পারো!!

বড়ো সংখ্যাকে ছোটো করে নিলে আঁকতে সুবিধা হবে। প্রথমে সব দৈর্ঘ্যগুলো এক হাজার দিয়ে ভাগ করে ফেলো। তারপর ভাগফলগুলোকে সেমি. ধরে, একটা স্কেলের সেন্টিমিটারের দাগ অনুযায়ী লম্বা করে লাইন এঁকে ফেলো। প্রতিটা নদীর জন্য একটা করে লাইন টানতে হবে। যেমন ৬৩০০ কিলোমিটারকে ১০০০ দিয়ে ভাগ করলে হয় ৬.৩। একে সেন্টিমিটার ধরে নিয়ে খাতায় একটা ৬.৩ সেন্টিমিটার লম্বা লাইন এঁকে ফেলো। প্রতিটা নদীর জন্য টানা লাইনগুলোর পাশে নদীর নামগুলো লিখে ফেলো। দেখোতো কোন নদী কত লম্বা তা এক নজরেই বোঝা গেলো কিনা!


📖 শব্দগুলো 'কঠিন'! সহজ করে বুঝে নাও

  • ধারণ অববাহিকা (Catchment Basin) 🏞️

    তোমরা 'হৈ' আর 'চৈ'-এর যে গল্পটা পড়লে, ওটা আসলে নদীর 'ধারণ অববাহিকারই' গল্প। পর্বতের বরফগলা জল বা বৃষ্টির জল অসংখ্য ছোটো ছোটো জলধারার মাধ্যমে বয়ে বড়ো নদী তৈরি করে। এই জলধারা সহ মূল নদীটি যে বিরাট অঞ্চলের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয় সেই অঞ্চলটাই হলো ওই নদীর ধারণ অববাহিকা।

  • জলবিভাজিকা (Watershed) ⛰️

    তোমার ভূগোল বইটার মাঝের পাতাটা খোলো, তারপর খোলা অবস্থায় বইটা উল্টে দাও। ভেবে দেখো, যদি মাঝখানের উঁচু শিরার মতো অংশটায় জল পড়ে, তাহলে কী হবে? জলটা উঁচু অংশটা থেকে দু-দিকে ঢাল বরাবর গড়িয়ে যাবে, তাই তো? ঠিক এইভাবে উঁচু পাহাড়ি অঞ্চলে যখন বৃষ্টি হয়, সেই বৃষ্টির জল ভূমির ঢাল বরাবর বিভিন্নদিকে বয়ে যায়। অর্থাৎ কোনো পাহাড়ের চূড়ার অংশটা বৃষ্টির জলকে বিভিন্ন দিকে ভাগ করে বা 'বিভাজন' করে, তাই তাকে 'জলবিভাজিকা' বলে। জলবিভাজিকার বিভিন্ন দিকে বয়ে যাওয়া জল, একাধিক ছোটো ছোটো জলধারার মধ্যে দিয়ে বয়ে গিয়ে, মিলিত হয়ে মূল নদী তৈরি করে।

'হৈ-চৈ'-এর গল্পে নিশ্চয়ই লক্ষ করেছো অনেকগুলো ছোটো ছোটো জলধারা পরস্পরের সঙ্গে মিশে গিয়ে একটা বড়ো নদী তৈরি করেছে। ঐ ছোটো ছোটো জলধারাগুলো মূল নদীটার উপনদী

🧪 দেখো কী হয়!

বাড়ির উঠোনে, পার্কে বা স্কুলের মাঠে, ঢালু জায়গায় জল ঢেলে দিয়ে দেখো, ভূমির ঢাল কোন দিকে। জল উঁচু থেকে নীচের দিকে গড়িয়ে যাবে, ঢালের উপরের দিকে এবার পাশাপাশি (৬ ইঞ্চি ব্যবধানে) কিন্তু একটু উপরে-নীচে তিনটি বিন্দু 'ক', 'খ', 'গ' চিহ্নিত করো। এরপর তিনটি বিন্দুতে জল ঢেলে দিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে দেখো তিনটে জলধারা ঠিক কীভাবে উঁচু থেকে নীচুর দিকে গড়িয়ে যায়।

আরও একটা বিন্দু 'ঘ' নাও। 'ঘ' এর সামনে একফুট দূরে একটা বড়ো ইট বা বড়ো পাথর রেখে দাও, এবার 'ঘ' বিন্দুতে জল ঢেলে দেখো জলধারাটা কীভাবে গড়িয়ে যায়।


🌍 ভূগোল

  • উৎস থেকে সৃষ্টি হয়ে কোনো নদী যখন অন্য কোনও নদীতে এসে মেশে, তখন তাকে ঐ নদীটার উপনদী (Tributary) বলে। যমুনা, গোমতী, ঘর্ঘরা, কোশী, গণ্ডক প্রভৃতি নদীগুলো গঙ্গার উপনদী।
  • আবার মূলনদী থেকে যে সমস্ত নদী শাখার মতো বেরিয়ে গিয়ে অন্য কোথাও গিয়ে মেশে তাদেরকে শাখানদী (Distributary) বলে। ভাগীরথী-হুগলী হলো গঙ্গার প্রধান শাখানদী।

🤔 ভেবে দেখোতো!

আগের দুটো পরীক্ষায় জলের প্রবাহ লক্ষ করে যা কিছু বুঝতে পারলে তার সঙ্গে এই 'উপনদী' ও 'শাখানদীর' ধারণার কি কোনো মিল পেলে?

🏞️ পিকলুর ডায়েরি

  • 'উৎস' থেকে 'মোহনা' পর্যন্ত যে খাতের মধ্যে দিয়ে নদী প্রবাহিত হয় তাকে নদীর উপত্যকা (River Valley) বলে।
  • নদী তার উপনদী ও শাখানদী সহ উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত যে অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়, সেই বিস্তীর্ণ ভূমিভাগকে নদী অববাহিকা (River Basin) বলে। আমাজন নদীর অববাহিকা পৃথিবীর বৃহত্তম নদী অববাহিকা।
  • পাশাপাশি প্রবাহিত দুটো নদীর মধ্যবর্তী স্থানকে দোয়াব বলা হয়। (পার্শি শব্দ 'দোয়াব' 'দো'= দুই 'আব'-জল/নদী) ভারতের গঙ্গা ও যমুনা নদীর 'দোয়াব' অংশে আগ্রা, এলাহাবাদ প্রভৃতি শহর অবস্থিত।
  • যে নদী কোনো দেশের মধ্যে উৎপন্ন হয়ে সেই দেশের মধ্যেই কোনো হ্রদ বা জলাশয়ে গিয়ে মেশে তাকে অন্তর্বাহিনী নদী (Inland River) বলে। ভারতের লুনি, রাশিয়ার আমুদরিয়া অন্তবাহিনী নদী।
  • যে নদী একাধিক দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয় তাকে আন্তর্জাতিক নদী (International River) বলে। সিন্ধু, ব্রহ্মপুত্র, ইউরোপের রাইন, দানিয়ুব আন্তর্জাতিক নদী।

🏞️ নদী

পুজোর ছুটিতে গঙ্গোত্রী বেড়াতে গিয়ে পুতুল যখন জানতে পারলো যে ডায়মন্ড হারবারে তার বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া শান্তশিষ্ট গঙ্গা নদীটাই এখানে ভীষণ জোরে শব্দ করে ছুটে চলেছে, তখন তার বিস্ময়ের আর সীমা রইল না।

  • আরও একটা ব্যাপার সে লক্ষ করল, গঙ্গোত্রীতে নদীটা খুব বেশি চওড়া নয়, বেশি জলও নেই, অথচ প্রবল তার গতি! কিন্তু তার বাড়ির কাছে এই নদীটাই কত চওড়া আর প্রচুর জলে ভর্তি!

🤔 বলতে পারো, একই নদী দুটো জায়গায় দু রকম কেন?

পুতুলের মতো তোমরাও নিশ্চয়ই তোমার বাড়ির আশপাশের কোনো নদীকে লক্ষ করেছো?

  • ভেবে দেখেছো নদীর 'এত' জল আসছে কোথা থেকে? (বরফ-গলা জল/বৃষ্টির জল/ ঝরনার জল/ হ্রদের জল/না কি অন্য কোনো নদী থেকে?)

"আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে বৈশাখ মাসে তার-হাঁটু জল থাকে---"

  • তোমার দেখা কোনো নদীর সঙ্গে যদি এই কবিতার মিল খুঁজে পাও, তাহলে সেই নদীটার নাম লেখো----------

💡 জানো কী?

  • সাধারণত যে সব নদী উঁচু পার্বত্য অঞ্চলে সৃষ্টি হয়, তার জলের উৎস প্রায়শই বরফ-গলা জল। এই নদীগুলোতে সারা বছর জল থাকে বলে এদের নিত্যবহ নদী (Perennial river) বলে। মানচিত্রে এই নদীগুলো নীলরঙের সাহায্যে দেখানো হয়।
  • মালভূমি বা অন্য কোনো কম উঁচু জায়গায় সৃষ্টি হওয়া নদীগুলোর জলের উৎস সাধারণত বৃষ্টির জল। একারণে শুধুমাত্র বর্ষাকাল ছাড়া, সারাবছর এই নদীগুলোতে জল প্রায় থাকে না, তাই এদেরকে অনিত্যবহ নদী (Non-perennial river) বলে। মানচিত্রে এই রকম নদীকে কালো রঙে দেখানো হয়।

💧 বর্ষাকালে অথবা কোনো বৃষ্টির দিনে রাস্তার জমা জলে, নর্দমার জলে, খালে, বিলে কাগজের নৌকা ভাসাতে বেশ ভালো লাগে, কেমন তর্ তর্ করে স্রোতে ভেসে চলে! লক্ষ করেছো কি জলটা কেমন ঘোলা। জলের স্রোতে মাটি, বালি, ছোটো নুড়ি পাথর, আর্বজনা সবই জলের মধ্যে এসে পড়ে, আবার কিছু দূরে যেতে না যেতেই নৌকাটাও কোথাও আটকে যায়!


🛠️ নদী কী কী কাজ করে

  • নদীও মূলত বয়ে যাওয়া জলধারা। নদীও তার জলস্রোতের ধাক্কায় মাটি, বালি, ছোটো বড়ো নুড়ি এমনকি বড়ো বড়ো পাথর সবই চূর্ণ করে এগিয়ে চলে, এটাই নদীর ক্ষয়কাজ (Erosion)।
  • এইসব নুড়ি, কাঁকড়, বালি, পলি সবই নদীর স্রোতের সঙ্গে উঁচু থেকে নীচু অঞ্চলের দিকে বয়ে চলে, এটাই নদীর বহনকাজ (Transportation)।
  • আবার কোথাও স্রোত কমে গেলে এই সব পদার্থগুলো নদীর পাশে বা নদীর মধ্যে জমা হতে থাকে। এটাই নদীর সঞ্চয়কাজ (Deposition)।

নদীর এই তিনপ্রকার কাজ নির্ভর করে নদীর শক্তির ওপর। নদীতে জলের পরিমাণ, গতিবেগ, ভূমির ঢাল প্রভৃতি থেকে নদী শক্তি পায়। নদীর শক্তি বেড়ে গেলে, নদী বেশি করে ক্ষয় আর বহন কাজ করে, আবার নদীর শক্তি কমে গেলে নদী বেশি সঞ্চয় করে।

🤔 নদীর শক্তির সঙ্গে নদীর কাজের কী সম্পর্ক, বুঝতে পারলে?

ভূমির ঢাল
নদীতে শক্তি দেয়জলের পরিমাণ
জলের গতিবেগ

এই শক্তি দিয়ে নদী যে কাজ করে:

  • নীচের দিকে এবং পাশের দিকে ক্ষয় করে (ক্ষয়কাজ)
  • ক্ষয়করা পদার্থ নিয়ে চলে (বহনকাজ)
  • সমস্ত বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে চলে (বহনকাজ/সঞ্চয়)

🧠 ভেবে দেখেছো?

স্কুল থেকে ফেরার পর কেমন ক্লান্ত লাগে। যে স্কুলব্যাগটা স্কুলে যাওয়ার সময় অনায়াসে বয়ে নিয়ে গেছ, সারাদিন পর ফিরে সেটাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রেখে দিতে ইচ্ছে করে। আবার খাওয়া দাওয়া করে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলে আর ক্লান্তি থাকে না। তুমিও শক্তি পেয়ে যাও!

📝 পরীক্ষা করে বলো তো?

জল কোথায় তাড়াতাড়ি গড়িয়ে যায়?

  • সমতল জায়গায়: [ ]
  • ঢালু জায়গায়: [ ]

ঢালু জায়গায় জল কখন তাড়াতাড়ি গড়িয়ে যায়?

  • জলের পরিমাণ বাড়লে: [ ]
  • জলের পরিমাণ কমলে: [ ]

🤝 মানুষের জীবনের সঙ্গে নদীর কী মিল!!

ভেবে দেখেছ, মানুষের মতো নদীরও একটা জন্ম অর্থাৎ 'উৎস' আছে। আর উৎসের কাছাকাছি প্রচণ্ড শক্তিতে নদী দুরন্ত গতিতে বয়ে চলে, নদী তখন ঠিক তোমাদেরই মতো ছটফটে, চঞ্চল!

➡️ এটাই নদীর উচ্চপ্রবাহ

পরবর্তী পর্যায়ে নদী যখন পাহাড় থেকে মালভূমি বা সমভূমিতে এসে পড়ে, তখন ভূমির ঢাল কম হয়ে যাওয়ায় নদীর শক্তিও কমে যায়, আর নদীর গতিও কম হতে শুরু করে। নদী তখন একজন পরিণত মানুষের মতোই (যেমন বাড়িতে তোমার মা-বাবা) ধীর এবং শান্ত।

➡️ এটাই নদীর মধ্যপ্রবাহ

শেষ পর্যায়ে নদী যখন সাগর বা অন্য কোনো জলভাগের কাছাকাছি চলে আসে, তখন ভূমির ঢাল একেবারেই থাকে না, নদীর শক্তিও প্রায় ফুরিয়ে যায়, নদী তখন বৃদ্ধ মানুষের মতোই (যেমন তোমার ঠাকুরদাদা, ঠাকুরমা বা দাদু, দিদা), কাজ করার ক্ষমতা প্রায় থাকে না এবং শেষ পর্যন্ত 'মোহনায়' গিয়ে তার প্রবাহ শেষ হয়ে যায়।

➡️ এটাই নদীর নিম্নপ্রবাহ

✏️ ভেবে নিয়ে লিখে ফেলো

নদীর শক্তিবৃদ্ধি পেলেহ্রাস পেলে
প্রভাব??

🌍 ভূগোল

  • উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত প্রবাহপথে নদী তার শক্তি অনুযায়ী ক্ষয়, ক্ষয়জাত পদার্থ বহন এবং বাহিত পদার্থ সঞ্চয়ের মাধ্যমে ভূ-পৃষ্ঠকে প্রতিনিয়তই পরিবর্তন করে চলেছে।

🏞️ নদীর উচ্চপ্রবাহ

উৎস থেকে সমতলভূমিতে নামার আগে পর্যন্ত নদীর উচ্চপ্রবাহ। ভারতের প্রধান নদী গঙ্গার উচ্চপ্রবাহ গোমুখ থেকে হরিদ্বার পর্যন্ত।

💡 নদী, জলচক্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বৃষ্টির জল নদীর মধ্য দিয়ে সাগরে গিয়ে পড়ে। সাগরের জল বাষ্পীভূত হয়ে বৃষ্টিরূপে আবার নদীতে ফিরে আসে।

  • পার্বত্য অঞ্চলে ভূমির ঢাল এবং ভূমির উঁচু নীচুভাব (বন্ধুরতা) খুব বেশি হওয়ার জন্য নদীর শক্তিও বেশি থাকে। ফলে এই প্রবাহে নদীর প্রধান কাজ ক্ষয়
  • এই প্রবল জলস্রোতের আঘাতে নদীর গতিপথের বড়ো বড়ো পাথর ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে জলের সঙ্গে ভেসে বা গড়িয়ে এগিয়ে চলে।
  • নদীর স্রোতের সঙ্গে এই ছোটোবড়ো পাথরগুলো নদীর তলায় ধাক্কা দিয়ে ক্ষয় করে, ফলে নদীর উপত্যকা গভীর হতে থাকে। উচ্চ প্রবাহে নদীর উপনদীর সংখ্যা কম থাকে, ফলে নদী-উপত্যকা খুব চওড়াও হয় না। এই 'সরু' এবং 'গভীর' নদী উপত্যকা ইংরেজি 'I' বা 'V' অক্ষরের মতো দেখতে হয়। একে গিরিখাত (Gorge) বলে। বৃষ্টিহীন পার্বত্য অঞ্চলে, শুষ্ক অঞ্চলে এরকম সুগভীর গিরিখাতকে ক্যানিয়ন (Canyon) বলা হয়।
  • নদীর গতিপথে শক্ত আর নরম পাথর অনুভূমিক ভাবে থাকলে, নদী নরম পাথরকে বেশি ক্ষয় করে, ফলে শক্ত এবং নরম পাথরের মধ্যে ধাপের সৃষ্টি হয় আর নদী শক্ত পাথরের ওপর থেকে নীচে ঝাঁপিয়ে পড়ে, জলপ্রপাত (Waterfall) সৃষ্টি করে। পশ্চিমঘাট পর্বতের 'যোগ' জলপ্রপাত (২৬০ মিটার)।

🏞️ নদীর মধ্যপ্রবাহ

পার্বত্য অঞ্চলের পর, মালভূমি বা সমভূমি অঞ্চলে নদীর মধ্যপ্রবাহ। হরিদ্বার থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের মিঠিপুর পর্যন্ত গঙ্গানদীর মধ্যপ্রবাহ।

  • মধ্যপ্রবাহে ভূমির ঢাল কম থাকায় নদীর গতি এবং শক্তি দুটোই কমে যায়। নদী প্রধানত বহন এবং সঞ্চয় কাজ করে।
  • এসময় নদী নীচের দিকে ক্ষয় করা প্রায় বন্ধ করে দেয়, ফলে উপত্যকার গভীরতাও কমে যায়। প্রচুর উপনদীর মাধ্যমে নদীতে জলের পরিমাণ বাড়ে এবং নদী দু-পাশের দিকে বেশি ক্ষয় করে, ফলে নদী উপত্যকা চওড়া হতে থাকে।
  • ভূমির ঢাল কমে যাওয়া এবং জলের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার কারণে নদী খুবই আঁকাবাঁকা পথে (মিয়েন্ডার) প্রবাহিত হয়। নদীর বহনক্ষমতাও কমে যায়। বয়ে আনা পলি বালি, নুড়ি, কাঁকর নদীর মধ্যে বা দু-ধারে সঞ্চিত হলে, জল প্রবাহের পথ আটকে যায়। নদীতে চড়া পড়ে। কখনও নদী-দ্বীপ তৈরি হয়।
  • নদীর বাঁকের একদিকে (খাড়াপাড়ের দিকে) জলস্রোত বেশি থাকে, তার উল্টোদিকে (ঢালুপাড়ে) সঞ্চয় বেশি হয় ফলে নদী একপাড় ভাঙে, অন্য পাড় গড়ে। নদীর বাঁকের পরিমাণ বাড়লে, বা নদীতে জল বাড়লে কখনো কখনো নদী বাঁকের একটা অংশ মূল নদী থেকে আলাদা হয়ে যায়। এই আলাদা হওয়া অংশটা ঘোড়ার খুরের মতো দেখতে হয় বলে একে অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ বলে।

🌍 জানো কী?

  • পৃথিবীর মোট স্থলভাগের ৬০ শতাংশ স্থানে কম বেশি নদীর কাজ দেখা যায়।
  • সব নদীতে 'উচ্চ', 'মধ্য' এবং 'নিম্ন' এই তিনটি প্রবাহ দেখা যায় না।

🏞️ নদীর নিম্ন প্রবাহ

উচ্চ এবং মধ্যপ্রবাহের পর অত্যন্ত মৃদু ভূমিঢালের ওপর দিয়ে এঁকে বেঁকে নদী মোহনা পর্যন্ত প্রবাহিত হয়। এটাই নিম্নপ্রবাহ। মুর্শিদাবাদের মিঠিপুরের পর থেকে বঙ্গোপসাগরে মোহনা পর্যন্ত গঙ্গা নদীর নিম্নপ্রবাহ।

এই সময় নদীর গতি এবং শক্তি এতই কমে যায় যে ক্ষয়কাজ একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়, সামান্য বহন কাজ হলেও, নদীর মূল কাজ হয় সঞ্চয়। এই প্রবাহে উপনদী প্রায় থাকেই না। বরং কিছু শাখানদী সৃষ্টি হয়। নদীর মধ্যে পলি, বালি, কাঁকর জমে নদী অগভীর হয়ে যায়। ফলে বর্ষার অতিরিক্ত জল দুকূল ছাপিয়ে বন্যা সৃষ্টি করে। নদীর দুধারের বিস্তীর্ণ জমিতে বন্যার সময় পলি সঞ্চিত হয়ে উর্বর প্লাবনভূমি (Flood plain) সৃষ্টি করে।

  • নদীর মোহনার কাছে নদীর বহন করে আনা পলি, বালি, কাঁকর জমা হয়ে চড়া সৃষ্টি হয়। নদীর স্রোত তখন ভাগ হয়ে চড়ার দু-দিক দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে। ফলে প্রায় ত্রিভুজের মতো (বাংলার মাত্রাহীন '△'/ গ্রিক অক্ষর 'ডেল্টা 'র মতো) ব-দ্বীপ (Delta) সৃষ্টি হয়।
  • সব নদীই কিন্তু মোহনায় ব-দ্বীপ সৃষ্টি করতে পারে না। নদীতে পলির পরিমাণ কম থাকলে, নদী প্রবল বেগে সমুদ্রে পড়লে, অথবা মোহনায় প্রবল সমুদ্র স্রোেত থাকলে ব-দ্বীপ গড়ে উঠতে পারে না। একারণেই পৃথিবীর বৃহত্তম নদী আমাজনের কোনো ব-দ্বীপ নেই।

🌊 খাঁড়ি কী?

  • কিছু নদীর মোহনায় জোয়ারের সময় নোনা জল নদীতে ঢুকে ফানেলের মতো আকৃতির চওড়া মোহনা বা খাঁড়ি তৈরি করে।
  • পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন অঞ্চলের প্রচুর নদীতে এরকম খাঁড়ি দেখা যায়।

📝 ঠিক ঠিক লেখো দেখি

উচ্চগতিমধ্যগতিনিম্নগতি
ক্ষয়কাজবেশি?ক্ষয়কাজ হয় না
বহনকাজ?বেশি?
সঞ্চয়কাজকম?বেশি হয়

🏡 ধরতে পারলে মজা

➡️ তোমার বাড়ির কাছাকাছি কোনো নদীকে লক্ষ করে নদীর বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে ধরণা করো।

  • নদীটার নাম—
  • নদীতে জল (বেশি / কম)
  • নদীর গতিবেগ (বেশি / কম)
  • ভূমির ঢাল (বেশি / কম)

➡️ অতএব নদীটার কোন প্রবাহ? (উচ্চ/মধ্য/নিম্ন)।


🧑‍🤝‍🌊 নদী ও মানুষ

Visuals of various human activities related to rivers: fishing, transportation, bathing, agriculture, city life, etc.


🌍 আমাদের জীবনে নদীর প্রভাব কতখানি

সেদিন ভূগোল ক্লাসে শিক্ষক মহাশয় যখন মধুকে নদীর উপকারিতা সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন, মধু শুধু একটা কথাই বলেছিল- "নদীটা আমাদের খেতে দেয়, আমাদের বাঁচিয়ে রাখে!"

নদীমাতৃক এই দেশের নদীগুলো আসলে আমাদেরই জীবনকথা। নদী শুধু আমাদের ভূগোল, ইতিহাস, পুরাতত্ত্ব, ভূতত্ত্বের বিষয় নয়। রোজকার জীবনের সঙ্গে নানাভাবে জড়িয়ে আছে নদী।

  • মানুষের প্রাচীনতম সভ্যতাগুলো গড়ে উঠেছিল কোনো না কোনো নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে। (সিন্ধু নদের তীরে সিন্ধু সভ্যতা, নীল নদের তীরে মিশরীয় সভ্যতা, টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস নদীর ধারে সুমেরীয় সভ্যতা)। বর্তমানকালে আমাদের গঙ্গা, পদ্মা, ব্রহ্মপুত্রের যে সুবিশাল সমভূমি, চিনের ইয়াং সিকিয়াং, হোয়াংহো নদীর উপত্যকা সবই পৃথিবীর অন্যতম জনবহুল অঞ্চল। অতএব নদী শুধু সভ্যতার জন্মই দেয় না, তাকে লালন-ও করে।

🖼️ ছবির কোলাজ থেকে সব লিখে ফেলা যায়

নদীর প্রভাবআমাদের জীবনে
নদীর জলকৃষিকাজ, নগরায়ন, সভ্যতার উন্নতি
পলিমাটি, সমভূমি
প্লাবনভূমি, কৃষিজমি
জলসেচ
জলবিদ্যুৎ
নদীর মাছ, প্রাণী
পরিবহণ
ভ্রমণ, বিনোদন
পরিবেশ, বাস্তুতন্ত্রনদীর জল, পলিমাটি, উদ্ভিদ-প্রাণীর বিকাশ, মাটির নীচের জলের ভারসাম্য রক্ষা।
ভারসাম্য

😟 ভেবে দেখেছো?

  • মানুষের জীবনের সঙ্গে নদীর সম্পর্ক এত নিবিড় হলেও, মানুষের কিছু কিছু কাজ নদীর স্বাভাবিক ছন্দকে নষ্ট করেছে।
  • কৃষি ব্যবস্থার প্রসার, শিল্পায়ন, নগরায়ন, ইতাদি নানাভাবে নদীকে প্রভাবিত করছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য নদীর পাড়ে কৃত্রিম বাঁধ তৈরি করলে সাময়িক সুফল পাওয়া গেলেও শেষ পর্যন্ত তা আরও ভয়াবহ বন্যারই কারণ হয়ে উঠছে! একদিকে কৃষিজমি থেকে ধুয়ে আসা পলিতে নদী ক্রমশ ভরাট হচ্ছে। অন্য দিকে সেচের জলের জোগান দিতে নদী ক্রমশ শুকিয়ে যাচ্ছে।
  • শহর, শিল্পাঞ্চলের বর্জ্য জল নদীতে অবাধে মিশে গিয়ে নদীর জল ক্রমশ বিষাক্ত হয়ে যাচ্ছে।

🌍 ভূগোল

🤔 ছবিটাকে বুঝতে পারলে?

Image depicts a river from its source to its mouth, with various features.

🔎 শব্দগুলো খুঁজে বের করো

তিমোনাদ্ব
প্রনিখীপ্রলু
শাত্যপ্রপাখা
খাবিজ্ঞমালী
ক্যাভাশিবিষ্ণ
দীপ্তনিজিক্ত
জীক্ষকাজিনি
প্লাভূমিখামি

সূত্র:

  • নদী যেখানে মেশে।
  • যে নদীতে সারা বছর জল থাকে।
  • মূল নদী থেকে যে নদী বেরিয়ে যায়।
  • যে ভূখণ্ড বৃষ্টির জলকে বিভিন্ন দিকে ভাগ করে দেয়।
  • শুষ্ক অঞ্চলের সুগভীর গিরিখাতকে যা বলে।
  • নদীর জল ওপর থেকে নীচে ঝাঁপিয়ে পড়ে-----সৃষ্টি করে।
  • নদীর দু-ধারে বন্যার সময় পলি সঞ্চিত হয়ে----সৃষ্টি হয়।
  • উচ্চপ্রবাহে, মধ্যপ্রবাহে এবং নিম্ন প্রবাহে নদী যে প্রধান কাজগুলো করে।

CONTENT MANAGER

Sattar Uddin SohelSattar Uddin Sohel